নিউইয়র্কে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে পারিবারিক সহিংসতা

ব্রঙ্কস ব্যুরো : স্বপ্নের দেশ আমেরিকা। কিন্তু এই স্বপ্নের দেশে এসে বহু পরিবারের স্বপ্নই ভেঙে চুরমার। পারিবারিক সহিংসতা বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। এমনও দেখা যাচ্ছে- একটি পরিবারের অশান্তি, কোলাহলের আঁচ লাগছে তার সাথের ঘনিষ্ঠ পরিবারটিতে। এ যেনো ভাইরাস সংক্রমণ! অনেক বাঙালি পরিবারের নারীরা শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্যাতিত নারীরা আইনের আশ্রয় নেন না।

যদিও এদেশের আইন অত্যন্ত কার্যকর। অন্যায় যে করে, আর অন্যায় যে সহে উভয়েই অপরাধী। কিন্তু বাঙালি নারীরা বুঝেও অন্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছেন, সামাজিক বা পারিবারিক মর্যাদা অক্ষুণœ রাখার তাগিদে কিংবা সন্তানের মায়ায়। ফলে পারিবারিক সহিংসতা পরিণত হচ্ছে সামাজিক ব্যাধিতে। সুধী পাঠক, আমি আজ আপনাদের সামনে তারই কিছু নমুনা, কিছু হৃদয়স্পর্শী ঘটনা তুলে ধরছি।

আমার প্রতিবেশিনী, নামটা না হয় অজানাই থাক, ধরে নেই নাম তার শিউলি। সকালে বাসা থেকে বের হলেই সাইড ওয়াকে শিউলির সাথে দেখা হতো। ওর হাতে শিউলি ফুল কিংবা শিউলি ফুলের মালা থাকতো না, থাকতো বড় সাইজের গার্বেজের ব্যাগ ও পরিত্যক্ত মালামাল। একাই সব করছে। ছোট ছোট দুটি বাচ্চা। একটু বাড়তি আর্থিক সহায়তায় কারণে ও বিল্ডিংয়ের কেয়ারটেকারের কাজ করতো। মাঝে মাঝে পথে দেখা হতো, তড়িঘড়ি করে ছুটছে!

জিজ্ঞেস করলে বলতো, কাজে যাচ্ছে। শিউলি ফুলের সুবাস ছড়ানো মহিলাটির মাঝে যে এতোটা দুঃখ লুকিয়ে আছে কিংবা এতোটা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, তা আমার অজানাই ছিলো। বেশ কিছুদিন ধরে শিউলি ফুলের সাথে দেখা হয় না! ওরা একটি পরিবারের সাথে বাসা শেয়ার করে থাকতো। ভদ্রমহিলাকে শিউলির কথা জিজ্ঞেস করতেই বললো, আমি ওকে নিয়ে খুব চিন্তায় আছি! ওরা তো মুভ হয়ে গেছে। আমি বললাম, দুঃশ্চিন্তা কেনো?

আপনি জানেন না, ওকেতো ওর হ্যাজবান্ড প্রচ- মারধর করতো। আমি বিস্মিত স্তম্ভিত! মহিলা বললো, শিউলি দুটি কাজ করে সংসার চালাতো। স্বামী খুব একটা কাজকর্ম করতো না। দুটি কাজ এবং দুটি বাচ্চা সামাল দিয়ে ওকে প্রতিদিনই রান্না করতে হতো। কোনদিন না রান্না করলেই হাজব্যান্ড মারধর করতো। ফ্রিজের রান্না বাসি, তাই প্রতিবেলা রান্না করতে হবে। নিজের সম্মান বাঁচাতে শিউলি দরজা বন্ধ করে দিতো।

মাঝে একবার শিউলি ছোট সন্তানটিকে নিয়ে রাগ করে চলে যায়। বড় সন্তানটি তখন খালাম্মাকে বলে, দাদু আমার মা কখন আসবে? আমার মাকে নিয়ে আসেন। অনাত্মীয় হয়েও মহিলা শিউলিকে বুঝিয়ে বাসায় আনেন। কিন্তু যেই না শিউলি বাচ্চার মায়ায় বাসায় আসে, অমনি আবার উত্তম মধ্যম চলে। সব পুরুষ এক নয়, কিছু ব্যতিক্রমী পুরুষও আছেন। তাইতো প্রতিবেশী অন্য ভাইরা শিউলিকে বলে- এরপর যদি আপনার হাজব্যান্ড আপনাকে এমন মারধর করে, তবে আপনি পুলিশে কল না দিলে আমরা কল দেবো। শিউলিকে উত্তম মধ্যম দেয়া বন্ধ হয়েছে কিনা জানি না, তবে বাসা বদল হয়েছে।

খালাম্মাকে বললাম, ওর সাথে নিয়মিত কথা বলেন আর মাঝে মাঝে বাসায় যাবেন। নিজেকে কেনো যেনো বড় অসহায় মনে হলো।

এবার দৃষ্টি ফেরাই অন্য একটি ঘটনায়। দুটি পরিবার পাশাপাশি একই এরিয়ায় থাকতো, সেখান থেকেই ঘনিষ্ঠতা। ১ম পরিবারে মহিলাটি গৃহিণী। অনেক টানপোড়েনের মধ্যে জীবন চালিয়ে দুটি সন্তানকে মানুষ করছেন। বড় মেয়েটির বিয়ে দিয়েছেন। গত বছর মহিলার স্বামী দেশে গিয়ে দ্বিতীয় বিয়ের দ্বারস্থ হয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে পাবিরারিক বিপর্যের মধ্যে থেকে মহিলাটি এমনিতেই মানসিকভাবে কিছুটা বিপর্যস্ত।

তিনি উকিলের সাথে আলাপ করলেও কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। এদিকে চতুর স্বামী আনকনটেস্টেড ডিভোর্সের যাঁতাকলে ফেলে ডিভোর্স প্রক্রিয়াও চূড়ান্ত করছেন। দ্বিতীয় স্ত্রীকে এদেশে আনার প্রক্রিয়া চলছে। পুরাতন আসবাবপত্রের মতো স্ত্রীও পুরাতন বাতিল হয়ে যায়। এদিকে তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ পরিবারটির অবস্থা আরো করুণ। প্রতিবেশী ভাই বিয়ে করেছেন। সুখবর। আর সুখবর তো বাতাসেই ভাসে। সুতরাং শুভ কাজে দেরি করতে নেই! প্রক্রিয়া চলতে থাকে। স্ত্রীকে মানসিক নির্যাতনের পাশাপাশি শারীরিক নির্যাতন বাড়তে থাকে। মায়ের বিপদাবস্থা দেখে একপর্যায়ে সন্তানেরা পুলিশ কল করে।

কিছুদিন ঠিকঠাক চলে। তারপর আবারও সেই। গত তিন মাস আগে স্বামী দেশে গিয়ে নতুন বিয়ে করেছে। মহিলা ঠিক করেন, তিনি আইনের আশ্রয় নেবেন। তাকে বলা হলো, যেদিন তার স্বামী দেশে ফিরবেন, জেনো পুলিশকে ইনফর্ম করা হয়। স্বামী নিউইয়র্কে এলে ভদ্র মহিলা পুলিশকে কল করেন। পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যায়। এখন এ নিয়ে কোর্টে মামলা চলছে।

পার্কচেস্টারের আরেক বাসিন্দা, অল্পবয়সী গৃহবধু। দুটি সন্তানের মা। কাজ করছেন একটি ফাস্টফুডের দোকানে। স্বামীর ঘর ছেড়ে দু’সন্তান নিয়ে থাকছেন একটি ছোট রুমে, আলাদা। জিজ্ঞেস করলাম- কি নিয়ে সমস্যা? বললেন- স্বামী, শাশুড়ি সবাই মিলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেন। মহিলা মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেও বাধ্য হয়ে বাসা ছাড়েন।

বাংলাদেশে নারী নির্যাতন ভয়াবহ জানতাম, কিন্তু নিউইয়র্কেও তা আশঙ্কাজনক হারে ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে পরিবারে বাজছে ভাঙ্গনের সুর। পরিবার টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব শুধু স্বামী বা স্ত্রীর নয়, দুজনেরই। বাংলার নারীরা এমনিতেই মমতাময়ী, স্নেহময়ী। খুব বড় ধরনের বিপর্যয় না হলে তারা সংসার ছাড়ে না। তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, তার সমস্ত ত্যাগ যেনো বৃথা না যায়। সে যেনো পায় তার প্রাপ্য সম্মান।