নিঃসন্তান দম্পতির কোল আলো করাই যার নেশা

প্রতিটি দম্পতিই আশা করেন তাদের ঘর আলো করে আসবে ফুটফুটে সন্তান। কিন্তু বন্ধ্যত্বজনিত সমস্যায় অনেক দম্পতিই সে আনন্দের ভাগ পান না। মানসিক কষ্টের পাশাপাশি নেমে আসে পারিবারিক ও সামাজিক লাঞ্ছনা। ফলে সন্তান জন্ম দিতে না পারার অজুহাতে অনেক স্ত্রীকেই স্বামী সংসার ছাড়তে হচ্ছে। তবে তাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. পারভীন ফাতেমা। ১৭ বছর ধরে দেশের সন্তানহীন দম্পতিদের কোলে সন্তান তুলে দেওয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।
ডা. পারভীন ফাতেমা হাতেই বাংলাদেশে প্রথম ইনভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (আইভিএফ) বা টেস্টটিউব পদ্ধতির শিশুর জন্ম হয়। মূলত চিকিৎসার মাধ্যমে যাদের বন্ধ্যত্বজনিত সমস্যার সমাধান হচ্ছে না, তাদের কোলে তুলে দেন টেস্টটিউব বেবি।
জানা গেছে, দেশে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে অনেক কর্মসূচি রয়েছে। কিন্তু বন্ধ্যত্ব এমন একটি প্রজনন সমস্যা, যা নিয়ে কোনো কর্মসূচিই নেই। অথচ এ সমস্যায় পেছনে ব্যাপক সামাজিক, মানসিক, অর্থনৈতিক প্রভাব। আর নীতিনির্ধারকদের এ নীরবতার সুযোগে চিকিৎসার নামে গ্রামীণ নিঃসন্তান নারীরা হচ্ছেন প্রতারণার শিকার, আধুনিক চিকিৎসার সঠিক তথ্যের অভাবে শহরের নারীরাও লাখ টাকা খরচ করে হয়ে পড়ছেন নিঃস্ব।
এসব বিবেচনায় স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. পারভীন ফাতেমা বন্ধ্যত্ব দূরীকরণের বিষয়ে কাজ শুরু করেন ১৯৯৫ সালে। এ কাজে সফলতা পেতে তিনি গবেষণাও শুরু করেন; সংশ্লিষ্টবিষয়ক সেমিনার, কর্মশালা ও প্রশিক্ষণে অংশ নিতে ছুটে যেতেন বিভিন্ন দেশে। এর পর তিনি বন্ধ্যত্বের চিকিৎসা ও টেস্টটিউব বেবি জন্ম দেওয়ার বিষয়ে কাজ শুরু করেন। তাকে এ কাজে উৎসাহিত ও সহযোগিতা করতেন তার স্বামী অধ্যাপক ডা. মোয়াজ্জেম হোসেন। সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে ডা. পারভীন ফাতেমা সফলতার মুখে দেখেন ২০০১ সালের ৩০ মে। ফিরোজা বেগম নামে এক প্রসূতির ঘরে হীরা, মণি ও মুক্তা নামে একসঙ্গে জন্ম নেয় তিন সন্তান। সেটাই ছিল দেশে প্রথম টেস্টটিউব বেবির জন্ম নেওয়ার ঘটনা। এর আগে বাংলাদেশের সবাই বিষয়টি সম্পর্কে ছিল অজ্ঞ। তাই হাজার প্রতিকূলতা আর টেস্টটিউব বেবি নিয়ে মানুষের ভ্রান্ত ধারণাকে মিথ্যা করে ডা. পারভীনের তত্ত্বাবধানে ১৭ বছরে অনেক সন্তানহীন দম্পতির কোলে এসেছে শিশু, যার সংখ্যা কয়েক শতাধিক। বর্তমানে দেশে ১০টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ্যত্বের চিকিৎসা ও টেস্টটিউব বেবি জন্মদানে কাজ করছে।
এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. পারভীন ফাতেমা বলেন, সন্তানহীনতার জন্য নারীকে দায়ী করা হতো। এখন সেই প্রবণতা কমছে। বন্ধ্যত্বের সমস্যা নারী বা পুরুষ, যে কারোরই হতে পারে। মানুষ এখন সচেতন হয়েছে। সন্তান না হলে স্বামী-স্ত্রী দুজনই চলে আসছেন চিকিৎসকের কাছে। আগে বিএসএমএমইউতে বন্ধ্যত্বের সমস্যা নিয়ে চার হাজার লোক আসতেন। এখন বছরে ১৭ থেকে ১৮ হাজার লোক আসছেন। আর যারা আসছেন তাদের সমস্যা চিহ্নিত করতে স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বন্ধ্যত্বের চিকিৎসা দিতে হয়। চিকিৎসার মাধ্যমে অনেকেই সন্তান লাভ করছেন। তবে যাদের চিকিৎসার মাধ্যমে বন্ধ্যত্বজনিত সমস্যার সমাধান হচ্ছেন না, তাদের আইভিএফ বা টেস্টটিউব বেবি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। আমাদের দেশে টেস্টটিউব বেবি নেওয়ার হার ২ থেকে ৫ শতাংশ।
ডা. পারভীন ফাতেমা আরও বলেন, বন্ধ্যত্বের চিকিৎসা ব্যয়বহুল। এ ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই প্রচুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়। আবার বন্ধ্যত্বের চিকিৎসা বিনামূল্যে করা হলেও তা সবাই নিতে পারবেন না। কারণ ওষুধ কিনতেই ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়। এত টাকা ব্যয় করে নিম্নবিত্তদের চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ থাকে না। এ ক্ষেত্রে সরকারের এগিয়ে আসা উচিত। আমি একাই নই, দেশে এখন আরও অনেকেই বন্ধ্যত্ব নিয়ে কাজ করছেন। দেশে টেস্টটিউব বেবির সংখ্যা বাড়ছে। তবে টেস্টটিউব বেবির প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি একটু ভিন্ন। মানুষ সচেতন হলে ধীরে ধীরে সেটাও বদলে যাবে।