নিউইয়র্ক বইমেলার একত্রিশ বছর

এবিএম সালেহ উদ্দীন :

নিউইয়র্ক মুক্তধারার কর্ণধার বিশ্বজিৎ সাহা কর্তৃক ৩১ বছর আগে নিউইয়র্কের বইমেলা শুরু হয়। আমি তখন বাংলাদেশে। দেশে থাকাকালীনই বইমেলার খবর পেয়েছিলাম। আগামী প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী বন্ধুবর ওসমান গনি ঢাকা থেকে সর্বপ্রথম নিউইয়র্ক বইমেলায় যোগদান করেন। তিনি ঢাকায় ফেরার পর নিউইয়র্ক বইমেলা সম্পর্কে তার কাছ থেকে অনেক কিছু জানতে পারি।
বাংলাদেশের বইমেলার একটি ইতিহাস আছে। তৎকালীন পাকিস্তান আমলে (আমাদের পরাধীন দেশে) মহান ভাষা আন্দোলনের পর এবং অমর একুশে ফেব্রুয়ারি মহান ভাষা দিবসের পর ১৯৫৪ সালে বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। তারপর ষাটের দশকের দিকে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের প্রাক্তন মহাপরিচালক ও কথাসাহিত্যিক সরদার জয়েনউদ্দীন বাংলাদেশে প্রথম বইমেলা নিয়ে চিন্তা করেছিলেন। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে চিত্তরঞ্জন সাহা কলকাতা থেকে ফিরে ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউস চত্বরের বটতলায় ছালার চট বিছিয়ে কলকাতা থেকে বয়ে আনা কয়েকটি বই নিয়ে বসে যান। সেটি অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পরবর্তী সময়ে তিনি পাবলিক লাইব্রেরি ও বাংলা একাডেমির বটতলার নিচে বইমেলা শুরু করেন।
বর্তমানে অমর একুশে বইমেলা বাংলাদেশে আমাদের জাতিসত্তার একটি জাগরণী অধ্যায়ের সূচনা করেছে। বাংলাদেশে বইমেলা একটি জাতীয় মেলা। বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রকাশনাশিল্পের ব্যাপক উন্নয়ন ও জাগরণের পেছনেও বইমেলার যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। দেশে সরকারি-বেসরকারি বইমেলার আয়োজনের মধ্য দিয়ে সৃজনশীল বই বিক্রির নেটওয়ার্ক ও পাঠক বৃদ্ধির দিকটি বেগবান হয়েছে।
নিউইয়র্কে প্রথম বইমেলার উদ্যোগ গ্রহণ করেন জনাব বিশ্বজিৎ সাহা। বর্তমানে নিউইয়র্ক বইমেলা বহির্বিশ্বের একটি বৃহৎ বইমেলায় রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশেও নিউইয়র্ক বইমেলার সুনাম রয়েছে। কেননা এই বইমেলায় বাংলাদেশ ও ভারতের খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিক ছাড়াও বিভিন্ন অঞ্চলের লেখকেরা যোগদান করেন।
বইমেলা নিয়ে আমার জীবনের উচ্ছ্বাস ও অনেক স্মৃতিকথা ইতিপূর্বেকার বেশ কিছু লেখায় উল্লেখ করেছি। আগেই উল্লেখ করেছি, দেশে থাকাকালীন প্রকাশক-জীবনের সজ্জন আগামী প্রকাশনীর কর্ণধার বন্ধুবর ওসমান গনির কাছ থেকে নিউইয়র্ক বইমেলা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পেয়েছিলাম। তিনি তার প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত বইয়ের ইনারে বহির্বিশ্বের দুটি বই বিক্রয় কেন্দ্রের নাম দিতেন। একটি কলকাতার ‘নয়া উদ্যোগ’ আরেকটি নিউইয়র্কের ‘মুক্তধারা’। তবে বাংলাদেশের কিংবদন্তি সৃজনশীল প্রকাশনা সংস্থা ‘মুক্তধারা’র সঙ্গে নিউইয়র্ক মুক্তধারার সম্পর্ক ছিল না বলে ঢাকাতেই জ্ঞাত হয়েছিলাম। প্রথম আমেরিকায় যাত্রা করার এক দিন আগেও বইয়ের সাম্রাজ্য বাংলাবাজারের অনেক বন্ধু-সজ্জন ও শুভাকাক্সক্ষীর মধ্যে শ্রদ্ধেয় দাদা চিত্তরঞ্জন সাহার সঙ্গে দেখা করে এসেছিলাম। নিউইয়র্কে মনের মধ্যে পুঞ্জীভূত কৌতূহলটির জবাব পেলাম নিউইয়র্কে আগমনের দুই সপ্তাহ পর।
