ধর্ম এবং রাষ্ট্রধর্ম প্রসঙ্গে একটি মতবিনিময়

মাহমুদ রেজা চৌধুরী : বিষয়টা নিয়ে কোনো তর্ক বা আলোচনাকে মনে করি নিজের এবং অন্যের সময় নষ্ট করা অনেকটাই। আমার মতো নির্বোধেরা এ রকম ‘সময়’ অনেকবারই নষ্ট করি।
ধর্ম এবং রাষ্ট্রধর্ম। এই বিষয় বা প্রতিপাদ্য দুটোই মূলত পলিটিক্যালি ‘ইল মোটিভেটেড‘। ক্ষুদ্র একপ্রকার শ্রেণিস্বার্থকেন্দ্রিক। এর পেছনে রাষ্ট্রের কোনো সর্বজনীন কল্যাণমূলক চিন্তা নেই। অগ্রাধিকার পায় রাষ্ট্রের বিভক্তি এবং শাসকদের দলীয় স্বার্থের চিন্তা। ‘শ্রেণিস্বার্থের’ একটা বিশেষ ‘কু-উদ্দেশ্য’ থাকে এসবের পেছনে।
বাংলাদেশে যখন রাষ্ট্রধর্ম সংবিধানে ছিল না এবং যখন এটা যোগ হলো, এর পেছনে সত্যিকারের কোনো ধর্মীয় আনুগত্যতা, ভালোবাসা, পছন্দ-অপছন্দ নেই। আছে রাজনৈতিক চক্রান্তের ইচ্ছা বা খেলা। তাই কখনো যদি বিষয়টাকে উপড়ে ফেলাও হয়, সেটার পেছনেও ‘ধর্মবিদ্বেষ’ অথবা কোনো ‘ধর্মপ্রীতি’ এসবের কিছু অগ্রাধিকার নাও পেতে পারে। অগ্রাধিকার পেতে পারে রাজনৈতিক ক্ষুদ্র স্বার্থ বা রাজনৈতিক বিভক্তির চেষ্টা। ধর্মকে নিয়ে যারা অপরাজনীতি করেন, এটা তাদের প্রধান একটা উদ্দেশ্য।
এই চেষ্টাটা বাংলাদেশের শাসকদের অগ্রাধিকার বিষয়ের একটি অন্যতম। পাশাপাশি অস্বীকার করা কঠিন যে বর্তমান বিশ্বরাজনীতির ভেতরে হিংসা-প্রতিহিংসার জাল বিস্তারের শক্তিশালী একটা মাধ্যম হচ্ছে মানুষের ধর্মবিশ্বাস নিয়ে বিভক্তি সৃষ্টি। বাংলাদেশ এই চক্র এবং জালের বাইরে নয়। কেউ এর পক্ষে কেউবা বিপক্ষে। এখানে ধর্মবিশ্বাস অথবা অবিশ্বাসের চাইতেও বেশি কাজ করছে ধর্মকে ব্যবহার করে অগণতান্ত্রিক শক্তি এবং শাসকশ্রেণির আয়ু বাড়ানোর চেষ্টা।
বাংলাদেশের সংবিধান থেকে কথিত রাষ্ট্রধর্ম উঠিয়ে দিলেও ধর্মবিশ্বাসীদের ধর্মের প্রতি বিশ্বাস কমে যাবে না অথবা বাড়বেও না। যখন আমাদের সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম বলে কিছু ছিল না, তখন কি ধর্ম অনুসারীদের সংখ্যা কমে গিয়েছিল? তাই এটা না থাকলেও কিছুই যায়-আসে না বা আসবেও না।
তবু কেন এটা নিয়ে কথা ওঠে মাঝেমধ্যে? আমার মতো মূর্খরাই এসব নিয়ে হয়তো কখনো কখনো উত্তেজিত হই, উত্তেজনার কারণে পরনের প্যান্ট কখনো নিচে নামাই বা ওপরে ওঠাই। জ্ঞানীরা কিন্তু এই কাজ করেন না। তারা যেটা করেন, নীরবে করেন।
কখনো যদি কোনো কারণে শরীরে ইনজেকশন দিতে যাই, কোনো নার্স আছেন সুন্দরভাবে দেন যে বুঝতেই পারি না শরীরের ভেতরে ‘সুই‘ গেল। আবার অনেক নার্স আছেন, যারা এমনভাবে ছোট্ট সুই হলেও শরীরের ভেতর প্রবেশ করান, ব্যথা পাওয়া যায়।
সমাজে অনেক বুদ্ধিজীবী ও পণ্ডিত আছেন, যারা সমাজের মানুষের বুদ্ধি, চিন্তা, বিবেক এবং ব্যক্তির দৃষ্টি মনোভাবের ভেতরে এমন দক্ষভাবে কোনো কোনো সংক্রামক ব্যাধি বা রোগের ভ্যাকসিন ইনজেক্ট করেন, যেটার কষ্ট তাৎক্ষণিক বুঝতে না পারলেও পরে অনেক ব্যথা হয়। কিন্তু এর মধ্যে তো সুই চিকন হলেও ঢুকে তো গেছে। এখন ব্যথা হলে চট করে কি আর ব্যথা যাবে? স্বাধীনতার পরপরই এ রকম অনেক চিকন সুই আমাদের দেহে ও মস্তিষ্কে ঢোকানো হয়েছে।
আমাদের সমাজেই শুধু নয়, বিশ্বের অনেক সমাজেই অনেক গুণী ব্যক্তি আছেন, যারা সমাজের ভেতর মানুষের সহজাত যেকোনো বিশ্বাস, বিশেষ করে ধর্ম নিয়ে এবং ধর্মের কৃষ্টিবোধকে নিয়ে কখনো কখনো এমন সব কথা বলেন, যা মানুষকে বিভ্রান্ত করে বেশি কিন্তু মানুষের হৃদয়ের প্রত্যয় অথবা সেই বিশ্বাস থেকে মানুষকে এক ইঞ্চিও সরাতে বা নড়াতে পারেন না এবং পারবেনও না।
কেউ কেউ যারা নিজের ধর্মবিশ্বাস থেকে সরেন কিংবা সরে আসেন, সেটা তাদের ধর্মের ব্যাপারে বিশ্বাস নয়, কিন্তু বিশ্বাসের ব্যাপারে তাদের দোদুল্যমানতাই ক্রিয়াশীল হয়। পাশাপাশি কারো কারোর জাগতিক এবং বৈষয়িক তাৎক্ষণিক কিছু অর্জনের অদম্য ইচ্ছা থেকে হয়। সব ধর্মই যেখানে বলে বল্গাহীন চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণ করতে, জাগতিক চাহিদা সেখানে বলে নগদ যা পাও হাত পেতে নাও। একটাই তো জীবন। এখানে বিশ্বাসের সাথে অথবা দৃশ্যত চাওয়া-পাওয়ার সাথে অদৃশ্য মনের নীতিনৈতিকতার একটা অদৃষ্টিগত দ্বন্দ্ব শুরু হয়। সে কারণে ধর্মটা অনেকেরই অপছন্দের।
বিভিন্ন সময়ে আমরা কোনো মানুষকে যখন ধর্মান্তরিত হতে দেখি, অধিকাংশই নিজেদের ধর্মের বিষয়ে ‘বিশ্বাসী’ যতটা না, তার চেয়ে বেশি ব্যক্তি তার নিজের ধর্মবিশ্বাসে অথবা অবিশ্বাসে সংশয়ী বা দোদুল্যমানতা থেকে নিজের ধর্ম ছেড়ে অন্য কোনো ধর্ম গ্রহণ করি বা করেন। অথবা ধর্ম ব্যাপারটা থেকেই দূরে সরে যাই বা যান। কিন্তু যারা ধর্মের ব্যাপারে বিশ্বাসী এবং তার বিশ্বাস অনুযায়ী সেটা চর্চা করেন, তারা কখনো যে ধর্মেই হন না কেন, ওখান থেকে বিচ্যুত হন না।
রাষ্ট্র নামের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের অবয়বে সাংবিধানিক আদর্শ কখন কার নামে বা কীভাবে লিখিত হলো, ‘ম্যাটার, জিরো’ যদি না সেটা অনুসারিত বা চর্চা না হয়, গণতান্ত্রিক না হয়।
পৃথিবীতে রাজা আসে রাজা চলে যান। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আজকের রাজার সাথে রাজার রাষ্ট্রনীতিও মুছে যায়। বাংলাদেশে রাজতন্ত্র বা গণতন্ত্র যা-ই বলি, নীতি বদলে যাওয়ার একাধিক নিদর্শন আছে। আবারও যদি কোনো নীতির পরিবর্তন হয়, বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই বা হবেও না।
তবে ‘মব প্রতিক্রিয়া’ বলতে একটা ব্যাপার আছে, ওটা ধর্ম নিয়ে হলেও ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে এখনো বেশ স্পর্শকাতর বলা যায়। কেবল বাংলাদেশ বলব কেন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, পাকিস্তানÑএসব দেশেও ধর্ম নিয়ে স্পর্শকাতরতা আছে। এই মৌচাকে ঢিল ছুড়ে মৌমাছির কামড় থেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন।
আমরা যারা মুখে ধর্মের ব্যাপারে একধরনের স্পর্শকাতরতা নিয়ে ভাবি অথবা যখন কেউ বলি, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’Ñএ ধরনের আজগুবি কথা, সেই প্রতিক্রিয়ার পক্ষে-বিপক্ষে ‘মব মনোভাব’ আছে। ভিন্ন রকমের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াও আছে। বিষয়টাও আরেকটা চিন্তার বিষয়।
