নিজের ঢাক নিজে পেটাই

পবিত্র সরকার

আজ, পাঠকদের নাক-সিটকানো বিরক্তির ঝুঁকি নিয়ে, একটু নির্লজ্জ আত্মপ্রচার করা যাক। আমি যে লিখি, পাঠকদের কাছে নিজেকে ভাষায় জাহির করি, সেটাই তো এক ধরনের আত্মপ্রচার। লেখার শিরোনামের নিচে নিজের নামটা থাকে, সেটা তো আর প্রত্যাহার করতে পারি না। যারা আমার ওই নামটা সহ্য করেন, তারা এই প্রচারটুকুও সহ্য করুন, এই প্রার্থনা।
এই যে আমি একটা লোক, সে বাংলাদেশে জন্মেছে বলে নয়, বন্ধুদের আনুকূল্যে বাংলাদেশে ঘন ঘন মুখ দেখানোর সুযোগ পেয়েছে। এ মুখ এমন কিছু দেখনধারী নয়, তবু বাংলাদেশের বন্ধুরা তা মাঝে মধ্যে দেখতে চান। ১৯৮৮ থেকে তা কালেভদ্রে ছিল, কিন্তু ২০১০-এর পর থেকে এই আকাক্সক্ষা প্রায় মহামারউর আকার নিয়েছে।
ঢাকার বাংলা একাডেমির একটা খাঁটি বাংলা ব্যাকরণের সম্পাদনার (অগ্রজ অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের সঙ্গে) জন্য সেই যে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান ভাই ব্যবস্থা করেছিলেন বছরে চার-পাঁচবার গিয়ে থাকার, ১৫ দিন ২০ দিন করে, তার পর ব্যাকরণ বেরিয়ে গেল ২০১২ নাগাদ, কিন্তু আমার প্রতি বাংলাদেশের বন্ধুদের একটা অসুস্থ ভালোবাসা তৈরি হলো, তারা আমাকে ছাড়লেন না।
পশ্চিম বাংলার বাঙালিদের অবশ্য এখনও ধাঁধা আছে ঠিক কী কাজে আমি যেতাম, ব্যাকরণ না অভিধান।
এখনও অনেকে জিজ্ঞেস করেন- আপনাদের বাংলাদেশের সেই অভিধান না কিসের কাজ চলছিল সেটা কি শেষ হয়েছে? আমার ধারণা, ব্যাকরণ রচনা আর সম্পাদনা তাদের কাছে ভয়ংকর একটা অনুচিত আর গর্হিত কাজ, জঘন্য এক পাপকর্ম, তাই তারা আমার বেলায় সেটা বিশ্বাস করতে চান না, একটা ধাড়ষফধহপব ংুহফৎড়সব বা ‘পরিহার-প্রপঞ্চ’ কাজ করে। ভাবেন, এই লোকটা অত খারাপ কাজ করতে পারে না, তাই তারা তুলনায় অনেক নিষ্পাপ ও মহৎ কাজ, অভিধান রচনার দায়িত্ব আমার ওপর চাপিয়ে দেন। যাই হোক, ব্যাকরণের কাজ সেই ২০১২তেই শেষ হলে হবে কী, আমার বাংলাদেশে যাওয়া থামল না। বরং বারংবারতায় তা অনেক বেড়ে গেল, বছরে আট-দশবার তো যেতেই হয়, এক মাসে দু’বারও হয়েছে কখনও। ফলে কলকাতার লোক আমাকে বলে- আপনি কি দেশে আছেন, না বাংলাদেশে?
বাংলাদেশের মানুষেরাও, তাদের মধ্যে মহা ঘ্যাম সব লোক আছেন, দারুণ ফুর্তিতে এই কথায় তাল দেন। যেমন এই সেদিন, ২৭ অক্টোবর, বাংলাদেশে উদীচীর সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবের উদ্বোধন শহীদ মিনারে, আমি অতিথিমাত্র, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর তার উদ্বোধনী ভাষণে বলে দিলেন, পবিত্রদা বাংলাদেশেরই লোক, মাঝে মাঝে কলকাতায় গিয়ে থাকেন মাত্র। আর এই ২ নভেম্বর, কলকাতায় বাংলাদেশ বইমেলা উদ্বোধন করতে এসে প্রধান অতিথি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ভাই শ্রোতার আসনে আমাকে দেখে বলে বসলেন, পবিত্র বাবুকে তো আমরা দখল করে নিয়েছি, উনি আমাদেরই লোক এখন।
এর আগেও একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তিনি আমাকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেয়ার সদিচ্ছা জানিয়েছেন। এতে কার না ল্যাজ মোটা হয় বলুন। আমি তো রক্ত-মাংসের মানুষ বই নয়।
আর বাংলাদেশ যাওয়া যেসব সময় খুব মজার ব্যাপার তা-ও নয়। এ ব্যাপারে আমি আগে লিখেছি, কোনো রাখঢাক করিনি, তারই পুনরাবৃত্তি করছি। ওখানে এক হিসেবে প্রাণ হাতে করে যেতে হয়। গেলেই বন্ধুরা আমন্ত্রণ করেন দুটো ‘ডাল-ভাত’ খাওয়ার জন্য। গেলে বসিয়ে বলেন, অহন ত কিছুই পাওয়া যায় না, কী খাওয়ামু আপনেগো? বলে টেবিলে পাঁচ রকমের ভর্তা, তিন রকমের ভাজা, চার রকমের সবজি, পাঁচ রকমের আমিষ, তিন রকমের মিষ্টি আর দু’রকমের দই সাজিয়ে দেন। সে এক প্রাণঘাতী ব্যাপার। তার অন্তত নব্বই শতাংশ যদি আপনি না খান, আমন্ত্রণকর্তারা মুহ্যমান হয়ে পড়েন।
প্রথম প্রথম তো মনে হয়েছিল হাতাহাতি না করে এদের হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে না। তার পর থেকে তারা বুঝেছেন যে, বেশি জোরাজুরি করলে আমাকে ওখানেই দেহরক্ষা করতে হবে, এই এখন ক্ষমাঘেন্না করে কিছুটা রেহাই দেন। কাজেই বাংলাদেশে নেমন্তন্ন রক্ষা করতে গিয়ে কারও মুখে ‘অহন ত’ শুনলেই আপনারা প্রচ- সাবধান হয়ে যাবেন।
নইলে আপনাদের প্রাণরক্ষা করা দায় হবে। ব্যাকরণ রচনা/সম্পাদনার সময় আমার সঙ্গে যেত সহসম্পাদক রাজীব চক্রবর্তী, দু-তিন সপ্তাহে সে প্রত্যেকবার দু-তিন কেজি ওজন বাড়িয়ে ফিরত, ফলে এখানে এসে তন্বী স্ত্রী অদিতির কাছে তাকে প্রচুর গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে এবং তার পরে প্রায় নিরম্বু উপবাসে থেকে সেই ওজন কমাতে হয়েছে। আমার সহকারী হিসেবে তার খানিকটা দায় আমাতেও বর্তেছে।
বাংলাদেশের কথা ছেড়ে দিন। এখানে কী হলো? গতবার বইমেলায় একটি ইসলামী পুস্তকের স্টলে মুসলমান নামকরণ সম্বন্ধে একটা বই কিনতে গেছি, বই কিনতে টাকা বার করেছি, মালিক বা প্রতিনিধি বললেন, এই বইয়ের জন্য আমি আপনার কাছে টাকা নেবো না। আমি চোখ কপালে তুলে বললাম, সে কী? কেন?
তিনি বললেন, এমনি, কোনো কারণ নেই। নিলেন না তো নিলেন না। আরেকবার উদ্বোধনের দিন অনুষ্ঠানের শেষে আমার বড় নাতির জন্য তার প্রিয় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবালের বই কিনতে গেছি, দুটি বই বেছেছি। প্রকাশক বললেন, এ বই দুটি আপনাকে আমাদের উপহার। আমি বললাম, পাগল নাকি? আপনি কলকাতায় এসেছেন ব্যবসা করতে, বই বিলিয়ে ফতুর হতে নাকি? টাকা নিতেই হবে। বলে আমি তার হাতে একটা মাঝারি নোট গুঁজে দিলাম।
তিনি আয়ত, বিষন্ন চোখে টাকাটা নিয়ে বললেন, টাকাটা আমি গ্রহণ করলাম, করে আপনাকে আবার ফিরিয়ে দিচ্ছি। আপনাকে নিতেই হবে। তার চোখের দিকে তাকিয়ে আমি আর হাত গুটিয়ে নিতে পারলাম না। কিন্তু আমার সর্বনাশ হয়ে গেল। এই বইমেলায় আমি আর কোনো স্টলে ঢুকতে পারব না। বই কিনতে হলে, কেনার মতো বই প্রচুর আসে, অন্যকে দিয়ে কেনাতে হবে।
এই ভালোবাসা আমাকে সোনালি মেঘের ওপর ভাসিয়ে রাখে, আমি ওই মেঘের খেয়ায় দুই দেশে পারাপার করতে থাকি। সাদাত হোসেন মান্টোর টোবা টেক সিং ভারত-পাকিস্তানের সীমারেখার ওপরে নিজেকে ছুড়ে দিয়ে দীর্ণ-বিদীর্ণ হয়েছিল, আমার অবস্থা ঠিক তার উল্টো হয়। আমি প্রবল সুখে দু-প্রান্তে বিস্তারিত হই, দু’দিকের ভালোবাসায় বেঁচে থাকি। এ বড় মধুর জীবন।
সাবেক উপাচার্য, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা।