পরিবার এবং অতঃপর (২)

রোমিনা লোদি :

এর আগে ‘পরিবার এবং অতঃপর’ শিরোনামে একটি লেখা লিখেছিলাম। এটা তার ধারাবাহিকতায় লেখা।
টেক্সাসের উভালদে স্কুল শুটিংয়ের খবরটা নতুন করে আবার আমাকে আতঙ্কিত করে তুলল। এই দেশের স্কুলসমাজে গোলাগুলি, ছাত্রছাত্রী হত্যা, বোমা ফাটানোর ঘটনাগুলো কেমন যেন স্বাভাবিক আকার ধারণ করছে। আমার দুটো ছেলেও উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষার্থী। এই তো কিছুদিন আগে স্কুল চলাকালীন ওদের প্রিন্সিপালের কাছ থেকে মেসেজ এল, এক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি স্কুল প্রাঙ্গণে বোমা রেখেছে বলে জানিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে পুরো স্কুল লকডাউন করে পুলিশ ও সোয়াট টিম স্কুল প্রাঙ্গণে এসে শুরু করল বিস্তর খোঁজাখুঁজি। বাইরে ও ভেতর থেকে যে কারো স্কুলে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হলোÑএটা স্ট্যান্ডার্ড প্রটোকল। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলল এই শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। অবশেষে আবিষ্কৃত হলো, ওটা ছিল কারো প্র্যাঙ্ক বা তামাশা। আসলে কেউ বোমা রাখেনি। কিন্তু ব্যাপার হলো, কখনো কখনো এটা তামাশা না হয়ে সত্যি হতে পারে এবং হয়েছেও।

এর কিছুদিন পরে ঘটল আরো একটি শুটিংয়ের ঘটনা। ৪ জুলাই আমেরিকার স্বাধীনতা দিবসের উইকেন্ডে আমরা গিয়েছিলাম উইসকনসিন স্টেটে বেড়াতে। ওইদিন ঠিক তার পাশের লাগোয়া স্টেট ইলিনয়ের একটি সীমান্তবর্তী শহরে অবস্থিত হাইল্যান্ড পার্কে প্যারেড চলাকালে এক বন্দুকধারী পাশের একটি উঁচু ছাদের ওপর থেকে গুলি করে প্রায় অর্ধশত মানুষকে। এর মধ্যে ৪৮ জন জখম ও সাতজনের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনার সময় আমরা খুব কাছাকাছি উইসকনসিনের একটি শহরে অবস্থান করছিলাম। পুলিশ বিজ্ঞপ্তিতে জানা গেছে, বন্দুকধারীর প্ল্যান ছিল এর পরে উইসকনসিনের একটি শহরে গিয়ে মানুষ মারার। কে জানে, হয়তো এটা হতে পারত আমরা যে শহরে ছিলাম, সেটিই।

খুব লজ্জাজনক হলেও সত্যি, এ বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আমেরিকায় ইতিমধ্যে তিন শতাধিক ‘মাস শুটিং’ বা গণহামলার ঘটনা ঘটেছে। সংখ্যাটি পৃথিবীর যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক অনেক বেশি। পুরো আমেরিকার বিভিন্ন স্টেটে প্রতি সপ্তাহে একটি করে তো ঘটছেই, মাঝেমধ্যে দু-তিনটি করে শুটিংয়ের ঘটনা ঘটছে, যার সবগুলো খবরে আসছে না। স্কুল, শপিং মল, সুপার মার্কেট, সিনেমা হল, ক্লাব, অফিস, রেস্তোরাঁ, পার্ক, রাস্তাঘাটÑএমন কোনো জায়গা বাকি নেই, যেখানে জনসমাবেশে কোনো না কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি।

এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই দেশের মোট জনসংখ্যা যত, তার থেকেও অধিক পরিমাণ বন্দুক বা আগ্নেয়াস্ত্র কিছু মানুষের হাতে এখন বিদ্যমান আছে, যা কিনা মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ। নিজেদের নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে লাগামহীন অস্ত্র ক্রয় এবং তার যত্রতত্র ব্যবহারের মধ্য দিয়ে আমেরিকানরা একটি যুদ্ধবাজ, মারকুটে জাতিতে পরিণত হচ্ছে। কাউকে পছন্দ না হলে, কারো সঙ্গে বনিবনা না হলে, প্রেমে প্রত্যাখ্যান হলে, প্রতিশোধ নিতে চাইলে, মাথায় রাগ উঠে গেলে, পুরোনো ক্ষার মেটাতেÑএ রকম বহুবিধ কারণের বশবর্তী হয়ে আমেরিকানরা হাতে তুলে নিচ্ছে বন্দুক, রাইফেল, মারণাস্ত্র।
আর সেটা করতে পারছে দুটি কারণে। এক. তাদের বাড়িতেই মজুদ আছে আগ্নেয়াস্ত্র, যা আগে থেকেই বাবা-মা বা অন্য সদস্যদের দ্বারা কেনা। অথবা দুই. দোকানে গিয়ে কোনো রকম ব্যাকগ্রাউন্ড চেক ছাড়াই ১৮ বছর বা ঊর্ধ্বের যে কেউ এগুলো সহজে কিনতে পারছে।

অনেক অপরাধবিজ্ঞানী ও মানসিক বিশেষজ্ঞের মতে, আমেরিকানদের এ রকম হত্যাপ্রিয় মনোবৃত্তির অনেক কারণ রয়েছে : খুব ছোটবেলায় অনেক ধরনের পারিবারিক নির্যাতনের শিকার; স্কুল-কলেজে অতিরিক্ত বুলিং বা অপমান, অপদস্থের শিকার; যাদের দ্বারা একসময় নির্যাতিত, নিগৃহীত তাদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার প্রবল ইচ্ছা; জীবনের প্রতি কোনো মায়া না থাকা বা এর গুরুত্ব না বোঝা প্রভৃতি। আরেকটি কারণ খুব অবাক হওয়ার মতোÑরাতারাতি ফেমাস বা জনপ্রিয় হওয়ার ইচ্ছা। সাধারণত এই সাংঘাতিক হত্যাকাণ্ডগুলো যখন ঘটে, তখন এ দেশের মিডিয়া, বিভিন্ন নিউজ চ্যানেল যে পরিমাণ কাভারেজ দেয়, সেই পরিমাণ কোনো ভালো কাজ করলে দেয় কি না আমার জানা নেই।

যুগে যুগে সমাজবিজ্ঞানীরা তো বলেই গেছেন, ঋণাত্মক কর্মকাণ্ডের প্রতি মানুষের একটি সহজাত আকর্ষণ সব সময় থাকে। একটি খারাপ কাজের হোতা, আরো একজন খারাপ কাজের অনুসারীকে সাহস দেয়। আরো সাহস দেয় বিভিন্ন টিভি শো, সিনেমা, ভিডিও গেম ও কমিক বই; যেখানে প্রচুর অন্যায় কাজ ও অপকর্মের বিশদ বিবরণ ও গ্রাফিক চিত্র ক্রমাগত প্রচার করা হয়। সামাজিক অবক্ষয়ের চাইতে আর্থিক মুনাফা আর মিডিয়া রেটিং এ দেশে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সমস্যাটা কী এবং কারণটা কী, এটা পরিষ্কারভাবে জানার পরও সেই সমস্যা সমাধানের কোনো উপায় বা ইচ্ছে এ দেশের সরকার, ঊর্ধ্বতন প্রশাসন ও আইন প্রণয়নকারীদের মধ্যে তেমন একটা নেই কেন, তা অবশ্যই ভাবার বিষয়। আপনি যদি এই দেশে থাকেন, তাহলে মনে হবে, এরা কি ইচ্ছে করেই এই সমস্যাটা জিইয়ে রাখছে? সমাজ ও রাজনীতির আনাচ-কানাচে, অলিগলিতে চিরকালই ‘পাওয়ার প্লে’ একটা বড় ভূমিকা রেখে আসছে।

স্বপ্নের এই দেশটি কেমন যেন বদলে গেল। আমি যখন প্রথম এই দেশে আসি, সেই তিরিশ বছর আগেকার আমেরিকাকে আর খুঁজে পাই না। আগে এরা নিরাপত্তার খাতিরে কুংফু, কারাতে, মার্শাল আর্ট, আত্মরক্ষার ট্রেনিং নিত। এখন এরা নিরাপত্তার খাতিরে দোকানে গিয়ে বন্দুক কিনে আনে। বন্দুক চালানোর ক্লাসে ভর্তি হয়।

মাঝখানে কিছুদিন কথাবার্তা চলল, স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা ও কর্মচারীদের বন্দুক চালানোর ট্রেনিং দেওয়া হবে। এতে সুফলের চাইতে কুফল যে বেশি হবে, তা বলাই বাহুল্য। যে দেশের পুলিশ বাহিনী সংঘবদ্ধ অবস্থায় একজন ১৮ বছরের বন্দুকধারী ছোকরাকে সামাল দিতে ভয় পায়, সেই দেশে স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা বই-খাতা ফেলে দিয়ে বন্দুক হাতে তুলে নিয়ে কীভাবে শত্রু দমন করবেন, ঠিক বুঝলাম না। আর তা-ই যদি হয়, তাহলে তো লেখালেখি বাদ দিয়ে আমাকেও অস্ত্র চালানোর ট্রেনিং নিতে হবে।

লেখক : কলামিস্ট ও ব্লগার, টেক্সাস।