পৃথিবীতে এসেছি ভালো কাজ করার জন্য…

সাক্ষাৎকারে অ্যাটর্নি সোমা সায়ীদ

নাশরাত আর্শিয়ানা চৌধুরী : কুইন্স কাউন্টি ওমেন্স বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট, ল’ইয়ার রেফারেল অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস ফর দ্য সার্ভিস ফর দ্য নিউইয়র্ক স্টেট বার অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারপারসন অ্যাটর্নি অ্যাট ল’ সোমা সায়ীদ বলেছেন, আমরা পৃথিবীতে এসেছি কিছু ভালো কাজ করার জন্য। পৃথিবীতে এসে কেবল নিজেকে ও নিজের পরিবার নিয়ে ব্যস্ত থাকলাম কিংবা নিজের স্বার্থটাই দেখলাম, তাহলে হবে না। নিজের পাশাপাশি পরিবার, সমাজ, দেশ ও জনগণের প্রতি আমাদের দায়িত্ব আছে। সেসব দায়িত্ব পালন করতে হবে। পেশায় একজন অ্যাটর্নি হলেও আমি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। পেশাগত কাজের বাইরেও আমি এসব কাজে সময় ব্যয় করে থাকি। দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কমপক্ষে আমাকে ১২-১৪ ঘণ্টা পেশাগত, রাজনৈতিক, সাংগঠনিক ও সামাজিক কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। মনের তাগিদে এবং দায়িত্ববোধ থেকেই কাজ করছি। অ্যাটর্নি সোমা সায়ীদ ঠিকানার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন।
অ্যাটর্নি সোমা সায়ীদ প্রথম মুসলিম ও দক্ষিণ এশিয়ান নারী অ্যাটর্নি, যিনি ৯০ বছরের পুরোনো একটি সংগঠনের প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করে জয়ী হয়েছেন। এটা অন্তত মুসলিম কমিউনিটি, দক্ষিণ এশিয়া তথা বাংলাদেশের কমিউনিটিকে রিপ্রেজেন্ট করেছে। তিনি জানান দিতে পেরেছেন যে আমরাও এগিয়ে আছি।
সোমা সায়ীদ একজন সংগ্রামী নারী। আজ তিনি একজন অ্যাটর্নি, সংগঠক এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। নিজের নামে গড়ে তুলেছেন অ্যাটর্নি সোমা সায়ীদ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস। তিনি কাজ করেন নিজের ফার্মে। সেখানে তার রয়েছেন কয়েকজন সহকারী। এর বাইরেও বিভিন্ন ল’ইয়ার রয়েছেন তার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তিনি সিভিল ও ক্রিমিনাল দুই ধরনের মামলাই পরিচালনা করেন। ১৬ বছর ধরে নিউইয়র্কে আইন পেশায় জড়িত। তিনি কাজ করেন দ্য সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট অব নিউইয়র্ক, দ্য ইস্টার্ন ডিস্ট্রিক্ট অব নিউইয়র্ক, দ্য সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট ব্যাংকক্রাপসি কোর্ট, দ্য ইস্টার্ন ডিস্ট্রিক্ট ব্যাংকক্রাপসি কোর্ট, দ্য ইউএস ট্যাক্স কোর্ট এবং দ্য সেকেন্ড সার্কিট কোর্ট অব আপিলস। আইন পেশার পাশাপাশি নিজ কাজের জন্য একাধিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি।
সোমা সায়ীদ আগামী নির্বাচনে ডিস্ট্রিক্ট-২৪-এ কাউন্সিলম্যান নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এখন তিনি গ্রাউন্ড ওয়ার্ক করছেন। বিভিন্ন মানুষের সাথে মতবিনিময়ও করছেন। আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বিষয়টিও ঘোষণা করবেন।
