পথ ও প্রবাসের গল্প: জায়ান্ট স্কুইড

আবু রায়হান

নজরুল সাময়িকভাবে একটা ঘোরের রাজ্যে হারিয়ে যায়। বার টন ওজনের একশ’ ফুটি একটা স্কুইড তার ভাবনার জগত পুরোপুরি ঢেকে ফেলে। এ নিয়ে যে কারো সাথে আলাপ করবে, তারও উপায় নেই। সবাই ব্যস্ত বাস্তব জীবনের ধান্ধায়। মহাসাগরের তিন হাজার ফুট গভীরে কি তেলেস্মাতি ঘটতে পারে, তাতে কার কি আসে যায়!
তবে অর্জিত জ্ঞান বেশিক্ষণ চেপেও রাখা যায় না। তাই, ফলাফল সুখকর হবে না জেনেও সে নিজেকে সামলাতে পারে না। একদিন খুব কৌশলে রোমানের কাছে স্কুইড প্রসঙ্গ টেনে আনে।
‘তোমার ক্যালামারি খাওয়া কেমন চলছে?’
‘সে আর নতুন কি, প্রতি সপ্তাহেই তো খাচ্ছি।’
‘স্কুইড কত বড় হতে পারে, তোমার ধারণা আছে?’
‘ধারণা থাকবে না, বলো কি! আমার মধ্যম আঙ্গুলের সমান।’
‘লেটেষ্ট জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কে দেখি তোমার ধারণাই নেই।’ অনেকদিন পর বন্ধুকে মোক্ষম খোঁচা দিয়ে নজরুল খুব তৃপ্তি পায়। ‘তুমি তো খাও শিশু স্কুইড। সেই শিশুর বাপ আছে, দাদা আছে… সেই দাদার আবার বাপ আছে…’ নজরুল হেসে ফেলে। ‘স্কুইডের একটা বিশেষ প্রজাতি আছে। তাদের একটা যদি তোমাকে হাতের কাছে পায়, বাকী জিন্দেগীতে তোমার আর ক্যালামারি খেতে হবে না, বরং ওটাই তোমার গোষ্ঠীশুদ্ধ খেয়ে ফেলবে। ভালো কথা রোমান, সব মিলিয়ে তোমার গোষ্ঠীর সদস্য সংখ্যা কত?’
বন্ধু তার চেয়ে বেশি জানে, এই ভাবনা রোমানকে আহত করে। সে ভয় পাওয়া গলায় জিজ্ঞেস করে,াভাভর্ভাবভ। ‘স্কুইড সম্পর্কে এত তথ্য তুমি কিভাবে জানো ?’
‘মাসুদ রানা পড়ে।’ নজরুল বড় ক্ষুধা বইটির বিষয়বস্তু রোমানকে খুলে বলে।
আর একটু হলেই রোমান প্রায় বিশ্বাস করে ফেলেছিল, বন্ধু তার চেয়ে বেশি জানে। কিন্তু বন্ধুর মুখে মাসুদ রানা নাম শুনে তার ভয়ভীতি নিমেষেই দূর হয়ে যায়।
‘ও তাই বলো! মাসুদ রানা পড়ে আমার সাথে জ্ঞান-বিজ্ঞান কপচাতে এসেছো! ও সব গাঁজাখুরি কাহিনী…’
নজরুল আর শুনতে চায় না। আর কতজনের মুখে শুনবে! সেই ছোটোবেলা থেকে শুরু হয়েছে, আর থামাথামি নেই। অথচ তার চারপাশের পরিচিত জগত অনেক বদলে গেছে। দূর পল্লীতে তার যে বৃদ্ধা বোন বাস করেন, তিনিও এখন মোবাইল ফোনে কথা বলেন। তাদের গ্রামের রাস্তা পাকা হয়েছে। সেখানে গরুর গাড়ির বদলে টেম্পু-রিকশা চলে। বিদ্যুতের বাতি জ্বলে। আমাদের বাপ-দাদাদের সময় থেকে জীবন এখন অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু মাসুদ রানার কাহিনীকে গাঁজাখুরি বলা থামবে কখন?
তার যখন বারো-তের বছর বয়স, তখন হাত থেকে মাসুদ রানার বই কেড়ে নেয়া হতো। অভিযোগ ছিলÑএগুলো প্রাপ্তবয়স্কদের বই। পড়তে চাইলে ছোটদের উপযোগী বই পড়ো। কে বলে দেবে, কোনগুলো ছোটদের উপযোগী বই! সেগুলো কোথায় পাওয়া যায়? পাঠ্যপুস্তকের পড়া খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়। তারপর অখন্ড অবসর…। উপরের ক্লাশে পড়া ভাইবোনদের বইপত্র নেড়েচেড়ে দেখা…। তারা হাত থেকে বই কেড়ে নিয়ে যায়, ‘খবরদার! আমার বই ধরবি না’।

সে আর একটু বড় হলে মাসুদ রানার বই হয়ে গেলো ‘সময়ের অপচয়’। এইসব জঞ্জাল পড়ে সময় নষ্ট করা কেন? একান্তই যদি পড়তে হয়, তাহলে আমাদের দেশীয় লেখকদের বই পড়ো। সমাজটাকে চেনো এবং নিজস্ব সংস্কৃতি জানো। সুতরাং… তাই সই। শুরু হলো দেশজ সংস্কৃতির বই পড়া। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র, শংকর, নীহাররঞ্জন, নিমাই, আশুতোষ, ফাল্গুনি…। জানা হলো আমাদের সমাজ ব্যবস্থার অলি-গলি-তস্যগলি। হৃদয়ের লেনদেন, সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারা, ষড়যন্ত্র। বাক্য গঠন ও পূর্নবিন্যাস, শব্দচয়ন…।
তারপর সে যখন প্রাপ্তবয়স্ক হলো, তখন সবাই বলতে শুরু করল ‘মাসুদ রানা গাঁজাখুরি গল্প’। কিন্তু তার যে আরও অনেক কিছু জানতে ইচ্ছে করে। আমাদের দেশ ছাড়িয়ে দুরের দেশ, পরিচিত গন্ডির বাইরের সমাজ। সেইসব সমাজের জীবন ব্যবস্থা কেমন! সাগরের কত গভীরে প্রাণ ধারন সম্ভব? মহাশূন্যের সীমানা কতদূর! ছায়াপথ, বামন নক্ষত্র… কেউ তাকে কখনো মাসুদ রানা পড়তে উৎসাহ দেয়নি, দেয়া উচিত ছিল।
বন্ধুকে যুতমতো ঘায়েল করা গেছে ভেবে রোমান খুব তৃপ্তি বোধ করে। কিন্তু একসময় মন আন্চান করতে থাকে। কতক্ষণ এভাবে চুপ থাকা যায়!
‘কাহিনী শুনে তো খুব ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে। দিও বই দু’টি, পড়ে দেখবো।’ কিন্তু এত সহজে ভবি ভোলার নয়। নজরুল সাড়াশব্দ করে না।
‘তোমার ঐ জায়ান্ট স্কুইডটা মারা গেলে বেশ হতো। বাকী জীবন ক্যালামারি নিয়ে চিন্তা করতে হতো না। দশ টন ক্যালামারি! ও মাই গড! আচ্ছা নজরুল, তুমি কি জানো পানির নিচের সব খাবার হালাল?’
আবার ঘুরেফিরে সেই খাদ্য! বিরক্তিতে নজরুলের কপালে আরো একটা অতিরিক্ত দাগ যোগ হয়।
‘কে বলেছে তোমাকে পানির নিচের সব খাবার হালাল?’
‘এক আফ্রিকান মাওলানা বলেছে।’
‘এক মওলানার কথা শুনে বাছ-বিচার না করে সব খাও, পরে বেকায়দামতো অবস্থায় অন্য মওলানা হারাম খাওয়ার দায়ে তোমাকে নাপাক ঘোষণা করবে। তখন কি হবে? ভালো কথা, ঐ মাওলানা সাপের ব্যাপারে কি বলেছে? পানির কিছু সাপ যে ডাঙ্গার সাপের চেয়ে বহুগুণ বেশি বিষাক্ত, সেইসব সাপও কি হালাল ?’
‘সাপের ব্যাপারে… নাহ্। এখনও সাপ খাওয়া শুরু করিনি তো, তাই সাপের ব্যাপারে আগ্রহ নেই। কিন্তু পানির সাপ কি করে বিষাক্ত হয়! ঢোঁড়া সাপ, মেছো আলাদ, দাঁড়াশ সাপÑজীবনে শুনিনি এসব সাপের বিষ আছে।’
‘আরে, আমি বাঙালি সাপের কথা বলছি না। বলছি সাগরের সাপের কথা। লবণাক্ত পানির সাপ। এরা ‘অস্ট্রেলিয়ান টাইপেন’ বা ‘ইন্দোনেশিয়ার কেউটে’র চেয়ে অনেক বেশি বিষাক্ত। এদেরকে কি হালাল খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা যায়?’
‘এই দেখো! আমি ভাবছি আমাদের খাল-বিল-নালার কথা, আর তুমি বলছো সাগর-মহাসাগরের কথা। মাসুদ রানা পড়ার এই এক বিড়ম্বনা। সব কিছুতে খালি ইন্টারন্যাশনাল খোঁজো। আচ্ছা নজরুল, তুমি এত মাসুদ রানা পড়ো কেন?’
‘তুমি এত হিন্দী মুভি দেখো কেন?’
‘হিন্দী মুভি দেখা আর মাসুদ রানা পড়া এক হলো ? হিন্দুস্তান আমাদের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী। ওদের কালচার আর আমাদের কালচার প্রায়ই এক। ভাষাটাও থোড়া থোড়া বোঝা যায়। নিজেদের তৈরি ভালো মুভি নেই বলে প্রতিবেশীরটা দেখি।’
‘হিন্দী মুভির কালচার আর তোমার কালচার এক ? আচ্ছা রোমান, তুমি তো প্রেম করে বিয়ে করেছো। তোমার বউ দীর্ঘদিন তোমার প্রেমিকা ছিল। প্রেম করাকালীন সময়ে সেই বউ কতদিন সখীগণ পরিবেষ্টিত হয়ে তোমাকে নেচে দেখিয়েছে ? আর তুমিই বা কতদিন সাগরের পাড়ে দাপাতে দাপাতে রঙ্গলীলা করে বেড়িয়েছো ? আমাদের দেশে তো দূরের কথা, যারা এইসব মুভি বানায় তাদের নিজেদের মধ্যেও এসব ফ্যান্টাসী নেই। সেই আজগুবি মুভি দেখে তুমি যদি মজা পাও, তাহলে আমার মাসুদ রানা সিরিজ পড়তে অসুবিধে কোথায়? আর মাসুদ রানা তো ফ্যান্টাসী নয়। ওসব ঘটনা আমাদের ভেতো বাঙালি জীবনে ঘটে না, কিন্তু উন্নত বিশ্বে বা পৃথিবীর কোথাও না কোথাও তো অহরহ ঘটছে।’
‘মাসুদ রানা ফ্যান্টাসী না! তা হলে জায়ান্ট স্কুইডের ব্যাপারটা আমাকে ব্যাখ্যা করে বলো।’
নজরুল চুপ মেরে যায়। এই জায়ান্ট রহস্যের ব্যাখ্যা আপাতত তার কাছে নেই। বন্ধুকে ভালো ভাবে কোণঠাঁসা করা গেছে ভেবে রোমানও চুপ মেরে যায়। সে অসীম মহানুভবতার পরিচয় দিয়ে এ প্রসঙ্গে আর ঘাঁটাঘাটি করে না। পরক্ষণেই অন্য এক গোপন আনন্দে তার মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠে।
‘তোমার ঘরের টিভিতে কি কেবল্ আছে?’
