পাছে লোকে কিছু বলে!

অরুণ কুমার বিশ্বাস : কিছুতেই মন ঠিক করতে পারছেন না রশিদুল— বিয়েটা তিনি করবেন কী করবেন না! ওদিকে বয়স ক্রমশ বাড়ছে, নাকি কমছে। এক হিসাবে কমছেই তো! হায়াত যদ্দিন আছে, তার থেকে তো কমছেই। অথচ বৈষয়িক মানুষ ক্রমশ সম্পদের পাহাড় গড়ে, নতুন নতুন স্বপ্নে বিভোর হয়। যেন বয়সের সুতো চায়নিজ নুডলসের মতো ক্রমশ বাড়ছেই। সে যাই হোক, এবেলা রশিদুলের একটা বিয়ে না করলেই নয়। নিন্দুকেরা নানা কথা বলছে। রশিদুলের নাকি চরিত্রের কোনো গাছপাত্থর নেই।
রশিদ অবশ্য মন্দলোকের নিন্দে না শুনে বরং এক ফুত্কারে তা উড়িয়ে দিলেই পারতেন। একা থাকা মানে ঝাড়া হাত-পা। কারো শাসন বারণ শুনতে হয় না। চাই কি নিয়মিত কাজ-কারবার না করলেও আটকায় না কিছু। ব্যাচেলর মানে জরু-ছানাপোনার বালাই নাই। খাও-দাও বগল বাজাও! নিজের মতো জীবন সাজাও। কিন্তু আমাদের রশিদুল তা পারলেন না। পাছে লোকে কিছু বলে, তাই তিনি হন্যে হয়ে কন্যে খুঁজছেন।
ঠিক একই সমস্যা আমাদের প্রিয় হারুদার। বাপ তার জমিদার না হলেও বেশ কিছু জোত-জমি রেখে গেছেন ছেলের জন্য। হারুদা নেকাপড়া জানা মানুষ। কিন্তু চাকরি-বাকরি তার ঠিক পোষায় না। তিনি ইচ্ছেস্বাধীন চলতে চান। হারুদা চাকরি করবেন না ধরেই নিয়েছেন। বাপ যা রেখে গেছেন তা দিয়ে তার বাকি জীবন হেসেখেলে চলে যাবে। কিন্তু নিজের মতে কি হারু অটল থাকতে পারলেন! পারলেন না। ওই যে, পাছে লোকে কিছু বলে! ভাবখানা এমন যেন হারুদা চাকরি না করলে কারো কারো পেটের ভাত ঠিক হজম হয় না। কেন রে বাপ, হারুর চাকরি করা না-করায় তোদের কী এসে যায়!
সব শেষে পলিটিক্যাল স্টান্টবাজির কথায় আসি। আমাদের গগনবাবু নেহাত্ই ভালো মানুষ। তার চোদ্দপুরুষে কেউ রাজনীতি করেনি, তিনি ও বস্তু চেনেন না, বোঝেনও না। তিনি দীর্ঘকাল একটি স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন। শিক্ষক হিসেবে দু’দশ গ্রামের মানুষ তাকে বেশ চেনে, মানেও। এইটেই কারো সহ্য হলো না, ফলে পাছে লোকের দল গগনবাবুর নিস্তরঙ্গ জীবনে রঙ ছড়াতে উঠে পড়ে লাগলো।
একজন বাড়ি বয়ে এসে বলল, স্যার, শুনছি আপনি নাকি পলিটিকসে নামছেন! তা নামুন না, কে বারণ করেছে। অকৃতদার মানুষ আপনি। এতকাল শিক্ষকতা করেছেন, এলাকায় আপনার কত সুনাম। আপনি রাজনীতি করলে দেশের মানুষ একজন যোগ্য নেতা পাবে। দেশে তো এখন আদর্শবান নেতার খুব অভাব— যারা আছে সব ‘তেনা’ কিংবা চামচের দল, ওরা করে খাচ্ছে। শুরুতে গগনবাবু এদের কথায় খুব একটা পাত্তা দেননি। কিন্তু ইউনিয়ন কাউন্সিল নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, গগনের মনটা কেমন যেন উচাটন ঠেকছে। পাছে লোকেদের ভাবখানা এমন যেন স্যার নির্বাচনে দাঁড়ালেই পাশ, তাকে আর বসে পড়তে হবে না। বাকি জীবনটা তিনি আরামসে জনগণের সেবায় বিলিয়ে দিতে পারবেন। তাতে দেশ ও দশের চরম মঙ্গল বই ক্ষতি হবে না।
পাছে লোক লাগলে তারা কী করতে পারে তার উত্কৃষ্ট উদাহরণ আমাদের গগনবাবু। পরের কথায় নেচে তিনি সর্বস্বান্ত হলেন শুধু নয়, শিক্ষক হিসেবে তার মান-সম্মান যেটুকু যা ছিল সব ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেলো। নির্বাচনে তিনি জিতলেন বটে, তবে বছর না ঘুরতেই গম চুরির অভিযোগে বরখাস্ত হন গগনবাবু। না না, গম তিনি খাননি, আর সেটাই তার অপরাধ। তিনি গমটম মারলে, কম করে আদর্শ দেখালে পাছে লোকেদের বেজায় সুবিধা হতো। গগন যেহেতু তা করেননি, সূর্য যখন মধ্যগগনে, তিনি বসে বসে প্রকাশ্য দিবালোকে তারা গুনছেন!
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও রম্যলেখক