নিন্দিতদের বিরুদ্ধে নন্দিত অভিযান

নজমুল হেলাল : এখনই সময় দুর্নীতি, ঘুষ, চুরি-ডাকাতি, মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিকে চিরতরে বিদায় করার। প্রশাসন ও পুলিশের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠিন অ্যাকশনে যাওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের মাধ্যমে ফুটপাত, বাজার ও যানবাহনসহ যেকোনো উন্নয়নমূলক কাজ থেকে চাঁদা সংগ্রহ বা কমিশন বাণিজ্য সম্পূর্ণ বন্ধ করার জন্য গোপন নির্দেশনা দরকার। চাকরিতে ঢোকার জন্য প্রকাশ্যে অর্থ চাওয়ার ক্ষেত্রে জনগণের কাছ থেকে অভিযোগ নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। দুর্নীতি দমন কমিশনকে আরও স্বাধীন ও ক্ষমতাবান করা এখন সময়ের দাবি। আইন সংশোধন করে দুর্নীতি দমনের অধীনে কয়েকটি বিশেষ থানা ও আদালত দেওয়া যায় কি না- ভেবে দেখা প্রয়োজন। সরকারি-বেসরকারি যেকোনো রাজনৈতিক সংগঠন কোথাও কমিশন বাণিজ্য ও দখল কালচারে থাকে, তাদের দল থেকে শুধু অব্যাহতি নয়, তাদের আটক করে তাৎক্ষণিক সাজা দেওয়া দরকার।
প্রশাসনের অনেকের সম্পদের কাহিনি মিডিয়ায় আসছে, এসব লোকদের চাকরিচ্যুতি স্থায়ী করা ও তাদের কারাদ-সহ অর্থদ- দেওয়া, তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা অপরিহার্য। সর্বত্র জবাবদিহির কালচার চালু, মন্ত্রীদের মাধ্যমে নিজ নিজ মন্ত্রণালয় থেকে ঝেঁটিয়ে দুর্নীতিকে বিদায় করার কোন বিকল্প নেই।
ড. আতিউর রহমানের আমলে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কয়েক শ কোটি টাকা চুরি বা পাচার হয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রকাশের পূর্ব পর্যন্ত ক্যাসিনো শব্দটা সোশ্যাল মিডিয়ায় বা জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়নি। কিন্তু আজ কদিন হলো বেশ আলোচিত হচ্ছে এবং ক্যাসিনোর বৈশিষ্ট্য কার্যক্রম বিস্তারিত প্রকাশ পাচ্ছে। এর নেতিবাচক ভয়াবহতা থেকে হঠাৎই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী-দেশকে বাঁচাতে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছে। কিন্তু যারা অবৈধ পন্থায় দ্রুত আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে উঠেছে, তাদের তো সর্বনাশ-মাথায় বজ্রাঘাত। তারা দিশেহারা হয়ে উঠেছে, আর জনমনে করছে আশার সঞ্চার। এই অভিযান দেশব্যাপী সব সময়ের জন্য আন্তরিক ও অব্যাহত থাকলে আদর্শিক একটা বাতাস রাজনৈতিক অঙ্গনে বইতে শুরু করবে সবার ধারণা। প্রায় সব ক্ষেত্রে আদর্শহীনতার যেন জয়জয়কার। এ অবস্থা থেকে সমাজ ও দেশকে বাঁচাতে সরকারকেই অগ্রণী ভূমিকা রাখতে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন সৎ রাজনৈতিক আবহ সৃষ্টি দৃশ্যমান করে তোলার বিকল্প নেই। যদিও এই অভিযান প্রশংসিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর জন-আস্থা বৃদ্ধির শুভ সূচনালগ্ন এটা। ক্লাব কখনো সেবা, কখনো সামাজিক বিনোদনের মাধ্যম। খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রাখার ও তার বিস্তৃতি ঘটিয়ে গৌরব এবং উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপনের প্রতিষ্ঠান। সেই ক্লাব যখন মাদকের আড্ডা, জুয়া তথা অনৈতিক কাজের উৎসস্থল হয়ে যায়-দেশের সম্ভাবনাময় উদ্দীপ্ত তারুণ্য ধবংসের হয়ে ওঠে হাতিয়ার; তখন সাধারণ মানুষ তা সহজে মেনে নিতে পারে না। একদিকে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে, অন্যদিকে প্রায়ই মাদকদ্রব্য ধরাও পড়ছে। অর্থাৎ মাদক ব্যবসায়ীরা ভয় পাচ্ছে না। এই সাহস কিংবা অবাধ্যতার কারণ উদ্্ঘাটন করে সঠিক পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। যাতে যুবশক্তি, তারুণ্য যেন ধবংস না হয়। যুবশক্তি ধ্বংস করার পরিকল্পনা বহু আগেও ছিল। ছিল আফিম, গাঁজা, মদ প্রভৃতি। ছিল বাগানবাড়ি, বসত বাইজি আসর। যুগের পরিবর্তনে ক্যাসিনো কালচার ঢুকে পড়েছে আমাদের দেশে। কালো টাকা অবৈধ অর্থ-সম্পদ ব্যয়ের জায়গা এসব ক্লাব ক্যাসিনো কিংবা বিভিন্ন মেলা নামধারী নানা আয়োজনে। এসব আয়োজন যেমন সামাজিক বিনোদন দিয়ে থাকে, তেমনই এরই ফাঁকফোকর দিয়ে ঢুকিয়ে দেয় দ্রুত ধনী হওয়ার জন্য জুয়াখেলা, মাদকদ্রব্য বিক্রির মতো বেআইনি অপকর্ম। কখনো কখনো এসব অপকর্মের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে নারী বিলাসীদের নানা ঘটনাও সমাজ, দেশ কিংবা পৃথিবীকেও পীড়িত করে।
রাজনীতি হলো নীতির রাজা; রাজার নীতি নয়। অথচ এখনো যারা জনগণকে প্রজা ভাবে, মানুষকে অবহেলা করে, তাচ্ছিল্যের পাত্রপাত্রী বানায়, তারা হয়তো ভুলেই গেছে বঙ্গবন্ধুর ত্যাগের কথা, ৩০ লাখ শহীদের কথা, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতার কথা। তা না হলে শুধু টাকার জন্য অবৈধ অর্থের লোভে নীতিনৈতিকতা বিবর্জিত কর্মকা-ের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার গৌরবময় পরিচয় নিয়ে চলা দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অপ্রত্যাশিত অভিযোগে আক্রান্ত। আর তাই বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকার বাধ্য হচ্ছে শুদ্ধি অভিযান চালাতে।
এই অধঃপতিত অবস্থার সৃষ্টি একদিনে হয়নি; হয়েছে ক্রমান্বয়ে, নানা হাত ধরে। সমাজের শৃঙ্খলা রক্ষা করে তার অভ্যন্তরীণ আদর্শিক নীতিমালা। চাঁদাবাজি, বেআইনিভাবে টেন্ডারবাজিতে এসব নীতিমালা অনুপস্থিত। তাই সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে এসব বেআইনি অপকর্ম করায়। এতে দল ও দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। কর্মসংস্থান ও উন্নয়নকাজের অন্যতম অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত হয়। একটি দেশ চলতে ও চালাতে এবং উন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সে জন্য নজর রাখতে হয় সরকারকে। সব সরকারের আমলে দুর্নীতিপরায়ণ ব্যবসায়ী মহাব্যস্ত থাকে তার অবৈধ পন্থায় মূলধন আর সম্পদ-বৃদ্ধির নেশায় আর কারও কারও প্রমোশন কখনোই বাধাপ্রাপ্ত হয় না। এ ধরনের সুবিধাবাদী মানুষের অপকৌশলের কাছে দেশ যেন বারবার হেরে যাচ্ছে। অতিরিক্ত লোভ, মোহ মানুষকে স্বার্থান্ধ, আত্মকেন্দ্রিক কওে তুলছে। নিজের স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই তাদের ভাবনায় থাকে না। এদের সংখ্যায় অপরাজনৈতিক কর্মকা-ের কারণেও আজকাল বেড়েই চলেছে। এ অবস্থায় শান্তিপ্রিয় সাধারণ জনগণের যে চাওয়া, তা যেন পূরণ হওয়ার নয়Ñএমনই হতাশাজনক অবস্থায় আকস্মিক অভিযান; তাও আবার মহামারি দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে, ক্ষমতার অপব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে। এ যেনো নিন্দিত ক্ষমতাধরদের বিরুদ্ধে নন্দিত অভিযান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকার এই অভিযানের মধ্য দিয়ে যে শুদ্ধির বার্তা দেশ ও জাতিকে দিয়েছেন, তাতে তিনি ও তার সরকার নন্দিত হচ্ছেন। জনগণ হচ্ছেন আশান্বিত।