পঁচিশে মার্চ : যে গল্প আমাদের বেদনা থেকে স্বাধীনতা, শোক থেকে শক্তি এনে দেয়

চন্দ্রানী দে পলি

১৯৭১ সালের পঁচিশে মার্চ। একাত্তরের অগ্নিঝরা এই রাতে বাঙালির জীবনে নেমে এসেছিল নৃশংস ও বিভীষিকাময় এক কালো রাত। এ রাতেই ভারী অস্ত্রে সজ্জিত রক্তপিপাসু হিংস্র পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নিরপরাধ, ঘুমন্ত বাঙালির ওপর এক পৈচাশিক হত্যার উল্লাসে। এ গণহত্যা আজও বিশ্ব বিবেকের কাছে মানবতার লঙ্ঘন ও বর্বরতার ঘৃণ্যতম দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

এই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, প্রফেসর এম মুনিরুজ্জামান, জগন্নাথ হলের প্রফেসর ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, সিনিয়র লেকচারার ড. ফজলুর রহমান খান, সিনিয়র লেকচারার এম এ মুক্তাদির, লেকচারার অনুব্রেপায়ন ভট্টাচার্য, লেকচারার এম আর খান খাদেম, লেকচারার শরাফত আলী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সিনিয়র লেকচারার ড. মোহাম্মদ সাদত আলী ও সিনিয়র টিচার মো. সাদেক, মধুসুদন দে, পরিমল গুহ, সুধা পাল ছাড়াও এসএম হল, জহুরুল হক হল ও জগন্নাথ হলের বহুসংখ্যক আবাসিক ছাত্রকে হত্যা করা হয়। ব্যারিকেড রচনাকারী জনতা, নিঃস্ব বস্তিবাসী কেউই এই হত্যাযজ্ঞের হাত থেকে রেহাই পাননি।

ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার গুলিবিদ্ধ হওয়া সেই রাতের হৃদয়বিদারক ঘটনা ও হাসপাতালের করুণ মুহূর্তগুলোর বর্ণনা জানা যায় তার স্ত্রী বাসন্তী গুহঠাকুরতার ১৯৭৪ সালের ২০ মে প্রদত্ত নিম্নোক্ত সাক্ষাৎকারে।

‘১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ সেই কালরাতে আমরা স্বাভাবিকভাবে প্রতিদিনের মত খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সবাই রাত নয়টার সময় রেডিও খুলে বসে ছিলাম। ঢাকা রেডিও থেকে আমরা সে রাতে দুর্যোগের কোনো পূর্বাভাস পাই নাই। ভয়েস অব আমেরিকা-এর সংবাদ শুনে আমার স্বামী ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা মেয়ে মেঘনার ঘরে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ. প্রিলিমিনারি এবং অনার্স পরীক্ষার্থীদের খাতা দেখতে বসলেন।

‘অকস্মাৎ জনতার দুপদাপ শব্দ শুনে আমার স্বামী এবং আমি দেয়ালের বাইরে গিয়ে দেখলাম, জনতা রাস্তায় রাস্তায় বড় বড় গাছ, পানির ট্যাঙ্ক ও ইট-পাটকেল দিয়ে প্রতিরোধ তৈরি করছে। আমার স্বামী বিপদ বুঝতে পেরে আমাদের ফ্ল্যাটের প্রবেশপথ তালাবদ্ধ করেন। আমার স্বামী রাস্তার দিকে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে ভারাক্রান্ত মনে “বিপদ আরম্ভ হয়ে গেল” বলে আবার মেয়ের কক্ষে গিয়ে খাতা দেখতে বসে গেলেন। আমি আজেবাজে চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। রাত বারটার দিকে অদূরে বোমার আওয়াজ শুনে জেগে উঠে দেখলাম, ইকবাল হল এবং রোকেয়া হলের দিক থেকে বোমার আওয়াজ ভেসে আসছে। আস্তে আস্তে অসংখ্য লাইট বোমা আকাশকে আলোকিত করে দিচ্ছে, আলোর ফুলকিতে দেখলাম বোমা ও গুলি বর্ষিত হচ্ছে। আমরা দুজন গুলি ও বোমার কানফাটা আওয়াজ সহ্য করতে না পেরে খাটের তলায় বেড কভার বিছিয়ে নিরাপদে শুয়ে বর্বর পাক সেনাদের বীভৎসতার তাণ্ডব শুনছিলাম। আমরা সবাই গুলির অবিরাম গর্জনে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম।

