পরিশুদ্ধ হৃদয়ের গুরুত্ব

ড. মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম খান

(গত সংখ্যার পর)
সিংহভাগ মুসলমানই মোনাফেকি, গীবত বা পরচর্চা, পার্থিব স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও পরকালের স্বার্থকে উপেক্ষা করার মত জঘন্য পাপাচারে লিপ্ত। এ সব থেকে মুক্ত থাকার জন্য মুসলিম উম্মাহর প্রতি নিদের্শ দিয়ে রাসূল (সঃ) বলেছেন, তোমরা অবশ্যই ধারণা-অনুমান থেকে বেচেঁ থাক। কেননা, ধারণা-অনুমান সবচেয়ে বড় মিথ্যা কথা। কারো দোষ খুঁজে বেড়িও না, গোয়ন্দাগিরিতে লিপ্ত হয়ো না। একে অন্যকে ধোঁকা দিও না, পরস্পরকে হিংসা করো না, পারস্পরিক বিদ্বেষভাব পোষণ করো না, বিচ্ছেদাত্মক আচরণ করো না, একজন থেকে আরেকজন বিচ্ছিন্ন হয়ে যেও না। বরং তোমরা সবাই এক আল্লাহর বান্দা হয়ে ভাই ভাই বনে যাও। আর একজন মুসলমানের জন্য তার ভাইয়ের সাথে তিন রাতের বেশি [বিরাগবশত] দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ রাখা জায়েয নেই [হারাম]। {সহীহ আল-বোখারী, খন্ড ৫, নম্বর ৫৬৩১ এবং ৫৬৩৮}। শয়তানের প্ররোচনাতে ক্রোধবশেই মানুষ এ সকল অপকর্মে লিপ্ত হয়। কাজেই ক্রোধ সংবরণ করা সম্পর্কে আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, একবার একজন লোক নবী (সঃ)-এর নিকট আরজ করলোঃ আপনি আমাকে উপদেশ দিন। তিনি (সঃ) বললেন, ক্রোধান্বিত হয়ো না। লোকটি বার বারই নসীহত করার জন্য (নবীর (সঃ) নিকট) আরজ করতে লাগলো। রাসূল (সঃ) প্রত্যেকবারই বলতে থাকেন, ক্রোধান্বিত হয়ো না।” (সহীহ আল-বোখারী, খন্ড ৫, ৫৬৭৬)। ক্রোধ সংবরণ করতে হলে খারাপ বাসনা-কামনাকে বিসর্জন দিতে হয় এবং উদ্ধত প্রকৃতি পরিহার ও শয়তানের কুমন্ত্রণা উপেক্ষা করতে হয়। এব্যাপারে রাসুল (সঃ) বলেছেন, “ প্রকৃত বলবান ও বীর পুরুষ সে নয়, যে কুস্তিতে কাউকে হারিয়ে দেয়। আসল বীরপুরুষ হলো সেই ব্যক্তি, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রিত রাখতে পারে।”(সহীহ আল-বোখারী, খন্ড ৫:৫৬৭৪)।
মূলত দুর্দমনীয় ক্রোধ এবং প্রতিহিংসার কারণেই বিশ^জুড়ে বিরাজ করছে অশান্তি, অস্থিরতা এবং মানব জীবনের নিরাপত্তাহীন পরিস্থিতি। ইবনে আমর (রাঃ) বলেন, আমি বিদায় হজ্জে রাসূল (সঃ)-কে লোকদের উদ্দেশ্যে বলতে শুনেছি, “ জেনে রাখ, তোমাদের এ শহরে কখনও শয়তানের ইবাদত (কেউ সরাসরি শিরকে জড়িত হবে না) করা হবে না। এ ব্যাপারে সে নিরাশ হয়ে গেছে। তবে যেসব কাজকে তোমরা তুচ্ছ মনে কর সেসব কাজে অচিরেই তার অনুসরণ (তার পদাংক অনুসরণ করা) করা হবে, তাতে সে খুশি হবে। (তিরমিযী, ২১০৬)। পরর্চ্চা ও পরনিন্দায় অভ্যস্ত মুসলিম উম্মাহর অধিকাংশই ঈর্ষাপরায়ণতা ও প্রতিহিংসায় লিপ্ত। তাই মুসলিম উম্মাহকে এই গর্হিত কর্ম থেকে দূরে থাকার তাগিদ দিয়ে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “হে বিশ^াসীগণ! যতদুর সম্ভব সন্দেহ পরিহার কর, নিশ্চয়ই কোন কোন ক্ষেত্রে সন্দেহ পাপ, এবং তোমরা পরস্পরের উপর গোয়ন্দাগিরী কর না এবং পরস্পরের অগোচরে পরস্পরের নিন্দা (পরর্চ্চা) কর না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের মাংস খেতে চাইবে? না, তোমরা তা ঘৃণা করবে। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ নিত্য ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়।”(সূরা হুজুরাত : ১২)।
