নবতর কৌশলে ড. কামাল

নিজস্ব প্রতিনিধি : বিগত সরকারের কাছে বিএনপি অসংখ্যবার সংলাপে বসে বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানের দাবি করেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা পারস্পরিক আলোচনার অব্যাহত তাগিদ দিয়েছিল। সরকার তাদের প্রস্তাব, অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে শেষ মুহূর্তে অতি নাটকীয়ভাবে সংলাপে বসার আগ পর্যন্ত সংলাপের প্রবল বিরোধিতা করে আসছিল। বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় বসার সময়-সুযোগ কোনোটাই নেই বলে সংলাপের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ যে প্রধানমন্ত্রী নিজে বিরোধীদের সংলাপে বসার আমন্ত্রণ জানান জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেনের অনুরোধের পর। বিএনপিসহ দেশের সব বিরোধী রাজনৈতিক দল ও বিদেশিদের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে ড. কামাল হোসেনের আহ্বানে সাড়া দেওয়ার ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন রয়ে গেছে। জানা যায়, প্রস্তাবিত সংলাপে সরকারের দিক থেকে নির্বাচন নিয়ে কোনো অ্যাজেন্ডা দেওয়া হবে না। শুভেচ্ছা বিনিময়, নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি, উপজেলা পরিষদ নির্বাচন, আইনশৃঙ্খলা, মামলা-মোকদ্দমা নিয়ে আলোচনা হবে। সংলাপ হওয়ারই কোনো সম্ভাবনা নেই।
সেই কামাল হোসেন কর্তৃক নির্বাচনের পর সরকারকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানানো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে খোদ বিএনপি শিবিরে। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনই যেখানে বিএনপি ও তাদের ঐক্যফ্রন্ট মেনে নেয়নি, নির্বাচিত সরকারকে স্বীকার করছে না, দেশে-বিদেশে নির্বাচন ও সরকারবিরোধী সর্বাত্মক প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন তাদের শীর্ষ নেতা কর্তৃক সেই সরকারের সঙ্গেই সংলাপে বসার আহ্বান নিয়ে রহস্য ঘনীভূত হয়েছে।
সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সূত্রে জানা যায়, পূর্ববর্তী সময়ের মতো এবারও প্রধানমন্ত্রী নিজে বিএনপি, সিপিবিসহ বাম গণতান্ত্রিক জোটসহ নিবন্ধিত সব দল ও অন্যান্য ৭২টি দলের সঙ্গে দলগত ও জোটগতভাবে সংলাপে বসবেন। তবে তা এখনই নয়। বিরোধী শিবিরের অনেকেরই ধারণা ছিল, সরকার নির্বাচন-পূর্ববর্তী আলোচনায় বসবে না। সরকারের প্রতি সংলাপে বসার জন্য ড. কামাল হোসেনের আহ্বানকে সহজভাবে নেননি বিএনপির অধিকাংশ নেতা। বিএনপির শীর্ষস্থানীয় ও কেন্দ্রীয় কিছুসংখ্যক নেতা ছাড়া অন্যদের মনোভাবও অভিন্ন। তারা মনে করেন, নির্বাচনের পর সরকারের সঙ্গে সংলাপে বসার অর্থ যে নির্বাচন ও সরকারকে সেই নির্বাচন ও সরকারকে বৈধতা দেওয়া। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন ও নির্বাচিত সরকার সংবিধানসম্মত হলেও রাজনৈতিকভাবে বিএনপি ও তার সহযোগীদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ত্রুটি-বিচ্যুতির পর সামগ্রিকভাবে নির্বাচন ও নির্বাচিত সরকারকে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন মেনে নিয়েছে। ভারত, চীন, রাশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নির্বাচন ও সরকারকে মেনে নেওয়ার পর ড. কামাল হোসেন এবং বিএনপি ও তার সহযোগীদের নির্বাচন ও সরকারবিরোধী কোনো ভূমিকাও নিতে পারছে না। ভোট ডাকাতির প্রামাণ্য দলিল, তথ্যপ্রমাণও দিতে পারছে না।
বিএনপির তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা দারুণভাবে হতাশ। নির্বাচনে অভাবনীয় ভরাডুবি তাদের বিধ্বস্ত করেছে। সেই সঙ্গে পুলিশি হয়রানি, গ্রেফতার অভিযানে তারা বিপন্ন। সরকারবিরোধী কোনো কর্মসূচিতে তারা সর্বাত্মকভাবে শরিক হবে কি না, তা নিয়ে শীর্ষস্থানীয় নেতারা শঙ্কিত। এই নেতারা টেবিলের আলোচনায় নানা কথা বললেও মামলা, কারাবাসের ঝুঁকি নিয়ে তারাও মাঠে নামতে আগ্রহী নন। সরকারের সঙ্গে সংলাপে বসাও অর্থহীন হবে মনে করে তারা সংলাপের প্রবল বিরোধী। আবার বিএনপির মধ্যেই নেতৃত্বের একটি অংশ সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসা, নতুন নির্বাচনের দাবি তোলা, নেতা-কর্মীদের ওপর থেকে মামলা তুলে নেওয়া, হয়রানি, নির্যাতন বন্ধ করার বিষয়ে সরকারের সঙ্গে কথা বলে ফলদায়ক কিছু করার পক্ষে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারের সঙ্গে সংলাপে বসার পক্ষে বলেই জানা যায়। ব্যারিস্টার মওদুদ, ড. খন্দকার মোশাররফ, মির্জা আব্বাসসহ মামলায় থাকা নেতাদের বড় অংশের মনোভাবই ইতিবাচক। তাদের সামনে বিকল্পও খুবই সীমিত। রাজপথে আন্দোলন সংগঠিত করার মতো শক্তি, সামর্থ্য তাদের নেই। সরকারের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে অবশিষ্ট শক্তিও নিঃশেষ হয়ে যাবে। এ পর্যায়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন, সহযোগিতার আশাও করতে পারছেন না। তাদের মতে, দেশের মানুষ বিগত নির্বাচন ও সরকারের বিপক্ষে হলেও জনমত সংগঠিত করে আন্দোলনে রূপ দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না।