নিজস্ব সত্তায় ও গতিতে বাংলা সাহিত্যে কবি কাজী নজরুল ইসলাম

সৈয়দ মামুনুর রশীদ

বাঙালির কবি, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে (১৮৯৯-১৯৭৬) কোন বিশেষণ দিয়ে আখ্যায়িত করব? বিদ্রোহী কবি, মানবতার কবি নাকি প্রেমের কবি? প্রশ্ন পুরোনো হলেও সাধারণ পাঠক অনেকের লেখা পড়ে দ্বিধান্বিত হয়ে যাই, বিদগ্ধজনেরাও আঁতকে ওঠেন যখন কবিকে লেখায় ও বক্তব্যে খণ্ডিত করা হয়। বিশেষ করে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাহিত্যের কষ্টিপাথরবিহীন বিচার-বিবেচনায়। বিদ্রোহী কবি আখ্যা দিয়ে তাঁকে আলাদা করে দেওয়ার কারণ কী হতে পারে, তা পাঠককুলের কাছে এখনো অস্পষ্ট। অনেকের কাছে তিনি হুজুগের কবি হিসেবে আখ্যায়িত। অনেকে তাঁর সাহিত্যে আরবি, ফারসি ও উর্দু শব্দের ব্যবহার পছন্দ করতেন না। জানি না, তাঁকে বিখণ্ডিত করার চেষ্টা না সমালোচনার স্বার্থে সমালোচনা! হ্যাঁ, তাঁকে বিদ্রোহী কবি বলা যায়, কিন্তু সাহিত্যের বিচারে শুধু শুধু ‘বিদ্রোহী’ উপাধি দিয়ে তাঁকে সীমাবদ্ধ রাখার জন্য নয়। কেননা অনেক লেখকের লেখায় কেবল ‘বিদ্রোহী’ বিশেষণ দিয়ে তাঁকে সীমাবদ্ধ করে রাখার প্রবণতা দেখা যায়। তারা ভুলে যান ব্রিটিশবিরোধী জ্বালাময়ী লেখার পাশাপাশি আজীবন অর্থাৎ নির্বাক হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মানবজীবনের সাম্য ও অসাম্প্রদায়িকতার সপক্ষে তাঁর কালি ও কলম ছিল সোচ্চার। তিনি যেমন ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন, তেমনি ছিলেন মানুষে মানুষে বিভেদহীনতায় সাম্যবাদী, সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব নিরসনে অসাম্প্রদায়িক এবং প্রেমিক কবি কাজী নজরুল ইসলাম। কবির এক হাতে ছিল ‘অগ্নিবীণা’, আরেক হাতে ছিল বাঁশের বাঁশরী। তাইতো তিনি তাঁর স্বকণ্ঠে বলতে পেরেছিলেন : ‘আমি বিংশ শতাব্দীর অসম্ভাবনার যুগে সম্ভাবনার বাণী নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছি, তারই সেনাদলের তূর্যবাদকেরই আমি একজন এই হউক আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়।’ সেই সাথে গেয়ে উঠলেন : ‘মোরা এক বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু-মুসলমান। মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তার প্রাণ…।’ সাম্যবাদীর দৃপ্ত কণ্ঠ কখনো থেমে থাকেনি বলেই তিনি বলতে পেরেছিলেন, ‘মানুষের জীবনে একদিকে কঠোর দারিদ্র্য, ঋণ, অভাব; অন্যদিকে লোভী অসুরের যক্ষের ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা পাষাণ-স্তূপের মত জমা হয়ে আছে- আমি এই অসাম্য, এই ভেদজ্ঞান দূর করতেই এসেছিলাম আমার কাব্যে, সংগীতে, কর্মজীবনে। এসেছিলাম অভেদ ও সুন্দর সাম্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে।’ প্রেমিক নজরুলকে পাই তাঁর প্রেমের গানের বিচিত্র ভান্ডারে। যেমন ‘আকাশে আজ ছড়িয়ে দিলাম আমার গানের ফুলগো কুড়িয়ে তুমি নিও…।’ অথবা ‘আমার আপনার চেয়ে আপন যেজন খুঁজি তারে আপনায়…।’ ‘যাবার বেলায় ফেলে যেয়ো একটি খোঁপার ফুল…’। কবি নজরুল বাংলা গজলের প্রবর্তক হিসেবেও সুখ্যাত। তাঁর গজলের মধ্যে যেমন রয়েছে ‘গুলবাগিচার বুলবুলি আমি রঙিন প্রেমের গাই গজল’, ‘পথ চলিতে যদি চকিতে কভু দেখা হয় পরাণ প্রিয়’। তাঁর ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যের মতো গজলগানের গ্রন্থ ‘বুলবুল’ও খুব জনপ্রিয়তা লাভ করে। যেমন কবিতায়, তেমনি গানেও সম্যক খ্যাতি লাভ করতে পেরেছিলেন।