অবিশ^াসীদের হৃদয়ের প্রধান রোগ হচ্ছে তাওহিদে অবিশ^াস। তাই তাদের আধ্যাত্মিক হৃদয় হচ্ছে মৃত এবং অন্ধকারে আবৃত। হিদায়েতের আলো পেতে হলে তাদেরকে অবশ্যই নিজের ধর্মীয় বিশ^াসে যে বিভ্রান্তি ও অন্ধকার রয়েছে তা বুঝতে হবে। তবে আল-কুর’আনের সংর্স্পশে আগতরা পরম দয়ালূ আল্লাহ তা’আলার অপার কৃপায় হিদায়েতের আলো দিয়ে অন্ধকার হৃদয়কে আলোকিত করেন।
আইয়ামে জাহেলী যুগে তাওহিদী দাওয়াত পৌঁছাতে রাসূলের (সঃ) উপর ন্যস্ত প্রাথমিক দায়িত্ব ছিল চারটি। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, ২: তিনিই নিরক্ষর জনসাধারণের মধ্যে পাঠিয়েছেন তাদেও মধ্য থেকেই একজন রাসূল, তার আয়াতসমূহ তাদেরকে পড়ে শোনানোর জন্যে, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করার জন্যে এবং তাদেরকে গ্রন্থ ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দেওয়ার জন্যে, পূর্বে তারা ছিল সুস্পষ্টরূপে পথভ্রষ্ট।”(সূরা আয-জুমু’আ)। আল-কুর’আনের পবিত্রবাণী দিয়েই জাহেলী সমাজের কলুষিত হৃদয়কে রাসূল (সঃ) পরিশোধন করেন যাতে তাদের হৃদয় আল্লাহ তা’আলার প্রদত্ত পবিত্র বিধিনিষেধ স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণে কোন দ্বিধা না থাকে। রাসূলের (সঃ) ব্যবহারিক সুন্নাহ অবলম্বনে ধীশক্তি ও প্রজ্ঞা ব্যবহারে তারা যেন জীবন যাপন করে পরবর্তীদের জন্য শিক্ষণীয় উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারে। এই শিক্ষাও তাদেরকে রাসূল (সঃ) দিয়েছিলেন। মক্কায় নাযিলকৃত আয়াতে ছিল, শিরক না করা, মা-বাবার সাথে সদয় ব্যবহার, ওজন ও মাপ ঠিকমত দেওয়া, ন্যায়বিচার করা, এতিমের সম্পদ ভোগ না করা, আত্বীয়স্বজনের প্রাপ্য দেওয়া ইত্যাদি (সূরা আন’আম : ১৫১-১৫৩ দ্রষ্টব্য)। এভাবে মক্কার প্রাথমিক মুসলিমদের কলুষিত হৃদয় পরিশুদ্ধ হওয়ার পর তারা যখন মদীনায় হিজরত করলেন তখন ইসলামী পরিপূর্ণ জীবনাদর্শের পবিএ বিধিনিষেধ নাযির হওয়া শুরু হয়। এগুলো মেনে চলতে তাদেও হৃদয়ে কোন সংশয় সৃষ্টি হয়নি বরং আয়াত নাযিল হওয়ার সাথে সাথেই তারা পরিপূর্ণরূপে গ্রহণ করেছিলেন। যেমন মদ্যপান ছিল তাদের সামাজিক রীতি, প্রায় সকলেই মদ্যপান করতেন। মদ্যপান হারাম ঘোষণাসম্পৃক্ত আয়াত নাযিল হলে কোন প্রশ্ন ব্যতিরেকে সকলেই একসাথে মদ্যপান পরিহার করলেন। উম্মাহর মাতা আয়েশা (রাঃ) বলতেন, “মক্কায় যদি এই সকল বিধিনিষেধ নাযিল হতো তাহলে কেউ অত সহজে অভ্যাস পরিহার করতো না।” কাজেই বলা