বাংলাদেশে সামরিক প্রধানেরা যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তারা ধর্মকে নিয়ে খেলাধুলা করতে চেয়েছেন এবং পেরেছেন। সিভিল কোনো সরকার অথবা তথাকথিত গণতন্ত্রের নামের কোনো সরকার ইচ্ছা করলেই সে রকম খেলাধুলা খুব সহজভাবে করতে পারবে কি না, সন্দেহ আছে। যদি ক্ষমতার অশুভ কোনো শক্তির বা স্বার্থের কারণে এবং গণতন্ত্রের নামে স্বৈরতন্ত্র অথবা স্বেচ্ছাচার চর্চার কারণে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠদের কোনো রকম স্পর্শকাতরতা নিয়ে এদিক-সেদিক করতে কেউ চেষ্টা করি অথবা করেন, ফলাফলটা কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারব বা পারবেন, সন্দেহ আছে। আর যদি পারি বা পারেনও তারও একটা ‘প্রাইস’ বা ‘মূল্য’ দিতে হতেও পারে। সেটা আজ হোক, কাল অথবা পরশু। একটি কারণ, নির্দিষ্ট কোনো জনগোষ্ঠীর সহজ, স্বাভাবিক, স্বতঃস্ফূর্ত কোনো বিশ্বাস এবং সেই বিশ্বাসের কৃষ্টিকে শাসকগোষ্ঠী চাইলেই বাতাসের বিপরীতে খুব বেশি দিন ধরে রাখতে পারে কি? ভারত উপমহাদেশে এ রকম কোনো দৃষ্টান্ত নেই। পারলেও সেখানে অস্থিরতা, জীবনের অনিরাপত্তা এবং সহবাস অবস্থানের চর্চা, পরমতসহিষ্ণুতা, গণতন্ত্রÑএসব ব্যাপারে পারস্পরিক বিদ্বেষ, বিশৃঙ্খলা ও অবিচার বাড়বে। ইতিহাসে এর দৃষ্টান্ত আছে, ছিল এবং থাকবে।
বাংলাদেশে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা নাকি বাড়ছে। এ রকম কিছু অজুহাত তুলে মাঝেমধ্যে কিছু বুদ্ধিজীবী অনেক সময় গলাবাজি করেন। হাতের আঙুল নাড়াচাড়া করেন। তাদের এটা অন্তত মনে রাখার কথা যে বাংলাদেশে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক সুসম্পর্ক পৃথিবীতে এখনো অনেক দেশের কাছে অনুসরণীয়। চেষ্টা হয়েছে এখানে বহুবার এটা নিয়ে নানা রকম বিভ্রান্তি ও বিভেদ ছড়াতে। এখনো যা সফল হয়নি, ভবিষ্যতে হবে কি না, জানি না। এককালীন রাষ্ট্র পাকিস্তান আমাদের নিয়ে একই চেষ্টা করেছিল। ফলাফল কী হয়েছে বলার অপেক্ষা রাখে কি।
বাংলাদেশে ধর্মীয় ডেমোগ্রাফিতে ধর্মীয় জনসংখ্যা কাদের কত? মুসলমানদের সংখ্যাটা যে বেশি, অস্বীকার করার উপায় নেই। যেমন ভারতে হিন্দুদের সংখ্যা অস্বীকার করা যাবে কি! ভারতে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা হয় কি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো কথিত ধর্মনিরপেক্ষ দেশেও খ্রিষ্টধর্মের আধিপত্য যে রকম বাস্তবে আছে এবং এর যে বিস্তার আছে, এই বিষয়টকেও কি অস্বীকার করা অথবা সামান্যভাবে দেখার উপায় আছে? না এর কোনো শাসক প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী এটাকে বিপরীত ধারায় প্রবাহিত করতে চান বা সে রকম কিছু চেয়ে সফল হয়েছেন, সেটাও বলা যাবে না।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে বাইবেলে হাত রেখেই কিন্তু প্রেসিডেন্টের শপথ নেন। তখন কোনো ধরনের ধর্মনিরপেক্ষতার অথবা আমেরিকার অন্য কোনো ধর্মের অগ্রাধিকারের প্রশ্ন কিন্তু ওঠে না, ওঠানোর সাহস কারোর নেই, কালচার নেই। অতএব, কোনো মুসলিম অধিকাংশ জনসংখ্যার দেশে তাদের নিজেদের ধর্মের প্রতি একটা দৃঢ়তা থাকতেই পারে। এটাকে খাটো করে দেখার কিংবা উপেক্ষা করার সংস্কৃতিকে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বলা যায় না।
বাংলাদেশের প্রতিটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে শুধু কোরআন তিলাওয়াত হয় না; গীতা, বাইবেল, ত্রিপিটকÑএসব ধর্মগ্রন্থ থেকেও পড়া হয়। এ রকম অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পৃথিবীতে কটা আছে। আমাদের পাশের দেশ ভারতের রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠানেও পবিত্র কোরআনের তেলাওয়াত হয় কি?
