নিউইয়র্কের ‘অলিগলি’তে মন্ত্রী-এমপির বাড়ি

ঠিকানা রিপোর্ট : বাংলাদেশের মন্ত্রী-এমপিরা গত চার দশকে বিভিন্ন সরকারের আমলে নিউইয়র্কে বাড়ি কিনেছেন, এটা নতুন কোনো খবর নয়। নিউইয়র্ক সিটির কুইন্সের বিভিন্ন এলাকা বা অলি-গলি’তে তাদের ঘর-বাড়ি চোখে পড়ে। কিন্তু সম্প্রতি কানাডার বেগমপাড়ায় বাংলাদেশিদের বাড়ি এবং যুক্তরাষ্ট্রে ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খানের যুক্তরাষ্ট্রে একাধিক বাড়ির খবর প্রকাশিত হওয়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মন্ত্রী-এমপিদের বাড়ি ও সম্পদের খবর বের হচ্ছে।
সর্বশেষ খবর বেরিয়েছে- নিউইয়র্কে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও সংসদ সদস্য ড. আব্দুস সোবহান গোলাপের একাধিক বাড়ি রয়েছে। যদিও এর আগে নিউইয়র্কে একসঙ্গে তিনটি বাড়ি কিনেছিলেন সরকারের একজন সিনিয়র সচিব, যিনি নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে যুগ্ম সচিব পদমর্যাদায় অর্থাৎ ডিমোশনে কর্মরত ছিলেন।
নিউইয়র্কে মন্ত্রী-এমপির বাড়ি মানে ক্ষমতাসীন সরকারের মন্ত্রী বা ক্ষমতাসীন দলের এমপি নয়, গত চার দশকে বিভিন্ন সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা বাড়ি কিনেছেন। বিশ্বের রাজধানী হিসাবে পরিচিত নিউইয়র্ক সিটিতে বাড়ি কেনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক বা বাসিন্দা না হয়েও নিউইয়র্ক সিটিতে বাড়ি কেনা সহজ কথা নয়। অথচ এ ধরনের ঘটনা এখন হরহামেশাই ঘটছে। হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার হয়ে ঢুকছে যুক্তরাষ্ট্রে। এরপর নানা কৌশলে তা বৈধ করে বাড়ি কেনা হচ্ছে।
একাধিক সূত্র জানায়, নিউইয়র্কে ঢাকা মহানগর বিএনপির একজন নেতার একাধিক বাড়ি রয়েছে। বিএনপি সরকারের আমলে একটি কোম্পানি পরিচালনা করতেন ওই নেতা। সেই কোম্পানির মাধ্যমে মোটা অংকের অর্থ তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করেন। এরপর নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন স্টেটে তিনি কয়েকটি বাড়ি কেনেন।
বিএনপি আমলে সাবেক একজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর বাড়ি রয়েছে। তারা নিউইয়র্কে এলে নিজেদের বাড়িতেই থাকেন। ওই প্রতিমন্ত্রী একজন ছাত্রনেতা হিসাবেই বেশী পরিচিত। এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপি আমলের একজন মন্ত্রী নিউইয়র্কে একাধিক বাড়ি কিনেছেন নগদ অর্থে। ওই নেতার মৃত্যুর পর মোট চারটি বাড়ি যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির দুজন নেতা ও একজন সাংবাদিক ভোগ করছেন বলে জানা গেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও এমপি নিউইয়র্কে বাড়ি কিনেছেন নগদ অর্থে। ৫-৬ বছর আগে জ্যামাইকায় একাধিক অ্যাপার্টমেন্ট কিনে আলোচনায় আসে সাবেক ও প্রয়াত একজন মন্ত্রীর নাম। ওই মন্ত্রীর ছেলের নামে একাধিক অ্যাপার্টমেন্টের খবর বেরিয়ে আসে। যতটুকু খবর বেরিয়েছে, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশী বাড়ির মালিক ওই মন্ত্রী ও তার ছেলে। বিভিন্ন কোম্পানির ব্যবস্থাপনায় অ্যাপার্টমেন্টগুলো রক্ষণাবেক্ষণ হওয়ায় প্রকৃত মালিকের নাম বের করা কঠিন। এ কারণে অনেকে বিভিন্ন কোম্পানির নামে বাড়ি ও সম্পদ কিনছেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের তৃতীয় মেয়াদে একজন সাবেক আমলা, পরবর্তীতে যিনি মন্ত্রীও হয়েছিলেন, তিনিও নিউইয়র্কে একাধিক বাড়ির মালিক। কিন্তু তার নাম কখনো আলোচনায় আসেনি। বর্তমানে তিনি আবার এমপি হয়েছেন।
নিউইয়র্কের বাংলাদেশি অধ্যুষিত জ্যাকসন হাইটস এলাকায় আওয়ামী লীগের একজন সাবেক মন্ত্রীর বাড়ি রয়েছে। তিনি কখনোই প্রবাসী ছিলেন না। আরেক সাবেক এক মন্ত্রী ও বর্তমান এমপি জ্যাকসন হাইটসে একটি মার্কেটের মালিক, যেটি একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। জ্যামাইকায় একজন প্রতিমন্ত্রী বেনামে বিশাল বাণিজ্যিক ভবন গড়ে তুলেছেন। এখনো সেটির নির্মাণ কাজ চলছে।
শুধু মন্ত্রী-এমপি নয়, ঢাকার একজন যুবলীগ নেতা যুক্তরাষ্ট্রে পা রাখার কয়েক মাসের মধ্যে নিউইয়র্কে একাধিক বাড়ি কিনেছেন। তিনি বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অর্থ লগ্নি করছেন। এ বিষয়টি প্রবাসীদের নজর এড়াতে পারেনি।
এদিকে আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ও সংসদ সদস্য ড. আব্দুস সোবহানের একাধিক বাড়ি নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, তার সঙ্গে অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি দ্বিমত পোষণ করেছেন। তারা বলছেন, আব্দুস সোবহান গোলাপ প্রকৃত অর্থে একজন প্রবাসী। জীবনের দীর্ঘ একটি সময় তিনি প্রবাসে কাটিয়েছেন। আমেরিকার নাগরিক ছিলেন। তিনি ট্যাক্সি চালিয়ে বিপুল অর্থ উপার্জন করেছেন। স্ত্রী চাকরি করতেন। তাদের ছেলে ও মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে লেখাপড়া করেছেন। এখন ছেলে-মেয়ে বছরে অর্ধমিলিয়ন ডলার আয় করেন। তাদের পক্ষে ৪ মিলিয়ন ডলার দিয়ে চারটি বাড়ি কেনা অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু আব্দুস সোবহান গোলাপের বাড়ির খবরে চাপা পড়ে যাচ্ছে দুর্নীতিবাজদের অবৈধ অর্থে বাড়ি কেনার বিষয়টি।
কানাডায় দুই বছরের মধ্যে নতুন কোনো অভিবাসী বাড়ি কেনার সুযোগ পাবে না বলে আইন হলেও যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের কোনো আইন নেই। বরং যে কেউ বৈধ অর্থে দেশটিতে বাড়ি কিনতে পারেন।