নারায়ণগঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণে নিহত বেড়ে ২৩

  • সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় আরও ১৪ জন
  • ‘এসি থেকে নয় গ্যাস থেকেই আগুনের সূচনা’

ঠিকানা অনলাইন ডেস্ক: নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লার পশ্চিম তল্লায় মসজিদের এসি বিস্ফোরণে দগ্ধদের মধ্যে আরও দুইজনের মৃত্যু হয়েছে; মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে মোট ২৩ জন। দগ্ধদের মধ্যে ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে যে ১৪ জন ভর্তি আছেন, তাদের অবস্থাও সঙ্কটাপন্ন বলে ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক পার্থ শংকর পাল জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের বাইতুস সালাত জামে মসজিদ থেকে দগ্ধ অবস্থায় যে ৩৭ জনকে বার্ন ইনস্টিটিউটে আনা হয়েছিলে, তাদের মধ্যে ২১ জনের মৃত্যু হয় শনিবার রাত ১১টা পর্যন্ত। এরপর রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) ভোরের মধ্যে মারা যান জুলহাস উদ্দিন (৩০) ও শামীম হোসেন (৪৮) নামে দুজন। তাদের নিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৩ জন হয়।

এদিকে নিহতদের বাড়িতে শোকের মাতম চলছে। কেউ শোকে স্তব্ধ, কেউ চিৎকার করে কাঁদছেন, কারও চোখে জল টলমল। প্রিয়জনের লাশের জন্য অপেক্ষায় কেউ, কারও আবার সংকটাপন্ন স্বজনকে নিয়ে উৎকণ্ঠা। এর মধ্যে স্বামী ইব্রাহিম বিশ্বাসের মৃত্যুর খবর শুনে অচেতন হয়ে পড়লেন নাসরীন আক্তার। আরেক মা বিলাপ করছিলেন তার সাত বছরের ছেলে জুবায়ের ফরাজীর জন্য। টিভি দেখতে থাকা ছোট্ট ছেলেটিকে তিনি একরকম জোর করে স্বামীর সঙ্গে নামাজে পাঠান। ছেলে আর ফিরে আসেনি মায়ের বুকে, স্বামীও সংকটাপন্ন।

এমন অনেক বেদনাবিধুর দৃশ্য দেখা যায় ৫ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। গত ৪ সেপ্টেম্বর রাতে নারায়ণগঞ্জ শহরের তল্লা এলাকার মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দগ্ধদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এই হাসপাতালে। শনিবার রাত পর্যন্ত সেখানে ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসাধীন আছেন ১৪ জন। তাদের কেউই শঙ্কামুক্ত নয়। এদিকে তদন্ত কমিটির সদস্য ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক নূর হাসান ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, এ ঘটনায় তারা গ্যাস ও বিদ্যুৎ থেকে আগুনের উৎস ধরে নিয়ে তদন্তকাজ শুরু করেছেন। এর বাইরে মসজিদটিতে আগুন লাগার আর কোনো কারণ তারা প্রাথমিকভাবে খুঁজে পাননি।

এদিকে মসজিদে এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা মেনে নিতে পারছেন না কেউ। ধর্মপ্রাণ মানুষেরা নামাজ পড়তে গিয়ে অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে পাড়ি জমালেন পরপারে। স্বজনরা বলছেন, কিছু সময় পরই তাদের বাসায় ফেরার কথা ছিল। অনেকে বাসা থেকেই মসজিদে গিয়েছিলেন। আবার কেউ বাইরের কাজ সেরে যান মসজিদে। ফোনে স্বজনকে জানান, নামাজ পড়েই ফিরবেন বাসায়। তাদের আর ফেরা হয়নি। যন্ত্রণাক্লিষ্ট মৃত্যুর পর তাদের ঠাঁই হয়েছে কবরে।

অভিযোগ উঠেছে, তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষকে মসজিদের নিচের গ্যাসের পাইপলাইনে সমস্যার কথা জানানোর পরও তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এ পরিস্থিতিতে বিস্ফোরণের ঘটনা তদন্তে তিনটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও তিতাস গ্যাসের পক্ষ থেকে ঘটনার নেপথ্যের কারণ অনুসন্ধানে এসব কমিটি গঠন করা হয়।

অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। তিনি এক শোকবার্তায় নিহতদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। আহতদের আশু আরোগ্য কামনা করেন রাষ্ট্রপতি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সার্বক্ষণিক এ ঘটনার খবর রাখছেন এবং আহতদের সর্বোচ্চ সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন ও তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

মৃতদের মধ্যে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জের তল্লার বাসিন্দা নূর উদ্দিনের বড় ছেলে সাব্বির (২১) ও মেজো ছেলে তুলারাম ডিগ্রি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র জোবায়ের (১৮), পশ্চিম তল্লা বায়তুস সালাত জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন দেলোয়ার হোসেন (৪৫) ও তার ছেলে কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের বাসিন্দা জুনায়েদ হোসেন (১৬), মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার হাটবুকদিয়া গ্রামের কুদ্দুস ব্যাপারী (৭২), চাঁদপুর সদর উপজেলার করিম মিজির ছেলে মোস্তফা কামাল (৩৪), নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পোশাক শ্রমিক জুলহাস ফরাজীর ছেলে জুবায়ের ফরাজী (৭), পটুয়াখালীর গলাচিপার আবদুল খালেক হাওলাদারের ছেলে পোশাক শ্রমিক মো. রাশেদ (৩০), পশ্চিম তল্লার বাসিন্দা হুমায়ুন কবির (৭২), পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার কাউখালী গ্রামের জামাল আবেদিন (৪০), পোশাক শ্রমিক ইব্রাহিম বিশ্বাস (৪৩), নারায়ণগঞ্জ কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী রিফাত (১৮), চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাইন উদ্দিন (১২), নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার মো. জয়নাল (৩৮), লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার তালুকপলাশী গ্রামের মেহের আলীর ছেলে পোশাক শ্রমিক মো. নয়ন (২৭), ফতুল্লার ওয়ার্কশপের শ্রমিক কাঞ্চন হাওলাদার (৫০), শ্রমিক মো. রাসেল (৩৪), বাহার উদ্দিন (৫৫), ইমাম আবদুল মালেক (৬০) ও নিজাম ওরফে মিজান (৪০)। এর মধ্যে ১৬ জনের লাশ স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকিদের লাশও হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।

জানা যায়, গত ৪ সেপ্টেম্বর রাত পৌনে ৯টার দিকে নারায়ণগঞ্জ জেলা শহরের পশ্চিম তল্লা এলাকার বাইতুস সালাত জামে মসজিদে এশার নামাজ শেষ হওয়ার পর ঘটে গ্যাস-বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড। এতে মসজিদে নামাজ আদায়রত সবাই দগ্ধ হন। তাদের উদ্ধার করে ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়।

নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তারা জানান, মসজিদটির নিচ দিয়ে গ্যাস সরবরাহের পাইপ ছিল। সেই পাইপের ছিদ্র থেকে কয়েকদিন ধরেই গ্যাস নির্গত হচ্ছিল। মসজিদ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় সব জানালা বন্ধ থাকত। এ কারণে গ্যাস বাইরে যেতে পারেনি। এর মধ্যেই শুক্রবার রাতে মসজিদের এসি বা ফ্যানের সুইচ বন্ধ করার সময় সৃষ্ট ছোট্ট স্ফুলিঙ্গ থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এক প্রত্যক্ষদর্শী শনিবার বার্ন ইনস্টিটিউটে জানান, শুক্রবার মসজিদে মুসল্লির উপস্থিতি ছিল কম। কারণ মসজিদের সামনে পানি জমে থাকায় যাতায়াত কষ্টকর ছিল। তবু তিনি মসজিদে যান। নামাজ পড়ে মসজিদের সামনে এসে দাঁড়ান। তখনই হঠাৎ বিস্ম্ফোরণের মতো শব্দ ও আগুনের হলকা দেখতে পান। প্রথমে বুঝতে পারেননি কী ঘটেছে। পরে মুসল্লিদের চিৎকার শুনে তিনি ও আশপাশের লোকজন এগিয়ে যান এবং উদ্ধার তৎপরতা চালান।

নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম চিকিৎসাসহ সার্বিক বিষয়ে খোঁজ নেওয়ার পর সাংবাদিকদের বলেন, জেলা প্রশাসন ও পুলিশের ব্যবস্থাপনায় লাশ তাদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হবে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার যেভাবে চাইবে সেভাবেই লাশ হস্তান্তর করা হবে। স্বজনরা চাইলে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ হস্তান্তর করা হবে। তবে কারও কোনো অভিযোগ থাকলে ময়নাতদন্ত করা হবে।

