নিউইয়র্কে একদিনে ৪১ জন গুলিবিদ্ধ, হত ১১

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি

ঠিকানা রিপোর্ট : করোনাভাইরাসে বিপর্যস্ত নিউইয়র্কে গত এক মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। নগরীতে হঠাৎ করে বেড়ে গেছে অপরাধ। এই ভয়ানক পরিস্থিতি অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। গত ৪ জুলাই দিবাগত রাতে নিউইয়র্ক সিটির বিভিন্ন জায়গায় ৪১ জন গুলিবিদ্ধ এবং ৪ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া পুরো সপ্তাহে সংহিংসতায় ১১ জন নিহত এবং ৪৫ জন আহত হয়েছে। এ বিষয়ে নিউইয়র্ক সিটির মেয়র বলেছেন, করোনার কারণে আইন – শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। তিনি আরো বলেন, আমরা একটি কঠিন সময় অতিক্রম করছি। সহিংসতা জনগণের উদ্বেগের কারণ হিসাবে দাঁড়িয়েছে স্বীকার করে মেয়র বলেন, সহিংসতা আমাদের রুখতে হবে এবং আমরা রুখে দাঁড়াবো। মেয়র জামিন আইনের সংস্কারসহ অন্যান্য বিষয়ে আলোকপাত করে মেয়র বলেন, অনেকে অপরাধীকেই রাইকার্স আইল্যান্ড কারাগার থেকে ছেড়ে দিতে হয়েছে করোনার কারণে। এখন এই অপরাধীরাই ঘুরে বেড়াচ্ছে। অথচ তাদের কারাগারে থাকার কথা ছিলো।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি কৃষ্ণাঙ্গ যুবক ফ্লয়েডকে হত্যার প্রতিবাদে আমেরিকার বিভিন্ন স্টেটে প্রায় ১ মাস লাগাতার আন্দোলন চলে। আন্দোলনের সময় লুটপাটের ঘটনাও ঘটে। তবে সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতির তৈরি হয় আন্দোলনের সময়। সেই সময় নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন স্টেটে বেল রিফর্ম আইন পাস হয় এবং পুলিশ আইন সংস্কারের দাবি গ্রহণ করা হয়। নিউইয়র্ক সিটির ক্রাইম ইউনিট বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
সূত্র জানায়, বেল রিফর্ম আইন সংস্কারের কারণে নিউইয়র্ক সিটির পুলিশ বিভাগ এখন আর স্বাধীন নেই। তাদেরও আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এখন থেকে পুলিশের কোনো অপরাধ গোপন করা হবে না।
পুলিশের একটি সূত্রে জানা গেছে, বেল রিফর্মের কারণে পুলিশ আসামিকে ধরেও থানায় নিয়ে ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। আগে অপরাধী ধরা পড়লে তার ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করা হতো। সে যদি আগে অপরাধ করে থাকতো, তাহলে তাকে গ্রেফতারের পর জেলে পাঠিয়ে দেয়া হতো এবং সেখান থেকেই কোর্টে চালান দেয়া হতো। এখন কোনো অপরাধীকে ধরার পর যদি তার বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগও থাকে, তাহলেও তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে পুলিশ ডিপার্টমেন্ট। আগে পুলিশ যে কৌশলে গ্রেফতার করতো এখন সেই কৌশলে গ্রেফতারও করতে পারছে না। এখন পুলিশকে আসামির মর্জির উপর ভিত্তি করেই তাকে গ্রেফতার করতে হচ্ছে। জোরপূর্বক গায়ে হাত দিয়ে গ্রেফতার করতে গেলেই এখন সেই পুলিশের চাকরি থাকছে না। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হচ্ছে। যে কারণে এখন নিউইয়র্ক সিটির পুলিশও শঙ্কার মধ্যে রয়েছে।
তারা বলেন, বেল রিফর্ম এবং পুলিশ রিফর্ম এর কারণে অপরাধ অনেক বেড়ে গেছে। এখন খুন করেও বিচার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আসামি বাইরে থাকতে পারবে। বেল রিফর্মের কারণে ভয়ঙ্কর অপরাধীদেরও জেলে নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাদের থানায় নিয়ে কোর্টের তারিখ দিয়ে পুলিশ ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। বেল রিফর্ম এবং পুলিশ আইন সংস্কারের কারণে এখন নিউইয়র্ক সিটির পুলিশেরই হাত বেঁধে দেয়া হচ্ছে। সোজা কথা তাদের হাতেই হ্যান্ডকাপ পরিয়ে দেয়া হচ্ছে। এই দুটো সংস্কারের কারণে নিউইয়র্কে অপরাধ অনেক বেড়েছে।
এখন থেকে পুলিশ সদস্যরা আগে নিজেদের নিরাপদ রেখেই কাজকর্ম করতে বাধ্য হচ্ছেন। অপরাধীরা ইতিমধ্যেই জেনে গেছে যে, অপরাধ করলে তাদের জেলে যেতে হচ্ছে না। সুতরাং তারা আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। অবৈধ পিস্তল নিয়ে ধরা পড়লেও তাদের জেলে পাঠানো যাবে না।
নিউইয়র্ক সিটির আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিন দিন অবনতি হচ্ছে এবং ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করছে। অনেকেই বলছেন, নিউইয়র্ক সিটি কী আবারো অতীত আমলে ফিরে যাচ্ছে? গত ৪ জুলাই রাত ১২টা ৪০ মিনিটে প্রথম গোলাগুলির ঘটনা ঘটে ব্রুকলিনের ইস্ট নিউইয়র্কে। ২০ বছর বয়সী তরুণ নিজ বাসার সামনে গুলিবিদ্ধ হন। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গুলিবিদ্ধ ওই তরুণকে নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে গেল তিনি প্রাণ হারান।
ম্যানহাটনের হারলামে রাত ২টা ৪০ মিনিটে ২৩ বছর বয়সী আরেক তরুণ গুলিবিদ্ধ হলে নিজে হাসপাতালে যাওয়ার ১ মিনিট পর মারা যান। ব্রুককলিনের ফ্লাটবুশে ১৯ ও ২৭ বছর বয়সী দুজন রাত ৪টা ২০ মিনিটে গুলিবিদ্ধ হন। আহতদের কিংস কাউন্টি হাসপাতালে ভর্তি করা হলে ১৯ বছর বয়সী এক তরুণ মারা যান। আরেকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
ঠিক ৪০ মিনিট পর ব্রুকলিনের ব্রাউন্সভিলে ৪০ বছর বয়সী একব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হন। গুরুতর অবস্থায় গুলিবিদ্ধ ওই ব্যক্তিকে নিকটবর্তী ব্রুকডেল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া ব্রুকলিনে ২২ ও ২৩ বছর বয়সী আরো দুজন গুলিবিদ্ধ হন। এর মধ্যে একজন নারী রয়েছেন। তবে এসব ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি বলে নিউইয়র্ক পুলিশ জানিয়েছে।