পাবলিক হাউজিংবাসী লাখ লাখ নিউইয়র্কারের দুরবস্থা

কাজী ইবনে শাকুর : বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অনেক বাঙালি নিউইয়র্কের পাবলিক হাউজিংয়ে থাকেন। তাদের পাবলিক হাউজিংয়ের হালহকিকত নিয়ে কোনো রিপোর্ট হয় না। যে পাবলিক হাউজিংগুলো এখন আছে, সেসবের অধিকাংশই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার। তখন থেকে অনেক হাউজিংয়ের কোনো উন্নতি তেমন চোখে পড়ার মতো নয়। আর বছরের পর বছর এসব পাবলিক হাউজিংয়ে ইঁদুর, তেলাপোকা, লিড পেইন্ট ও মোল্ড বা স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে গজিয়ে ওঠা ফাঙাশ বা ছত্রাক নিয়ে বসবাস করে মাসের পর ভাড়াটেকে গুনতে হয় ভাড়ার টাকা। নিউইয়র্ক এখন এ ধরনের পচা বসবাসের স্থান হয়ে গেছে অনেক ক্ষেত্রে।
পাবলিক হাউজিং বলতে বোঝায়, গরিব-মেহনতি মানুষের হাউজিং। আমাদের বাংলাদেশি অনেকেই এসব হাউজিংয়ে বসবাস করেন। নিউইয়র্কে প্রায় ৬ লাখ মানুষ পাবলিক হাউজিংয়ে থাকেন। লিড পয়জনিংয়ের এক কেলেঙ্কারিতে ফেডারেল প্রসিকিউট অনুসন্ধান চালানোর পরও তা কমেনি।
এরপর নিউইয়র্ক সিটি এ বাড়িঘর বানানোর জন্য উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু তার গতি বড়ই সর্পিল। অনেক ক্ষেত্রে নবায়ন করা হলেও তা কার্যকর নয়। নিউইয়র্ক সিটি হাউজিং অথরিটির ফেডারেল মনিটর এ নিয়ে বিশদ রিপোর্ট দিয়েছে, যা প্রকাশিত হয়েছে।
হাউজিং অথরিটি বা নাইচা ছাড়াও যেসব অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় রয়েছে, সেসবেও দেখা যায় বহুদিন কোনো সংস্কারের হাত পড়েনি। সম্প্রতি নাইচার ফেডারেল রিপোর্ট হচ্ছে দুই বছর অনুসন্ধানের পর যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস কর্তৃক নিয়োজিত কোনো মনিটরিং সার্ভিসের প্রথম ব্যাপক অনুসন্ধান। আর এ অনুসন্ধানের ফেডারেল মনিটর বার্ট এম সোয়ার্টজ লিড পেইন্ট এবং ফাঙাশের মতো স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে কাজ করেন। আর এ রিপোর্টের ভিত্তিতে সেটেলমেন্ট যা হয়েছে, তাতে পরবর্তী ১০ বছরে এসব বাসাবাড়ি ঠিক করার জন্য নিউইয়র্ক সিটিকে ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হবে।
এ রিপোর্টে যে অবস্থায় মানুষকে এসব নাইচা অ্যাপার্টমেন্টে থাকতে হয়, তার ডকুমেন্ট করা হয়েছে। বলতে গেলে তাদের থাকতে বাধ্য করা হয়। ইস্ট হারলেমের ওয়াশিংটন হাউজেসে ট্রাস ব্যাগে গার্বেজ এমনভাবে স্ত‚প হয়েছে যে ইঁদুর ১৪ তলা পর্যন্ত উঠে বসবাসকারীদের ভয় দেখাতে পারে। ইঁদুর স্ত‚প বেয়ে ওপরে উঠে যায়।
এনবিসি-৪ নিউইয়র্কের এক প্রতিবেদনে আরো ভয়াবহ চিত্র দেখানো হয়। মেলিসা রুশো রিপোর্ট করেন, জ্যাকি রবিনসন হাউজের ভেতরে এক সামার ক্যাম্প বন্ধ করে দেওয়া হয়, যখন দেখেন যে মরা ইঁদুর রয়েছে। সেখানে যারা ক্যাম্প করছেন ও তাদের পরামর্শকদের দুস্থ করে ফেলেছে। দেখা গেছে, মৃত ইঁদুর ছাদ থেকে তাদের গায়ে পড়েছে। মিস রুশোর রিপোর্টের পর তা পরিষ্কার করার পর ক্যাম্প পুনরায় খোলা হয়।
অনেক বাঙালি, যারা ব্রঙ্কস, কুইন্সের পাবলিক শেল্টার বা পাবলিক হাউজিংয়ে বসবাস করেন, তাদের অনেকেই জানিয়েছেন, তাদের বিল্ডিংয়ে অনেক কম প্লেস। যেমন বাচ্চাদের খেলাধুলার জায়গা কিংবা কমিউনিটি রুম বা ক্যাফেটেরিয়ার অবস্থা শোচনীয়।
ম্যানহাটনে অনেক পুরোনো বাড়ি রয়েছে, যেখানে ভাড়াটিয়াদের তোলার জন্য নবায়ন করা হয় না। যেমন অনেক প্রাইভেট বাড়িও রয়েছে, যেখানে ভাড়া বাড়ানোর জন্য নবায়নের কাজ করা হয় না। পেইন্ট করা হয় না।
পাবলিক হাউজিং রেসিডেন্টের অনেকে বলেছেন, মনিটর যা দেখেছে, তা সর্বৈব সত্য।