তিনি আর বলেন, আগুনে মসজিদের ছয়টি এসি বিস্ফোরিত হয়েছে। এতে সব জানালার কাচ ভেঙে যায়। আগুনে সিলিং ফ্যানগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘটনাস্থলে মানুষের রক্ত-মাংস-চামড়া লেগে থাকতে দেখা গেছে।

এসি বিস্ফোরণ হয়নি, আগুন গ্যাস থেকেই : তদন্ত কমিটির সদস্যরা
মসজিদে আগুন লেগে হতাহতের ঘটনায় শোকে স্তব্ধ পুরো তল্লা এলাকা। নিহত ও আহতরা সবাই একই এলাকার বাসিন্দা এবং পরস্পরের প্রতিবেশী। তাই কে কাকে সান্ত্বনা দেবে, সেই ভাষা ছিল না কারোরই। এ ঘটনা তদন্তে ৫ সেপ্টেম্বর বিকেল পর্যন্ত তিনটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যরা কাজও শুরু করে দিয়েছেন। দুপুরে তদন্ত কমিটির প্রধান লে. কর্নেল জিল্লুর রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

এই কমিটির অন্য সদস্য ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক নূর হাসান ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, এ ঘটনায় তারা গ্যাস ও বিদ্যুৎ থেকে আগুনের উৎস ধরে নিয়ে তদন্তকাজ শুরু করেছেন। এর বাইরে মসজিদটিতে আগুন লাগার আর কোনো কারণ তারা প্রাথমিকভাবে খুঁজে পাননি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘মসজিদটিতে এসি বিস্ফোরণের কোনো ঘটনাই ঘটেনি। কারণ প্রত্যেকটি এসির কম্প্রেসর অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। তবে মসজিদের পেছনের অংশের নিচ দিয়ে গ্যাসের লাইন যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ওই লাইনের লিকেজ থেকে বুদ্বুদ আকারে গ্যাস নির্গত হতেও দেখা গেছে। এখন দেখার বিষয় হচ্ছে, কোনটি আগে হয়েছে। শর্টসার্কিট নাকি নির্গত গ্যাস। তবে নির্গত গ্যাসে বৈদ্যুতিক স্পার্ক থেকে আগুনের সূত্রপাত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এখানে এর বাইরে আর কোনো ঘটনা নেই।’

এদিকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খাদিজা তাহেরী ববিকে প্রধান করে জেলা প্রশাসন পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তিতাস গ্যাস অ্যান্ড ট্রান্সমিশন কোম্পানির জিএম (পরিকল্পনা) আবদুল ওয়াহাব তালুকদারকে প্রধান করে অন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। এ ছাড়া ডিপিডিসি থেকেও আলাদা একটি তদন্ত কমিটি করার কথা জানা গেলেও প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা এর সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেননি। ডিপিডিসির মহাব্যবস্থাপক বিকাশ দেওয়ান নারায়ণগঞ্জে ডিপিডিসির কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘটনা সম্পর্কে বৈঠক করেছেন বলে জানা গেছে। ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটির বাইরেও র‌্যাব, পুলিশ, সিআইডি এবং অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের সদস্যরা পৃথকভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ড. আবদুল হান্নান নামে এক বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেছেন।

মসজিদ কমিটির সাবেক সদস্য ও অতীতে মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালনকারী স্থানীয় মোশারফ হোসেন মিথুন বলেন, নব্বইয়ের দশকে খানপুর সরদারপাড়া এলাকার মাহমুদ সরদার নিজের এই জমিটি মসজিদের জন্য দান করেন। ওই সময় মসজিদটি ছোট আকারে নির্মিত হয়েছিল। ওই সময় টিনশেড মসজিদটির পেছনের অংশে মুয়াজ্জিনের থাকার কক্ষে গ্যাসের রাইজার ছিল। পরে ১০-১২ বছর আগে মসজিদটি বহুতল ভবন করা হলে রাইজারটি খুলে গ্যাসের লাইনটি মসজিদের নিচে রেখেই ওপরে নির্মাণকাজ করা হয়।