দেশে দেশে রুদ্ধশ্বাসে বাংলাদেশি প্রবাসীরা

বিশেষ প্রতিনিধি : বিশ্বের প্রায় সব প্রান্তেই চরম দুর্দশায় বাংলাদেশি প্রবাসীরা। উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম মেরুর কোথাও কোথাও তা মাত্রা ছাড়ানো। সৌদি আরবে ১২ ক্ষেত্রে প্রবাসীদের নিয়োগ নিষিদ্ধের পর হঠাৎ কর্মহীন হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের হাজার হাজার শ্রমিক। অনেক বাংলাদেশি না খেয়ে কিংবা এক বেলা খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। দেশটিতে প্রবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যা দেশে দেশে রুদ্ধশ্বাসে প্রচুর। তাদের মধ্যে বেশি শোচনীয় দশায় নির্মাণ শ্রমিকরা। অনেক প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের হঠাৎ ছাঁটাই করা হয়েছে। কোনো কোনোটিতে ছাঁটাই না করলেও মাসের পর মাস বেতন বন্ধ। তার ওপর তারা বাইরেও যেতে পারছে না। বের হলেই নানা রকম কর, জরিমানার খড়্্গ। এরই মধ্যে বাসায় ঢুকে নিরপরাধ বাঙালিদের সৌদি পুলিশ ধরে নিতেও শুরু করেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজারে ৩০ লাখেরও বেশি প্রবাসী। সৌদি সরকারের নতুন নতুন নিয়মের নীতিকলে নাস্তানাবুদ অবস্থা বাংলাদেশিদের। দেশটিতে এখন আর থাকা অসম্ভব হওয়ায় নিরুপায় হয়ে দেশে ফিরতে হবে অনেককে। এরই মধ্যে জেদ্দায় বাদশা আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবাসীদের সরিয়ে ১ হাজার ৫০০ সৌদি নাগরিককে নিয়োগ দেওয়া হবে।

সৌদি আরবের তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশটির কর্মক্ষেত্র সৌদিকরণের উদ্দেশ্যে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেখানে ১৮ মার্চ থেকে কার রেন্টাল সেক্টরে প্রবাসীদের কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। কোনো প্রবাসীকে কার রেন্টাল অফিসে কর্মরত অবস্থায় পেলে তাৎক্ষণিক ২০ হাজার রিয়াল জরিমানা করা হবে। পরিবার-পরিজন নিয়ে সৌদিতে অবস্থানকারী প্রবাসীরা পড়েছেন বাড়তি ভোগান্তিতে। সৌদির বিভিন্ন স্কুল-কলেজে অধ্যয়নরত তাদের সন্তানদের পড়াশোনা মাঝপথে বন্ধ হওয়ার উপক্রম।

দেশটিতে আন্তর্জাতিক স্কুলগুলোর মার্চের সমাপনী পরীক্ষার মধ্য দিয়ে বন্ধ হতে চলেছে হাজার হাজার সৌদিপ্রবাসী ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া। সৌদি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেশটিতে ছোট-বড় আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রায় ৭৫টি দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ৩৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক ও দুটি বাংলাদেশি। এসব স্কুলে পড়ছে হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী।

এদিকে বিদেশি শ্রমিক কমানোর কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কুয়েতও। এর মধ্যে রয়েছে বৈধ বা অবৈধ দুই ধরনের অভিবাসীই। সেই লক্ষ্যে আবারো ২০ ও ১৮ নং ভিসায় বহু বাংলাদেশিকে নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। জিটিসিভুক্ত যেকোনো দেশ থেকে বহিষ্কৃত বাংলাদেশি কোনোভাবেই কুয়েতে ঢুকতে পারবে না। সেখানে শুধু আগে থেকে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকেরা সরকারি চুক্তির ভিত্তিতে অথবা খামার শ্রমিকের কাজে যেতে পারবে। বহিষ্কৃতদের রুখতে তাদের ডাটাবেজের আওতায় আনতে জিসিসি দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে।

ভিসা জটিলতায় অবৈধ হয়ে যাওয়া বাংলাদেশি প্রবাসীদের এখন কুয়েত ছাড়াই নিরাপদ। নইলে ২২ এপ্রিলের পর কঠিন অবস্থায় পড়তে হবে তাদের। তখন তারা জিটিসি অন্তর্ভুক্ত অন্য কোনো দেশেও যেতে পারবে না। এ অবস্থায় এরই মধ্যে বাংলাদেশিসহ ৪৬ হাজার বিভিন্ন দেশের প্রবাসী কুয়েত ছেড়েছে। কুয়েতে বসবাসকারী প্রতি তিনজন অবৈধ অভিবাসীর মধ্যে একজন সরকার ঘোষিত সাধারণ ক্ষমার সুযোগ নিয়েছেন। এর মোট সংখ্যা প্রায় ৪৭ হাজার। এরা হয়তো সাধারণ ক্ষমার সুযোগ নিয়ে বৈধ হয়েছেন না হয় কুয়েত ছেড়ে চলে গেছেন। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আবাসিক নিয়ম লঙ্ঘনকারীর সবচেয়ে বেশি মানুষের তালিকাভুক্ত করেছে বাংলাদেশসহ পাঁচটি দেশকে।