যায়, আধ্যাত্মিক হৃদয় অর্জন ও কলুষিত হৃদয় পরিশোধনে রাসূলের (সঃ) শিক্ষা ও প্রদত্ত ব্যবস্থা হচ্ছে সর্বোত্তম। যারা আধ্যাত্মিক হৃদয়কে পরিশোধন করেন তারাই সফলকাম হবেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “শপথ মানুষের এবং তার (আল্লাহ তা’আলার) যিনি তাকে সুষমতা ও সুবিন্যস্ততা দান করেছেন, তারপর তাকে তার অন্যায়ের এবং তার ন্যায়ের চেতনা দান করেছেন, সত্যিই তার জীবন সার্থক যে তাকে (হৃদয়কে) পবিত্র করেছে এবং তার জীবন ব্যর্থ যে তাকে কলুষিত করেছে!”( সূরা আশ-শামস : ৭-১০)
মস্তিষ্ক দিয়ে বিচার এবং ন্যায়-অন্যায় যাচাই করার বোধশক্তি মানবকে দেওয়া হয়েছে। অতঃপর হৃদয়কে দিয়েছে গ্রহণ করার ক্ষমতা। যাতে সে হৃদয়কে পবিত্র করে মুক্তিলাভ ও সাফল্যের স্বর্ণশিখরে আরোহণ করতে পারে। একাজ সঠিকভাবে করতে হৃদয় দিয়ে ভালোবেসে মানবের প্রতি দরদী হওয়া, নিজ প্রবৃত্তির চাহিদার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা, মানব কল্যাণে স্বার্থত্যাগী হওয়ার প্রত্যয়ে ধৈর্যশীল ও সংযমী হওয়া আবশ্যক। যারা আল্লাহ তা’আলার ভালোবাসায় পার্থিব বিষয়াদীতে স্বার্থত্যাগী হয়ে মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিবেদন করেন তারাই হৃদয় পরিশোধন করতে পারেন। আত্মশুদ্ধির পথ সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা আরো বলেছেন, “আমি কি তার জন্যে সৃষ্টি করিনি এক জোড়া চোখ- এবং একটি জিহ্বা ও দুটো ঠোট? এবং তাকে দেখাইনি দুটো পথ (ন্যায়-অন্যায়)? তারপরেও সে দুর্গম পথে গেলো না এবং কিসে তোমাকে বোঝাবে দুর্গম পথ কি? সেটা হলো ক্রীতদাসকে মুক্তিদান (অনাথ-গরীবদের সাহায্য করা); অথবা দুর্ভিক্ষের দিনে অন্নদান; নিকটাত্মীয় অনাথকে, অথবা ধুলিলুণ্ঠিত দরিদ্রকে, তখন সে হবে তাদের অন্তর্ভুক্ত যারা বিশ^াস করে যারা পরস্পরকে সহিষ্ণুতার উপদেশ দেয়। তারাই সৌভাগ্যের অধিকারী।” (সূরা বালাদ : ৮-১৮)
তবে কষ্টার্জিত ধন-সম্পদ নিয়ে সমাজের অভাবীদের পাশে দাঁড়ানো এবং সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা অতো সহজ কাজ নয়। কারণ ধন-সম্পদ আগলে রাখার আকাঙ্খা এবং কৃপণতা মানুষকে দান-খয়রাত করা থেকে বিরত রাখে। উদাহরণ স্বরূপ, তাবুক অভিযানে যাওয়া থেকে বিরত থাকার অপরাধ স্বীকার করে তিনজন সাহাবী ক্ষমাপ্রার্থী হয়েছিলেন। তাদের হৃদয়কে পরিশোধন করার জন্য আল্লাহ তা’আলা দান করার আদেশ দিয়ে বলেন, “অন্যেরা তাদের দোষ স্বীকার করেছে। তারা একটি ভালো কাজকে অন্য একটি মন্দ কাজের সাথে মিলিয়ে ফেলেছে। হয়তো আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। তাদের সম্পদ থেকে দাতব্য গ্রহণ কর, যাতে তুমি তা দ্বারা তাদেরকে পবিত্র ও নির্মল করতে পার। তুমি তাদের জন্যে প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই তোমার প্রার্থনা তাদের জন্যে শান্তির কারণ। আল্লাহ সব শোনেন ও সব জানেন।”