বাংলাদেশে যেসব অবিচার, অত্যাচার, অন্যায় আর জুলুম হয় এবং হয়েছে, সংখ্যানুপাতে সেটা মুসলমানদের ওপর বেশি হয়, হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। কিন্তু কোথাও বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজের কারো সে ব্যাপারে তো কোনো হাই জাম্প, লং জাম্প দিতে দেখি না। বাংলাদেশে অনেক মুসলিম কৃষকের ওপর, শ্রমিকের ওপর, দিন আনে দিন খায় মানুষের ওপর, নিম্ন আয়ের ভুক্তভোগী মানুষের ওপর অবিচার-অত্যাচার প্রতিদিন কোনো অংশেই কম হচ্ছে না। অতীতেও হয়নি, ইতিহাস কি বলে! ভাবার বিষয় বৈকি।
একসময়ের মুসলিম জমিদার তাদের মুসলিম প্রজাদের ওপরও শোষণ করত এবং করেছে। সেটা কি কোনো অংশে কমেছে? তবে আদিকালের জমিদারের জায়গায় এখন ‘মাস্তান’ এবং দলীয় জমিদারের সংখ্যা বেড়েছে। তারা হিন্দু না মুসলিম জিজ্ঞাসে কোন জন! ওরা ক্ষমতাবান, ওরা প্রভাবশালী ও শক্তিশালী। এটাই ওদের বড় ধর্ম। অস্বীকার করতে পারি কি? এদের আরেকটি ধর্ম হলো ‘লুটেপুটে খা’। এটা পুঁটি মাছ বা রুই মাছÑযেটাই হোক।
সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় শোষণের বিষয়টাও কিন্তু ‘ধর্মীয়’ নয়। এটাও মূলত বাহ্যিক ‘ক্ষমতা’ শক্তির মহড়া। এর পেছনে কাজ করে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য। বিষয়টা বুদ্ধিজীবীরাও জানেন না তা কিন্তু না। তবে বাস্তবতায় তারা এই ব্যাপারটাতে অসম্ভব রকম নীরব। কিন্তু অন্য কোনো ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর ব্যাপারে কিছু হলেই ওনাদের গায়ের চামড়া থেকে শুরু করে পরনের পায়জামা অথবা প্যান্ট যেন ওঠানামা করতে শুরু করে। কেন? গণতন্ত্রে যদি একটি মানুষেরও ন্যায্য অধিকার যুক্তিযুক্ত বিবেচিত হয়, সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষদেরও অধিকার এবং কৃষ্টি কেন বা কোন অর্থে যৌক্তিক হবে না, অগ্রাধিকার পাবে না? স্বীকৃতি পাবে না? এই প্রশ্ন তোলার বা করার অবকাশ আছে। তারা কি বলতে চান, তাদের এত বুদ্ধি-জ্ঞান রাখার পরও ওনারা বোঝেন না যে কোনো অন্যায়, অবিচার, অত্যাচার, শোষণ, দুঃশাসনÑএসবের পেছনে ধর্মের ভূমিকার চাইতেও বেশি সুসংগঠিত মানুষের শ্রেণিগত হীন স্বার্থ, ক্ষমতা, শক্তি, প্রভাব, রাজনীতির নামে ধান্দাবাজি, অপরাজনীতি, সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতিÑএই সবকিছু। বর্তমান গ্লোবাল বা বিশ্বের বৈষম্যমূলক রাজনীতির চক্রে আজকের মানুষের ধর্ম ও নীতি-নৈতিকতাবোধ সবকিছু যেন মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।
রাজনীতি যখন গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যের আলোকে পরিচালিত ও আলোকিত হয় এবং রাজনীতি যখন সত্যিকারের রাজনীতিকদের হাতে থাকে, তখন এসব ‘অপশক্তি’ আপনাতেই সমাজ ও রাষ্ট্রে নিষ্ক্রিয় হয়। এ কারণে কোনো ধর্ম নয় বা রাষ্ট্রধর্ম নয়, সবকিছুর আগে প্রয়োজন ‘গণতন্ত্রকে’ সুনিশ্চিত করা। গত পাঁচ দশকে আমরা সেখানে কতটুকুবা অগ্রসরমান হতে পেরেছি, ভাবার বিষয় আছে। প্রকৃত গণতন্ত্র কোনো ধর্মের অন্তরায় নয়। ধর্ম গণতন্ত্রের একটি শক্তিশালী হাত। সেই হাতের সঠিক ব্যবহারটা জানতে হবে। এখানে কবি রুমির একটি কবিতার সারাংশ বলছি। দার্শনিক ও কবি রুমি তার এক কবিতায় বলেছেন, ‘আকাশ থেকে যখন বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে, সেটা যদি কোনো পরিষ্কার হাতে পড়ে, সেই বৃষ্টির পানি নিশ্চিন্তে পান করা যায়। সেই পানি যদি নর্দমায় পড়ে, সেই পানি দিয়ে তখন পা-ও ধোয়া যাবে না। সেই পানি যদি উত্তপ্ত জমির ওপর পড়ে, ভূমিতে তখন শস্য ফলতে পারে। পদ্ম পাতার ওপর পড়লে সেটা তখন মুক্তার মতো মনে হতে পারে।’ এই কথার অর্থ হলো, একই পানির ফোঁটা, কিন্তু কোথায় সেটা পড়ছে সেটাই মূল কথা।
আমাদের সমাজে যারা ধর্ম, ধর্মনিরপেক্ষতা, রাষ্ট্রধর্ম- এসব নিয়ে অথবা এর পক্ষে-বিপক্ষে নানা রকম মেসেজ দিতে থাকি বা থাকেন, একই সময় আমাদের কেবল সেই মেসেজ দেখলে বা শুনলেই হবে না, মেসেঞ্জার কে এটাও ভাবার বিষয়। এই ভাবনাগুলোকে দৃষ্টির আড়ালে বা অন্তরালে রাখার জন্য যত রকম কুতর্কের বিষয় আছে, সেগুলোকেই আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। দুশ্চিন্তার কারণ এখানেই। সম্প্রতি বাংলাদেশে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ নিয়ে যে কোথাও কোথাও এখন কারো কারোর ভেতরে শিয়ালের ‘হুক্কাহুয়া’ শোনা যায় বা এ রকম কিছু নাকি শুরু হয়েছে, উদ্দেশ্যটা আসলে কী?
