পাথর নিয়ে দুঃখগাঁথা

প্রণবকান্তি দেব : পাঠক বন্ধুগণ, ক্যালেন্ডারের ঘরগুলো পেরিয়ে আবার হাজির নতুন একটি সপ্তাহ। ‘সিলেটের চিঠি’ পাঠে আবার আপনাদের স্বাগত। আজ হাজির হয়েছি পাথরের দুঃখগাঁথা নিয়ে।
প্রিয় পাঠক, অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্য্য আর প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ আমাদের প্রিয় জনপদ সিলেট। সিলেটের পাথর গোটা দেশের নির্মাণ শিল্পে রসদ যুগিয়ে আসছে বহুকাল ধরে। সিলেটের জৈন্তা, গোয়াইঘাট, কানাইঘাট, ছাতক প্রভৃতি এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এ পাথর সাম্রাজ্য। উল্লেখযোগ্য পাথর কোয়ারিগুলো হচ্ছে, কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ, শাহ আরেফিন ও উৎমা ছড়া, গোয়াইনঘাটের জাফলং ও বিছানাকান্দি, জৈন্তাপুরের শ্রীপুর ও কানাইঘাটের লোভাছড়া। এসব কোয়ারি থেকে উত্তোলিত পাথর যায় সারাদেশে। ভবন নির্মাণের পাশাপাশি সড়ক ও রেলপথের সংস্কারেও ব্যবহৃত হয় সিলেটের এসব অঞ্চলের পাথর। অন্যদিকে, পাথর উত্তোলন ও পরিবহন ব্যবসার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে লক্ষ লক্ষ মানুষ। তিনটি উপজেলার লক্ষাধিক পরিবারের উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন এই পাথর শিল্পকে ঘিরেই। কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলন, পাথর ভাঙা, নৌকা দিয়ে পরিবহন ইত্যাদি নানা কাজের মাধ্যমে অত্র এলাকার মানুষের দৈনন্দিন খাবার জুটে। অনেকে বংশ পরম্পরায় এ কাজে নিয়োজিত।
কিন্তুসম্প্রতি বদলে গেছে তাদের জীবনের গল্প। বিশেষ করে পাথর উত্তোলন করতে গিয়ে নানা দুর্ঘটনা ও শ্রমিকের মৃত্যু, পর্যটন এলাকার সৌন্দর্য বিনাশ, পরিবেশ বিপর্যয়, লীজ নিয়ে দ্বন্ধ ইত্যাদি কারণে দীর্ঘদিন যাবত বন্ধ রয়েছে পাথর উত্তোলন ও পরিবহন। এসবের সাথে যুক্ত হয়েছে করোনা সংকট। ফলে ব্যবসায়ী ও শ্রমিক উভয় পক্ষই পড়েছেন মারাত্মক বিপাকে। একদিকে, ধার দেনা করে আনা বিনিয়োগকারী ব্যবসায়ীরা, অন্যদিকে নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী পাথর শ্রমিক – কেউই ভালো নেই।
সিলেটের জাফলং এবং বিছানাকান্দি যে কারণে পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ে তার মধ্যে অন্যতম হলো নানা আকারের পাথর। পাথরে আছড়েপড়া জলের ঢেউ দেখতে কিংবা নুড়ি পাথরের উপর দিয়ে হেটে যেতে যেতে সুন্দরের কাছে হারিয়ে যাওয়া – পর্যটকদের কাছে টানে। কিন্তু গত কয়েক বছর যাবত ব্যভিচারে পাথর উত্তোলনের ফলে হুমকির মুখে পড়ে পর্যটন কেন্দ্রগুলোর সৌন্দর্য্য। অপরদিকে, পাথর উত্তোলনের জন্য পরিবেশ বিধ্বংসী ‘বোমা মেশিন’ ব্যবহার, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে পাথর উত্তোলন করতে গিয়ে তিন বছরে ৭৬ জন শ্রমিকের মৃত্যু, সরকারের রাজস্ব ফাঁকি ইত্যাদি সমস্যার ফলে আজকের এ সংকট ঘনীভুত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
এদিকে, এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড়ো পাথর কোয়ারি কানাইঘাটের লোভাছড়ার লীজের মেয়াদ গত ১৩ এপ্রিল উত্তীর্ণ হলেও অদ্যাবধি নতুন লীজের ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ না নেয়ায় সংকট আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে। অনেক ব্যাবসায়ী শুষ্ক মৌসুমে পাথর তুলে রাখলেও আইনী জটিলতার কারণে তা পরিবহন কিংবা বিক্রি করতে পারছেন না। এ ছাড়াও জাফলংয়ের পিয়াইন নদীতে পাহাড়ি ঢলের সাথে নেমে আসা প্রায় এক লাখ ঘনফুট পাথর গত ২৯ জুলাই জব্দ করে সাথে সাথে নিলাম করেন সিলেটের জেলা প্রশাসক কাজী এমদাদুল ইসলাম। একইসাথে পাথর লুট ঠেকাতে লোভাছড়াসহ কোয়ারিগুলোতে টাস্কফোর্সের অভিযান চলছে নিয়মিত। প্রকৃতপক্ষে, এসব নানামুখী সংকট একীভূত হয়ে এখন মারাত্মক অচলাবস্থা চলছে পাথর সাম্রাজ্যে। অন্যদিকে, পাথরের অভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম। সিলেটে সওজ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বিভাগ মিলে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পাথর সংকটে। ফলে উদ্বেগ ছড়িয়েছে ঠিকাদারদের মাঝেও। সিলেটের পাথরের সুনাম দেশজুড়ে থাকায় সিলেটের পাশাপাশি সারাদেশে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সিলেটের পাথর সরবরাহ বন্ধ থাকায়। পুরো বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। এমতাবস্থায় গত ৩০ আগস্ট পাথর কোয়ারি পরিদর্শনে আসেন সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সমন্বয় ও সংস্কার বিষয়ক সচিব মোহাম্মদ কামাল হোসেন। তিনি পাথর শ্রমিক, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ এবং প্রশাসনের সাথে দীর্ঘ বৈঠক করেন এবং বিষয়টির যথাযথ সমাধানের আশ্বাস দেন। ফলে এখন সরকারের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছে জীবন জীবিকার জন্য পাথরের উপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী।
প্রিয় পাঠক, পরিবেশ ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক পাথর নিয়ে এ দুঃখগাঁথার সমাপ্তি হোক- এ প্রত্যাশা রইল।
সবাই ভালো থাকুন। নিত্য শুভ কামনা।