এদিকে ইতালিতে অবৈধ হওয়ার শঙ্কায় ভুগছে হাজার হাজার বাংলাদেশি। রোমে বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিলান কন্স্যুলেট অফিসে আটকে আছে প্রায় তিন হাজার পাসপোর্ট। এর সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর নেই দূতাবাস এবং কনস্যুলেট অফিসে। এদিকে নতুন পদ্ধতিতে তৈরি মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) না থাকায় অবৈধ হওয়ার আতঙ্কে অনেক বাংলাদেশি।

কারণ ইতালির আইন অনুযায়ী এমআরপি ছাড়া কোনো প্রবাসী বৈধতা পায় না। এর বাইরে পাসপোর্ট রিনিউ করতে যেসব প্রবাসী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দূতাবাসে জমা দিয়ে সেগুলো ফেরত পাচ্ছেন না ঠিকভাবে। এছাড়া গত পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে ইতালির শ্রমবাজারে বাংলাদেশ কালো তালিকাভুক্ত। এ কারণে প্রতিবছর মৌসুমি ভিসা থেকে বাংলাদেশ বাদ পড়েই যাচ্ছে। এ অবস্থায় পাসপোর্ট সমস্যা দ্রুত সমাধান না হলে বাংলাদেশের জন্য সব ধরনের ভিসা-প্রক্রিয়া বন্ধ করে দিতে পারে ইতালি সরকার।

নানা আশ্বাস ও সুখবর শোনানো হলেও মালয়েশিয়ায় প্রবাসীদের যাতনা আরো বেড়েছে। বাংলাদেশ দূতাবাসে ট্রাভেল পারমিট (টিপি) ইস্যুতে করারোপ করা হলেও থেমে নেই দালালরা। যত্রতত্র গড়ে উঠেছে টিপি করে দেওয়ার নামে দালালি অফিস। ওইসব অফিস ফেসবুক আইডি খুলে ওয়ালে ট্রাভেল পারমিট করে দেওয়ার নামে শ্রমিকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার রিঙ্গিত। প্রতিদিন মালয়েশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নানা কারণে অবৈধ হয়ে পড়া শ্রমিকেরা ট্রাভেল পাস নিতে ভোরবেলা থেকেই বাংলাদেশ হাইকমিশনে এসে ভিড় জমান। এদের মধ্যে অনেকেই প্রত্যাশিত ট্রাভেল পাস সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়ে বিকেলে কোনো রকমে পুলিশি গ্রেফতার এড়িয়ে ফিরে যাচ্ছে।

বাংলাদেশি প্রবাসীদের দুর্গতি মালদ্বীপেও। দেশটিতে সাড়ে তিন লাখ নাগরিকের মধ্যে এখন লাখ খানেকই বাংলাদেশি। তারা কেউ ব্যবসা করছেন, কেউ কাজ করছেন হোটেল- রেস্টুরেন্টে। বিভিন্ন দোকানেও কাজ করছেন অনেকে। দেশটি পর্যটকদের জন্য সুন্দর হলেও শ্রমিকদের জন্য কষ্টের। বিশেষ করে, হোটেল ও সামুদ্রিক ইয়োটে বাংলাদেশি শ্রমিকদের দৈনিক ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। তার ওপর সাপ্তাহিক ছুটি নেই। এত পরিশ্রমেও বেতন মাসিক বাংলাদেশি টাকায় ৯-১০ হাজার টাকা। ৫-৬ লাখ টাকা খরচ করে মালদ্বীপে গিয়ে খরচের টাকাও তোলা যায় না।

এত দিন অনেকটা নিঃশব্দে কাজ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে এগোতে থাকলেও দক্ষিণ আফ্রিকায় সম্প্রতি উৎকণ্ঠায় বাংলাদেশিরা। সেখানে প্রায়ই হামলার শিকার হচ্ছে তারা। গত ৮ মার্চ স্থানীয় একটি বাংলাদেশি দোকানে হত্যা করা হয় এক বাংলাদেশিকে। মাঝেমধ্যেই এ ধরনের হামলায় বেশ আতঙ্কে প্রবাসীরা। নানা ধরনের হামলার পাশাপাশি মুদ্রাস্ফীতির কারণে ইদানীং দেশটিতে ব্যবসা-বাণিজ্যও ভালো যাচ্ছে না। ভাগ্য গড়তে বিভিন্ন সময় দক্ষিণ আফ্রিকায় গেছেন ২০ লাখেরও বেশি অভিবাসী। কিন্তু তাদের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকায় জীবন কঠিন হয়ে পড়েছে। সেখানকার কালোরা বাংলাদেশিদের উত্থানে ভীত। বহিরাগত বিশেষত বাংলাদেশিদের চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে সবকিছুতেই থাবা বসাচ্ছে তারা। সম্প্রতি তা মাত্রা ছাড়ানো পর্যায়ে।