থলের ভেতরের বিড়ালটার রং কী। বোঝার বিষয় আছে। কাউকে কাউকে বোকা বানানো সহজ কিন্তু সবাইকে কি বোকা বানানো যায়? না সে রকম চেষ্টা করা উচিত? বুদ্ধি-বিবেক, শিক্ষা কী বলে?
বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে যত রকমেরই অন্যায়-অবিচার, খুন-খারাবি এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অপচর্চা হয়েছে এবং যেটা এখনো হচ্ছে, এর পেছনে ধর্ম নয়, ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ এবং ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ক্ষুদ্র শ্রেণিস্বার্থ মেটানোই এর প্রধান একটি উদ্দেশ্য কি না ভেবে দেখার গুরুত্ব আছে বৈকি।
যারা আজকে বাংলাদেশে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার কথা বলেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে সেটা প্রচার করেন, এদের একটা বিশেষ অংশ যতটা নিজে ‘সাম্প্রদায়িক’ তার চেয়ে বড় সাম্প্রদায়িক আর কেউ আছে কি না বিষয়টা বোঝার জন্য ‘রকেট সায়েন্টিস্ট’ হওয়ার বা উচ্চ কোনো শিক্ষাগত ডিগ্রির প্রয়োজন পড়ে না।
বাংলাদেশে দলীয় আনুগত্যে আবেগতাড়িত ‘কিছু টুপিওয়ালা’কে দিয়ে রাষ্ট্রধর্ম বিষয়ে কোরআনে কী বলা অথবা সেখানে কী ব্যাখ্যা আছে বা নেই, মদিনার ভাষণে নবী মুহাম্মদ (সা.) কী বলেছেন অথবা সেখানে কী বলা হয়েছিল বা বলা হয়নিÑএসব আলোচনার ওই সময়ের মেসেজটাই ম্যাটার করবে না কেবল, সাথে সাথে আজকে এর মেসেঞ্জার কারা, এটা ভাবার বিষয় আছে কিন্তু।
রাষ্ট্র ও সমাজে এখন যখন এ রকম বক্তৃতা-আলোচনা শুনি, নিজেকে প্রশ্ন করি, এই ‘নব্য টুপিওয়ালারা’ কোরআনের উদ্ধৃতি যখন দিতে চেষ্টা করেন, তারা কি এটাও জানেন না যে প্রতিটি ধর্মগ্রন্থে মানুষের কল্যাণের জন্য যত যত কথা এবং নির্দেশ অথবা বর্ণনা আছে, যার যার ধর্ম অনুরাগীরাও-বা সেটাও অনুসরণ করেন না নিজেদের ধর্মীয় চর্চাতেও। কেন করেন না, তারও অনেক ব্যাখ্যা আছে। তথাকথিত ধর্মীয় গুরুরা সেই ব্যাখ্যাটা নিয়ে আলোচনা করেন কি না সন্দেহ আছে।
কোরআনে তো রাষ্ট্র পরিচালনার অনেক কথা বলা আছে। কেমন হবে রাষ্ট্র পরিচালনা, কীভাবে রাষ্ট্রের প্রধানেরা রাষ্ট্র ও সমাজে সব নাগরিকের ন্যায্য অধিকার এবং সব নাগরিকের সমান সুনিরাপত্তা বাস্তবায়িত করবেন, সুনিশ্চিত করবেনÑসেটা আজকের কোনো কথিত ধর্মীয় রাষ্ট্র কিংবা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের পরিচালকেরা অথবা নেতা-নেত্রীরা অনুশীলন করেন কতটা। ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ হুজুররা কী বলবেন এ ব্যাপারে।
কথিত মুসলিম অথবা অমুসলিম রাষ্ট্রের কোথাও কি এই সময় সততা বা নীতি-নৈতিকতার চর্চা কতটা-বা হয় এবং হচ্ছে। এর পেছনে কি কোনো ধর্মীয় শক্তির কিংবা বিশ্বাসের ভূমিকা বেশি, নাকি সমাজ ও রাষ্ট্রের শাসকশ্রেণির স্বেচ্ছাচারিতা এবং স্বৈরতন্ত্র ‘ক্ষমতার’ শক্তি বেশি ক্রিয়াশীল।
সৌদি আরব থেকে শুরু করে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান, সাথে মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপ কিংবা আমেরিকার রাজনীতিতেও গণতন্ত্র আজ ভিশন রকম চ্যালেঞ্জের মুখে। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চাহিদা এবং গুরুত্ব থেকে সাধারণ নাগরিকদের দৃষ্টিকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা বিশ্বে আজ সর্বত্রই বেশি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করছে। অস্বীকার করা যাবে কি?