‘আমাদের ফ্ল্যাটটি কাঁপছিল-চারিদিকে দেখলাম লাইট বোমের আলোর ঝলকানি। হিসহিস শব্দ শুনে আমার গায়ের লোম শিউরে উঠল। আমি উঠে গিয়ে জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখলাম-আমার ফ্ল্যাটের প্রবেশপথের সামনে পাক সেনা-ভারী অস্ত্রবাহী সশস্ত্র আর্মি ট্রাক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে-অল্পক্ষণ পরেই এক পাঞ্জাবী মেজর আমার গেটের লোহার জিঞ্জির হাত দিয়ে সজোরে ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে। আমি আমার স্বামীকে বললাম, পাক সেনারা আমাদের ফ্ল্যাট ঘেরাও করেছে-আমরা বিপদগ্রস্ত, বিপন্ন। আমার স্বামী আমার মেয়েকে অন্য কামরায় গিয়ে শুয়ে থাকতে বললেন, পাঞ্জাবী সৈন্যরা আমাদের কামরার দরজায় বুটের লাথি মারছিল। আমি দৌড়ে গিয়ে আমার স্বামীকে বললাম, পাক সেনারা এসে গেছে, হয়তো তোমাকে গ্রেফতার করবে, তুমি তৈরি হয়ে নাও, বলে একটি পাঞ্জাবী তার হাতে দিয়ে মেয়েকে নিয়ে ঘরে এসে দেখলাম, রান্নাঘরের পাশে বারান্দার দরজা দিয়ে প্রবেশ করে আমার “আয়াকে” কনুইয়ের আঘাতে সজোরে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে আমার সামনে এসে জিজ্ঞাসা করলো “প্রফেসর সাহাব হায়?” আমি নিরুপায় হয়ে সত্য কথা বললাম, “হায়।” পাঞ্জাবী মেজর আবার বললো, “উনকো লে যায়েগা।” মেজর চলতে চলতে বলতে লাগলো, “ফ্লাটমে আওর কই জোয়ান আদমী হায়?” আমি বললাম, “নাহি, ত হামারা একহী লাড়কি হায়।” এ কথা শুনে মেজর বললো, “ঠিক হায়, লাড়কি কা ডার নাহি হায়।” আমার সাথে যে কামরায় ছিলেন সেই কামরায় প্রবেশ করে আমার স্বামী ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাকে বাম হাত চেপে ধরে জিজ্ঞাসা করলো, “আপ প্রফেসর সাহাব হায়?” আমার স্বামী ইংরেজীতে বললেন, “ইয়েস।” পাঞ্জাবী মেজর বললো, “আপকো লে যায়েগা।” আমার স্বামী মোটা গলায় অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বললেন, “হোয়াই?” মেজর তার প্রশ্নের কোন জওয়াব না দিয়ে টেনে বাইরে নিয়ে গেল।

‘আমি পিছনে পিছনে কিছুদূর গিয়ে তাদেরকে আর দেখতে না পেয়ে কামরায় ফিরে এসে টেলিফোনের রিসিভার উঠিয়ে দেখলাম সবকিছু বিকল অচল হয়ে আছে। আমি এ সময় সবই বুঝতে পারলাম-আমরা বিপদগ্রস্ত, বিপন্ন। ফিরে দেখলাম, উপরতলার সিঁড়ির শেষ মাথায় মিসেস মনিরুজ্জামানকে পাঞ্জাবী জোয়ানরা “যাও, যাও, হাঁটো” বলে তাড়া দিচ্ছে। ইতিপূর্বেই পাকসেনারা ড. মনিরুজ্জামান, তার ছেলে, তার ভাগনে এবং প্রতিবেশী যুবককে টানাটানি করে ঠেলে ধাক্কিয়ে ধাক্কিয়ে নিচে নামিয়ে নিয়ে আসার জন্য জোরাজুরি করছিল। আমি বাইরে দুটি গুলির আওয়াজ শুনে দৌড়ে বালিশ হাতে অদূরে দাঁড়ানো মেয়েকে ধরতে গিয়ে পরপর আটটি গুলির শব্দ শুনে অগ্রসর হয়ে দেখলাম, সিঁড়ির নিচে চারজনের দেহ গড়াগড়ি যাচ্ছে। গুলিবর্ষণ করার পরক্ষণেই পাকসেনারা সবাইকে কার্ফু জারীর কথা ঘোষণা করে, দ্রুত ট্রাকগুলি নিয়ে চলে গেল।

‘মিসেস মনিরুজ্জামান তেতলা থেকে পানি নিয়ে এসে গুলিবিদ্ধ সবাইকে খাওয়ালেন। তিনি দৌড়ে এসে বললেন, “দিদি আপনার সাহেব গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে আছেন, আমার সাথে কথা বলছেন, তিনি বাঁচবেন।” এ কথা শুনে আমি এবং আমার মেয়ে মেঘনা দৌড়ে আমার স্বামীর গুলিবিদ্ধ দেহের সামনে উপস্থিত হয়ে দেখলাম, আমার স্বামীর দেহ গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে আছে। তিনি বলছিলেন, “ওরা আমাকে গুলি করেছে, আমার শরীর প্যারালাইসিস হয়ে গেছে। আমাকে তুলে ঘরে নিয়ে যাও।” আমি কান্নার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলাম শুধু হায় হায় শব্দ করছিলাম। আমরা কোন রকমে আমার স্বামীর রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত দেহ ধরাধরি করে আমাদের ফ্ল্যাটে নিয়ে এসে বারান্দার খাটে এলিয়ে দিলাম-আমার স্বামী জ্ঞান হারান নাই তখনও।

‘দূরে-অদূরে বৃষ্টির মত অবিরাম গুলি বর্ষণ করছিল পাকসেনারা। কিছুক্ষণ পরে দেখলাম পাকসেনারা জগন্নাথ হলের পূর্বদিকে ছাত্রদের কেন্টিনে আগুন লাগিয়ে দেয়-মাঝে মাঝে পাকসেনাদের সামরিক ট্রাকগুলি টহল দিচ্ছিল, চারিদিকে শ্মশানের হাহাকার।

‘পরের দিন ১৯৭১ সনের ২৬ শে মার্চ এবং ২৭ শে মার্চ সকাল পর্যন্ত আমার স্বামীর ক্ষত বেয়ে রক্ত ঝরছিল-বাইরে সান্ধ্য আইন বলবৎ থাকায় তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে তার চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা করতে পারি নাই।

‘১৯৭১ সনের ২৭ শে মার্চ সকালে কতিপয় লোকের সাহায্যে আমার স্বামীকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করি। হাসপাতালে কোন লোকজন ও ডাক্তার ছিল না। দায়িত্বরত নার্সরা সাধ্যমত আমার স্বামীর সেবাযত্ন করেছে।

‘১৯৭১ সালের ৩০ শে মার্চ বিনা চিকিৎসায় আমার স্বামী মৃত্যুবরণ করেন। স্বামীর মৃত্যুর পর আমি তার মৃতদেহ হাসপাতাল থেকে সরিয়ে আনার অনুমতি পাই নাই-তার পবিত্র মৃতদেহের সৎকার করতে পারি নাই। আমার স্বামীর মৃত্যুর পরক্ষণেই পাকসেনারা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ঘেরাও করে। আমি স্বামীর মৃতদেহ নিয়ে আসার কোন উপায় না দেখে ডাক্তারদের উপদেশে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ড. মালেকের বড় ভাই আব্দুল বারি সাহেবের স্ত্রীর সাথে তাদের গাড়ীতে আমাদের স্কুলের সেক্রেটারী ড. এম.এ. ওয়াহিদ সাহেবের ২০ নং ধানমন্ডিস্থ বাসায় আশ্রয় লাভ করি। আমার স্বামীর লাশ চারদিন হাসপাতালে পড়ে ছিল-আমার ড্রাইভার ৩রা এপ্রিল পর্যন্ত হাসপাতালের ওয়ার্ডের বারান্দায় আমার স্বামী ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার মৃতদেহ দেখে এসেছে।’ (সূত্র বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র, অষ্টম খণ্ড। আন্তজাল)

বাংলাদেশের স্বাধীনতা বানানোর মধ্যে রয়ে গেল লাখো বাঙালির জানা-অজানা নাম। তারা চিরঞ্জীব হয়ে থাকবেন বাংলার স্বাধীনতার উপলব্ধিতে। -নিউইয়ক