পরিবর্তিত অ্যাসাইলাম নীতির ব্যাখ্যা: মামলা খারিজের হার এখন ৬৫ শতাংশ

মঈনুদ্দীন নাসের : সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ট্রাম্প প্রশাসনের দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করা বিদেশিদের অ্যাসাইলাম দেওয়ার নীতিতে পরিবর্তন আনলেও যারা ভিসা নিয়ে এ দেশে প্রবেশ করেছেন বা সরাসরি বিমানযোগে বিমানবন্দর দিয়ে বৈধভাবে প্রবেশ করেছেন, তাদের অ্যাসাইলাম প্রক্রিয়ায় কোনো পরিবর্তন আনেননি। দেশে বিতাড়িত হয়ে জীবনঝুঁকির কারণে ভিসা নিয়ে যারা এ দেশে এসেছেন, তাদের অ্যাসাইলাম প্রক্রিয়া আগের মতোই রয়ে গেছে। তবে যারা অ্যাসাইলাম চেয়েছেন, তাদের আবেদন যাচাই-বাছাই বা তাদের ওপর স্বদেশে নির্যাতন, নিষ্পেষণের দলিল প্রদান অনেকটা যথার্থ হিসেবে দেখতে চায়। সে কারণে অ্যাসাইলাম মামলা নাকচ হওয়ার হার বেড়ে গেছে। ২০১২ সালে যেখানে ৪২ শতাংশ মামলা খারিজ হতো, সেখানে এখন ৬৫ শতাংশ মামলা খারিজ হয়ে যায় বলে সিরাকুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাক রেকর্ড থেকে জানা যায়।
সুপ্রিম কোর্ট আমেরিকার দক্ষিণ সীমান্ত অর্থাৎ মেক্সিকোর যেসব লোক এসে অ্যাসাইলাম চেয়েছেন, তাদের জন্য প্রথম অন্য কোনো দেশে বিশেষ করে তাদের যেসব দেশ অতিক্রম করে এসেছেন সেসব দেশে অ্যাসাইলাম না চাইলে তাদের আবেদন খারিজ করে বর্তমান প্রশাসনিক বিধানকে কার্যকর রেখেছেন। কার্যত অন্য কোনো তৃতীয় দেশের মধ্য দিয়ে এলে প্রথমে সেসব দেশে আবেদন করতে হবে, নতুবা আমেরিকায় অ্যাসাইলাম আবেদন নাকচ করা হবে। আর এই নতুন বিধান বস্তুত ট্রাম্প প্রশাসন নীতিগত অবস্থান থেকে সরে আসার অন্যতম বিধান। বিশেষ করে দক্ষিণ আমেরিকায় যেসব লোক সেখানে রাজনৈতিক পীড়নের শিকার হয়ে আমেরিকায় পাড়ি জমাচ্ছেন তাদের জন্য এ বিধি জারি হয়েছে। আমেরিকায় বর্ডার পেট্রোল রিপোর্টে দেখা যায়, তারা ৮ লাখ মাইগ্র্যান্ট ও অ্যাসাইলাম আবেদনকারীদের আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্তে ২০১৯ অর্থবছরেই আটক করে রেখেছে। ৩০ সেপ্টেম্বর এই অর্থবছর শেষ হয়েছে।
সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
গত জুলাই মাসের ১৬ তারিখে প্রশাসন ‘অ্যাসাইলাম নিষিদ্ধকরণ ২.১’ এই বর্তমান নীতি চালু করে। ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসেও এ ধরনের নীতি চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল সীমান্তের দুই পোর্টন অব এন্ট্রির মাঝখান দিয়ে কোনো ইনস্পেকশন ছাড়া অবৈধভাবে আমেরিকায় প্রবেশ বন্ধ করা। একটি ফেডারেল কোর্ট এ ধরনের আদেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রদান করে। সুপ্রিম কোর্টও এই ধরনের ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
সংক্ষেপে বলা যায়, ‘অ্যাসাইলাম বন্ধ করায় ১.০’ আদেশ কার্যকর হয়নি। মাইগ্র্যান্টদেরকে কর্তৃপক্ষের কাছে অ্যাসাইলাম চাওয়ার অধিকার বহাল থাকে। তারা অ্যাসাইলামের অনুরোধ করতে পারে। তাদের সীমান্ত অতিক্রম করার পর কিংবা আমেরিকার ভ‚মিতে গ্রেফতার হওয়ার পর অ্যাসাইলাম চাইতে পারে। রেকর্ড পরিমাণ মানুষ গ্রেফতার হলে তাদের আবেদন প্রসেস করতে বর্ডার পেট্রোল হিমশিম খায়। ডিটেনশন হোমসমূহ অনেক বেশি সংখ্যক লোকের সমাগমে ভর্তি হয়ে যায়।
আইনপ্রণেতা ও মানবাধিকার অ্যাডভোকেটদের প্রতিবাদের মুখে আমেরিকান সরকার আমেরিকার মাটিতে মাইগ্রেশন কমানোর উদ্যোগ নেয়। তার মধ্যে একটি হচ্ছে ‘মাইগ্রেন্ট প্রটেকশন প্রটোকল’- এমপিপি। যার অর্থ ‘মেক্সিকোতে অবস্থান’। প্রথমে তা ক্যালিফোর্নিয়ায় বাস্তবায়িত হয় জানুয়ারিতে, পরে তা দক্ষিণ টেক্সাসে বাড়ানো হয়।
এই আইন ‘এমপিপি’ নামে অভিহিত। এ অনুসারে প্রায় ৪২ হাজার মাইগ্রেন্ট, যারা অ্যাসাইলাম চায়, তাদের মেক্সিকোতে ফেরত পাঠানো হয়। তাদের কোর্ট হিয়ারিংয়ের জন্য সেখানে অবস্থান করতে বলা হয়।
অনেকেই দেখেন, মেক্সিকান বর্ডার স্টেটে আমেরিকা ব্যাপক হুঁশিয়ারি বার্তা দিয়ে পোস্টার দেয়। যেমন তমালিপাস এলাকা। অনেকে দক্ষিণ মেক্সিকো চলে যায়। অনেকে মেক্সিকান শেল্টারে কয়েক সপ্তাহ অবস্থান করেন। তারা আমেরিকায় ইমিগ্রেশন যে তাঁবুতে কোর্ট বসিয়েছে, তার মাধ্যমে অ্যাসাইলাম দাবি উত্থাপন করেন।
গত ১১ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনকে যারা প্রথমে অন্য দেশে প্রটেকশন চায়নি তাদের যারা দক্ষিণ সীমান্তে এসেছে, তাদের অ্যাসাইলাম খারিজ করার অনুমতি দেয়।
এই নিষেধাজ্ঞার পক্ষে-বিপক্ষে মামলা কী?
সুপ্রিম কোর্টের রুলিংয়ের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্প্যানিশ ভাষায় এক বার্তা টুইট করেন।
‘আর নয়, আর ভুয়া অ্যাসাইলাম নয়, আর ধরে ছেড়ে দেওয়া নয়,’ এই ধরে ছেড়ে দেওয়া মানে আমেরিকায় পলিসিতে ইতিপূর্বে এমপিপির আওতায় কোনো মাইগ্রেন্টকে ইমিগ্রেশন কোর্টে পরবর্তীতে শুনানির জন্য অপেক্ষা করা পর্যন্ত আমেরিকার ভেতরে ছেড়ে দেওয়া হয়। গত সোমবার (২৩ সেপ্টেম্বর) হোমল্যান্ড সিকিউরিটির ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি কেবিন ম্যাকলেলিন আনুষ্ঠানিকভাবে এই নীতির অবসান ঘোষণা করেন। এ পলিসি পরিবর্তন করে ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তি দেয়, মাইগ্রেন্টরা তাদের বাছাইকৃত দেশে অ্যাসাইলাম পেতে পারে না। প্রথম যেখানে সুযোগ পায়, তারা সেখানে না গিয়ে তাদের পছন্দ করা স্থানে এসে আবেদন করলে, তা তাদের দাবির যথার্থতা ও জরুরি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এ অবস্থায় বিধিতে বলা হয়, মাইগ্রেন্ট সত্যিকার ভয়ে ভীত কি না, তা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ থেকে যায়। মেক্সিকান ছাড়া অন্য সব মাইগ্রেন্ট তৃতীয় কোনো না কোনো দেশের মধ্য দিয়ে আসছে।
এর বিরোধীরা অবশ্য বলছে, এই বিধি ডোমেস্টিক ও ইন্টারন্যাশনাল বৈধ নিয়মের পরিপন্থী। আর তা অত্যন্ত সঙিন লোকদের কাছ থেকে অর্থাৎ যারা নির্যাতন থেকে পালিয়ে আসছে, তাদের কাছ থেকে মৌলিক প্রটেকশন কেড়ে নেওয়ার মতো।
আমেরিকান ইমিগ্রেশন ল’য়ারস অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী পরিচালক বেঞ্জানিন জনসন বলেন, এ বিধি অ্যাসাইলাম প্রার্থীদের অর্থবহ প্রটেকশনের দাবিকে খারিজ করে পুনরায় তাদের নির্যাতনকারীদের হাতে বা আন্তর্জাতিক গ্যাংস্টারদের কাছে তুলে দেওয়ারই শামিল।
এসবের মাধ্যমে যারা মেক্সিকোতে কোর্ট ট্রায়ালের জন্য অপেক্ষা করছে, তাদের কাছে কী বার্তা পৌঁছাচ্ছে? গত জুলাই মাসের ১৬ তারিখের পর কোনো অ্যাসাইলাম প্রার্থী যদি সীমান্তে এসে যাচ্ছেন, এ ট্রান্সজিট বিধি তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
নুরেভো লারেডো, মেক্সিকো ও অন্যান্য জায়গা থেকে বলেছেন, তারা এ পলিসি সম্পর্কে কিছুই জানে না। ইমিগ্রেশন ল’য়ার্সরা বলেন, যাদের মেক্সিকো ফেরত পাঠানো হয়, তাদের সাথে যোগাযোগ করা কঠিন।
আগস্ট পর্যন্ত ৩৮ হাজার ২৯১ জন লোকের মধ্যে মাত্র ৫৮২ জন এমপিপিভুক্ত মাইগ্রেন্ট লয়ারদের মাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব হয়েছেন। তাদের সংখ্যা মাত্র ১ দশমিক ৫২ শতাংশ।
এ নিষেধাজ্ঞা কি দক্ষিণ সীমান্তে অ্যাসাইলামকে পুরোপুরি শেষ করতে পারবে?