কোন দেশে কে টুপি বা ধুতি পরে অথবা স্যুটেড-বুটেড হয়ে কিছু বললেই যে সেটা স্বতঃসিদ্ধ হবে, তাও কি সত্যি? এই শ্রেণিদের নিজস্ব ‘শ্রেণিস্বার্থ’ এবং রাজনীতিটাকেও বোঝার গুরুত্ব আছে। কেবল পোশাকের ধর্মে যে জ্ঞান কিংবা অজ্ঞানতার মাতোয়ারা, সেটাও আরেক ভিন্ন অপরাজনীতি। মানুষের পোশাক দেখে যেন মানুষের মানবধর্ম এবং তার অন্তরের ধর্মকে ভুল না বুঝি।
বাংলাদেশে নব্য টুপিওয়ালাদের একাংশ দলীয় রাজনীতির সাথে কখনো ‘হাডুডু’ খেলেন, কখনো দাবা কিংবা লুডু খেলেন। এখন তো বাংলাদেশে প্রতিদিনই দলীয় ‘তেলাওয়াত’ শুনি। নেতা-নেত্রীদের দলীয় ওয়াজ মাহফিল ভার্চুয়ালিও হচ্ছে। থেমে নেই এরা কেউ আজকে ঘরে বা বাইরে, কোথাও।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন নির্বাচনে এই ওয়াজ শুনতে পাওয়া যায় রিপাবলিকান দলের জাতীয় কনভেনশনে, যেখানে হুজুর ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথাও মার্কিন নাগরিকেরা শোনেন। পবিত্র বাইবেল হাতে নিয়ে ফটো শো করলেই কি ধর্মপ্রেমিক হওয়া যায়? কলিকাল কী বলে?
কখনো কোনো ধর্মকে আমরা যারা সমালোচনা করি অথবা অপমান করতে চেষ্টা করি, এই শ্রেণির আমরা অনেকেই অধিকাংশ সময়ই যখন যেমন, তখন তেমন। তথাকথিত জাতীয় মসজিদ ‘বায়তুল মোকাররম’ মসজিদে দলীয় ওয়াজ হয়। আগেও হতো। এটা হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের অনেকের ধর্মীয় একধরনের ‘থিংক ট্যাংক’। এখানকার অনেক ইমামের কথায় বিভ্রান্ত হলে না বোঝা যাবে ইসলাম কী, না বোঝা যাবে ইসলাম কী বলে, আমরা-বা কী করি।
পরিশেষে বলব, বাংলাদেশে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ নামে কিছু রাখার আদৌ কি প্রয়োজন অথবা আদৌ এই নামে কিছু রাখার যৌক্তিকতা আছে? বিষয়টা আমরা সবাই যেন একটু মাথা ঠান্ডা রেখে ভাবতে চেষ্টা করি। আবেগ দিয়ে নয়, এটা যুক্তি দিয়ে বোঝার ব্যাপার। কিছু টুপিওয়ালার দলীয় স্বার্থের ওয়াজ না শুনে প্রত্যেকের এ বিষয়ে নিজেদের পড়াশোনা এবং সভ্যতার ইতিহাস পড়াকে যেন বেশি গুরুত্ব দিতে পারি।
আদৌ কি এতে কোনো ধর্মের অথবা ইসলাম ধর্মেরও কিছু যায়-আসে? এ বিষয়ে যত বেশি পড়াশোনা করব ততই নিজেরা নিজেদের আলোকিত করতে পারব। তর্কের কোনো প্রয়োজনই নেই, যদি পড়াশোনা থাকে। আর গণতন্ত্রের প্রতি সম্মান নিয়ে যদি কথা বলতে চাই, অবশ্যই এ দেশের কোনো পরিবর্তন সেটা সাংবিধানিক হোক কিংবা শাসকের ইচ্ছা বা কোনো বিশেষ শ্রেণির স্বপ্ন বিলাস হোক, সে রকম কোনো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে ‘গণভোট’ হওয়াটা জরুরি। কিন্তু আমাদের দেশে এখন অনেক দেশের মতোই ‘ভোট’ বিষয়টি কাজ করে না। এখন তো রাতের অন্ধকারে ভোট, চাপার জোরে ভোট, গুম ভয়ের ভোট। বিপরীত মতাবলম্বীদের জেলে ঢুকিয়ে ভোট। এর সাথে যুক্ত হচ্ছে এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট মি. ডোনাল্ড ট্রাম্পের চরম অসত্য এবং বিভ্রান্তিমূলক কথাবার্তা এবং আচার-আচরণে নাগরিকের ভোটাধিকারকে বিভ্রান্ত করে গায়ের জোরে ভোটে জেতার চেষ্টা।
অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজের ভাষায় যেটা ভয়ের সংস্কৃতির বিস্তৃতি, এমন পরিবেশে ভোট হয়। তাই ‘গণভোট’ও যে কাজ করবে, ভরসা কোথায়!