‘কেবল্ না থাকলে টিভি দেখি কিভাবে? শুধু অ্যান্টেনার কানেকশন দিয়ে তো এদেশে টিভি দেখা যায় না। অবশ্য, প্রথম কিছুদিন শুধু অ্যান্টেনা দিয়েই চালিয়ে নিতে চেষ্টা করেছি। সর্ব সাকুল্যে সাতটা চ্যানেলের দেখা মেলে। সি.বি.এস, এন.বি.সি, ফক্স নিউজ, এ.বি.সি, ইউ.পি.এন, টাইম ওয়ার্নারের চ্যানেল ইলেভেন, আর একটা স্প্যানিশ চ্যানেল-গ্যালাভিশন দেখা যায়।
একমাত্র গ্যালাভিশন ছাড়া আর সবগুলোর রিসেপশন খুব খারাপ। ফর্সা নায়ক নায়িকাদের চেহারা-সুরত বোঝা যায় না। সারাক্ষণ টিভি পর্দা ঝিল্মিল ঝিল্মিল করতে থাকে। আলো ছায়া লুকোচুরি নদীর তরঙ্গে…। তুলনামূলক ভাবে স্প্যানিশ চ্যানেলটার রিসেপশন খুব ভালো। তাই বাধ্য হয়ে অনেক দিন ঐ চ্যানেল দেখেছি। বুঝলে, স্প্যানিশভাষী মেয়েদের লাজ-লজ্জা, বসন-ভূষণের খুব একটা বালাই নেই। তাই ওদের বিজ্ঞাপন দেখে খুব আরাম পাওয়া যায়। এ্যাড্ দেখে দেখে পুকিতো স্প্যানল, মানে অল্প অল্প স্প্যানিশ শব্দও শিখেছি। দুই একটা বাক্যও বলতে পারি। যেমন ‘রোমানো, পোরকে এরেস্ তু তান্ মালো ?’
‘মানে কি এর?’
‘এর মানে হলো- রোমান, তুমি এত খারাপ কেন ?’
বলা শেষ করে অফিসের পরিবেশ পরিস্থিতি ভুলে নজরুল উচ্চস্বরে হেসে উঠে। তার হাসি সহজে থামে না। অন্য সহকর্মীরা কাজ ভুলে তাকিয়ে থাকে, সে ভ্রক্ষেপ করে না। দমকা হাসির প্রতিটি ঢেউয়ের সাথে বন্ধুর প্রতি জমে থাকা ক্ষোভ বের হয়ে গেলে, তারপর সে থামে। রোমান ঠান্ডা চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। বন্ধু তাকে অপমান করছে কিনা বুঝতে চেষ্টা করে। অবশেষে, নজরুলের মুখে বিদ্রূপের চিহ্ন না দেখে ভরসা খুঁজে পায়।
‘কোন্ কেবল্ কোম্পানি তোমার ঘরে সার্ভিস দেয়, টাইম ওয়ার্নার না কেবলভিশন?’
‘টাইম ওয়ার্নার।’
‘গুড! টাইম ওয়ার্নার হলে ভালো খবর আছে।’
‘কেমন ভালো খবর? এখন থেকে কি কেবল্ কোম্পানী বিল চার্জ করবে না? ফ্রি টিভি দেখতে পাবো?’
‘তা নয়, তবে অবশ্যই সু-সংবাদ। অফিসে বসে এসব আলোচনা করা ঠিক হবে না। বাড়ি যাওয়ার পথে ট্রেনে বসে বলব।’
এক রাশিয়ান লোকের সন্ধান পাওয়া গেছে। সে দু নম্বরী কেবল্ বক্স বানাতে পারে। প্রতিটি বক্সের দাম ২৫০ ডলার। এক বছরের সার্ভিস গ্যারান্টি। এই সময়ের মধ্যে বক্সে কোনো ডিস্টার্ব দেখা দিলে সে বিনামূল্যে মেরামত করে দেবে। রাশিয়ানরা আমাদের মতো ভেতো বাঙালি না। ওরা মিগ টুয়েন্টি নাইন বানায়, নিউফ্লিয়ার সাবমেরিনে চড়ে পানির নিচ দিয়ে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ায়। টেক্নোলজি ওদের নিত্য সঙ্গী। এখন কম্যুনিস্ট শাসন ব্যবস্থার কোমরে ব্যথা হবার কারণে ওরাও আমাদের মতো ভাগ্যান্বেষণে এদেশে এসেছে।
এদের সমস্ত যন্ত্রপাতি কিভাবে কাজ করে, তা ওদের নখদর্পণে। নিজ দেশে শেখা বৈজ্ঞানিক জ্ঞান কাজে লাগিয়ে এখানে ডুপ্লিকেট যন্ত্রপাতি তৈরি করে। গোপন বিশ্বস্ত চ্যানেলের মাধ্যমে সেগুলো বিক্রি করে দু’পয়সা বাড়তি উপার্জন করে। একান্ত ভাগ্যগুণে এই টাইপের এক লোকের সন্ধান পাওয়া গেছে। পুলিশের নজর এড়াতে এরা ঘন ঘন ঠিকানা বদল করে। বর্তমান বাসা চেঞ্জ করলে বাকী জীবনে এই সুযোগ নাও আসতে পারে। এখন নজরুলের উচিত, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আড়াইশো ডলার দিয়ে একটা দু নম্বরী বক্স কিনে ফেলা।
‘দুই নম্বরী বক্স কিনলে লাভটা কি হবে, শুনি ?’
রোমান বন্ধুর চিন্তার সীমাবদ্ধতায় বিরক্ত হয়।
‘এক বছরের মধ্যেই বক্স কেনার টাকা উঠে আসবে। ফাও হিসেবে অসংখ্য ভালো অনুষ্ঠান ও সিনেমা দেখতে পাবে। টাইম ওয়ার্নারের সঙ্গে তোমার চুক্তি কি ধরনের, বেসিক না প্রিমিয়াম?’