তিনি একজন সংগ্রামী নারী। তার সফলতার পেছনে রয়েছে অনেক কষ্টের দিনের ইতিহাসও। ১২ বছর বয়সে টাঙ্গাইল থেকে বাবা-মায়ের সাথে পাড়ি জমিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে। এখানে আসার পর পরই স্বপ্ন দেখেন তিনি একজন অ্যাটর্নি হবেন। সেই হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকেন। ভর্তি হন এখানকার মিডল স্কুলে। এরপর জ্যামাইকা হাইস্কুলে। সেখান থেকে হাইস্কুল ডিপ্লোমা করার পর ভর্তি হন কিউনির সিটি কলেজে। সেখানে আরবান লিগ্যাল স্টাডিজ বিষয়ে ব্যাচেলর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। ব্যাচেলর করার পর আলবেনিতে ল’ স্কুলে (The Albaû Lwa School of the Union University) চলে যান। সেখান থেকে জুরিস ডক্টর (জেডি) ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। পড়াকালীন তিনি তার মাকে হারান। মা ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ২০০৩ সালে। ২০০৪ সালে তিনি পাস করেন। ২০০৫ সালে তার বাবাকেও হারান। মা-বাবাকে হারানোর কষ্ট সয়ে নেওয়ার সাথে সাথে মানসিকভাবে নিজেকে শক্ত অবস্থানে ধরে রাখার চেষ্টা করেন। কাজে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু মন বসাতে পারেননি। এরপর গড়ে তোলেন নিজের নামে ল’ ফার্ম। ২০১৩ সালে সেটিকে ইনকরপোরেশনে রূপান্তর করেন। সেখানেই কাজ করে যাচ্ছেন।
সোমা সায়ীদ বলেন, ছোটবেলা থেকেই আমি কম কথা বলতাম। এ জন্য অনেকেই বলত, ও মেয়ে, ও কেন ল’ইয়ার হবে। তা ছাড়া ও তো কথাই বলে না। ল’ইয়ার হলে তো কথা বলা জানতে হবে। আমার বাবা বলতেন, যখন কথা বলার ঠিকই বলবে।
অনেকেই আইনজীবী হতে চায় না। আইনজীবী হতে হলে অনেক কষ্ট করতে হয়, পরিশ্রমী হতে হয়। মনোবল থাকতে হয়। এটি অনেক হার্ড। এ কারণে সবাই পড়তে চায় না। মানুষ ডাক্তার, ফার্মাসিস্ট, ইঞ্জিনিয়ার হতে চাইলেও সহজে অ্যাটর্নি হতে চায় না। বেশির ভাগ পেশায় অফিসে কাজ করে আসার পর বাসায় কাজ করতে হয় না। কিন্তু একজন আইনজীবীকে বাসায়ও কাজ করতে হয়। তাছাড়া অনেক স্ট্রেসের মধ্যে থাকতে হয়। মানুষ নিয়ে কাজ। মানুষের সমস্যার কথা শোনার পর স্টোরি দাঁড় করাতে হয়। কোন আইনে কী আছে সেটা জানতে হয়। এরপর সমাধান বের করতে হয়। সবশেষে যখন একটি কেসে উইন করি, তখন সব কষ্ট দূর হয়ে যায়। তাই এই পেশা অনেক কঠিন হওয়া সত্ত্বেও এর মাধ্যমে মানুষের উপকার করতে পারছি-এটাই সবচেয়ে ভালো লাগে। তিনি বলেন, আমি নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করব ল’ পড়তে। কারণ মেইনস্ট্রিমে যেতে হবে, নিজেদের কথা বলতে হবে, আইন পরিবর্তন করতে হলে আইন জানতে হবে। ল’ইয়ার হলে সুবিধা হবে।
তিনি বলেন, এ পর্যন্ত আসতে পড়াশোনা যেমন করতে হয়েছে, তেমনি অনেক পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করতে হচ্ছে। ল’ স্কুলে অনেক খরচ। টিউশন ফিও বেশি। আমি ৭৫ ভাগ স্কলারশিপ পাওয়ার পরও ২৫ শতাংশ টিউশন ফি আমাকে দিতে হয়েছে। এ জন্য পড়ালেখার পাশাপাশি বিভিন্ন কাজ করতে হয়েছে। ম্যাকডোনাল্ড থেকে শুরু করে ফার্মাসি, ডাক্তার অফিস, ল’ অফিসসহ বিভিন্ন জায়গায় কাজ করেছি। আলবেনিতে একা থেকেছি। ছুটি এবং জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাসায় আসতে পারতাম না।
বর্তমানে কোর্টের কর্মকাণ্ড কীভাবে করছেন জানতে চাইলে অ্যাটর্নি সোমা বলেন, প্যান্ডামিকের কারণে এক মাস সব বন্ধ ছিল। এরপর অনলাইনে কাজ শুরু হয়। এখন সীমিত পরিসরে কোর্ট চালু হয়েছে। অনলাইনেও কাজ করছি। স্কাইপ ইন বিজনেসও ব্যবহার করা হচ্ছে। এটা সাবস্ক্রাইপ করতে হয়। কোর্ট অ্যাপে কোড দিচ্ছে কবে কখন কীভাবে হবে। এখানে ফ্রিডম, মুভমেন্ট অব পিপল, হিউম্যান রাইটসের বিষয়টি বড় ব্যাপার। এ জন্য এর গুরুত্ব অন্য রকম। তাই কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে না। মানুষের সুবিধা এখানে বেশি দেখা হয়।
করোনার কারণে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়াদের মধ্যে যে সংকট তৈরি হয়েছে এ ব্যাপারে কিছু বলবেন কি? তিনি বলেন, যেসব ভাড়াটিয়ার ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য আছে, তাদেরকে ভাড়া দিতে হবে। কারণ কারো ভাড়া মওকুফ হয়নি। আর যাদের ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য নেই, তারা বাড়িওয়ালার সঙ্গে কথা বলে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেবেন। যারা ভাড়া দিতে পারেননি, তাদের জন্য রেন্ট রিলিফ দেওয়া হচ্ছে। ৩১ জুলাই পর্যন্ত আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে। যারা সত্যিকার অর্থেই ভাড়া দিতে পারেননি, তাদের জন্য এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে মধ্যবিত্তদের। তারা না পাচ্ছেন সরকারি সুবিধা, না পাচ্ছেন রেন্ট সুবিধা। মধ্যবিত্ত মানুষদের অনেকেই কষ্টে আছেন। তাদের কষ্টগুলোও দেখা প্রয়োজন।
তিনি আরো বলেন, আগামী ১ অক্টোবর পর্যন্ত নিউইয়র্কে ইভিকশন বন্ধ আছে। ইভিকশন করার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলে এই সেক্টরে অনেক বড় সমস্যা ও সংকট তৈরি হতে পারে। অনেক ইভিকশনের মামলা হবে। এখন কোনো ইভিকশন ও মার্শাল কাউকে উচ্ছেদ করছে না। তিনি বলেন, অনেক বাড়িওয়ালা ফরবিয়ারেন্স পেয়েছেন। আবার ছয় মাস সময়ও পেয়েছেন। ওই সব বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়াদের বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করবেন বলে আশা করছি। প্রাইভেট হাউস ছাড়া বড় বড় অ্যাপার্টমেন্টগুলো ডিজাস্টার লোনসহ বিভিন্ন সুবিধা পেয়েছে। এখন সরকারের কাছ থেকে সবাই সহযোগিতা পাবে, সেই আশায় চুপ করে আছে। কিন্তু যখন সুবিধা পাওয়া বন্ধ হবে, তখন সমস্যা বাড়বে।
কোনো কোনো বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়াদের সাথে খারাপ ব্যবহার করছেন। মানসিক অশান্তি দিচ্ছেন। আইন বলছে, কোনোভাবেই কোনো ভাড়াটিয়াকে হ্যারেজ করা যাবে না। বাড়িওয়ালাদের বুঝতে হবে লাখ লাখ মানুষের চাকরি নেই।
পাবলিক চার্জ রুল নিয়ে অনেক শঙ্কা ও ভয় কাজ করছে, অনেকেই সুবিধা প্রয়োজন হলেও নিচ্ছেন না-এ ব্যাপারে কিছু বলবেন কি? সোমা সায়ীদ বলেন, পাবলিক চার্জ রুলের বিষয়টিতে সবারই সচেতন হওয়া দরকার। কারণ কোনো মানুষ যখন এই দেশে আসেন, তখন তিনি ও তার পরিবারের সদস্যদের ভরণ-পোষণ করবেন, সব ধরনের ব্যয় বহন করবেন। কাজ করবেন, সরকারের ওপর কোনো ধরনের বোঝা হবেন না-সেটাই আশ্বাস দেন। কিন্তু দেখা যায়, এখানে এসে কেউ কেউ কাজ করছেন না। পরিবার ও নিজের জন্য সব ধরনের সুবিধা নিচ্ছেন। সেটা তো ঠিক নয়। তিনি বলেন, আমি বলব নেহাত এবং জরুরি প্রয়োজন না হলে পাবলিক চার্জে বিদ্যমান কোনো সুবিধা কেউ নেবেন না। আবার কেউ কেউ কাজ করার বিষয়টি লুকিয়ে আয় গোপন করে সরকারি সুবিধা নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এটা করা অন্যায়। যিনি ক্যাশ ইনকাম করেন, তিনি তার আয় ঘোষণা দিয়ে যদি সত্যিকার অর্থে কোনো সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হন, তাহলে নেবেন। কিন্তু আয় গোপন করে সরকারি সুবিধা নেওয়া বেআইনি। পরে সমস্যায় পড়তে পারেন।
তিনি বলেন, আগামী দিনে পাবলিক চার্জের সুবিধা যারা গ্রহণ করছেন, তারা স্পনসর দিতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে পারেন। সিটিজেনশিপ নিতে গেলেও এখনকার নিয়ম অনুযায়ী সমস্যায় না পড়লেও আগামীতে নতুন নিয়ম করা হবে না বা সিটিজেনশিপ আবেদনকারীদের বেলায় এটি কার্যকর করা হবে না-এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই যারা সিটিজেন হননি, তাদেরকে সরকারি সুবিধা না নেওয়ার পরামর্শই দেওয়া ঠিক হবে।
আগামী সিটি কাউন্সিলের নির্বাচনে অংশ নেবেন বলে শোনা যাচ্ছ-এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সে রকম পরিকল্পনা আছে। এখন এক্সপ্লোর করছি। সময়মতো ঘোষণা করব। আমি নির্বাচন করার জন্য কেবল করতে চাই না। রান করতে চাই জয়ী হওয়ার জন্য। যারা এর আগে নির্বাচনে রান করেছেন কয়েকজন ছাড়া বেশির ভাগই দেখা গেছে জয়ী হতে পারেননি। আসলে জয়ী হওয়ার জন্য ভোটারদের কাছে বার্তা পৌঁছানো দরকার। তাদেরকে জানানো দরকার। সহযোগিতা করার জন্য সবার এগিয়ে আসা দরকার। সমস্যা হলো ইয়াং জেনারেশন ও ওল্ড জেনারেশনের সঙ্গে আমরা যারা মিডলে আছি, তাদের একটি গ্যাপ আছে। এই গ্যাপটা দূর করতে হবে। কেউ নির্বাচন করলে তাকে পরাজিত করার জন্য আমাদের কমিউনিটির মধ্যে যাতে কোনো গ্রুপ তৈরি না হয়, সেটাও খেয়াল রাখতে হবে। আমরা বাংলাদেশি আমেরিকান কমিউনিটি কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু সময় এসেছে নিজেদের কমিউনিটি থেকে নেতা তৈরি করার। ভালো ও কোয়ালিফাইড ক্যান্ডিডেট দিতে হবে, তাকে সবাইকে সাহায্য করতে হবে। আমি আশা করছি, একজন যোগ্য প্রার্থী হিসেবে সবাই ভোট দিয়ে আমাকে সহযোগিতা করবেন এবং জয়ী হওয়ার জন্য যত রকম সহযোগিতা দরকার সেটি করবেন। মনে রাখতে হবে, কেবল আমাদের কমিউনিটির ভোট হলেই চলবে না, অন্যান্য কমিউনিটির ভোটও প্রয়োজন হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশি কমিউনিটির অনেকে সেনসাসে নাম অন্তর্ভুক্ত করাননি। এটা ঠিক নয়। তাদেরকে স্বপ্রণোদিত হয়ে সেনসাসে নাম অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। না হলে আগামী দিনে অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত হবেন। ২০১০ সালে কুইন্স থেকে অনেক মানুষ চলে গেছেন। এরপর একটি কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট আসন আমরা হারিয়েছি। এবারও সেনসাসে নাম না লেখালে আগামীতে কংগ্রেশনাল আসন হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। এটা হতে দেওয়া ঠিক হবে না। স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, ব্রিজসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা সেনসাসে মানুষের সংখ্যা বিবেচনা করে বাজেট বরাদ্দ করা হয়। সেনসাসে নাম অন্তর্ভুক্ত করার সময় সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এর মধ্যেই সবার নাম লেখানো উচিত।
ইমিগ্রেশন ব্যবস্থায় বিভিন্ন পরিবর্তন আসছে। আগামীতে এর প্রভাব কী হতে পারে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি সোমা সায়ীদ বলেন, ইমিগ্রেশন ব্যবস্থায় প্রতিনিয়ত পরিবর্তন আসছে। আগামীতে আরো অনেক পরিবর্তন আসতে পারে। সেসব পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। তিনি বলেন, যারা গ্রিনকার্ডধারী আছেন, যাদের চার বছর নয় মাস কিংবা ইতিমধ্যে ৫ বছর হয়ে গেছে, তাদের এখনই সিটিজেনশিপের জন্য আবেদন করা প্রয়োজন। কারণ সিটিজেন হলে তার অনেক ধরনের রাইট তৈরি হয়। এছাড়া কেউ যদি তার পরিবারের সদস্যদের আনতে চান, তাদের আবেদনও জমা দেওয়া প্রয়োজন। ভিসা ইস্যু ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্ধ থাকলেও আবেদন গ্রহণ বন্ধ নেই।
গ্রিনকার্ডধারী যেসব ব্যক্তি বাংলাদেশে বিয়ে করেন এবং বাংলাদেশ থেকে বিয়ে করে হাজব্যান্ড কিংবা ওয়াইফকে নিয়ে আসেন তাদের কী ধরনের সমস্যা হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কে কোন দেশে বিয়ে করবেন, সেটা তাদের পার্সোনাল ব্যাপার। সেটা নিয়ে আমার বলার কিছু নেই। কিন্তু গ্রিনকার্ডধারীরা আগামী দিনে স্ত্রী কিংবা স্বামীকে দেশ থেকে আনতে গেলে অনেক বেশি সময় লাগতে পারে। ডিসেম্বর পর্যন্ত ভিসা বন্ধ আছে, এটা কত দিন স্থায়ী হবে সেটা বলা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, একজন গ্রিনকার্ডধারী সিটিজেন হওয়ার পর যদি বিয়ে করেন, তাহলে ভালো হয়। কারণ তিনি তখন কোন দেশে বিয়ে করেন, সেটা দেখা হয় না। তার স্পাউসকে আনতেও কোনো সমস্যা হয় না। গ্রিনকার্ডধারীদের স্পাউসদের আনতে যত সময় লাগে সিটিজেনদের তা লাগে না।
তিনি বলেন, যেহেতু ইমিগ্রেশনে অনেক পরিবর্তন আসছে, তাই নিজে নিজে কেউ আবেদন জমা দেওয়া কিংবা কেস ফাইল না করাই ভালো। অভিজ্ঞ অ্যাটর্নি দিয়ে বুঝেশুনে ফাইল করলে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকবে না। সফলতাও আসবে। তাই যারা বিভিন্ন ধরনের ইমিগ্রেশন রিলেটেড ফাইল করতে চাইছেন, তাদের অ্যাটর্নির মাধ্যমে ফাইল করাই উচিত।
কমালা হ্যারিসকে জো বাইডেন তার রানিংমেট হিসেবে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। একজন নারী প্রার্থী দেওয়ার বিষয়টি কীভাবে দেখছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বছর বেশ কয়েকটি সেক্টরে নারীদের সাফল্য দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে একজন নারীকে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী করা সহজ কথা নয়। এটি হিউজ ডিল। খুবই ভালো উদ্যোগ। আমি এতে হ্যাপি। কমালা হ্যারিসকে জয়ী করতে হলে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে, বিশেষ করে নারীদের। তারা যদি মনে করেন, একজন নারীকে জয়ী করতে হবে, তাহলে আমেরিকার নারীরা তাদের ভোট দেওয়ার মাধ্যমে নতুন একটি ইতিহাস রচনা করতে পারেন। ২০১৬ সালের নির্বাচনে অনেকেই ভোট দিতে যাননি। যে কারণেই নারী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন জয়ী হতে পারেননি। যদিও অন্যান্য কারণও ছিল এর সাথে। তাই সবাইকে ভোট দিতে যেতে হবে। কমালা হ্যারিসের জয়ের সম্ভাবনা আছে। তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন। সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। একজন আইনজ্ঞ মানুষ। তিনি ভালো রাজনীতি বোঝেন। তাকে সবাই মিলে ভোট দিলে জয়ী হবেন।
অনেকের পরিচয়-সংক্রান্ত তথ্য চুরি করে কেউ কেউ আন-এমপ্লয়মেন্ট ফাইল করে সুবিধা নিয়েছেন, এ ব্যাপারে লেবার ডিপার্টমেন্ট ব্যবস্থা নিচ্ছে। কীভাবে কারো পরিচয় চুরি হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেকেই বিভিন্ন ওয়েবসাইটে তাদের নাম, জন্মতারিখ, আইডি নম্বর দেন। সোশ্যাল নম্বর দেন। আবার কেউ কেউ ই-মেইলেও এসব রাখেন। ই-মেইল হ্যাক হতে পারে। অনেকে ক্রেডিট কার্ড যেখানে-সেখানে ও যেকোনো সাইটে ব্যবহার করেন। সেখান থেকেও তথ্য যায়। অনেক সময় বাড়ির মেইল থেকেও চিঠি চুরি হয়। কম্পিউটারে থাকা সব তথ্য চুরি হতে পারে। মোবাইলের তথ্যও চুরি হতে পারে। সেসব তথ্য চুরি করে হ্যাকাররা কাজ করতে পারে। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার পরও কেউ কেউ সেটার অপব্যবহার করতে পারে। বন্ধুদের কিংবা কাছের কেউ তথ্য চুরি করতে পারে। তাই সবাইকে তার ব্যক্তিগত তথ্যের ব্যাপারে সাবধান হতে হবে।
যারা ডব্লিউ-২-তে কাজ করেন, তাদের আন-এমপ্লয়মেন্টে সুবিধা পাওয়া সহজ হয়েছে। যারা সেলফ এমপ্লয়ী তাদের জন্য কষ্টকর ছিল। অনেকেই ক্যাশে কাজ করেন, তাদেরও কষ্ট হয়েছে। কারণ যারা ইনকাম করেন, তাদের সুবিধা পেতে হলে আয় ঘোষণা দিয়ে ট্যাক্স ফাইল করতে হবে। সেলফ এমপ্লয়ী যারা অর্থ আয় করেছেন, তাদেরকে সেটা লেবার ডিপার্টমেন্টে প্রমাণ দিতে হবে। যখন প্রমাণ চাইবে তখন যদি কোনো প্রমাণ দিতে না পারেন, তারা বিপদে পড়তে পারেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি সম্পর্কে সোমা বলেন, আগের চেয়ে অপরাধ কিছুটা বেড়েছে। জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে কী হয়েছে, এটা সবাই দেখেছে। সবকিছু বদলেছে। ক্রিমিনাল জাস্টিস রিফর্ম করার কথা উঠেছে। পুলিশ আট বছরের বাচ্চাকেও গ্রেফতার করেছে। প্যান্ডামিকের কারণে ও বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছু সমস্যা হচ্ছে। এটা বাড়ারও আশঙ্কা রয়েছে। তাই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে এবং ভালো কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, আসলে মানুষ মানুষের জন্য। সব মানুষকে সবারই সম্মান দিতে হবে। চলমান অবস্থা বেশি দিন সাসটেইন্ড করবে না। এটাতে পরিবর্তন আসবে। সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলার জন্য।
নিজের পেশা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের কাজ করার পর পরিবারে কীভাবে সময় দেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেটাতে সমস্যা হয় না, কারণ সবকিছু প্ল্যান অনুযায়ী করি। পরিবারের সঙ্গে সময় সমন্বয় করে নিই। পরিবারের সদস্যরা বুঝতে পারে আমার ব্যস্ততা। আমার হাজব্যান্ডও বুঝতে পারেন। তিনি পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। পাশাপাশি তার ব্যবসাও রয়েছে। তিনিও বোঝেন ও জানেন আমাকে কত ব্যস্ত থাকতে হয়। আমরা চেষ্টা করি দুজন দুজনকে সময় দিতে। বাচ্চাদের সময় দিতে। সব সময় মনে রাখতে হয়, আমি কে, আমার কী কী দায়িত্ব আছে পেশার প্রতি, পরিবারের প্রতি, সমাজের প্রতি, দেশের প্রতি। চেষ্টা করি সবকিছু ভালোভাবে করার। সেই সঙ্গে বাসায় আমার হোম অফিস আছে, সেখান থেকেও কাজ করি।
ছোটবেলার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমার জন্ম টাঙ্গাইলে। সেখানে থাকতাম। আমার আব্বা ছিলেন একজন আইনজীবী। সরকারি চাকরি করতেন। খুব সৎ অফিসার ছিলেন। এ কারণে তার খুব ঘন ঘন বদলি হতো। বদলি হতো বলে আমরা তার সাথে সব জেলায় যেতাম না। টাঙ্গাইলে প্রাইমারি স্কুলে গিয়েছি। ১২ বছর বয়সে এখানে এসে ক্লাস এইটে ভর্তি হই। এরপর হাইস্কুল, কলেজ ও ইউনিভার্সিটি কমপ্লিট করি। ১২ বছর বয়সে ল’ইয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম। সেটাই শেষ পর্যন্ত রূপ দিতে পেরেছি।
ল’ইয়ারই কেন হতে হবে জানতে চাইলে ওই অ্যাটর্নি বলেন, আমি ছোটবেলায় রক্ত ও ইনজেকশন দেখে ভয় পেতাম। এ কারণে ডাক্তার হতে চাইতাম না। গায়িকা হতে চেয়েছিলাম। সেটার জন্য অবশ্য তেমন প্রস্তুতি নিতে পারিনি। তাই ল’ইয়ার হওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আমার বাবার (আফতাব উদ্দীন সায়ীদ) ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল আইন। সেটাও একটি কারণ। মা (আমেনা সায়ীদ) ছিলেন শিক্ষিত নারী। মা বাংলাদেশে দুটি গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। মা ছিলেন একজন ধর্মভীরু, আধুনিকমনা মানুষ। আমরা দুই ভাই দুই বোন। মা চেষ্টা করেছেন সবাইকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার। আমরা সেভাবেই বেড়ে উঠেছি। বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণা, সহযোগিতা সবকিছুই কাজে লাগাতে পেরেছি।
তিনি বলেন, আমার আব্বা ও আম্মা দুজনই বাংলাদেশে ভালো অবস্থানে ছিলেন, তাদের এ দেশে আসার কোনো দরকার ছিল না। কেবল আমাদের জন্য এসেছিলেন। বাবা সরকারি চাকরি ছেড়ে এ দেশে এসে এমবিএ ডিগ্রি নেন, এরপর সিপিএ হন। তিনি বলেন, আমার আব্বা ঠিকানায় দীর্ঘদিন লেখালেখি করেছেন।
সোমা বলেন, ২০০৪ সালে নিউইয়র্ক বারের সদস্য হই। এখন আমি কাজ করছি। আমার ইচ্ছা ছিল নিউইয়র্ক বারের মেম্বার হওয়ার পর মাকে নিয়ে হজে যাব ও বাংলাদেশে যাব। কিন্তু মা মারা যাওয়ার কারণে আর সেটা হয়নি। এটা মনে হলে আফসোস হয়। মনে হয়, কেন আমি এই কাজটি করতে পারলাম না।
নিজের ল’ ফার্মের সফলতার বিষয়ে তিনি বলেন, মা-বাবা মারা যাওয়ার পর যখন কোনো কাজেই মন দিতে পারছিলাম না, তখন ল’ ফার্ম নিজেই করার সিদ্ধান্ত নিই। আস্তে আস্তে এটি সফল ফার্মে পরিণত হয়। আমি আসলে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার আয় করতে চাই না। আমার দর্শন হচ্ছে, এই পৃথিবী ছেড়ে আমাদের চলে যেত হবে, তাই কিছু ভালো কাজ করে যেতে হবে। মানুষের জন্য কাজ করে যেতে হবে। সেই হিসেবে পেশাগত কাজের পাশাপাশি কাজ করে যাচ্ছি। নিজের ও পরিবারের জন্য যতখানি কাজ করা দরকার, সেটি করছি। অফিসে আমার সহকারীরা আছেন, তারা কাজ করেন। সিভিল ও ক্রিমিনাল দুই ধরনের মামলাই করি।
সবশেষে তিনি বলেন, নিউইয়র্কে আমরা প্যান্ডামিকের পর একটি কঠিন সময় পার করছি। সেই বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে আগামী দিনগুলোতে এগোতে হবে। যে যার অবস্থানে আছেন, সেখান থেকে যতখানি সম্ভব সবাই সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আবার একটি সুস্থ, সুন্দর ও স্বাভাবিক পৃথিবী আমরা ফিরে পাব। যারা প্যান্ডামিকে তাদের পরিবারের সদস্যদের হারিয়েছেন, তাদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। যারা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, তাদের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি। সবাইকে বলব মাস্ক ব্যবহার করুন, গ্লাভস পরুন ও সিডিসির নির্দেশনা মেনে চলুন।