সেদিন ছিল রোববার। ম্যানহাটন থেকে লেখক নুরুল ইসলাম ভাই (প্রয়াত) এর সাথে জ্যাকসন হাইটসে একটি বই ও সিডির দোকানে গেলাম। দোকানের নাম ‘মুক্তধারা’। মনের মধ্যে স্মৃতির আনাগোনা। কাউন্টারে ঢুকেই দেখলাম এলোপাতাড়ি বই। বেশির ভাগ বই বক্সে ভর্তি। কিছু বই রেকে সাজানো। আরও আছে প্রচুর ভিডিও ক্যাসেট, সিডি ইত্যাদিতে ভরপুর। বুঝতে পারলাম, বইয়ের ক্রেতা অপ্রতুল। তবে দোকানে (প্রবাসীদের চাহিদানুপাতে) বাংলাদেশের নতুন-পুরাতন নাটক, সিনেমার ভিডিও ক্যাসেটের ব্যবসাই ছিল মুখ্য। মুক্তধারায় গিয়ে দেখলাম, বাংলাদেশ ও ভারতের দৈনিক ও সাপ্তাহিক, বিশেষ সাহিত্য সংখ্যা মিলে পাঠক-পছন্দের বইপুস্তকও আছে। দোকানের মালিকের সঙ্গে দেখা হলো না। তবে একজনের সঙ্গে পরিচয় হলো, তার নাম সুকুমার রায়। বেশ ভদ্র ও বিনয়ী। কিছুদিনের মধ্যে তিনি আমার ঘনিষ্ঠ হয়ে গিয়েছেন। তিনি এবং তার স্ত্রী আমার ম্যানহাটনের বাসায়ও বেড়িয়েছেন। সুকুমার’দা দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর অবশেষে প্রয়াত হয়েছেন।
তখন থেকেই আমার মুক্তধারায় আসা-যাওয়া। একদিন সত্যিই নিউইয়র্ক মুক্তধারার কর্ণধার বিশ্বজিৎ সাহার সঙ্গে পরিচয় হয়ে যায়। প্রথম পরিচয়ে তার ভেতরকার বিনয় ও ভদ্রতায় মুগ্ধ হয়েছি। শুভ্রতা ও চাঞ্চল্যে উদ্দীপ্ত লোকটি কঠোর পরিশ্রমী, তা সহজেই অনুমেয়। একসময় তিনি নিজে বই কাঁধে নিয়ে নিউইয়র্কে বাংলাদেশি গ্রোসারিতে (হাতে গোনা) দিয়ে আসতেন। এভাবেই তিনি বইমেলাকে এগিয়ে নিয়ে যান। ফলে কখনো নিউইয়র্ক বইমেলার ইতিহাস রচিত হলে বিশ্বজিৎ সাহার নামই সবার আগে আসবে।
বইমেলা বাঙালি জীবনের এক প্রত্যাশিত ও কাক্সিক্ষত উৎসব। যেখানে থাকে শুধু বই আর বইয়ের সমারোহ। বইয়ের মিলনমেলা। বই এবং বইপ্রেমীদের জন্য বইমেলাই মূলত আনন্দমেলা।
অগ্রসর পাঠকের কাছে বই হলো সবচেয়ে প্রিয়। তাই বইমেলাকে আনন্দমেলা ভাবতে আমার খুব ভালো লাগে। বই আনন্দের প্রতীক। বই কারও সাথে শত্রুতা করে না। বই হচ্ছে মানুষের প্রকৃত বন্ধু। বইকে ভালোবাসতে হবে। চার্লস ল্যাম্ব বলেছেন, ‘যে বই পড়তে ভালোবাসে, তার শত্রু কম।’
মুগ্ধ পাঠকের কাছে বই হচ্ছে সবচেয়ে বেশি আনন্দের খোরাক। বই এবং পড়া নিয়ে কোরআনে পাকের প্রথম নির্দেশনা হচ্ছে ‘পড়ো’। অর্থাৎ যা সত্য তা পড়ো। মানবকল্যাণের জন্য বই পড়ো। জ্ঞানের দুয়ার খুলে যাবে। বই পাঠ করার মধ্য দিয়ে মানুষ আলোর সন্ধানপ্রাপ্ত হয়।
এ মুহূর্তে দার্শনিক হোরেসের একটি বিখ্যাত উক্তি মনে পড়ছে। তিনি বলেছেন, ‘বই যে কত আনন্দ দান করে, তা অনেক শিক্ষিত লোকও জানে না।’