কেবল্ কোম্পানীগুলো দর্শকদের চাহিদা ও সামর্থ অনুযায়ী বিল ধার্য করে। বেসিক কেবল্ নিলে বিল সবচেয়ে কম আসে, মাসে চল্লিশ ডলার। এই চুক্তিতে রেগুলার চ্যানেলের বাইরে থাকে খেলার চ্যানেল, ওয়েদার চ্যানেল, এমটিভি ইত্যাদি। এর পরের ধাপে আছে প্রিমিয়াম সার্ভিস। মাসিক সত্তর ডলার। যারা আরো বেশি চ্যানেল দেখতে চায়, তাদের জন্য ‘আনলিমিটেড প্লান’। একশ’ ডলার বিল দিয়ে তিনশ’র কাছাকাছি চ্যানেল পাওয়া যায়। এর বাইরে আরো আছে বিজ্ঞাপনবিহীন মুভি চ্যানেল-এইচ.বি.ও, সিনেম্যাক্স, ষ্টারজ, এনকোর, শো টাইম, ইত্যাদি। দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা সিনেমা দেখানো হয়। বিজ্ঞাপনের বিরক্তি নেই। প্রতিটি চ্যানেলের জন্য মাসিক চার্জ বারো ডলার। এ ছাড়াও কেবল্ কোম্পানীগুলোর কিছু রিজার্ভ চ্যানেল আছে। এগুলি ‘পে পার ভিউ’ অর্থাৎ প্রতিটি সিনেমা অথবা খেলা দেখার জন্য আলাদা পয়সা দিতে হয়।
সদ্য মুক্তি পাওয়া মুভিগুলো সিনেমা হলে দেখানো শেষ হলে টিভির ‘পে পার ভিউ’ চ্যানেলে চলে আসে। যারা সময়মতো হলে গিয়ে পছন্দের ছবিটি দেখতে পারেনিÑতাদের জন্য এটাই সুযোগ। প্রতিটি মুভির জন্য চার্জ মাত্র পাঁচ ডলার। আরো আছে বক্সিং, রেসলিং, আলটিমেট ফাইটিং ইত্যাদির স্পেশাল শো। প্রতিটি ইভেন্টের জন্য দাম মাত্র চল্লিশ ডলার।
নজরুল সেই দু নম্বরী বক্স বাসায় এনে হতবাক হয়ে যায়। সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচশো চ্যানেল। সব চ্যানেলেই অবারিত অনুপ্রবেশ। সে কোন্টা ছেড়ে কোন্টা দেখে! যে মুভিগুলো এতদিন তার হাতের নাগালের বাইরে ছিল, এই বাক্সের বদৌলতে সেগুলো ধরাছোঁয়ার মধ্যে চলে আসে।
প্যারিসে মাইকেল জ্যাকসনের কনসার্ট হচ্ছে, নজরুল নিজের ঘরে বসে তা দেখে। অপূর্ব সুন্দরী ফরাসী যুবতীরা ‘আই লাভ ইউ, মাইকেল’ বলে জ্ঞান হারিয়ে লাজুক লতার মতো নেতিয়ে পড়ছে। সিকিউরিটি গার্ডরা তাদেরকে চ্যাংদোলা করে কনসার্ট থেকে বের করে নিয়ে যায়। চ্যাম্পিয়নশিপ বক্সিংয়ের খেলায় মাইক টাইসন, ইভান্ডার হলিফিন্ডের কান কামড়ে ধরেÑনজরুল বেকুবের মতো ফ্যাল্ফ্যাল্ করে সেদিকে তাকিয়ে থাকে।
পৃথিবীর এমন কোনো স্থান বা ঘটনা নেই, যা আমেরিকান টিভিতে দেখানো হয় না। ফুড চ্যানেলে কচুপাতা দিয়ে তেলাপিয়া মাছ রান্না দেখানো হয়। আবার পৃথিবীর সবচেয়ে দামী ক্যাভিয়ার কিভাবে তৈরি হয়, সেটাও দেখা যায়। ভারতের কোনো এক উপজাতিরা ইঁদুর খায়। তাদের ইঁদুর ধরার অভিযান নিয়ে ইন্টারভিউ। তাহিতী দ্বীপের প্রায়ই ন্যাংটো মানুষদের জীবন যাপন প্রণালী…। কলকাতার এক বাউল সমাবেশে জটাধারী বাউলদের কন্ঠে বাংলা গান। তুরস্কের এক ভূ-স্বামীর শতাধিক বউ ও তিনশোর কাছাকাছি সন্তানদের নিয়ে অনুষ্ঠান-কি নেই! সবই আছে, অভাব শুধু সময়ের। কোনো অনুষ্ঠানের মাঝখান থেকে দেখা শুরু করে বোঝা যায় সেটি খুব ভালো একটি অনুষ্ঠান। তখন খুব আফসোস হয়, যদি অনুষ্ঠানটা শুরু থেকে দেখা যেতো। কিন্তু কার্জকর্ম বাদ দিয়ে সারাদিন তো টিভির সামনে বসে থাকা সম্ভব নয়।
একদিন সে সিগারেট কেনার জন্য একটি ক্যান্ডি ষ্টোরের সামনে দাঁড়ায়। দোকানে অনেক খদ্দেরের ভীড়। সে লাইনে দাঁড়িয়ে সাজানো জিনিসপত্রের উপর চোখ বুলাতে থাকে। তার চোখ আটকে যায় মাসুদ রানা সাইজের একটি বইয়ের উপর। নাম লেখা আছে ‘টিভি গাউড’। সে বইটি হাতে নিয়ে চোখ বুলাতে থাকে। টেলিভিশনের সারা সপ্তাহের অনুষ্ঠানমালা নিয়ে এই বই। কোন্ চ্যানেলে কোন্ সময়ে কি অনুষ্ঠান দেখানো হবেÑতার বিস্তারিত তালিকা। সেই অনুষ্ঠান বা মুভির সংক্ষিপ্ত বর্ণনাও দেয়া আছে। অবশ্যই এই বই তার দরকার। সে এক ডলারের বিনিময়ে বইটি কিনে নেয়।
সারা সপ্তাহ সে টিভি গাইড নেড়ে চেড়ে দেখে। কোন্দিন কোন্ অনুষ্ঠান দেখবে তা আগে থেকে ঠিক করে রাখে। এক সময় বইয়ের ভিতরের একটি বিজ্ঞাপনে চোখ আটকে যায়।
‘আপনি কি জানেন যে, টিভি গাইড হচ্ছে ইউনাইটেড স্টেট্সের মধ্যে সর্বাধিক বেশি বিক্রিত ম্যাগাজিন। যদি গ্রাহক হতে চান তা হলে অমুক নাম্বারে ফোন করুন। এক বছরের জন্য গ্রাহক হলে প্রতিটি টিভি গাইড এক ডলারের পরিবর্তে তেষট্টি সেন্টস্ মূল্যে পাবেন।’ নজরুল তখনই ফোন করে এক বছরের জন্য চুক্তি করে ফেলে।
পরবর্তী দিনগুলোতে টিভি গাইডের কল্যাণে অসংখ্য ভালো অনুষ্ঠানের সাথে তার পরিচয় হয়। পৃথিবী বিখ্যাত সব ভালো জিনিস দেখার সুযোগ ঘটে। সমুদ্রের গভীর তলদেশে অনেক আগে হারিয়ে যাওয়া জাহাজ থেকে কোন্ প্রক্রিয়ায় আর্টিফ্যাক্ট উদ্ধার করা হয়, হাফ টন ওজনের মাংস ও চর্বির দলা পাকানো একজন যুবক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাহায্য নিয়ে কিভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করে-তা দেখে নজরুলের বিষ্ময় সীমা মানতে চায় না।
বিখ্যাত সব মুভি দেখার পাশাপাশি অজানা, অচেনা বা আগে দেখা হয়নি এ ধরনের অনেক সিনেমার সাথে তার পরিচয় হয়। ১৯৩৫ সালে নির্মিত একটি ছবি ‘দ্য লাইভস্ অব এ বেঙ্গল ল্যান্সার’। ব্রিটিশ শাসন আমলে ইন্ডিয়া সীমান্তে বাঙালি বিদ্রোহীদের উৎপাত নিয়ে এর কাহিনী। ছবিটিতে অভিনয় করেছেন দুবার অস্কার বিজয়ী অভিনেতা গ্যারি কুপার। বাঙালি দর্শকদের অনেকেই সোফিয়া লরেণের ‘সান ফ্লাওয়ার’ বা সিলভেষ্টার ষ্ট্যালোনের ‘র‌্যাম্বো’ সম্পর্কে জানে। কিন্তু বাংলা ভূখন্ড বা বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত এই ইংরেজি ছবি সম্পর্কে ক’জনে খবর রাখে? নজরুল সখেদে ভাবে, ‘একজন বাঙালির বীরত্বগাঁথা নিয়ে যদি ইংরেজরা ছবি বানাতে পারে, তা হলে সেবা প্রকাশনীর কাজী আনোয়ার হোসেন, ‘মেজর রাহাত’ লিখে কতটুকু দোষ করলেন? সব গাঁজাখুরি ?’
