নিবন্ধন স্থগিতের ঝুঁকিতে বিএনপি

নিজস্ব প্রতিবেদক : এখনো দৃশ্যমান না হলেও নানা কৌশলে বিএনপিতে ভাঙনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ দৃঢ় অবস্থান দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। চিকিৎসার নামে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে আগামী মার্চ-এপ্রিলে লন্ডনে পাঠানোর সম্ভাবনা রয়েছে। খালেদা জিয়া যদি শেষ পর্যন্ত বিদেশে যেতে রাজি নাও হন, তাকে কারাগারে রেখেই ভাঙনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য দলের মধ্য থেকেই নানা তৎপরতা চলছে।
বিএনপির একাধিক সূত্রে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, দলকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে আগামী মার্চে কাউন্সিল করা হবে। কাউন্সিলে দলের ঐক্য টিকিয়ে রাখা বর্তমান নেতৃত্বের পক্ষে কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ৩০ ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে ভয়াবহ ভরাডুবির জন্য শীর্ষস্থানীয় নেতাদের দায়ী করা হচ্ছে। বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান স্থায়ী কমিটির অধিকাংশ সদস্যের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। হতাশ, ক্ষুব্ধ শীর্ষস্থানীয় নেতারা নেতৃত্ব থেকে সরে যাওয়ার কথাও প্রকাশ্যে বলেছেন। তারেক রহমান তরুণদের নেতৃত্বে আনতে চান। খালেদা জিয়া প্রবীণ-নবীনদের সমন্বয়ে দল পরিচালনার পক্ষে।
বিএনপিকে বিপর্যস্ত ও নেতা-কর্মীদের চরম হতাশাগ্রস্ত অবস্থায় রেখে সরকার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচন নির্বিঘেœ করিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। এ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পক্ষে-বিপক্ষে মত রয়েছে বিএনপিতে। বিএনপি দলগতভাবে অংশ যদি নাও নেয়, দলটির মাঠের স্থানীয় নেতাদের নির্বাচনী মাঠে নামানোর প্রক্রিয়া চলছে বিএনপির ভেতর থেকেই। জামায়াতের পক্ষ থেকেও স্বতন্ত্র প্রার্থী দেওয়া হবে। দলগতভাবে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে সরকারের গণবিরোধী চরিত্র দেশে-বিদেশে আরও অধিকভাবে তুলে ধরার পক্ষে শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কেউ কেউ। এই নির্বাচনেও সংসদ নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি হলে সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনগণের অংশগ্রহণে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা এবং দেশে-বিদেশে অধিকতর জনমত, সমর্থন সংগঠিত করার সুযোগ হবে বলে তারা মনে করেন। এর বিপক্ষ মতের নেতারা মনে করেন, ৩০ ডিসেম্বরের অভিজ্ঞতার পর এই নির্বাচন কমিশন ও সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ নেওয়া সরকারি পরিকল্পনারই বাস্তবায়ন।
কাউন্সিলে চেয়ারম্যান পদে খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান পদে তারেক রহমানকে বৈধতা দেওয়া হবে। নির্বাচন কমিশন দ-িত কোনো ব্যক্তিকে রাজনৈতিক দলের পদাধিকারী করা যাবে না মর্মে সাংবিধানিক বিধান স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিএনপিকে চিঠি দিতে পারে। কাউন্সিলে সংবিধানসম্মতভাবে গঠনতন্ত্র সংশোধন করা না হলে অর্থাৎ দ-িত হিসেবে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে বাদ দেওয়া না হলে নির্বাচন কমিশন বিএনপির নিবন্ধন স্থগিত বা বাতিলও করতে পারে। বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তির জন্য আদালতের শরণাপন্নও হতে পারে বলে নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়।
বিএনপির একটি সূত্র জানিয়েছে, এ ব্যাপারে সরকারের দিক থেকে কোনো দৃশ্যমান চাপ নেই। বেগম খালেদা জিয়া কোনো অবস্থাতেই চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যেতে আগ্রহী নন। তাকে বিদেশে পাঠিয়ে দলে বিভক্তি সৃষ্টির পরিকল্পনা থাকতে পারে সরকারি মহলের। তিনি সে সুযোগ দিতে চান না। দেশেই স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে অধিকতর আগ্রহী তিনি। তবে পুত্রবধূ ডা. জুবাইদা অসুস্থ থাকায় তার পাশে থাকার ইচ্ছা পোষণ করেন। এ কারণেই তিনি লন্ডনে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে জেল কর্তৃপক্ষ সূত্র দাবি করছে। জেল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের গোচরীভূত করেছে। জানা যায়, সরকার তাকে তিন মাসের জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার কথা ভাবছে। জেল কোড অনুযায়ী দ-িত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যের মৃত্যু হলে বা উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজনেই কেবল প্যারোলো মুক্তির বিধান রয়েছে।
সরকারের একটি নেতৃস্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, বিএনপিতে ভাঙন সৃষ্টির জন্য খালেদা জিয়াকে দেশের বাইরে পাঠানোর কোনো চিন্তা নেই সরকারের। সে রকম তাগিদও বোধ করছে না। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-বিরোধ দলটিতে তীব্র আকারে রয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির বেশ কয়েকজন সদস্যের ব্যাপারেই খালেদা জিয়ার সন্দেহ রয়েছে। এই সন্দেহ তিনি প্রকাশও করেছেন। খালেদা জিয়া-তারেক রহমানের অবর্তমানে দলের শীর্ষ নেতৃত্বে আসার জন্য তাদের মধ্যকার প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য প্রতিযোগিতা বিএনপির নেতা-কর্মীদের কাছেও আর অস্পষ্ট নয়।
সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিপক্ষে ছিল দলের একটি অংশ। সরকারের সঙ্গে সংলাপে বসা এবং তাতে কোনো ফল না আসার পরও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তারা। তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের কথা বলে তারা পার পাওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু সাংবিধানিকভাবে তারেক রহমানের নেতৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত সকল মহলই।