নির্বাচনী বাজেটের কাজ শুরু

রাজনৈতিক ডেস্ক : আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে কাজ শুরু করেছে অর্থ বিভাগ। ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে চাহিদাপত্র প্রস্তুতের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও (এনবিআর) বাজেট প্রণয়নের প্রস্তুতি শুরু করেছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানিয়েছেন এবারের বাজেটে তেমন কোনো পরিবর্তন আসবে না। গতানুগতিক একটি বাজেট দেওয়া হবে। নতুন করে কোনো খাতে করারোপ করা হবে না। এমনকি নতুন করে উন্নয়ন প্রকল্প না নিয়ে পুরনো প্রকল্পগুলো শেষ করার ওপর জোর দেওয়া হবে।
অর্থ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, বাজেটে নতুনত্ব না থাকলেও চলমান সংস্কার কর্মসূচিকে আরও ত্বরান্বিত করা হবে। বিশেষ করে সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশনের ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন করা হবে। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় যেসব ভাতা রয়েছে সেগুলো বিকাশে কিংবা অন্য ডিজিটাল পন্থায় দেওয়ার চিন্তাভাবনা রয়েছে। ভর্তুকি বেশ কিছু বাড়তে পারে। পাশাপাশি নতুন এমপিওভুক্তির বিষয়টিও ভাবনায় রয়েছে। তবে বাজেট তৈরির ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রী বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন। অন্য দিকে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। বাজেটে দারিদ্র্য, নারী উন্নয়ন ও জলবায়ুর বিষয়টি বেশ গুরুত্ব পাবে। এবার বাজেটে নতুন মাত্রা হিসেবে বরাদ্দ থাকবে রোহিঙ্গাদের জন্য।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, আগামী বছরের বাজেটের শুধু আকারই বাড়বে। আর তেমন কোনো পরিবর্তন আসবে না। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে নতুন বাজেটের আকার হতে পারে ৪ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের বাজেটের চেয়ে ১৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ বেশি। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকার। এতে মোট রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ধরা হতে পারে ৩ লাখ ৪০ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা, যা চলতি (২০১৭-১৮) অর্থবছরের চেয়ে ১৮ দশমিক ৩২ শতাংশ বেশি। করের আওতা বাড়ানোর জন্য এ বছর যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সেগুলো সফল হলে আগামী বছরের বিশাল টার্গেট পূরণ করা কঠিন হবে না বলে মনে করে এনবিআর।
সূত্র জানায়, উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হতে পারে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। যা চলতি বছর ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। এটা অর্জিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাজেট সামনে রেখে অর্থমন্ত্রীর জন্য প্রস্তুত করা অর্থ বিভাগের এক সারসংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়েছে আগামী বছর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে। যদিও এ সময় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে তেমন কোনো পরিবর্তন আসার আভাস নেই। জিনিসপত্রের দামও নতুন করে বাড়বে না। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ভালো হবে। ফলে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ৭ দশমিক ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা খুব বেশি দুরূহ হবে না। চলতি বছরও উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, আগামী (২০১৮-১৯) অর্থবছরের বাজেটের আকার ধরা হচ্ছে ৪ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের বাজেটের চেয়ে ১৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ বেশি। টাকার অংকে ৬৭ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা বেশি। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হতে পারে ৩ লাখ ৪০ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। বিপুল পরিমাণ এ রাজস্ব আদায় করা এনবিআরের জন্য কঠিন এক চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কর ব্যতীত রাজস্ব প্রাপ্তির লক্ষ্য ধরা হতে পারে ৩৩ হাজার ১১২ কোটি টাকা, চলতি (২০১৭-১৮) অর্থবছরে যা রয়েছে ৩১ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা। এ ছাড়া ভ্যাট খাত থেকে ১ লাখ ২০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হতে পারে বলে জানা গেছে।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধরা হতে পারে ২ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি। এ বছর চলতি বাজেটে এডিপির আকার ধরা হয়েছে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। তবে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর অর্থায়নে আরও ১০ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে চলতি বছর। ঘাটতি প্রাক্কলন করা হতে পারে এক লাখ ২৭ হাজার ২২৬ কোটি টাকা। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে এক লাখ ১২ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা ঘাটতি ধরা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানিয়েছেন, ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ গঠনের লক্ষ্যে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগবান্ধব বাজেট দেওয়া হবে। এ জন্য ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আমাদের মোট বিনিয়োগ ছিল জিডিপির ৩০ দশমিক ৩ শতাংশ। যেখানে সরকারি খাতের বিনিয়োগ ছিল ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৩১ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। ২০১৮-১৯ বছরে তা ৩২ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, আগামী (২০১৮-১৯) অর্থবছরের বাজেটে অর্থ মন্ত্রণালয় প্রাথমিকভাবে ঘাটতির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করছে তার পরিমাণ ১ লাখ ২৭ হাজার ২২৬ কোটি টাকা। গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৩ দশমিক ৫১ শতাংশ বেশি। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এক লাখ ১২ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে।
বাজেট ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৬০ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা ধার করবে সরকার। মধ্যে ব্যাংক-ব্যবস্থা থেকে ২৮ হাজার ২০৩ কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র থেকে ৩০ হাজার ১৫০ কোটি টাকা এবং অন্য খাত থেকে এক হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।