এ সময়ে সে আরও একটি ভালো সায়েন্স ফিক্শন মুভির সন্ধান পায়। ‘২০০১-এ স্পেস অডিসি’। বনে বাঁদাড়ে ঘুরে বেড়ানো বানরেরা একখন্ড ম্ফটিকের মাধ্যমে জ্ঞান লাভ করে পরাক্রমশালী মানব সম্প্রদায়ে রূপান্তরিত হয়। সেই মানুষ একদিন চন্দ্র জয় করে। তারপর… চন্দ্র ছাড়িয়ে আরও দূর মহাকাশের দিকে অনিশ্চিত যাত্রা। বিশ্ববিখ্যাত পরিচালক ষ্টান্লি কুব্রিক দীর্ঘ সময় নিয়ে এই ছবির চিত্রায়ন করেন। গল্পে মহাকাশের অভূতপূর্ব পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং বিভিন্ন নক্ষত্রমন্ডলীর বিচিত্র আলো বিচ্ছুরণের বর্ণনা আছে। তিনি মুভিটির নির্মাণ কাজ শুরু করেন ১৯৬৫ সালে। তখনকার মুভি ক্যামেরাগুলোর কেরামতি এখনকার মত এতটা উন্নত ছিল না। মহাকাশের নক্ষত্র সমূহের বর্ণিল আলোর খেলা চিত্রায়িত করার জন্য পরিচালক বেশ কয়েকবার ক্যামেরা ও ফিল্ম পরিবর্তন করেন। অবশেষে ১৬ মাস দেরীতে সারে চার মিলিয়ন ডলার বেশি ব্যয় করে ছবির কাজ শেষ করেন। তখনকার দিনে তিন বছর সময় নিয়ে এক মুভি বানানো খুব স্বাভাবিক ঘটনা ছিল না।
সিনেমাটি দেখতে গিয়ে পুরো ঘটনা নজরুলের চেনা চেনা মনে হয়। মনে হয়, সে এর আগে গল্পটি কারো কাছে শুনেছে, অথবা কোন বইয়ে পড়েছে। তারপর মনে পড়ে সেবা প্রকাশনীর ’সন্ধানী’ নামক বইটির কথা। স্ট্যানলি কুবরিক ও আর্থার সি. ক্লার্কের যৌথ উদ্যোগে লিখিত এই বইটিও সেবা প্রকাশনীর নজর এড়ায়নি। অনেক বছর আগে বাংলাদেশের এক অখ্যাত গ্রামে হারিকেনের মিটিমিটি আলোয় সে বইটি বহুবার পড়েছে এবং বিস্মিত হয়েছে।
এই সিনেমাটি কখনো দেখার সুযোগ সব বাংলাদেশী দর্শকদের হবে না, কিন্তু বিশ্বনন্দিত এই গল্পটি মাত্র ত্রিশ টাকার বিনিময়ে অসংখ্য কৌতূহলী পাঠকের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেবার চেষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেন করেছেন। আরও একবার সেবা প্রকাশনীর প্রতি নজরুলের মন কৃতজ্ঞতায় ছেঁয়ে যায়।
গানের চ্যানেলগুলিতে সঙ্গীত জগতের বহু রথী-মহারথীর কনসার্ট দেখানো হয়। নিউইয়র্কের বিখ্যাত ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে বিটল্সের পরিবেশনার ভিডিও সে দেখে। দাড়িওয়ালা জর্জ হ্যারিসন বাংগাদেশ, বাংলাদেশ বলে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। ‘তোমরা দ্যাখো! বাংলাদেশ নামক শিশু রাষ্ট্রের নিরীহ জনগণের উপর কি অন্যায় করা হচ্ছে! তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে সবাই এগিয়ে এসো।’
জর্জ হ্যারিসনের ‘বাংলাদেশ’ উচ্চারণ নজরুলের পছন্দ হয় না, কিন্তু তার গান তাকে দূর অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। বিপন্ন মানুষের অসহায় অবস্থার কথা ভেবে চোখ ছলছল করে উঠে। পরক্ষণেই নির্বাক যুগে তৈরি সিনেমায় চার্লি চ্যাপ্লিনের অভিনয় দেখে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যায়।
সুন্দর বনের উপর নির্মিত ডকুমেন্টারীর দেখা মেলে। ধারা ভাষ্যকারের বর্ণনা ভেসে আসে, ‘দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দেশ, বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাস ভূমি।’
দীর্ঘ সময় ধরে গোলপাতার আকার আকৃতি ও ব্যবহার বিধি বর্ণনা করা হয়। বনের ভিতরে বনদেবীর আস্তানা। বাঁশ ও কাঠের তৈরি ঘরে দেবীর মূর্তি। বাওয়ালীদের মধ্যে কেউ কেউ দেবীর পূজা করেন। তাদের বিশ্বাস এতে বাঘের আক্রমণ থেকে বাঁচা যায়। বনের সীমানা ঘেঁষে বয়ে যাওয়া নদী। নদীর কিনারে কাঁদা পানির মধ্যে ডানাওয়ালা এক প্রজাতির মাছের উপর ক্যামেরা অনেকক্ষণ স্থির থাকে। নজরুল সেদিকে তাকিয়ে ভাবে, ‘এই পানি আমার পানি, এগুলি আমার মাছ।’
বাংলাদেশের টিভিতে এই ডকুমেন্টারী চিত্রটি কি দেখানো হয়েছে? তার জানা নেই। শুধু দুই নম্বরী কেবল বক্সটির প্রতি মুগ্ধতা আরো বাড়ে। এরূপ একটি যাদুর বাক্স যদি পঁচিশ বছর আগে তার কাছে থাকতো! ঘরের অন্ধকারের বুক চিড়ে তার কাতর গলা ভেসে আসে।
‘আহারে শিউলি! আহা!’