ব্রঙ্কসের মরিস হাউসের এক বাসিন্দা বলেন, তিনি ও তার প্রতিবেশী তেলাপোকা, ফাঙাশ বা ছত্রাক এবং ভাঙা এলিভেটর নিয়ে সব সময় ঝগড়া করেন। এসব মৌলিক সমস্যা সমাধানে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। প্রাইভেট ম্যানেজমেন্টের আওতায় এক সরকারি অফিসের কথা জানি, যেখানে এলিভেটর দুটি হলেও প্রায় সময়ই একটি বন্ধ থাকে। সেন্ট্রাল এসির অবস্থাও সুবিধাজনক নয়। রিপোর্টের পরও কোনো কিছুর সমাধান হচ্ছে না।
এমনকি ফেডারেল মনিটরের আগে এক বিচারক বিশেষ মাস্টার নিয়োগ করে মোল্ড বা ফাঙাশের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তা নিয়ে আজও কর্তৃপক্ষ সমস্যায় আছে।
২০১৭ সালে সিটির অনুসন্ধান বিভাগের উদ্ঘাটিত তথ্যে জানা যায়, পাবলিক হাউজিং কর্তৃপক্ষ কর্মকর্তারা লিড পেইন্ট পরিদর্শন করেছে বলে ভুয়া তথ্য দিয়েছে। কিন্তু আসলে তারা তা পরিদর্শন করেনি।
বছরের পর বছর কর্তৃপক্ষ লিড পেইন্টে আক্রান্ত শিশুদের সমস্যা পাশ কাটিয়ে যায়। ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ২ হাজার ৭০ জন শিশু বেশি মাত্রায় লিড পয়জনিংয়ে আক্রান্ত হয় বলে পরীক্ষায় ইতিবাচক রেজাল্ট আসে। মনিটর দেখেন, চলতি ২০১৯ সালে আরো ১৮ জন শিশুর রক্তে উচ্চমাত্রায় লিড পাওয়া গেছে।
এটা এমন নয় যে, হাজার হাজার অ্যাপার্টমেন্ট পরিদর্শনের ক্ষেত্রে এখন ব্যাকলগ হয়েছে। বরং দেখা যায়, যেসব অ্যাপার্টমেন্টে লিড পেইন্টের মাত্রা বেশি, অথচ সেখানে শিশু রয়েছে, এমন অ্যাপার্টমেন্টগুলো শনাক্ত করতে বা পরিদর্শন করতে যে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন, তাও নিশ্চিত হয়নি। দুই বছর পর অনুসন্ধান বিভাগ দেখাচ্ছে যে শত শত শিশু লিড পয়জনে আক্রান্ত। কর্তৃপক্ষের এ নিয়ে কোনো পরিকল্পনা নেই।
এ ব্যর্থতা হতাশাজনক। মেয়র ডি ব্লাজিও এ হাউজিং কর্তৃপক্ষ ব্যাপকভাবে অর্থ দিয়েছে। ২০১৪ অর্থবছরে ব্লুমবার্গের আমলে এ কর্তৃপক্ষ পেয়েছিল মাত্র ১৭ মিলিয়ন ডলার। বর্তমান অর্থবছরে, যা ১ জুলাই থেকে শুরু হয়েছে, সেখানে ডি ব্লাজিও এ হাউজিং কর্তৃপক্ষকে ২৮৮ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিয়েছে।
তারপর ডি ব্লাজিও নির্ধারিত মূল ভ‚মিকা এজেন্সি এখনো পূরণ করেনি। অথবা অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের কয়েক মাস ধরে কাজ করে তা পূরণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ করে।
সিটির পাবলিক হাউজিং অথরিটির একসময়ের প্রধান গ্রেগরি রাসকে এ কাজের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। জুলাই নাগাদ এজেন্সির হেড অব লিড হ্যাজার্ড ইউনিট গঠন করা হয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা বাড়ানো হয় কয়েক হাজার। হাউজিং অথরিটিতে এখন ১১ হাজার ৪৮৪ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। ২০০৩ সালে ছিল ১৫ হাজার ২১৬। রক্ষণাবেক্ষণ কর্মচারী এখন ৯৯০ জন। কয়েক দশক আগে প্রতিটি ভবনের নিজস্ব প্লাম্বার, রিপেয়ারম্যান, এক্সটারমিনেটর ও অন্যান্য রক্ষণাবেক্ষণের কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিল। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে এ খাতে ফেডারেল বিনিয়োগ প্রত্যাহারের পর এবং অব্যবস্থাপনার কারণে এ কাজ কেন্দ্রীভ‚ত হয়। আর তাতে ভাড়াটেদের মাসের পর মাস রিপেয়ারের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এ জন্য কর্তৃপক্ষের ইউনিয়নের সাথে দর-কষাকষি করে মেয়রকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তবে এ ক্ষেত্রে মেয়র তেমন কোনো জরুরি বোধ করছেন না। তিনি বলেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নতুন নেতৃত্ব আসছে। তারা নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়ক হবে। যারা এখন পাবলিক হাউজিংয়ে বসবাস করেন, তাদেরও উচিত কর্তৃপক্ষকে জানানো যে কোন সমস্যা। যাতে তারা চাপের মধ্যে থাকে। বাংলাদেশিরা নিজেদের মধ্যে যত ঝগড়া করেন, কাজের জন্য তত ঝগড়া করেন না।