নতুনরূপে কিলোগ্রাম বদল ধারণায় মান নয়

বিশ্বচরাচর ডেস্ক : মাপজোখ-বিয়ষক বিজ্ঞানীদের আন্তর্জাতিক সংস্থা ভোটাভুটির মাধ্যমে এক কিলোগ্রাম বাটখারার প্রচলিত সংজ্ঞা বদলে দিয়েছেন। ফ্রান্সে ঐতিহাসিক এ ভোটে ৬০ সদস্যরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তবে কিলোগ্রাম কী- এ ধারণায়ই কেবল বদল এসেছে; পরিমাণে কোনো পরিবর্তন হয়নি। আন্তর্জাতিক ভর ও পরিমাপ সংস্থার এ ধরনের উদ্যোগকে মাপজোকের ইতিহাসে ‘নতুন বিপ্লব’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষত্ব হারাল ‘বড় কে’
কাচের একটা জার, তার ভেতর আরেকটু ছোট জার, তারও ভেতর আরও খানিকটা ছোট জার এবং তার ভেতর ধাতব একটা পি-। ফ্রান্সের সেভারে ল্য গ্রঁদ কে বা ‘বড় কে’ নামে পরিচিত এই পি-টাই এত দিন কিলোগ্রাম বা এক কেজি ভরের মূল মান হিসেবে বিবেচিত হতো। আমি-আপনি বাড়িতে-বাজারে যে বাটখারায় এক কেজি জিনিস মাপি, সেগুলো ওই ‘বিশেষ কে’ (কিলোগ্রামের ‘কে’) নকল কপি।
ফরাসি বিপ্লবের পর ১৭৯৯ সালে কিলোগ্রামের পি-টা ছিল কেবল প্লাটিনামের। ১৮৮৯ সালে তা পাল্টে প্লাটিনাম-ইরিডিয়াম সংকর ধাতু দিয়ে গড়া হয়।
গত ১৬ নভেম্বর ফ্রান্সেরই ভার্সেই নগরে পরিমাপ-বিজ্ঞানীদের ভোটাভুটিতে সেই ‘আদর্শ’ মর্যাদা হারাল প্লাটিনাম-ইরিডিয়াম সংকর ধাতব টুকরোটা। নতুন কিলোগ্রাম এখন ‘প্রাকৃতিক মাপকাঠি’তে মাপা হবে। এর মানে এই নয় যে, পাল্লায় বাটখারাটা এখন বদলে যাবে। এখনো পৃথিবীর ভর আগের মতোইÑ ছয়ের পরে ২৪টা শূন্য বসালে যত হয়, তত কেজিই।
কেন পরিবর্তন
‘বড় কে’ পি-টা যেন কোনোভাবে ধুলাবালি, হাচি-কাশির সংস্পর্শে না আসে, সে জন্য ওরকম ত্রিস্তরী জারের ভেতর পুরে রাখা হতো। কিন্তু দীর্ঘদিনের ব্যবধানে ওটাকে যখন বের করা হয়েছে, দেখা গেছে, কিছুটা ভর হারিয়েছে ধাতব সিলিন্ডারটা। তা হলে হাটবাজারে কেজির যেসব বাটখারা, তাদের বেলায় কী ঘটছে সহজেই তা অনুমেয়।
নতুন মাপকাঠি কী
এখন কিলোগ্রামকে সংজ্ঞায়িত করা হবে প্রকৃতির সাহায্য নিয়ে। প্রয়াত নোবেলজয়ী জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী মাক্স প্লাংকের নামাঙ্কিত একটা ধ্রুবক এ ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা রাখছে। প্লাংকের ধ্রুবক মূলত একটা আলোর শক্তি আর কম্পাঙ্কের সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করে। এর মান অত্যন্ত ছোট। শূন্য দশমিকের পরে ৩৩টা শূন্য বসিয়ে ৬৬২৬০৭০১৫ বসালে যত হয়, তত কিলোগ্রাম বর্গমিটার/সেকেন্ড। এই যে ধ্রুবকটার ভেতর কিলোগ্রাম রয়েছে, ফলে এখান থেকে কিলোগ্রামের নিখুঁত মাপ পাওয়া যায়, যেখানে মানুষের কোনো হাত নেই। প্লাংক ধ্রুবকের সাহায্যে কিলোগ্রামের নতুন সংজ্ঞা নিয়ে গত ১৬ নভেম্বরের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তটি কার্যকর হবে ২০১৯ সালের ২০ মে।
কৃত্রিম থেকে ফের প্রকৃতিতে ফেরা
অন্যান্য মেট্রিক এককের মতো কিলোগ্রাম কিন্তু আগে প্রাকৃতিক মানদ-েই মাপা হয়েছিল। হিমাঙ্কে (শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস) এক লিটার বিশুদ্ধ পানির ভরকে বলা হতো এক কিলোগ্রাম। মিটারও ছিল প্রাকৃতিক একটা মানদ-। এরপর কৃত্রিম মাপকাঠি ‘ল্য গ্রঁদ কে’ ধাতবপি- ছিল কিলোগ্রামের মাপকাঠি। এখন আবার প্রাকৃতিক মাপকাঠিতেই ফিরল বিশ্ব।
কে কিভাবে দেখছেন
আন্তর্জাতিক ভর ও পরিমাপ সংস্থার সাবেক প্রধান টেরি কুইন বলেছেন, ‘সম্ভবত পাঁচ হাজার বছর আগের মেসোপটেমিয়া সভ্যতা থেকে এক পাল্লায় একটা বাটখারা আর অপর পাল্লায় পণ্য রেখে মাপজোক হয়ে আসছে। উনিশের ২০ মে থেকে এটা বদলে যাচ্ছে। আমি মনে করি, এটা অসাধাণ একটা ঘটনা।’
কিলোগ্রাম নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার বিষয়ে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী উইলিয়াম ফিলিপস বলেছেন, ‘ফরাসি বিপ্লবের পরে পরিমাপের জগতে এত বড় বিপ্লব আর হয়নি।’
বাটখারা বদলানোর উদ্যোগ সম্পর্কে মার্কিন বিজ্ঞানী স্টিফেন স্খলামিঙ্গার বলেছেন, ‘ভিনগ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণীর সঙ্গে আমাদের যদি যোগাযোগ হয়, আর যদি ওরা আমাদের জিজ্ঞেস করে, আমরা জিনিসপত্র মাপি কিভাবে? তখন যদি বলি, আমাদের হাতে তৈরি জিনিসের তুলনায় মাপামাপি করি, তা হলে ওরা আমাদের বোকা বলে ধরে নেবে। এত দিনে আমরা আসলে চালাক হচ্ছি।’