তিনি তাঁর আত্মপরিচয় দিতে গিয়ে নিজেই বলেছেন, ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতূর্য।’ সংগীতজ্ঞ নজরুলের জাগরণমূলক সংগীতে মুগ্ধ হয়ে ১৯২৯ সালে আলবার্ট হলে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু নজরুলকে বলেছিলেন, ‘আমি সারা ভারতবর্ষ ঘুরেছি কিন্তু দুর্গম গিরি, কান্তার মরু, দুস্তর পারাবার হে লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে, যাত্রীরা হুঁশিয়ার…।’ এই গানের মতো কোনো গান আমি খুঁজে পাইনি। সেই সাথে তিনি ঘোষণা দেন, ‘ভারতবর্ষ যেদিন স্বাধীন হবে বাঙালির জাতীয় কবি হবেন কাজী নজরুল ইসলাম।’
একটা দুর্ভাগা সময়ের সংকটকালেই কবিকে ‘দুখু মিয়া’ নাম নিয়ে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জন্মগ্রহণ করতে হয়েছিল। দরিদ্র বলে তাঁর অনুতাপ ছিল না কিন্তু অভিযোগ ছিল গরিব বলে মানুষকে মানুষ হিসেবে গণ্য না করায়। ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র নয় বছর বয়সে ‘দুখু মিয়া’র পিতৃবিয়োগ অপ্রত্যাশিতভাবে তাঁকে সীমাহীন দুর্দশায় ফেলে দেয়। পনেরো বছর বয়সে চুরুলিয়া গ্রাম ছেড়ে যে বিড়িয়ে ছিলেন, সেখানে আর প্রত্যাবর্তন হয়নি। কিন্তু নজরুল সংকটে মাথানত করার মানুষ ছিলেন না, তার প্রমাণ দিয়ে গেছেন তাঁর কৈশোরিক দুর্বার চেতনায় ও কর্মকাণ্ডে। ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা, বিপদে আমি না যেন করি ভয়।’ রবীন্দ্রনাথের এই উক্তিকে হয়তো তার চলার পথের দিশারি করে এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। সে জন্য তিনি কোনো বিপর্যয়ে থেমে থাকেননি। মাত্র দশ বছর বয়সে চুরুলিয়া গ্রামের মসজিদের মুয়াজ্জিনের চাকরি করাকে জীবনের প্রথম উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। সেই সাথে তাঁর চাচা কাজী বজলে করীমের সাহচর্যে লেটোর দলে অংশগ্রহণ নজরুলকে গানে ও কবিতায় প্রভাবিত করেছিল। চাচার সান্নিধ্যে থেকে আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষায় দক্ষতা অর্জন করতে পেরেছিলেন বলে পরবর্তী সময়ে তাঁর সাহিত্যকর্মে এসব ভাষার প্রয়োগ পাই। যেমন ‘আলগা করোগো খোঁপার বাঁধন, দিল ওহি মেরা ফাঁস গায়ি।’ ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ শীর্ষক কবিতায় দেখতে পাই, ‘দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ, ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মত।’ ‘খেয়া-পারের তরণী’তেও ব্যবহার করেছেন আরবি শব্দ ‘শাফায়াত’, পাল-বাঁধা তরণীর মাস্তুল, ‘জান্নাৎ’ হতে ফেলে হুরি রাশ রাশ ফুল। কবি নজরুলের লেখায় আরবি, ফারসি, উর্দু শব্দের ব্যবহার তাঁর সাহিত্যকর্মকে শিল্পের রং ও রসে চিত্তাকর্ষক করে রেখেছে।
এ প্রসঙ্গে নজরুলের ‘কামাল পাশা’ কবিতাটি উদাহরণের জন্য যথার্থ মনে করি। ‘ঐ ক্ষেপেছে পাগলী মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই, অসুর-পুরে শোর উঠেছে জোর্সে সামাল-সামাল তাই! কামাল! তুনে কামাল কিয়া ভাই!’
দারিদ্র্যের মধ্যে যাঁর জীবন সূচিত হয়েছিল, স্বভাবতই সেখানে ছিন্নমূল মানুষের হাহাকার থাকবেই। কবি নজরুল তৃণমূল পরিবেশে লালিত হয়েছিলেন বলেই তাঁর সাহিত্যকর্মে নিপীড়িত-নির্যাতিত-সর্বহারার কথা বারবার বাস্তবতার নিরিখে চলে এসেছে। কবি নজরুল সেই দারিদ্র্যের তিক্ত অভিজ্ঞতার অনুভূতি নিয়ে তাঁর বিখ্যাত ‘দারিদ্র্য’ কবিতার জন্ম দিতে পেরেছিলেন। মানুষ মানুষের জন্য স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ জীব হয়েও মানুষকে মানুষ পণ্য করে, ঘৃণা করে, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, বর্ণবৈষম্যতায় বিচ্ছিন্ন করে রাখে, সেই অভিজ্ঞতার আলোকে ‘সাম্যবাদী’র মতো অমর কবিতার স্রষ্ঠা হয়ে বাংলা সাহিত্যে অবিনশ্বর হয়ে আছেন। নারীর সমানাধিকার নিয়েও ছিল তাঁর প্রতিবাদী শব্দমালা। মানবজীবনের যত চাওয়া-পাওয়ার সুখ বেদনা সমাজের আনাচ-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে, তার প্রতিটির বাস্তব চিত্র নজরুলের সাহিত্যে সার্থকভাবে চিত্রায়িত হয়েছে। অধ্যাপক শিবনারায়ণের উদ্ধৃতিতে উপরিউক্ত সত্যতার যথার্থ উল্লেখ পাওয়া যায় : ‘নজরুলের গান ও কবিতা একেবারে নিচ থেকে উঠে আসা মানুষের গান, তাদের কথা। যারা দলিত, যারা অত্যাচারিত, যাদের ভাষা ছিল না, নজরুলের কলমে তারা ভাষা খুঁজে পেল।’ কবি, সাহিত্যিক, লেখক, সাংবাদিক ইত্যাদি সব পরিচয়ের বিশেষণ ব্যতিরেকেও নজরুল ছিলেন ব্যক্তিগতভাবে একজন নিখাদ মানুষ। এ সম্বন্ধে গবেষক জিয়াদ আলীর উদ্ধৃতিকে যথার্থ না বলার যুক্তি দেখি না : “কথিত আছে, কলকাতায় কলেজ স্ট্রিটে হ্যারিসন রোডের মুখে একটা রিক্সাওয়ালাকে তিনি একদিন রাত বারোটায় গিয়ে বলেছিলেন, ‘এ্যাই তুইতো অনেককেই নিয়ে যাস রিক্সায় টেনে। ঠিক আছে আজ তুই রিক্সায় বোস্ আর আমি তোকে টেনে নিয়ে যাই’।”
দারিদ্র্যের কারণেই নজরুলের একাডেমিক শিক্ষায় নানান বিঘ্নের সৃষ্টি হয়। ফলে কৈশোরেই স্কুলজীবনের অবসান ঘটে। অভাব-অনটনের কারণে জীবিকার তাগিদ তাঁকে অল্প বয়সেই ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে হয়েছিল। প্রায় তিন বছরকাল সৈনিক জীবন তাঁকে পরবর্তী জীবনের মূল্যবান অধ্যায়ের ভিত্তির শক্তি জুগিয়েছিল। সৈনিক জীবনের পাশাপাশি আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষার চর্চায় আত্মনিয়োগ করেন এবং এই তিন ভাষায় দক্ষ হয়ে ওঠেন। যার ফলে তাঁর সাহিত্যে ওইসব ভাষার শব্দপ্রয়োগ তাঁর সাহিত্যের শিল্পকর্মের অলংকরণে এক নতুন ধারার পথ উন্মোচনে সহায়তা করে। ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটলে ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে কবি কলকাতায় ফিরে আসেন। এই ফিরে আসাই নজরুলের জীবনের বাঁককে নতুনত্বের ধারায় নিয়ে আসে। ১৯২১ সাল নজরুলের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়, যে বছর নিজেকে নিজের মতো করে আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন। এ কে ফজলুল হক, কমরেড মুজাফ্ফর আহমদ, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের মতো বিশিষ্টজনের সাহচর্যে এগিয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন। এই বছরের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে কবি তাঁর বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতার জন্ম দিয়েছিলেন। ‘বিজলী’, ‘প্রবাসী’, ‘মোসলেম ভারত’সহ ‘সাধনা’য় প্রকাশিত কবিতা অভাবনীয় আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং এখান থেকেই কবি নজরুল তাঁর নতুন ধারার পথকে রবীন্দ্রবলয় থেকে মুক্ত করে নিয়ে আসেন। ১৯২২ সালে ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাথে নজরুলের সম্পর্কের সেতুবন্ধ গড়ে ওঠে। ‘ধূমকেতু’কে আশীর্বাদ জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নজরুলকে উদ্দেশ করে ‘ধূমকেতু’র জন্য বাণী পাঠালেন : ‘আয় চলে আয়রে ধূমকেতু। আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু, দুর্দিনের এই দুর্গশিরে উড়িয়ে দেয় তোর বিজয় কেতন।’ রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিচক্ষণতার দৃষ্টি দিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন স্বতন্ত্রতার ইমেজ নিয়ে বাংলা সাহিত্যে নজরুলের আগমন উন্মুক্ত হতে চলেছে। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার ২৬ সেপ্টেম্বর সংখ্যা (১৯২২ খ্রি.) নজরুলের জীবনে খ্যাতির ঝড় নিয়ে আসে বলেই ‘বিদ্রোহী কবি’র বিশেষণে বিশেষায়িত হয়ে ওঠেন।
ওই সংখ্যায় প্রকাশিত হয় তাঁর ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা, যে কবিতার জন্য ‘ধুমকেতু’র ২৬ সেপ্টেম্বরের সংখ্যাটি নিষিদ্ধ হয় ১৯২২ সালের ৮ নভেম্বর এবং ২৩ নভেম্বর তাঁর প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘যুগবাণী’ বাজেয়াপ্ত করা হয়। একই দিনে তাঁকে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করা হয়। আদালতের রায়ে তাঁকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে হয়। নজরুল কারাবাসে থাকাকালে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য নজরুলকে উৎসর্গ করেন। রবীন্দ্রনাথের এই সম্মান পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে কবি নজরুল কারাগারে বসে তাঁর অমর কবিতা ‘আজি সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ রচনা করেন। বাংলা সাহিত্যের দুই দিকপাল সাহিত্যিকের মধ্যে সম্প্রীতি সম্পর্কের কোনো ঘাটতি ছিল না। উপরিউক্ত ঘটনাই তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তার পরও কতিপয় লেখকের কাছে কাজী নজরুল চক্ষুশূল হয়ে ওঠেন রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্কের নিবিড়তা দেখে।
বাংলার হাজার বছরের বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে একমাত্র নজরুলই ছিলেন মনেপ্রাণে কালি ও কলমে, কাজে-কর্মে আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক। তিনি মুসলমান না হিন্দু এই পরিচয়ে মানুষকে বিচার করেননি, মানুষকে দেখেছেন মানুষের শরীরের ঘামকে সঙ্গী করে জাতিগত বিভেদের ঊর্ধ্বে থেকে। তাঁর কলম যেমন ইসলামি সংগীতের প্রতি এগিয়ে গেছে, তেমনি ছিল শ্যামাসংগীতে অবাধ বিচরণ। নজরুল তাঁর ‘হিন্দু মুসলমান’ প্রবন্ধে লিখেছেন : “নদীর পাশ দিয়ে চলতে চলতে যখন দেখি, একটি লোক ডুবে মরছে, মনের চিরন্তন মানুষ তখন এ প্রশ্ন করবার অবসর দেয় না যে, লোকটা হিন্দু না মুসলমান…তার মন বলে ‘আমি একজন মানুষকে বাঁচিয়েছি, আমার মত একজন মানুষকে’।”
নজরুলের আরেকটি পরিচয় তিনি ছিলেন বাংলা গানের অনন্যসাধারণ সংগীতজ্ঞ। সুরের বৈচিত্র্যে তাঁর গানে সুর সংযোজন ও সংগীত সৃষ্টিতে বাংলা গানের ইতিহাসে অনন্য হয়ে আছেন। তিনি বাংলা গজলের যেমন প্রবর্তক, তেমনি রণসংগীতও তাঁর হাত ধরে বাংলা গানে অনুপ্রবেশ। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু নজরুলসৃষ্ট রণসংগীতে মুগ্ধ হয়ে মন্তব্য করে বলেন, ‘আমরা যখনই যুদ্ধে যাবো তখনই নজরুলের জাগরণের গান গাইবো।’ নজরুলের গানের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন হাজার। ধারণা করা হয়, নজরুল কিছুটা অগোছালো প্রকৃতির ছিলেন বলে তাঁর কিছু গান হারিয়ে গেছে।
বিংশ শতাব্দীর জাগরণের কবি, বিদ্রোহী কবি, মানবতার কবি, প্রেমের কবি, সর্বহারার কবি কাজী নজরুল ইসলাম সাতাত্তর বছর বেঁচে থাকলেও সক্রিয় ছিলেন ৪৩-৪৪বছর। ৩৩-৩৪ বছর নির্বাক ছিলেন। শিল্পজীবন ২৩-২৪ বছর। এই সামান্য সময়ে বাংলা সাহিত্যে ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হয়ে যা রেখে গেছেন, তা সময়ের নিরিখে কম বলা যায় না বরং এ দিয়েই তিনি রবীন্দ্র প্রভাবমুক্ত হয়ে তাঁর নিজস্ব সত্তায় ও গতিতে বাংলা সাহিত্যে বাঙালির মননে অবিনশ্বর হয়ে আছেন এবং থাকবেন।
-নিউইয়র্ক, ২৩ আগস্ট ২০২০।