নীরব ভোট প্রস্তুতি জামায়াতে, স্বতন্ত্র প্রার্থী দেয়ার চিন্তা

রাজনীতি ডেস্ক : দীর্ঘদিন ধরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রকাশ্য তৎপরতা না থাকলেও আগামী জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে নীরবে জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামী। হাইকোর্টের পৃথক রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন ও দলীয় প্রতীক (দাঁড়িপাল্লা) হারানো দলটি আগামী নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রতীকে প্রার্থী দেয়ার চিন্তা করছে।

৭৭টি আসনে প্রাথমিকভাবে প্রার্থী বাছাই করে প্রয়োজনীয় কাজ শুরু করেছে তারা। এর মধ্যে অন্তত ৫০টি আসন জোট থেকে বরাদ্দ নেওয়ার টার্গেট রয়েছে জামায়াতের। এমনকি জোট থেকে কাক্সিক্ষতসংখ্যক আসন বরাদ্দ না পেলে এককভাবে শতাধিক আসনে তাদের নির্বাচন করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানা গেছে।

দলীয় সূত্র মতে, মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শীর্ষ নেতাদের ফাঁসির ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনে কোণঠাসা হয়ে পড়ে জামায়াত। এ বিচার ঠেকাতে আন্দোলন করতে গিয়ে প্রশাসনের চরম দমন-নীতির শিকার হয় দলটির নেতাকর্মীরা। দলের বর্তমান আমির মকবুল আহমাদ, সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান, ভারপ্রাপ্ত আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমানসহ শীর্ষ নেতাদের অনেকেই বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আত্মগোপনে থেকে দলীয় কার্যক্রম চালাচ্ছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। এ অবস্থায় রাজনৈতিক অঙ্গনে ফের ঘুরে দাঁড়াতে আগামী জাতীয় নির্বাচনকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে দলটি। এ জন্য যেকোনো পরিস্থিতিতে এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং কাক্সিক্ষতসংখ্যক আসনে জয়লাভের জন্য এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে বিএনপির মধ্যে এখনও অনিশ্চয়তা থাকলেও নিজস্ব কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে জামায়াত। শরিক হিসেবে ২০ দলীয় জোটের মাধ্যমেই এ নির্বাচনে অংশ নিতে চায় দলটি। এ জন্য অন্তত ৫০টি আসনে জোটের সমর্থন পেতে চায় জামায়াত। তবে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের সুযোগ না থাকায় স্বতন্ত্র প্রতীকে প্রার্থী দেওয়ার চিন্তা দলটির।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাক মহানগর জামায়াতের দুই নেতা জানান, জোট থেকে আসন বরাদ্দের বিষয়ে এখনও কোনো আলোচনা হয়নি। এ সংক্রান্ত কোনো তালিকাও বিএনপিকে দেওয়া হয়নি। তবে প্রাথমিকভাবে ৭৭টি আসনে নিজেদের প্রার্থী বাছাই করে নির্বাচনি প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছে জামায়াত। এর মধ্য থেকে অন্তত ৫০টি আসন জোট থেকে বরাদ্দ পাওয়ার জোর চেষ্টা করবে দলটি। কোনো কারণে আসনের বিষয়ে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা না হলে এককভাবে নির্বাচনেরও পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আসনের সংখ্যা বেড়ে শতাধিক হতে পারে।

তারা বলেন, নির্বাচনকে ঘিরে দলের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা (ইয়ানত) আদায়ের পাশাপাশি বিশেষ ফান্ড সংগ্রহের কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে দলীয় কর্মকা- জোরদার করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতারাও গোপনে নির্বাচনি এলাকায় সফর করছেন। সম্প্রতি এমন একটি সফরের সময় রাজশাহী থেকে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন ভারপ্রাপ্ত আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমানসহ ১০ নেতা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গ্রেপ্তার এড়াতে আরও গোপনীয়তা রক্ষা করে কাজ চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কেন্দ্র থেকে।

জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন এম এ হাকিম (ঠাকুরগাঁও-২), মোহাম্মদ হানিফ (দিনাজপুর-১), আনোয়ারুল ইসলাম (দিনাজপুর-৬), মনিরুজ্জামান মন্টু (নীলফামারী-২), আজিজুল ইসলাম (নীলফামারী-৩), হাবিবুর রহমান (লালমনিরহাট-১), শাহ হাফিজুর রহমান (রংপুর-৫), নূর আলম মুকুল (কুড়িগ্রাম-৪), আবদুল আজিজ (গাইবান্ধা-১), নজরুল ইসলাম (গাইবান্ধা-৩), আবদুর রহিম সরকার (গাইবান্ধা-৪), নুরুল ইসলাম বুলবুল (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২), মো. লতিফুর রহমান (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩), আতাউর রহমান (রাজশাহী-৩), রফিকুল ইসলাম খান (সিরাজগঞ্জ-৪), আলী আলম (সিরাজগঞ্জ-৫), মতিউর রহমান নিজামীর পরিবারের কোনো সদস্য (পাবনা-১), ছমিরউদ্দিন (মেহেরপুর-১), মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান (চুয়াডাঙ্গা-২), অধ্যক্ষ মতিয়ার রহমান (ঝিনাইদহ-৩), আজিজুর রহমান (যশোর-১), আবু সাইদ মুহাম্মদ সাদাত হোসাইন (যশোর-২), অ্যাডভোকেট আবদুল ওয়াদুদ (বাগেরহাট-৩), শহীদুল ইসলাম (বাগেরহাট-৪), মিয়া গোলাম পরওয়ার (খুলনা-৫), শাহ মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুছ (খুলনা-৬), ইজ্জতউল্লাহ (সাতক্ষীরা-১), আবদুল খালেক ম-ল (সাতক্ষীরা-২), মুফতি রবিউল বাশার (সাতক্ষীরা-৩), গাজী নজরুল ইসলাম (সাতক্ষীরা-৪), মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর দুই ছেলে (পিরোজপুর-১ ও ২), শফিকুল ইসলাম মাসুদ (পটুয়াখালী-২), মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ছেলে (শেরপুর-১), অধ্যাপক জসিমউদ্দিন (ময়মনসিংহ-৬), ফরীদউদ্দিন (সিলেট-৫), মাওলানা হাবিবুর রহমান (সিলেট-৬), ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের (কুমিল্লা-১১), শামসুল ইসলাম (চট্টগ্রাম-১৪), হামিদুর রহমান আযাদ (কক্সবাজার-২), শাহজালাল চৌধুরী (কক্সবাজার-৪) প্রমুখ।

সূত্র মতে, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে এককভাবে ২২০ আসনে প্রার্থী দিয়ে দলটি ১২ দশমিক ১ শতাংশ পায়। আসন পায় ১৮টি। ৯৬ সালে ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোট পেয়েছিল ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। আসন পেয়েছিল তিনটি। ২০০১ সালে ৩১টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট ও ১৭টি আসন পায়। এ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট জামায়াতকে ৩০ আসনে ছাড় দেয়। একটি আসনে বিএনপি-জামায়াত দুই দলেরই প্রার্থী ছিল।

২০০৮ সালে জোটগত নির্বাচনে ৩৯ প্রার্থী ছিল জামায়াতের। চারটি আসনে বিএনপি ও জামায়াত দুই দলেরই প্রার্থী ছিল। ওই নির্বাচনে দুটিতে জয়ী জামায়াত ৪ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পায়। সর্বশেষ বর্জন করা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জোটগতভাবে ৪৩ আসনে প্রার্থিতা চূড়ান্ত করেছিল জামায়াত। এবার তাদের চাওয়া অন্তত ৫০ আসন।

সূত্র মতে, ২০১৩ সালে হাইকোর্টের একটি রায়ে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়। একই বছর হাইকোর্টের আরেকটি রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে দলীয় প্রতীক (দাঁড়িপাল্লা) হারায় জামায়াত। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দলীয় নিবন্ধন ও প্রতীক ফিরে পেতে হাইকোর্টে আপিল করেছে দলটি। এ প্রক্রিয়ায় রায় নিজেদের পক্ষে আসবে বলে আশাবাদী জামায়াত নেতারা। যদিও এ আপিলের শুনানি কবে হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে এ আপিলের কোনো ফয়সালা না হলে উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদের মতো স্বতন্ত্র প্রতীকেই ওই ভোটে অংশ নেয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি।