পাহাড়ি পরিবার পুনর্বাসন ইস্যুতে উত্তপ্ত হচ্ছে পাহাড়

তালিকায় নেই ২৬ হাজার উদ্বাস্তু বাঙালি পরিবার

খাগড়াছড়ি : সরকারি অর্থায়নে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলার প্রায় ৮২ হাজার উপজাতি পরিবারের ৫ লাখ সদস্যকে পুনর্বাসনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে আয়োজিত ‘ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু নির্দিষ্টকরণপূর্বক পুনর্বাসনবিষয়ক টাস্কফোর্স’ এর নবম সভায় এ তালিকার অনুমোদন দেয়া হয়। জানা গেছে, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর উদ্বাস্তু পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে। সভায় পুনর্বাসনের জন্য ভারত থেকে স্বেচ্ছায় প্রত্যাগত ২১ হাজার ৯০০ শরণার্থী পরিবারের তালিকা যাচাই-বাছাইপূর্বক প্রস্তুত করার সিদ্ধান্তও নেয়া হয়।

তবে টাস্কফোর্সের তালিকায় অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু ২৬ হাজার বাঙালি পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বলে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি সংগঠনগুলো দাবি করছে। টাস্কফোর্সের এ সিদ্ধান্তে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে কথিত প্রায় ৮২ হাজার উদ্বাস্তু পরিবার পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে পাহাড় নিয়ে নতুন ষড়যন্ত্র বলে মন্তব্য করেছেন তারা। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে হঠাৎ এই শরণার্থী পুনর্বাসনের তোড়জোড় উপজাতি সংগঠনগুলোর ‘ভোট বাণিজ্যের’ একটি কৌশল বলেই তারা মনে করছেন। পার্বত্য বাঙালি নেতারা নির্বাচনের আগে সীমান্তে নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি টাস্কফোর্স কর্তৃক প্রণয়নকৃত তালিকাটি বাতিল করে নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করে তা যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ২৬ হাজার বাঙালি পরিবারকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণ এবং পাহাড়ে বাঙালিদের ভূমি দখল প্রতিরোধে কার্যকরি পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন।

জানা যায়, ১৯৯৭ সালে সম্পাদিত পার্বত্য শান্তি চুক্তির আলোকে ভারত প্রত্যাগত ১২ হাজার ২২২ শরণার্থী পরিবারকে পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে ২০০৯ সালে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সমাপ্ত ঘোষিত হয়। সর্বশেষ ২১ পরিবারকে খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালার জামতলীতে পুনর্বাসন করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের রিপোর্টেও শান্তি চুক্তির এই ধারা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত বলে দাবি করা হয়েছে। তাই হঠাৎ করে ভারত থেকে ‘স্বেচ্ছায় প্রত্যাগত’ এই ২১ হাজার ৯০০ শরণার্থী পরিবার কোথা থেকে এলো তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন পার্বত্য বাঙালি নেতারা। তারা পুনর্বাসনের নামে সীমান্তের ওপার থেকে এসে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে গোপনে বসবাসকারী লোকজনকে পুনর্বাসন করা হচ্ছে বলে দাবি করছেন। সরকারি এ উদ্যোগ নিয়ে তারা অনেকগুলো প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। যেমন এই বিপুল পরিমাণ লোককে কোথায় পুনর্বাসনের জন্য প্রস্তাব করা হচ্ছে। এখানে বাঙালিদের কবুলিয়ত প্রাপ্ত জমি, সরকারি ও নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ জমি ব্যবহার করা হচ্ছে কি না? শান্তি চুক্তি পরবর্তীকালে ইউপিডিএফ, জেএসএস তাদের অধিপত্য বিস্তারের জন্য বিভিন্ন এলাকায় (সরকারি, খাস, রিজার্ভ ফরেস্ট) যে সমস্ত নতুন বসতি স্থাপন করেছে তাদের এই অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু ক্যাটাগরিতে ফেলে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা পুনর্বাসন করিয়ে নিচ্ছে কিনা? চুক্তি পরবর্তী পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের অত্যাচারে বিভিন্ন সময় যেসব নিরীহ পাহাড়িরা বাস্তুচ্যুত হয়ে অন্যত্র বসতি গড়েছে তাদেরও এই অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের মধ্যে ফেলা হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন বাঙালি নেতারা।

বাঙালি নেতারা অভিযোগ করে বলেন, ১২ হাজার ২২২টি উপজাতীয় পরিবারকে পুনর্বাসনের পর পাহাড়ে ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী উপজাতীয় কোনো উদ্বাস্তু ছিল না। মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামকে উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের কাক্সিক্ষত জুম্মল্যান্ড বানাতে গোপনে পাশের মিয়ানমার ও ভারত থেকে উপজাতীয় পরিবারকে রাতের আঁধারে সীমানা পার করে এনে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু সাজানো হচ্ছে। এর আগেও ১৮টি উপজাতীয় পরিবারকে ভারত থেকে সীমান্ত পার করে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার রামগড় উপজেলার ছোট বেলছড়িতে নিয়ে এসে তাদের জোরপূর্বক বাঙালিদের ভূমিতে ঘর তৈরি করে দিয়ে বাংলাদেশি ভোটার করার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছিল স্থানীয় এক উপজাতীয় ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া সাম্প্রতিককালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা বেশ কিছু বার্মিজ পরিবারকেও পাহাড়ে আশ্রয় দিয়েছে উপজাতীয় নেতারা।

পার্বত্য অধিকার ফোরাম সভাপতি মাঈন উদ্দিন বলেন, নিরাপত্তার জন্য যেস বাঙালিকে তাদের বসতবাড়ি থেকে সরিয়ে গুচ্ছগ্রামে পুনর্বাসন করা হয়েছিল তারা দীর্ঘদিন ধরে সেখানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদেরকে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসাবে বিবেচনা করে সরকারি কবুলিয়ত প্রদত্ত পূর্বের জমিতে ফিরিয়ে আনতে হবে।