পাক-মার্কিন বিভেদে আমেরিকার লাভ হবে সামান্যই

সালমান রাফি : মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের তার সর্বশেষ আকস্মিক আফগানিস্তান সফরের সময় পাকিস্তানে সন্ত্রাসীদের ‘নিরাপদ আস্তানা থাকার’ এবং দেশটির ‘দুর্বৃত্তায়ননীতি অনুসরণ’ করাসহ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগনামা প্রকাশ করার সময়কার বাস্তবতা হলো এই যে, আফগানিস্তানে কথিত ‘দায়িত্বহীন’ আচরণের জন্য আমেরিকা যখন পাকিস্তানের সমালোচনা করছে, তখন আঞ্চলিক গতিশীলতা দ্রুত বদলে যাওয়ার এবং এর ফলে আমেরিকার অবস্থান নাজুক হওয়ার আলামত ফুটে ওঠতে শুরু করেছে।
আফগানিস্তান এবং চীনের সিল্ক রোডের আশপাশে প্রায় ১০ হাজার আইএস যোদ্ধার উপস্থিতির খবরটি বজ্রপাতের মতোই প্রকাশ পেয়েছে। এর ফলে চীন ও রাশিয়া প্রধান খেলোয়াড়ে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে এবং এর জেরে আফগানিস্তানের যুদ্ধ-গতিশীলতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।
আমেরিকার জন্য এ ধরনের দৃশ্যপট ভয়াবহ ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করবে। ঠিক যেভাবে সিরিয়ায় রাশিয়ার সম্পৃক্ততার ফলে আইএসের পরাজয় এবং প্রধান শক্তি হিসেবে আমেরিকার স্থলাভিষিক্ত ঘটে রাশিয়ার। আফগানিস্তানে রাশিয়া-চীনের সম্পৃক্ততাও সে ধরনের কিছু ঘটিয়ে ফেলতে পারে। সে ক্ষেত্রে ১৭ বছরের দীর্ঘ যুদ্ধটিরই অবসান ঘটাবে না, সেইসাথে আমেরিকাকেই আফগানিস্তানে বাহিরাগত খেলোয়াড়ে পরিণত করে ফেলতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে এবং চীন-রাশিয়ার জোটের দিকে পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান হারে ঝুঁকে পড়ার ফলে পাকিস্তানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ‘হুঁশিয়ারিগুলোর’ পুনরাবৃত্তি বোধগম্যই মনে হয়।
কিন্তু এসব করে কি পাকিস্তানকে তার নীতি থেকে সরে আসতে বাধ্য করতে পারবে আমেরিকা? আফগানিস্তান, চীন ও রাশিয়া যেভাবে আইএসের হুমকিকে বিবেচনা করবে, পাকিস্তান সেভাবেই দেখতে পারে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আমেরিকার সঙ্গে মিত্রতা করবে না পাকিস্তান। তা ছাড়া আমেরিকা ১৭ বছরেও তালেবানকে পরাজিত করতে পারেনি। আবার আফগানিস্তানের নিরাপত্তায় রাশিয়া ও চীনের প্রত্যক্ষ স্বার্থ রয়েছে। ফলে আফগানিস্তানে আইএসের উপস্থিতির ফলে তা সহজেই চীন ও রাশিয়ায় ঢুকে যেতে পারে, তাদের নির্মাণাধীন সিল্ক রোড এবং ইউরেশিয়ান অর্থনৈতিক কানেকটিভিটি প্রকল্পগুলোকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে।
এ কারণেই আশঙ্কা করা হচ্ছে, আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক এই পর্যায়ে পাক-মার্কিন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো অবনতি ঘটবে।
ওয়াশিংটন অতি সম্প্রতি চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের (সিপিইসি) ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছে। অথচ এটি হলো চীনের বৈশ্বিক অবকাঠামো কর্মসূচির সাফল্যের মূল প্রকল্প। বেল্ট অ্যান্ড রোর্ড উদ্যোগের অংশ এই প্রকল্পটি বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির কেন্দ্রে নিয়ে যেতে পারে চীনকে।