রাজা আসবেন, রাজা বিদায় হবেন অথবা বিদায় নেবেন। রাজার সাথে তার এবং ‘তাদের’ নীতিও বদলে যাবে। অতীতেও গেছে। ভবিষ্যতে আবার সে রকমই যে হবে না, বলি-বা কী করে। তখন কিন্তু অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। এর পেছনে যদি হীন কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকেও থাকে, সেটা বাস্তব হলেও ধোপে টিকবে না। অসত্যের সাথে লড়াইয়ে সত্য পরাজিত হয় না। দৃশ্যত যদি কোনো পরাজয় ঘটে বা হয়, সেটা ক্ষণস্থায়ী কিংবা কুহেলিকায় পর্যবসিত হয়।
গায়ের জোরে অথবা রাজনীতির অপশক্তিকে ব্যবহার করে কোনো ধর্ম কিংবা সেই ধর্মের আদর্শের নামে সেটা বিক্রি করলে সেটার ‘বায়ার’ বা ক্রেতা অতীতেও সীমিত ছিল, এখনো সীমিত, আগামীতেও এর কোনো সংখ্যা বাড়বে না। তবু কথাগুলো বলা, আমাদের সাময়িক উত্তেজনাকে প্রশমিত রাখার চেষ্টা। তর্ক করে কিছুতে জেতা যায় না, সে কারণেই হয়তো বলা, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর।
পৃথিবীতে প্রায় ৮০০ কোটি মানুষের মধ্যে অধিক সংখ্যকই কোনো না কোনো ধর্মের প্রতি বিশ্বাসী এবং সেটা প্রতিদিন তারা চর্চাও করেন কম-বেশি। যারা যেকোনো ধর্মের ব্যাপারে দোদুল্যমান, সংশয়ী, অশ্রদ্ধাশীলÑএদের সংখ্যা সীমিত। একইভাবে এদেরও পরিবর্তন হবে না, সেটা হওয়ার কোনো চেষ্টাও মূর্খের চেষ্টা হতেও পারে। কারণ মানুষের কিছু কিছু বিশ্বাস ও অবিশ্বাসÑএই দুইয়ের সাথে বিশেষ করে ধর্মবিশ্বাস ও অবিশ্বাসের ব্যাপারে তর্ক অর্থহীন। কারণ এই জায়গাটাতে প্রত্যেকে প্রত্যেকের অবস্থানে আত্মিকভাবেও কমিটেড থাকি।
সে ক্ষেত্রে প্রত্যেকেই আমরা প্রত্যেকের ধর্মবিশ্বাসকে, অন্যের ধর্মীয় সংস্কৃতিকেও সমান শ্রদ্ধার চোখে দেখতে চেষ্টা করব। হীনম্মন্যতা নিয়ে নয়; বিনয়, প্রজ্ঞা, সহনশীলতা দিয়ে। কোনো ধরনের ভয়ের সংস্কৃতি দিয়েও নয়, জ্ঞানের আলোকে দেখতে চেষ্টা করব। সব ধর্মবিশ্বাসের উভয়ের প্রতিই উভয়ের মতান্তরকে মন্বন্তরে যেন না নিয়ে যাই। এটাকেই বলতে পারি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং পারস্পরিক ধর্মীয় শ্রদ্ধাবোধ। শ্রদ্ধাবোধ ব্যতিরেকে ভালোবাসা হয় না, সহনশীলতাও আসে না। সমাজে বা রাষ্ট্রে কোনো সংহতি বা উন্নতিও টেকে না।
কথাটা অপ্রিয় হলেও সত্য, বর্তমান সময়ে ধর্মের সমালোচক অথবা অনাস্থাশীল হই যদি, তখন ততটাই ‘প্রগতিশীল’ বলে পরিচিত হওয়া অথবা স্বীকৃতি পাওয়া সহজ হয় এবং হচ্ছেও। এটাকে উপেক্ষা করতে পারলেও অস্বীকার করতে পারি না। কারণ এটাই বাস্তব। আর বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করতে পারলেও অস্বীকার করব কীভাবে।
বৃষ্টি হলে ছাতা মাথায় দিয়ে ভাবতে হয়তো পারি, বৃষ্টি হচ্ছে না। বৃষ্টি কিন্তু হয়। তাই বলেই তো ছাতা ধরি। এই ছাতা একেকজনের একেক রকমের হতে পারে, তবে বৃষ্টি কিন্তু এক। বৃষ্টিটা বাস্তব। ছাতার রং প্রজাপতির মতো বাহারি হলেও বৃষ্টির রং নেই। মিথ্যার অনেক রং আছে।
কিছুদিন আগে এক বিজ্ঞ বন্ধু লিখেছিল, প্রখ্যাত ভাষাবিদ ও দার্শনিক ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর পেছনে নামাজ আদায় করার সৌভাগ্য হয়েছিল ওর। পরপরই লিখল, ‘দোস্ত, আজ থেকে বুদ্ধিজীবীর খাতা থেকে নামটা হয়তো খসে গেল।’ কারণ কোনো বুদ্ধিজীবী কোনো ধর্ম অনুসরণ করেন, তাও সেটা ইসলাম! তাহলে তো সে বুদ্ধিজীবী থাকতে পারে না অথবা পারল না। এমন একটা ভাবসাব আছে কিন্তু আমাদের সমাজে অনেকের মধ্যে। এটাও অস্বীকার করা যাচ্ছে না। মানবসভ্যতার ইতিহাসে যত অসংখ্য মুসলিম জ্ঞানী, বিজ্ঞানী, আবিষ্কারক, চিকিৎসক, দার্শনিক আছেন এবং ছিলেন, তারা সবাই কি তাহলে অপ্রগতিশীল ছিলেন? যদি অপ্রগতিশীল হয়ে থাকেন, মানবসভ্যতার প্রগতিশীলতায় তাদের অবদান বিশ্বের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে।
অনেক বছর আগের একটা কথা। একজন গুণী ও জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছিলেন, আমাদের বুদ্ধিজীবীদের অনেকেরই মন্দিরে যেতে কোনো অসুবিধা নেই, গির্জায় যেতেও নয় কিন্তু মসজিদে গেলেই বিপদ, সাথে সাথেই বুদ্ধিজীবী তালিকা থেকে সে খালাস হয়ে যেতেও পারে। এদের মধ্যে কেউ কেউ অনেক সময় কারো কারোর জানাজা অথবা মৃত্যুর পরে এবং অনেকেই যে চার দিনের অনুষ্ঠান করেন, ওখানেও যান। কখনো কখনো নিজে যদি মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করেন, তখন বলেন, ভাই, দোয়া করেন। এটা কেন বলেন, কে জানে। যেটাতে বিশ্বাস নেই, সেটা কোনো সংস্কৃতিতে থাকতে পারে কি না, ভাবায় বৈকি। আর যেটাতে বিশ্বাস আছে, সেটা রাজনীতি, রাষ্ট্র ও সংস্কৃতি সব জায়গাতেই স্থান পেতে পারে। এই স্থান পাওয়ার ব্যাপারটা রাজনৈতিক স্বীকৃতি কিংবা অস্বীকৃতি পাওয়ার অনেক উপরে।
সে কারণেই বলি, আজ একটি বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহল বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের ধর্মানুভূতি নিয়ে একরকম অসম্মান অথবা অবজ্ঞা করার চেষ্টা করেন বা কেউ যদি করি, সেই চেষ্টাতে যদি সফল হই। মনে রাখতেই হবে, রাজা আসে, রাজা চলে যায় বা যান। সাথে রাজার নীতি, সেটা যদি কোনো জনগণের অধিকাংশের বিশ্বাস ও চিন্তার বিপরীত হয়, সেটাও নির্বাসনে যায় বা যাবে।
রাজা কত দিন। রাজার চাইতেও দীর্ঘায়ু পায় সমাজ ও রাষ্ট্র। বাংলাদেশে আজ কোথাও কোথাও নাকি রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে আইন-আদালত পর্যন্ত ঘাঁটাঘাঁটি হচ্ছে। একটি স্বার্থান্বেষী মহল হাত-পা নাড়াচাড়া করছে। উদ্দেশ্যটা কী?
কোনো দেশে কখনো কখনো কোনো ধর্মীয় জনগোষ্ঠী জ্ঞাত বা অজ্ঞাতে অনেক সময় লুক্কায়িত বোমা মাইনের মতো বিস্ফোরক হয়। আমরা যেন সে রকম কোনো বিস্ফোরণ বাংলাদেশে হতে না দিই। আবেগ দিয়ে নয়, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দিয়ে বিষয়টার অগ্রাধিকার এবং এর যথাযোগ্য ব্যবহারে যেন সতর্ক হই। ধর্ম, ধর্মনিরপেক্ষতাÑএসবের তর্ক বা কুযুক্তি উত্থাপন কাদের দ্বারা হচ্ছে এবং কেন হচ্ছে, এর বেনিফিশিয়ারি কারা বা কারা হতে চায় বা চান, বোঝার গুরুত্ব আছে।
বাংলাদেশের প্রত্যেক সচেতন নাগরিক এ ব্যাপারে সচেতন থাকবেন। বাংলাদেশ আমাদের সবার। জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে এর প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার সমান। জীবনের নিশ্চয়তার দাবি সবার সমান। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক নিরাপত্তাÑএই সবকিছুর অধিকারও সবার সমান।
রাষ্ট্র পরিচালক, রাজনীতিবিদ এবং এর পাশে বাংলাদেশের সকল বুদ্ধিবৃত্তিক গুণীজন ও সব নাগরিকের আগামী বাংলাদেশে সব রকম বৈষম্য, সামাজিক ও রাজনৈতিক অনাচার, অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিরতিহীন সম্ভাব্য সকল প্রকার সাহসী উচ্চারণকে সুস্পষ্ট রাখাটা জরুরি। মুখে, কলমে এবং তরুণদের রাজপথেও।
বাংলাদেশে যেকোনো ধর্মীয় বিভেদ বা ধর্মীয় বৈষম্যের যেকোনো অশুভ কর্মতৎপরতাকে এবং গণতন্ত্রহীনতার যেকোনো অপচেষ্টা ও সম্ভাবনাকেও সীমিত রাখার গণতান্ত্রিক সংগ্রাম আমরা অব্যাহত রাখব। সে কারণে ‘রাষ্ট্রধর্মের’ আলোচনা বা বিতর্কের চাইতেও বড় সমাজ ও রাষ্ট্রে গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা এবং সুপ্রতিষ্ঠিত রাখা।
Ñলেখক : সমাজ ও রাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক।
৩১ আগস্ট ২০২০, নিউইয়র্ক।
Email: [email protected]