(সূরা আত-তাওবা : ১০২-১০৩)। মানুষ সচরাচর কঠোর ও দুর্গম পথের চেয়ে আরাম-আয়েশের পথকেই বেশি পছন্দ করে এবং সাধ্যমত ধন-সম্পদ উপার্জন করে ও অর্জিত সম্পদ আগলে রাখতে পছন্দ করে। তাই অধিকাংশ মানবই আত্মশুদ্ধিকে ছাড়াই মারা যায়। মুসলিম উম্মাহও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়। অথচ আত্মশুদ্ধিও সংগ্রামে সাহস যোগাতে অনুপ্রাণিত হতে মুসলিম উম্মাহর সামনে রয়েছে রাসুলের (সঃ) জীবনী এবং সাহাবাদের আদর্শ। রাসূলের (সঃ) সান্নিধ্যে এসে আল-কুর’আনের ঐশীবাণীর সংস্পর্শে তারা জাহেলী যুগের নিষ্ঠুরতা, ঈর্ষা, হিংসা, প্রতিশোধ নেয়ার ঔদ্ধত্যপরায়ণ প্রকৃতি, বংশ মর্যাদা, লোভ-লালসা, ঐশ^র্য, ধন-সম্পদের আকর্ষণ পরিত্যাগ করে হয়েছিলেন ফিরেশতাতুল্য মানব। আল্লাহ তা’আলার প্রদত্ত বিধিনিষেধের কাছে পরিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করে আখেরাতের জীবনকে করেছিলেন তাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য। পার্থিব লোভ-লালসাকে পরিত্যাগ করায় আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টির জন্যে তারা সকল মানব এবং মুসলিম ভাই-বোনের প্রতি হয়েছিলেন বিনয়ী, সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ, উদার। পরস্পরের আখেরাত জীবনকে সুন্দর করার প্রত্যয়ে তারা যে কোন ত্যাগ স্বীকার করতে দ্বিধা করতেন না। দৈন্দিন জীবনে ঘটিত অপ্রত্যাশিত কোন বিষয় তারা হৃদয়ে স্থান না দিয়ে বরং যথাশীঘ্রই মুছে ফেলতেন, যাতে পরিশুদ্ধ হৃদয় নিয়ে আল্লাহ তা’আলার কাছে ফিরে যেতে পারেন। আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, আমরা রাসূলের (সঃ) সাথে বসা ছিলাম এবং তিনি (সঃ) বললেন, তোমাদের কাছে জান্নাতবাসীদের একজন আগমন করছে। তিনি ছিলেন আনসারদের একজন, তার দাড়ি ছিল অযুর পানি দিয়ে ভিজা এবং বাম হাতে তার উভয় জুতা বহন করছিল। এর পরে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দিনও উক্ত ব্যক্তি সম্পর্কে একই কথা রাসূল (সঃ) বললেন। অতঃপর রাসূল (সঃ) যখন চলে যাওয়ার জন্যে উঠে দাড়ালেন তখন আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) লোকটি অনুসরণ করলেন এবং বললেন, আমি আমার বাবার সাথে বির্তক করেছি এবং তিন দিনের জন্য ঘওে প্রবেশ না করার শপথ নিয়েছি। আমি কি তোমার সাথে থাকতে পারি? লোকটি বললো, হ্যাঁ থাকতে পার।
আবদুল্লাহ (রাঃ) তিন রাত থাকলেন কিন্তু রাতের বেলায় তিনি কখনোও তাকে বিশেষভাবে ইবাদত বা প্রার্থনা করতে দেখেনি। তবে যখনই তিনি বিছানায় গিয়েছে তখনই আল্লাহ তা’আলাকে স্মরণ করেছে এবং ঘুমিয়ে বিশ্রাম নেয়ার পর উঠে ফযরে নামাজ আদায় করেছে। আবদূল্লাহ (রাঃ) এই লোকের মুখ থেকে ভালো ছাড়া খারাপ কিছু শুনেনি তবে তার কর্মে ব্যতিক্রম কিছু দেখেনি। আবদুল্লাহ (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর বান্দা! আমি আমার বাবার সাথে বিবাদ করিনি, না আমি তার সাথে সম্পর্ক নষ্ট করেছি। আমি রাসূল (সঃ)-কে তোমার সম্পর্কে তিনবার বলতে শুনছি যে জান্নাতে বসবাসকারীদের একজন তুমি। তাই আমি চিন্তা করলাম, আমি তোমার সাথে থেকে দেখতে চাই তুমি এমন কি কর, যা আমি অনুসরণ করতে পারি। কিন্তু আমি তোমাদের মধ্যে ব্যতিক্রম কোন কিছু দেখলাম না। তবে কেন রাসূল (সঃ) তোমার সম্পর্কে এমন উচ্চ মর্যাদার কথা বললেন? সে লোকটি বললো, “ তুমি আমাকে যেরকম দেখেছ, আমি সেরকমই। অতঃপর আবদুল্লাহ যখন রওয়ানা হলেন, তখন লোকটি বললেন, আমাকে যে রকম দেখেছ, তবে কোন মুসলিম ভাইয়ের প্রতি আমার হৃদয়ে খারাপ ধারণা রাখি না এবং কারো প্রতি ঈর্ষা পোষণ করি না যাদেরকে আল্লাহ তা’আলা আমার চেয়ে বেশি সম্পদশালী করেছেন।” আবদূল্লাহ (রাঃ) বললেন, এটাই তোমার ব্যতিক্রম বৈশিষ্ট্য যা তুমি অর্জন করেছ কিন্তু আমরা করতে পারিনি।”{মুসনাদ ১২২৮৬)। আল্লাহ তা’আলা ও রাসূলের (সঃ) ভালোবাসায় মুসলিম ভাইয়ের কল্যাণে তার হৃদয় ছিল পরিশুদ্ধ ও পবিত্র। আধ্যাত্মিকভাবে মৃত সমাজ আল্লাহ তা’আলার অনুগ্রহে ও রাসূলের (সঃ) সান্নিধ্যে নতুন জীবন লাভ করেছিল। রাসূলের (সঃ) সাথী হিসেবে তারা রাসূলের (সঃ) নেতৃত্বে এবং আনুগত্যে যে স্বর্ণোজ্জল জীবনাদর্শের নিদর্শন রেখে গেছেন তা হবে উম্মাহর হৃদয় পরিশোধনের জন্য অন্যতম উপাদান।
যাহোক, আল-কুর’আনের আলোর পরশের অভাবে তাওহিদে অবিশ্বাসীদের হৃদয় হচ্ছে পুরোপুরি অন্ধকার। অনুরূপ বিশ^াসীরা যখন গর্হিত পাপে জড়িত থাকে, মোনাফেকী আচরণ গ্রহণ করে তখন হৃদয়ের আলো ক্রমশঃ কমতে থাকে, ঈমান হয়ে যায় দূর্বল। ঈর্ষা, হিংসা-প্রতিহিংসা, পরচর্চাসহ যাবতীয় কুপ্রবৃত্তি অন্তরে পোষণ করলেই অন্তর কলুষিত হয়। নিয়মিতভাবে এগুলো লালন করলে হৃদয়ের আলো কালো ছায়ায় ঢাকা পড়ে। আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সঃ) বলেছেন, বান্দা যখন পাপ করে তখন তার হৃদয়ে একটি কালো দাগ পড়ে। যদি সে পাপকে পরিত্যাগ করে. ক্ষমা চায় এবং অনুতপ্ত হয়, তবে তার হৃদয় পরিষ্কার হয়। আর যদি সে পাপে ফিরে যায় এবং নিয়মিতভাবে জড়িত থাকে তখন তার পুরো হৃদয় কালো দাগে আবৃত হয়ে যায়। এটি এমন আবরণ যা আল্লাহ তা’আলা উল্লেখ করেছেন: কখনও না, বরং তারা যা করে (পাপ কর্ম), তাই তাদের হৃদয়ে মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে (সূরা আত-তত্্ফীক)। (আল-তিরমিযী, ৩৩৩৪)। উপরোক্ত বৈশিষ্ট্য ছিল জাহেলী আরবের চারিত্রিক গুণাগুণ। ইসলামের আলোতে এসে তারা হৃদয় পরিশোধন করে শ্রেষ্ঠ মানবে পরিণত হয়েছিলেন। কাজেই নিজ হৃদয়ের অবস্থান সর্ম্পকে সর্তক হওয়া উচিত। অতঃপর রোগ থেকে মুক্তিলাভে আল্লাহ তা’আলার প্রদত্ত বিধানে এবং রাসূলের (সঃ) সুন্নাহর আনুগত্যে ফিরে আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী হলে হৃদয় পরিশোধনের সংগ্রামে আল্লাহ তা’আলা অবশ্যই সাহায্য করবেন।
আইওয়া।