ফেডারেল কোর্টে লিগ্যাল চ্যালেঞ্জের রায় বের হওয়া পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসনের এ প্রতিবন্ধকতাপূর্ণ অ্যাসাইলাম নীতি বহাল থাকবে।
অ্যাসাইলাম প্রার্থীদের আমেরিকায় প্রটেকশন পাওয়া মারাত্মকভাবে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে এই বিধিতে। তবে একেবারে শূন্য নয়।
তাদের জন্য এক সম্ভাব্য ব্যতিক্রম রয়েছে, যাদের ফিরিয়ে দিলে শারীরিকভাবে নির্যাতিত হবে এমন কোনো ডকুমেন্ট দেখাতে পারে।
আমেরিকান সিভিল লিবার্টি ইউনিয়নের আইনজ্ঞ লি. জেলিরেন্ট বলেন, এ ধরনের কোনো ডকুমেন্ট তারা আনতে পারলে তাদের ফেরত দেওয়া কঠিন হবে। তারা হয়তো ফেরত পাঠানো থেকে বেঁচে যেতে পারেন অথবা তারা টর্চার কনভেনশনে মুক্তি পেতে পাবেন।
জেলিরেন্ট বলেন, ফেরত পাঠানো না হলে অ্যাসাইলামের মতো তা নির্যাতন থেকে পালিয়ে আসা লোককে রক্ষা করতে পারে। কিন্তু তা অনেক কঠিন ব্যবস্থা। কারণ এ প্রমাণ অনেক স্ট্যান্ডার্ড প্রমাণ। আর তা অ্যাসাইলামের সব বেনিফিট দেয় না।
অন্য কোনোভাবে কি কোনো মাইগ্রেন্ট অ্যাসাইলামের জন্য কোয়ালিফাই করবে?
সাউদার্ন বা দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে আসা ছাড়াও অ্যাসাইলাম দাবি করা যাবে। যেমন যারা আমেরিকায় বিমানে এসেছেন এবং যারা ভিসা নিয়ে প্রবেশ করেছেন, তারা যদি স্বদেশে পারসিকিউশনের সম্মুখীন হয় বা ফিরে গেলে জাতিগত, ধর্মীয়, জাতীয়তা, রাজনৈতিক মতবাদ অথবা কোনো বিশেষ সামাজিক গ্রুপের সদস্য হওয়ার কারণে নির্যাতিত হওয়ার ভয় থাকে, তাহলে তারা এ দেশে আসার এক বছরের মধ্যে অ্যাসাইলাম চাইতে পারেন। তবে এক বছরের ব্যতিক্রমও আছে। একই সময়ে অ্যাসাইলাম দাবি করার অর্থ এই নয় যে তারা প্রটেকশন পাবে? তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে আপনার দাবি কতটা সত্যি, তার ওপর।
ট্রাম্প প্রশাসন একসময় আমেরিকায় মানবিক কারণে রিফিউজি অ্যাসাইলাম যারা চেয়েছে, তাদের যেভাবে ত্রাণ দিয়ে থাকত তা ব্যাপকভাবে পরিবর্তন করেছে। তার শুরু হয় ট্রাভেল ব্যানের মাধ্যমে, যা কয়েকটি মুসলিম দেশের ওপর বলবৎ করা হয়। ২০১৮ সালে আমেরিকায় সবচেয়ে কম রিফিউজি আসে। আর তা এ বছর রিপিট করা হয়।
অ্যাসাইলাম মামলা খারিজ হওয়ার সংখ্যা বেড়েছে। তা আগেই বলেছি, ৪২ শতাংশ থেকে ৬৫ শতাংশ হয়েছে। আর বাংলাদেশি অ্যাসাইলামপ্রার্থীদের ব্যাপক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেকে তা কাজে লাগাতে পারছেন না। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অবর্তমানে সরকারি মহলের গুম, খুন, রাহাজানি, বলাৎকারের সংখ্যাধিক্যের কারণে যারা নির্যাতিত হয়ে এ দেশে এসেছেন, তাদের অ্যাসাইলাম পাওয়া মানবাধিকারের মধ্যে পড়লেও তা অনেকে ব্যবহার করতে না পারায় সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।