আবার ওয়াশিংটনের অভিযোগ, দাবি, হুমকি বা দাবি মেনে নেওয়ার ব্যাপারে পাকিস্তানের আগ্রহ থাকবে বলে সামান্যই মনে হচ্ছে। তবে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা মহলগুলোর মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে, সম্পর্কের অবনতি ঘটলে আমেরিকা আবার পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ভয়ঙ্কর ড্রোন হামলা শুরু করতে পারে এবং এমনকি ২০১১ সালের মে মাসে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করার অভিযানের মতো পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সরাসরি হামলাও চালানো হতে পারে।অতি সম্প্রতি পররাষ্ট্রবিষয়ক সিনেট স্থায়ী কমিটির সদস্যরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, জমাতুদ দাওয়া (জেইউডি) প্রধান হাফিজ সাঈদের বিরুদ্ধে একতরফা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে আমেরিকা। জেইউডির মতো সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পাকিস্তান তার কিছু ভূখ- হারাতে পারে বলে আমেরিকা প্রকাশ্যে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করার পর এই উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। আমেরিকা অভিযোগ করছে, জেইউডি হলো পাকিস্তানের কৌশলগত সম্পদ এবং নির্বাচনী-প্রক্রিয়ায় এনে দলটিকে মূলধারায় শামিল করছে।
ডিসেম্বর মাসের প্রথম দিকে সিআইএ পরিচালক মাইক পম্পেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, পাকিস্তানে ‘সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানা’ নিশ্চিহ্ন করতে আমেরিকা সম্ভব সবকিছুই করবে।
কিন্তু পাকিস্তানের জন্য এসব গ্রুপ সরাসরি হুমকি সৃষ্টি করছে, ফলে তাদেরকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়োজন নেই। পাকিস্তান বিভিন্ন উৎস থেকে জেনেছে, মার্কিন দখলদারিত্বের ছায়াতলেই আফগানিস্তানে আইএস তার উপস্থিতি ঘটিয়েছে। পাকিস্তানের নীতিনির্ধারক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের কাছে সবচেয়ে প্রশ্নবোধ বিষয় হলো আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর নিজস্ব ভূমিকা আসলে কী? পুরো মধ্য এশিয়া, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ইরানকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যেই কি পরিকল্পিতভাবে আইএসের উপস্থিতি ঘটানো হচ্ছে? এবং এর মাধ্যমে সিপিইসি এবং বি আরআইয়ের সাফল্যকে বাধাগ্রস্ত এবং আন্তর্জাতিকব্যবস্থায় মার্কিন আধিপত্য বজায় রাখতে চাচ্ছে আমেরিকা?
ফলে আফগানিস্তানে কেবল যুদ্ধ জয় করাই মার্কিন আমেরিকার টার্গেট নয়, সেইসঙ্গে তার বৈশ্বিক অবস্থান ও প্রাধান্য ধরে রাখাও লক্ষ্য। সম্ভবত এ কারণেই ২০০১ সালে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আগের যেকোনো আমলের চেয়ে ট্রাম্প প্রশাসন পাকিস্তানকে অনেক বেশি হুঁশিয়ারি ও প্রত্যক্ষ হুমকি দিয়েছে।
এসব হুমকির প্রতি পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াও অবশ্য একইভাবে সঙ্ঘাতের গতিশীলতায় ব্যাপক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। সামরিক মুখপাত্র বলেছেন, ‘প্রমাণহীন’ মার্কিন ও আফগান (পাকিস্তানবিরোধী) ভাষ্য সম্প্রতি ‘হুমকির’ সুরে পরিণত হয়েছে এবং আমেরিকা এই অঞ্চলে যে যুদ্ধে লড়ছে এবং যে যুদ্ধ শেষ করার কোনো ইচ্ছা দেশটির নেই, তার মূল্য প্রদান করতে আর ইচ্ছুক নয় পাকিস্তান।
‘আরো কিছু করো’ মন্ত্র প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানের অভ্যন্তরে চাপিয়ে দেওয়া ও আমদানি করা যুদ্ধগুলো’ এবং এর যে মূল্য দিতে হয়েছে, তার ফলে এই বিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে, ‘আমরা যথেষ্ট করেছি এবং আমরা আর কারো জন্য কিছু করতে পারি না।’
পাকিস্তান ও আমেরিকার মধ্যকার ব্যবধান এখানে কেবল স্পষ্টই নয়, বরং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
এ ছাড়াও আরেকটি কারণে এই ব্যবধান ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। তাদের মধ্যে কৌশলগত সংলাপের অনুপস্থিতির কারণেই প্রকৃত অভিযানগত সহযোগিতা সুস্পষ্টভাবে অনুপস্থিত থেকেছে।
অর্থাৎ এই অঞ্চলের কৌশলগত ¯্রােত নিশ্চিতভাবেই বদলে যাচ্ছে এবং পাকিস্তানকে বিপরীত দিকে সাঁতার না কেটে ¯্রােতের অনুকূলেই চলতে আগ্রহী মনে হচ্ছে।

সালমান রাফি : পাকিস্তানের সাংবাদিক