দশম শ্রেণীতে পড়ার সময় সে গভীরভাবে একজনের প্রেমে তলিয়ে যায়। শিউলি নামের সেই মেয়ের কথা এখনো মাঝে মাঝে মনে পড়ে। সময়ে অসময়ে বুকের গভীর থেকে অতিদীর্ঘ সব দীর্ঘ-নিশ্বাস বেরিয়ে আসে। তখনো তার গোঁফ উঠেনি। সেই কারণে সবাই গায়ে পড়ে বিয়োগান্ত সব উপদেশ দেয়া শুরু করে। যদিও তাদের কথাবার্তা শুনে সে গোঁফের সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক ধরতে পারেনি, তবুও একসময় নজরুল ভয় পেয়ে যায়। সে আর সাহস করে শিউলির দিকে তাকাতে পারতো না। ফলে সেই মেয়ে জীবন থেকে চিরদিনের তরে হারিয়ে যায়।
এখন পঁচিশ বছর পর টিভিতে উত্তর মেরুর উপর একটা ডকুমেন্টারী দেখতে দেখতে নজরুল ভাবে-যদি সেই সময় তার হাতে আড়াইশ’ ডলার দামের এই দু নম্বরী যাদুর বাক্স থাকতো, আর যদি একটু আগেভাগে শালার গোঁফটা গজাতো, তাহলে আজ শিউলিকে পাশে নিয়ে ডিস্কভারী চ্যানেলে আর্কটিকের ‘ব্ল– মোমেন্ট’ দেখতে পেত। সূর্যাস্তের সময় মেরু বরফের উপর নীলাভ রঙের অপার্থিব শোভা শিউলির কোনদিন দেখা হবে না। আহা বেচারী রে !
টিভির সবগুলো চ্যানেলেই নজরুলের প্রবেশাধিকার আছে। যে চ্যানেলের অনুষ্ঠান পছন্দ হয়, সে সেটাই দেখে। তবুও ডিসকভারী গ্রুপের চ্যানেল কয়টির প্রতি তার আলাদা মোহ জন্মে। এই চ্যানেলগুলোতে প্রতিনিয়ত এমন কিছু দেখানো হয়Ñযা আমাদের প্রতিদিনকার আটপৌরে জীবনের ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাই সপ্তাহের শুরুতে টিভি গাইড হাতে পেলে সে প্রথমে এই চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠানমালায় চোখ বুলিয়ে নেয়। এইভাবেই একদিন সে দেখা পায় তার প্রার্থিত জীবটির।
তখনও নজরুলের ক্ষুদ্র মাথায় ‘জায়ান্ট স্কুইডের’ বিশাল পদচারণা। তার অবচেতন মন সব সময় এ সম্পর্কিত তথ্য খুঁজে বেড়ায়। তাই একদিন যখন সে দেখে, জায়ান্ট স্কুইড নিয়ে প্রোগ্রাম দেখানো হবে, তখন তার উত্তেজনার সীমা থাকে না। সে সাথে সাথে রোমানকে ফোন করে।
রোমান তখন মুখে আমসত্ব নিয়ে খুব মনযোগ দিয়ে হিন্দি সিনেমার নায়িকাদের লেটেস্ট খবর পড়ছিল। তার মন পড়ে আছে দিব্যা ভারতীর সাথে। নজরুল হড়বড় করে কি বলছে কিছুই তার মাথায় ঢোকে না। সে পাল্টা প্রশ্ন করে,
‘কিসের প্রোগ্রাম দেখাবে বললে? জায়ান্ট স্কুইড আবার কি জিনিস?’
