নববর্ষে ক্রিকেটারদের প্রতি কঠোর বিসিবি

স্পোর্টস রিপোার্ট : নতুন বছরের প্রথম দিনটিই সাব্বির রহমানের জন্য হয়ে গেল ‘দ্য জাজমেন্ট ডে’! ফেলে আসা বছরের ডিসেম্বরে জাতীয় ক্রিকেট লিগের শেষ রাউন্ডের ম্যাচের সময় কিশোর দর্শককে পেটানইনি শুধু, এই বিষয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) কাছে অভিযোগ করলে ম্যাচ অফিশিয়ালদের দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েও নিজের আমলানামায় কালো দাগ বাড়িয়েছেন আরো। দুয়ে মিলে এই ক্রিকেটারের ভাগ্যে জুটল বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের রেকর্ড শাস্তিও। সুবাদে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে জাতীয় দলের এ ব্যাটসম্যান। ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হতে যাওয়া বিসিবির নতুন কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে বাদ পড়ছেন সাব্বির। গুনতে হবে ২০ লাখ টাকা জরিমানাও। এখানেই শেষ নয়, বিসিবির ডিসিপ্লিনারি কমিটির সুপারিশ তাকে ছয় মাস সব ধরনের ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ করারও। সব সুপারিশই গৃহীত হচ্ছে জানিয়ে ধানমন্ডিতে নিজের কর্মস্থল বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের অফিসে গত সন্ধ্যার সংবাদ সম্মেলনে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান যা বলেছেন, তাতে আরো বড় শাস্তির আশঙ্কায়ও থাকতে হচ্ছে সাব্বিরকে, ‘এই সুপারিশগুলো এসেছে। এখান থেকে কমে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং আরো বাড়তে পারে।’ বাড়লে আর কী শাস্তি হতে পারে, সেটি অবশ্য বলেননি নাজমুল। তবে ডিসিপ্লি­নারি কমিটির যে আরো কঠোর হওয়ার চিন্তা ছিল, তা প্রকাশেও দ্বিধা ছিল না বিসিবি সভাপতির, ‘তারা (ডিসিপ্লিনারি কমিটি) বলে দিয়েছে, এটা ওর শেষ সুযোগ। তার মানে কমিটি অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিষিদ্ধ করার চিন্তাও করেছিল। এই শাস্তিগুলো যে থাকছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহই নেই। আরো শাস্তি দেওয়া হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত আমরা বোর্ডসভায় চূড়ান্ত করব।’ কাল অবশ্য তামিম ইকবালের শাস্তিও চূড়ান্ত হয়ে গেছে। বিপিএলের সময় মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের উইকেট এবং আউটফিল্ড নিয়ে বিরূপ মন্তব্যের জন্য ডিসিপ্লি­নারি কমিটি তাকে পঁাঁচ লাখ টাকা জরিমানার পাশাপাশি সতর্ক করে দেওয়ার সুপারিশ করেছে বলে জানিয়েছেন নাজমুল। নতুন বছরের প্রথম দিনে দুই ক্রিকেটারকে নানাবিধ দ- দিয়ে বিসিবিও যেন অন্যদের মাঝে এই বার্তা ছড়িয়ে দিতে চাইল যে শৃঙ্খলার প্রশ্নে ছাড় নেই কোনো। নিজের কর্মস্থলে ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা এবং অন্য দুই ফরম্যাটের অধিনায়ক সাকিব আল হাসানের সঙ্গে কাল আসন্ন ত্রিদেশীয় সিরিজ নিয়েও আলোচনায় বসেছিলেন বিসিবি সভাপতি। সেই আলোচনার এক ফাঁকে শৃঙ্খলা নিয়ে কঠোর নীতির বার্তা অন্য ক্রিকেটারদের পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশও অধিনায়কদের দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন নাজমুল। বোর্ড সভাপতির ভাষায়, ‘বছরের প্রথম দিনই এসব পদক্ষেপ নিয়ে আমরা সব খেলোয়াড়কে একটা শক্ত বার্তা দিচ্ছি। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। সে যত বড় খেলোয়াড়ই হোক না কেন। শৃঙ্খলা ওদের মানতেই হবে। বাংলাদেশে ক্রিকেট এখন এত জনপ্রিয় যে এরা একেকজন একেকটা ‘আইকন’। নতুন প্রজন্ম, ছোট ছোট শিশুরা ওদের আদর্শ মানে। ওরা বলে, ‘আমি সাকিব হতে চাই, মাশরাফি হতে চাই। তামিম, মুশফিক, রিয়াদ হতে চাই।’ কাজেই ওদের কোনো ভুল করা যাবে না। এসব ব্যাপারে অধিনায়কদের সঙ্গেও আলাপ হয়েছে। ওরা সব খেলোয়াড়কে বলবে, আমরা তো বলবই। বছরের প্রথম দিন যেসব সিদ্ধান্ত হয়েছে, খুব একটা কম কিন্তু নয়।’ সব মিলিয়ে সাব্বিরের শাস্তিটা তো বাংলাদেশে রেকর্ডই। আচরণগত সমস্যার জন্য সাকিবকে এর আগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ছয় মাসের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। দুই বছর বিদেশি লিগে খেলার এনওসি (অনাপত্তিপত্র) না দেওয়ার সিদ্ধান্তও হয়েছিল। অনুতাপ প্রকাশ করে ক্ষমা চাওয়ায় পরে শাস্তি কমে গিয়েছিল। তবে কোনো আর্থিক জরিমানার মুখে পড়েননি সাকিব। সাব্বিরকে অবশ্য বড় অঙ্কের জরিমানা নিয়মিতই গুনে যেতে হচ্ছে। ২০১৬-র বিপিএলের সময় মাঠের বাইরে শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনায় জরিমানা হয়েছিল ১৩ লাখ টাকা। এবার ২০ লাখ টাকা! যদিও নাজমুলের দেখানো হিসাবটা আরো বড় অংকেরই, ‘বোর্ডের চুক্তি থেকে একজন খেলোয়াড় কিন্তু অনেক টাকা পায়। সেই সঙ্গে আবার ২০ লাখ টাকা জরিমানা। এটা ওকে ক্যাশ দিতে হবে। এর সঙ্গে ঘরোয়া ক্রিকেটে ছয় মাসের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগও পড়ছে। এটাও বড় আর্থিক ক্ষতি।’ উইকেট ও আউটফিল্ড নিয়ে তামিমের বক্তব্যে বিসিবিও বড় ক্ষতির মুখে পড়তে পারত বলে ছাড় পেলেন না বাঁ-হাতি ওপেনারও। এ বিষয়ে বিসিবি সভাপতির ব্যাখ্যা, ‘শক্ত আর্থিক শাস্তি দেওয়া হচ্ছে তামিমকে। ওর কথাবার্তা বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য বিব্রতকর। এটা আমাদের ক্রিকেটের জন্য ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারত বা পারে।’ নাজমুলের ভাষ্যে স্পষ্ট, মূলত আউটফিল্ড নিয়ে মন্তব্যের কারণেই ঝড়টা বেশি যাচ্ছে তামিমের ওপর দিয়ে, ‘আপনি আউটফিল্ড ও কিউরেটর নিয়ে কথা বলবেন কেন? এমনিতেই আমাদের আউটফিল্ড (মিরপুরের) ২ ডিমেরিট পয়েন্ট পেয়ে বসে আছে (অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সবশেষ টেস্টে)। ৪ পয়েন্ট পেলে তো ঢাকা শহরে আর খেলাই হবে না।’ কিন্তু বাজে আউটফিল্ডের দায় তো বিসিবির কাঁধেই বর্তায়। নাজমুল মানলেন না তা, ‘সেটির দায় বৃষ্টির। ওই সময়টা আমাদের জন্য খুব অনুপযোগী ছিল। ধারাবাহিকভাবে বৃষ্টি হচ্ছিল। নিয়মিত বৃষ্টি হলে উইকেট ঢেকে রাখা যায়; কিন্তু আউটফিল্ড ঠিক রাখা খুব কঠিন।’ এই যুক্তিতে মিরপুরের কেউরেটর গামিনি ডি সিলভাকে আগলেই রাখল বিসিবি। মোদ্দা কথা, মাঠ ঠিক রাখা না গেলেও খেলোয়াড়দের ‘ঠিক’ রাখতে নতুন বছরের প্রথম দিনেই খুব কঠোর বিসিবি!