নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করার কৌশল!

ইসিতে বিএনপির অভিযোগের স্তূপ

শরীফুল ইসলাম : জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগের পাহাড় জমেছে। তফসিল ঘোষণার পর থেকে প্রতিদিনই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা নির্বাচন কমিশন ভবনে গিয়ে ধারাবাহিকভাবে অভিযোগ করছে। তবে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ করেছে বিএনপি। কখনও দলীয় ব্যানার, আবার কখনও নির্বাচনী জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে অভিযোগ করা হচ্ছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনে ৫৩৫টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এবারের মতো এত বেশি অভিযোগ কখনও জমা পড়েনি। তবে এসব অভিযোগ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কৌশল বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছে।
নির্বাচন কমিশনে গিয়ে অভিযোগ করার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলো সংবাদ সম্মেলন, এমনকি সংবাদ মাধ্যমে বিবৃতি দিয়েও অভিযোগ করা হচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ প্রতিদিনই অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ করছে। গত ২৫ ডিসেম্বর, মঙ্গলবারও বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা নির্বাচন কমিশনে গিয়ে ১৩টি অভিযোগ করেছে। এ ছাড়া প্রতিদিনের মতো নয়াপল্টন বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে দলের মুখপাত্র ও সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী নির্বাচন কমিশন, পুলিশ ও সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ করেছেন।
গত ৮ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ দাখিল শুরু হয়। নির্বাচন কমিশনে গিয়ে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোট প্রতিদিনই অভিযোগ করছে। কখনও কখনও একই দিনে বিএনপি একাধিকবার গিয়ে অভিযোগ দিচ্ছে। অবশ্য কখনও কখনও সরকারি দল আওয়ামী লীগও বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ করছে। সকালে বিএনপি অভিযোগ করলে বিকেলে নির্বাচন কমিশনে গিয়ে আওয়ামী লীগ পাল্টা অভিযোগ করেছে। তবে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিএনপির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে উদ্দেশ্যমূলক এসব অভিযোগ করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করা হচ্ছে।
সর্বশেষ গত ২৫ ডিসেম্বর, মঙ্গলবার, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) সঙ্গে সাক্ষাত করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ এ জোটের ১০ সিনিয়র নেতা ১৩টি অভিযোগ করেন। এসব অভিযোগের মধ্যে ছিল- এখনও নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি না করা, নির্বাচন কমিশন (ইসি) পক্ষপাতিত্ব, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ইসি শক্তিশালী ভূমিকা না রাখা, নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ দেখতে না পাওয়া, পুলিশের পক্ষপাতিত্ব, পুলিশ বাহিনীকে ইসির নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা, বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে মিছিল-মিটিং করতে না দেয়া, ২টার আগে মাইক ব্যবহার করতে না দেয়া, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনী প্রচারে পুলিশের সহযোগিতা, বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশের হামলা, বিরোধী দলকে নির্বাচনী প্রচারে আওয়ামী লীগের বাধা, সরকার ও ইসি বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার চেষ্টা এবং নির্বাচনে পোলিং এজেন্টের দায়িত্ব পাওয়া নেতাকর্মীদের এলাকা ছাড়া করা।
এদিকে নয়াপল্টন বিএনপি কেন্দ্রীয় কার‌্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে দলের মুখপাত্র রুহুল কবির রিজভী এসব অভিযোগের পাশাপাশি সেনা মোতায়েনের পরও অবস্থার উন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন। গত ২৪ ডিসেম্বর, সোমবার, সকাল থেকে ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ২৮টি নির্বাচনী আসনে হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং ধানের শীষের ১৯ প্রার্থীসহ শতাধিক নেতাকর্মী এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ করে এ জন্য আওয়ামী লীগ ও পুলিশকে দায়ী করেছেন।
এদিকে যখনই বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে নির্বাচনে অনিয়মের বিষয়ে অভিযোগ করা হয়, তখনই নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয় কখন, কোথায় এবং কিভাবে অনিয়ম হয়েছে তা জানাতে। অধিকাংশ সময়ই অভিযোগকারীরা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করতে ব্যর্থ হয়। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়ার পর অন্তত ৮০টি অভিযোগ খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে নির্বাচন কমিশন।
এ বিষয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর, মঙ্গলবার, দুপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনকে চাপে রাখার কৌশল। নির্বাচনে ভোট চাওয়ায় কোন প্রতিবন্ধকতা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটি নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ করতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসী, পেশীশক্তি যারা প্রয়োগ করতে পারে এবং দখলবাজ, চাঁদাবাজদের নিয়ন্ত্রণ করা নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের দায়িত্ব। আমরা সেই কাজটিই করে যাচ্ছি। কোনভাবে ভোট কেন্দ্রে বা ভোটগ্রহণের আগে ও পরে যেন কেউ জনগণের নিরাপত্তা বিঘœ করতে না পারে, সেজন্য আমরা সতর্ক আছি।
অনেক সময় মনগড়া ও ভিত্তিহীন অভিযোগ করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তবে ২/৪টা সত্যও রয়েছে। সেগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
বিএনপির অভিযোগ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, বিএনপি কিংবা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সব সময়ই অবাস্তব কথা বলেন। তারা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে নির্বাচন কমিশনকেও বিতর্কিত করতে চায়।
পর্যবেক্ষক মহলের মতে, নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচন কমিশন, পুলিশ, প্রশাসন ও সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযোগ একটি রাজনৈতিক কৌশল। এ কৌশলের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনকে চাপে রেখে নির্বাচনের পরিবেশ নিজেদের অনুকূলে রাখতে চায় তারা। তবে বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের নেতারা মুখে বলার সময় যেভাবে অভিযোগের কথা বলে বাস্তবে নির্বাচন কমিশনে সুনির্দিষ্ট করে এত অভিযোগের কথা তুলে ধরতে পারছে না। এর ফলে তাদের অধিকাংশ অভিযোগই নির্বাচন কমিশন আমলে নিচ্ছে না। তবে সুনির্দিষ্টভাবে তারা যেসব অভিযোগ করছে তা আমলে নিয়ে ব্যবস্থাও গ্রহণ করছে ইসি।
জানা যায়, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে নির্বাচন কমিশন একটি কমিটি গঠন করেছে। সারাদেশে ১২২টি কমিটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে ২৪৪ জন জজ দায়িত্ব পালন করছেন। নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ৫৩৫টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮০টি অভিযোগ তদন্তের জন্য গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
সম্প্রতি ঢাকা-৯ আসনে বিএনপির প্রার্থী আফরোজা আব্বাস তার নিজের ও দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও গাড়ি ভাংচুরের অভিযোগ করেন ইসির কাছে। তার অভিযোগ গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে নির্বাচন কমিশন। মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন তার ওপর হামলা চালানোর অভিযোগ এনে আবেদন দাখিল করলে তার অভিযোগ গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়। বিএনপির এক অভিযোগের ভিত্তিতে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. হুমায়ুন কবীরকে তার কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার করা হয়। এ ছাড়া ঠাকুরগাঁওয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গাড়িবহরে হামলায় সদর থানার ওসি প্রত্যাহার করা হয়। ঢাকা-৮ আসনে মির্জা আব্বাসের মিছিলে বাধা দেয়ার বিষয়টি আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া।