‘ঐ যে তোমার ক্যালামারি! যার সাইজ তোমার মুখের সমান হলে নাম হয় স্কুইড, আর সাইজ একটু বড় হলে হয়ে যায় গাঁজাখুরি, তার প্রোগ্রাম দেখাবে। বৃহস্পতিবার রাত আটটায়।’
১৯৯৮ সালের এক সন্ধ্যায় তারা দুই বন্ধু নিজেদের ঘরে বসে প্রোগ্রামটি দেখে। ভবিষ্যতে মাসুদ রানা সিরিজের সপক্ষে দলিল হিসেবে ব্যবহার করার জন্য নজরুল সেটি রেকর্ডও করে রাখে। প্রোগ্রামটি দেখে এবং টিভি ভাষ্যকারের বক্তব্য শুনে বইয়ের বক্তব্যের বাইরে নতুন যে তথ্য জানা যায়, তা এরুপ…
এরা গভীর সমুদ্রের প্রাণি, উপকুলের অগভীর পানিতে এরা আসেনা। জীবন্ত জায়ান্ট স্কুইডের সাক্ষাৎ পাওয়া বিরল ঘটনা। মারা যাওয়ার পর এদের শরীর ভেসে উঠে। ঢেউয়ের টানে কদাচিত উপকূলে এদের দেখা মেলে। এদের সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান আপাতত এ পর্যন্তই। ডীপ সি টেকনোলজি আরো উন্নত হলে এদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
উন্নত দেশের পর্যটকেরা নিউইয়র্কে বেড়াতে এসে গভীর আগ্রহ নিয়ে অনেক কিছু দেখে। সেই অনেক কিছুর মধ্যে একটি হলো মিউজিয়াম। অনেকগুলো বিখ্যাত ও সমৃদ্ধ মিউজিয়াম আছে নিউইয়র্কে। মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্ট, ন্যাচারাল হিষ্ট্রি মিউজিয়াম, মিউজিয়াম অব মর্ডান আর্ট, ফ্রিক কালেকশন্স, সলোমন গুগেনহেইম মিউজিয়াম, চিলড্রেন্স্ মিউজিয়াম, ইত্যাদি। এদের মধ্যে ন্যাচারাল হিষ্ট্রি মিউজিয়ামে পশুপাখির ষ্টাফ করা মৃতদেহ, ফসিল ইত্যাদি সংরক্ষিত আছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব বড় বড় শহরে এই মিউজিয়ামের শাখা আছে। রাজধানী শহর ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়ার কেন্দ্রস্থল কনস্টিটিউশন অ্যাভিনিউ এর উপরেও একটি আছে।
একদিন নজরুল বিশেষ কাজে ওয়াশিংটন ডিসির সেই এলাকায় গিয়ে হাজির হয়। হাতে বাড়তি কিছু সময় থাকায় সে ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে গিয়ে ঢোকে। বাঘ, সিংহ, গন্ডার, জলহস্তি দেখার পর এক সময় জায়ান্ট স্কুইডের কথা মাথায় আসে। সে জলের প্রানী বিভাগ খুঁজতে শুরু করে এবং একসময় নির্দিষ্ট চেম্বারে গিয়ে উপস্থিত হয়। সেখানে কাঁচের আবরণের ভিতর জায়াণ্ট স্কুইডের মৃতদেহ সংরক্ষন করা আছে। স্কুইডের আকার আকৃতি প্রত্যক্ষ করার পর নজরুলের ধারণা হয়, বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বড়। অর্থাৎ, এই প্রাণির ম্যান্টেল বা শরীরের চেয়ে এর ট্যান্টাকল বা প্রধান শুড় দুটি আকারে বহুগুণ বড়।
চেম্বারের চার পাশের দেয়ালে অনেক ছবি ও লেখা সেঁটে দেয়া। এই লেখায় স্কুইড সম্পর্কে প্রাচীন নাবিক ও সমুদ্র বিজ্ঞানীদের কল্পচিত্র ও ধারণা প্রকাশ পেয়েছে। কোন ছবিতে দেখা যায় স্কুইড মুখ দিয়ে আগুন ছড়াচ্ছে, আবার কোনো ছবিতে দুই শুড় দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে জাহাজ ভেঙ্গে ফেলছে। এখানকার বিভিন্ন মন্তব্য ও ছবি ‘বড় ক্ষুধা’ বইয়ের কাহিনীর সাথে বেশ মিলে যায়। নজরুল খুব পরিতৃপ্ত মনে সেখান থেকে বেরিয়ে আসে।
নজরুল ইসলামের উচিত ছিল জায়ান্ট স্কুইড বা মাসুদ রানা প্রসঙ্গের এখানেই ইতি টানা। একজন সুশীল সভ্য মানুষের জন্য সেটাই শোভনীয়। কিন্তু রোমান কেন মাসুদ রানা না পড়ে হিন্দি সিনেমার খবর পড়ে, এবং নজরুলকে উল্টো মাঝে মাঝে খোঁটা দেয়, এজন্য তার ক্ষোভ পুরোপুরি শেষ হয় না। সুযোগ পেলেই সে-ও পাল্টা নজির উপস্থাপন করে। আর নিউইয়র্ক এমন একটা শহর যেখানে উদাহরনের অভাব হয় না। পরবর্তী সময়ে এই শহরে আরও দু’টো ঘটনার সাক্ষাৎ মেলে, যা উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করে সে রোমানের সীমিত ধারণা শোধরানোর চেষ্টা করে।
উপসাগরীয় পরিস্থিতি তখন খুব অশান্ত। মিঃ বুশ জুনিয়র স্বপ্নে জেনেছেন যে, সাদ্দাম হোসেন অ্যাটম বোমার চেয়েও শক্তিশালী অস্ত্র আবিষ্কার করেছেন। সে অস্ত্র দিয়ে মানবকুলের, বিশেষত: সাদা প্রজাতির ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী। সুতরাং নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার খাতিরে সাদ্দামকে অবশ্যই ধ্বংস করতে হবে। অন্যান্য রঘুপতিরা প্রাথমিকভাবে মৃদু আপত্তি করে এখন মেনে নিয়েছেন। জাতিসংঘ ও অন্যান্য যাবতীয় সংঘ বহু আগেই শান্তির ব্রতে ভঙ্গ দিয়েছে। এখন কেবলমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী সিনেটর ও আমর্ত্যবর্গই এই অপরাধ থামাতে পারেন। কিন্তু জুনিয়র বুশ পিতৃরক্তের ঋনে দায়বদ্ধ। যুদ্ধ তাকে করতেই হবে, আর সেজন্য আরও কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বকে তার পক্ষে টানতে হবে। এ জন্য চাই অকাট্য প্রমাণ। এদিকে সময়ও ফুরিয়ে আসছে। চূড়ান্ত সময়সীমার আর মাত্র সপ্তাহ খানেক বাকী।
ক্যাপিটেল হিলে আবারো জরুরী সভা আহবান করা হয়। এবার তারা অকাট্য প্রমাণ হাজির করেছেন। তৃতীয় বিশ্বের একটা দেশের সমস্ত ডিফেন্সিভ ব্যবস্থাকে কাঁচকলা দেখিয়ে সে দেশের দুজন নামীদামী জেনারেলের কথোপকথন টেপ করে এনেছেন। সেই টেপ সুধী সমাবেশে বাজিয়ে শোনানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের রেডিও টিভিতে তা প্রচারিত হয়। বলা বাহুল্য, সেই কথোপকথনের পুরোটা ছিল আরবীতে। আরবী ভাষায় নজরুলের দখল খুব একটা ভালো নয়। আল্হামদুলিল্লাহ্ ও বিসমিল্লাহর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বোধকরি, তার অসুবিধার কথা বিবেচনা করে টেপের বক্তব্য ইংরেজিতে অনুবাদ করে শোনানো হয়।
এক জেনারেল আর এক জেনারেলকে বলছে, ‘ঐ সমস্ত জিনিস ট্রাকে করে নিয়ে গিয়ে লুকিয়ে ফেলতে হবে।’ ক্যাপিটাল হিলের অতি উৎসাহী যুদ্ধবাজরা এই বাক্যটির মনগড়া পর্যালোচনা করে শোনান, ‘ঐ যে, ওরা একজন আরেক জনকে কিছু একটা লুকিয়ে ফেলতে বলছেÑওটাই সেই মানব বিধ্বংসী অস্ত্র।’
অনেকেই সে কথা নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করে। ‘আমাদের ইনটেলিজেন্স প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে প্রমাণ নিয়ে এসেছে। তাদেরকে অবিশ্বাস করি কিভাবে? নিঃসন্দেহে সাদ্দামের হাতে আমাদের মৃত্যুবীজ লুকানো আছে। সুতরাং বুশ তুমি এগিয়ে যাও…।’
ফলাফল! সাদ্দাম হোসেন এখন আমাদের সময়ের সাম্প্রতিক ইতিহাস।
নজরুল যদিও বিশ্বাস করে না যে ওটা দু’জন জেনারেলের কথোপকথন ছিল, তবুও রোমানকে কোণঠাঁসা করার জন্য বলে, এস্পিওনাজ এজেন্টদের জন্যই এটা সম্ভব হয়েছে। আর মাসুদ রানাও একজন এস্পিওনাজ এজেন্ট। দ্বিতীয়টি, নিউইয়র্ক সিটির একটি ভ্রাম্যমান ঘটনা। অর্থাৎ চলন্ত ট্রেনের ভিতর এ ঘটনাটি সংঘটিত হয়। সাবওয়েতে চড়ে এক ইহুদি যুবক বাড়ি ফিরছিল। পাশে তার বান্ধবী বসা ছিল। আর ছিল এক বাংলাদেশী যুবক। হঠাৎ আট-দশ জনের এক সশস্ত্র শ্বেতাঙ্গ যুবকের দল ইহুদী যুবকের উপর চড়াও হয়। মুসা (আঃ) নবীর এই অনুসারী হয়তো সেদিন মরেই যেত, নিদেনপক্ষে মারাত্মক আহত হত। কিন্তু তার কোনটাই ঘটেনিÑশেষ নবী(স) এর উম্মতের কল্যাণে। বাংলাদেশী যুবক নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ইহুদী যুবককে রক্ষা করে। তার বীর বিক্রমের ধারে ঈসা নবীর দাঙ্গাবাজ চ্যালারা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। (নজরুলের ধারণা, এই যুবক ছোটবেলায় প্রচুর বাংলা মারদাঙ্গা সিনেমা দেখেছে।) এ খবর প্রচারিত হওয়া মাত্র সারা শহরে হুলুস্থুল পড়ে যায়। বিভিন্ন ইহুদী সংগঠনের নেতারা বাংলাদেশী যুবককে অভিনন্দন জানায়। সিটি প্রশাসনের ইহুদী কর্মকর্তা, কংগ্রেসম্যান মিলে মেয়রকে বাধ্য করে যুবকের বীরত্বের জন্য পুরস্কার প্রদানে।
অনেকদিন ধরে নিউইয়র্ক শহরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা হয় না। সেবারে নির্ঘাত হতো। ইহুদিরা এই শহরের অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করে। তারা ছেড়ে দেবার পাত্র নয়। বাঙালি যুবকের সাহসিকতায় পৃথিবীর টাফ নগরী এক কলঙ্কের হাত থেকে রক্ষা পায়।
নজরুল রোমানকে বলে, ‘দেখেছো! আমরা সবাই মাসুদ রানা নই। কিন্তু আমাদের মধ্যে কেউ কেউ নিঃসন্দেহে মাসুদ রানা।’ এ প্রসঙ্গে নজরুল রীতিমতো একটি বক্তৃতাও দিয়ে ফেলে, ‘অষ্ট্রিয়ার যুবরাজকে হত্যার কারণে প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হয়। হিটলারের উচ্চাভিলাষের জন্য দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ। সেই যুগ আজ পাল্টেছে, সময় পাল্টেছে। এখন বড় কোনো অন্যায়কে ঠেকানোর জন্য মহাযুদ্ধের দরকার হয় না। এক বা একাধিক এস্পিওনাজ এজেন্টই এখন এই কাজগুলো করতে পারে। দুর্ভাগ্যবশত: এই এজেণ্টদের কাজের পদ্ধতি, ধরন ইত্যাদি সম্পর্কিত লেখা বাংলাদেশের অন্য কোনো লেখকের বইতে নেই।
বইয়ের জগতে সীমাবদ্ধতা বলতে কিছু নেই। বিষয়বস্তু আমাদের পরিচিত জীবনকে কেন্দ্র করে ঘুরতে হবে-এরুপ বাধ্যবাধকতাও নেই। লেখকরা তাদের ইচ্ছেমত বারবার গন্ডীর বাইরে পা ফেলবেন। নইলে আমরা অচেনাকে চিনবো কিভাবে, অজানাকে জানবো কি করে? বিদ্রোহী কবির ‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতাটি পড়েছো?- ‘রক্ত ঝরাতে পারিনা তো একা, তাই লিখে যাই রক্ত লেখা।’
কবির হাতে অস্ত্রের পরিবর্তে কলম থাকায় রক্ত ঝরাতে পারেননি। হাতে অস্ত্র থাকলে তিনি অবশ্যই খুন-খারাবি করতেন! লেখার মাধ্যমে যদি এ ধরনের উন্নত বিদ্রোহ রচনা করা যায় তাহলে লেখা দিয়ে স্বত্ত্ব রচনায় দোষ কোথায়!
দেশকে নিয়ে গর্ব করার মতো খুব বেশি বিষয় আমাদের নেই। প্রতিটি সচেতন মানুষ জানেন-এটা কতবড় হতাশার ব্যাপার। কাজী আনোয়ার হোসেন ‘রানা’ চরিত্র সৃষ্টির মাধ্যমে অসংখ্য পাঠক পাঠিকার মনে আশার সঞ্চার করেছেন। একদিন আমরাও বড় হবো। বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে দাড়াবো…।
একেবারে কোনো আশা ছাড়া মানুষ বাঁচে কিভাবে?