অথচ বই পড়া নিয়ে অনেকে উষ্মা প্রকাশ করেন। বইকে অযত্ন, অবহেলা করেন। বইকে আবর্জনা মনে করেন। অনেক মূল্যবান বইকে ফেলে দেন এবং বাংলাদেশে সের দরে বিক্রি করে দেওয়া হয়। আবার অনেকে বইকেই জীবনের অমূল্য সম্পদ মনে করেন। বইকে জীবনের সঙ্গী মনে করেন। বই পড়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিখ্যাত সাহিত্যিক নর্মান মেলর বলেছেন, ‘আমি চাই বই পাঠরত অবস্থায় যেন আমার মৃত্যু হয়।’
বাংলাদেশে একসময় ক্ষুদ্র পরিসর নিয়ে (দীনহীনভাবে) বইমেলার যাত্রা শুরু হয়েছিল। বাংলা ভাষার জাগরণ এবং বাংলা সাহিত্যের বিকাশে বইমেলা হচ্ছে আমাদের জাতিসত্তার একটি অনিবার্য মাইলফলক। আমাদের মহান ভাষা আন্দোলন এবং ভাষাশহীদদের চরম ত্যাগের মহিমাকে সমুজ্জ্বল ও অবিস্মরণীয় করে রাখার দৃপ্ত প্রত্যয়ে প্রতিবছর এই বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়।
তেমনি বাংলাদেশের মতো নিউইয়র্ক বইমেলার সার্থকতা হচ্ছে বাংলাদেশ ও কলকাতার স্বনামধন্য কবি-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিসেবী এবং প্রকাশকদের অংশগ্রহণ। বইমেলায় বইয়ের সমারোহের পাশাপাশি বাড়তি অনুষ্ঠানমালার অলংকরণসমূহ প্রবাসের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মাঝে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং সবার আনন্দের জোগান দেয়।
বইমেলায় কেউ আসেন ঘুরতে, সময় কাটাতে। কেউ আসেন কেনাকাটা করতে। কেউ আসেন সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করতে। আবার কেউ আসেন বই দেখতে এবং পছন্দের বইটি কিনে নিতে। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে বইমেলা আনন্দ আর উৎসবের হাটবাজার। ‘মুক্তধারা ফাউন্ডেশন’ আয়োজিত নিউইয়র্ক বইমেলাকে বাংলা উৎসব হিসেবেও ইতিমধ্যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের প্রকোপে সমগ্র পৃথিবী স্থবির ও অচল হয়ে গিয়েছিল। সমগ্র পৃথিবীতে ভয়ংকর মহামারি কোভিড-১৯-এর আক্রমণে এ পর্যন্ত কোটি মানুষের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে। বিশ্বব্যাপী মহা আতঙ্ক, স্বজনহারার আর্তনাদ ও শোক কাটিয়ে মানুষ আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। এখনো পৃথিবীতে করোনাভাইরাসের আতঙ্ক কেটে যায়নি। এ অবস্থায় এক বছর নিউইয়র্কে বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়নি। গত বছর থেকে নিউইয়র্কে আবার বইমেলা শুরু হয়েছে।
এ বছর মুক্তধারা ফাউন্ডেশন আয়োজিত নিউইয়র্ক বইমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে জেনে সবাই আনন্দিত। নিউইয়র্ক বইমেলা বর্তমানে ৩১ বছরে পদার্পণ করল।
বইমেলায় কেনাবেচার পাশাপাশি লেখক-সাহিত্যিকদের অংশগ্রহণে আবৃত্তি, আলোচনা, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম, চিত্রাঙ্কন ও চিত্র প্রদর্শনী, শিশুদের নৃত্য, গান এবং নানা রকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদিতে আবার বইমেলা প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে বলে প্রত্যাশা।
বইমেলা হোক সকলের আনন্দোৎসবের আলোকিত সত্তার জাতীয় প্রতীক। স্বদেশের মতো নিউইয়র্ক বইমেলা হোক সকল প্রবাসীর আনন্দমেলা।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক