পেনসিলভেনিয়ার সিনাগগে বন্দুকধারীর গুলিতে ১১ জন নিহত

দেশজুড়ে উপাসনালয়ে নিরাপত্তা জোরদার

ঠিকানা রিপোর্ট : যুক্তরাষ্ট্রে পিটসবার্গ শহরের এক উপাসনালয়ে হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১১ জনে দাঁড়িয়েছে। হামলাকারীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এটর্নীরা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব ধরনের বিদ্বেষমূলক হামলার বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সিএনএন জানিয়েছে, ৭২ ঘন্টায় যুক্তরাষ্ট্রে তিনটি বিদ্বেষমূলক অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। নিহতদের বয়স ৫৪ বছর থেকে ৯৭ বছরের মধ্যে। এর মধ্যে ৮জন পুরুষ এবং ৩ জন মহিলা রয়েছেন। অন্যদিকে মুসলমানরদের একটি সংগঠন হতাহতদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছে বলে জানিয়েছে আল জাজিরা। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ইহুদিদের উপাসনালয়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। অন্য দিকে হামলাকারীর বিরুদ্ধে ২৯টি অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। এটর্নী জেনারেল তার মৃত্যুদন্ডের সুপারিশ করেছেন।
গত ২৭ অক্টোবর শনিবার সকাল ১০টায় পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের পিটার্সবার্গের স্কয়ার হিলের ‘ট্রি অব লাইফ’ সিনাগগে হামলার এই ঘটনা ঘটে। পুলিশের বরাত দিয়ে বলা হয়, এক ব্যক্তি ভারী অস্ত্র নিয়ে এই হামলা চালিয়েছে। ঘটনার পরপরই সেখানে অভিযান চালায় পুলিশ। প্রতিবেদনে বলা হয়, পুলিশের সঙ্গে ওই বন্দুকধারীর গোলাগুলি হয়েছে। এতে ওই হামলাকারীকে আটক করা সম্ভব হয়েছে। অভিযানের সময় তিন পুলিশ গুলিবিদ্ধ হয়।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম থেকে জানা গেছে, ঘটনার পরপরই ওই এলাকা ঘিরে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। পিটার্সবার্গ পুলিশের মুখপাত্র জেসন লেনডো বলেন, ঘটনাস্থল ও তাঁর আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তল্লাশি চালাচ্ছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১১ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন চার পুলিশসহ ৬ জন।
ঘটনার পরপরই এক টুইট বার্তায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নিচ্ছে। তিনি বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে আইন- শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এটি কোন সন্ত্রাসী হামলা নয়, এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তিনি আরো বলেন, এই ঘটনাটি অবিশ্বাস্য।
হামলাকারীর বিরুদ্ধে ২৯ মামলা : পেনসিলভানিয়ার পিটসবার্গে সিনাগগে হামলার ঘটনায় হামলাকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নাম রবার্ট বাউয়ার্স (৪৬)। একজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষ। ২৭ অক্টোবর শনিবার সকালের ওই ঘটনায় ২০ মিনিটের তা-ব শেষে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে সে। বাওয়ার্সের বিরুদ্ধে সরাসরি গুলি করা ও হত্যার অভিযোগসহ ২৯টি অভিযোগ এনে মামলা করা হয়েছে। এসব অভিযোগে তার মৃত্যুদ- হতে পারে বলে মনে করছেন রাষ্ট্রীয় প্রসিকিউটররা। এ হামলাকে ‘গণহত্যার লক্ষ্যে ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকা-’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ ঘটনায় হামলাকারীর মৃত্যুদ- চান তিনি। শিগগিরই ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যাবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। সেই সঙ্গে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার নির্দেশ দেন তিনি। শনিবার সকালে পিটসবার্গ এলাকার স্কুরেল হিল সংলগ্ন ‘ট্রি অব লাইফ’ সিনাগগে চলছিল শিশুদের নামকরণ অনুষ্ঠান। স্কুরেল হিল পেনসিলভানিয়ার একটি বড় ইহুদি জনবসতিপূর্ণ এলাকা। বিশেষ ওই অনুষ্ঠান উপলক্ষে এদিন বেশ ভিড় ছিল এলাকায়। পুলিশ জানায়, সকাল ৯টা ৫৪ মিনিটে হামলার খবর পান তারা। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর মতে, এর কয়েক মিনিট আগে সিনাগগে প্রবেশ করে বাওয়ার্স। একটি অসল্ট রাইফেল ও তিনটা বন্দুক নিয়ে সরাসরি গুলি চালাতে থাকে সে। ২০ মিনিট ধরে তা-ব চালিয়ে সেখান থেকে বের হয়। ইতিমধ্যে সেখানে উপস্থিত হয় পুলিশ ও বিশেষ সোয়াত বাহিনী। পুলিশের কাছ থেকে পালাতে ফের ভবনের মধ্যে ঢুকে পড়ে সে। গুলি চালায় পুলিশও। পরক্ষণেই সে আত্মসমর্পণ করে। পেনসিলভানিয়া পশ্চিমাঞ্চলের অ্যাটর্নি স্কট ব্রাডি বলেছেন, ‘রবার্ট বাওয়ার্সের কর্মকা-কে মানবতার ইতিহাসে নিকৃষ্টতম অপরাধ গণ্য করা হচ্ছে। ঘটনার তদন্ত ও বিচার নিশ্চিতে আমরা সব ধরনের পন্থা ব্যবহার করব।’ যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল জেফ সেশন্স বলেন, ‘ফেডারেল আইনজীবীরা মৃত্যুদ-ের আবেদন করতে পারেন।’

৭২ ঘন্টায় তিন অপরাধ : গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রে নামকরা রাজনীতিক এবং আরো অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিদের নামে ‘পার্সেল বোমা’ পাঠানোর অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় এক শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীকে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে বর্ণবিদ্বেষী শ্বেতাঙ্গ গোষ্ঠীগুলোর তত্পরতা অনেক বেড়ে গেছে বলে মনে করছে মানবাধিকার এবং নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো। শুক্রবার ৫১ বছর বয়সী গ্রেগারি বুশ নামের এক শ্বেতাঙ্গ কেনটাকি রাজ্যের একটি গির্জায় প্রবেশের চেষ্টা করে। কিন্তু দরজা বন্ধ থাকায় ব্যর্থ হয়ে সে একটি মুদি দোকানে গিয়ে গুলি চালায়। এতে আফ্রিকান-আমেরিকান দুইজন আহত হন যাদের মধ্যে একজন পরে মারা যান। সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামা এবং হিলারির ঠিকানায় পার্সেল বোমা পাঠানো হয়। এরপর আরো কয়েকজন ডেমোক্র্যাটদের কাছে পার্সেল বোমা পাঠানো হয়। মোট ১৪টি বোমা পাঠানো হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পার্সেল বোমা নিয়ে মিডিয়ার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ফায়েদা লুটার অভিযোগ এনেছেন। তিনি বলেছেন, মিডিয়া তার বিরোধী রাজনীতিকদের সুবিধা দিতে পার্সেল বোমা নিয়ে আলোচনার সৃষ্টি করছে। তিনি সমাজে অস্থিরতার তৈরির জন্য মিডিয়ার ভুয়া সংবাদ প্রকাশকে দায়ী করেন।
দেশজুড়ে উপাসনালয়ের স্থানগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার
অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পিটসবার্গ শহরে ধর্মীয় উপাসনালয় সিনাগগে গুলি করে ১১ জনকে হত্যার ঘটনার পর দেশজুড়ে উপাসনালয়ের স্থানগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করেছে কর্তৃপক্ষ। নিউ ইয়র্ক সিটি, লস এঞ্জেলেস, শিকাগোসহ ফিলাডেলফিয়ায় বাড়তি পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া, শনিবারেই দেশজুড়ে সিনাগগ ও ইহুদি সেন্টারগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোতায়েন করেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। নিউ ইয়র্ক, লস এঞ্জেলেস, শিকাগো ও অন্যান্য শহরগুলোর উপাসনালয়ে নতুন কোনো হামলার হুমকি পাওয়া না গেলেও ওই সমস্ত এলাকায় কড়া পাহারায় আছে পুলিশ। নিউ ইয়র্কের উপাসনালয়গুলোতে ভারি অস্ত্রসহ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের পাঠানো হয়েছে। শিকাগোর পুলিশ বিভাগও পরিস্থিতি গভীরভাবে নজরে রাখছে এবং ওই রাজ্যের সব সিনাগগগুলোতে বিশেষভাবে সতর্ক দৃষ্টি রেখেছে। লস এঞ্জেলেসের উপাসনালয়গুলোতেও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করাসহ কড়া পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে। হিউস্টনের হ্যারিস কাউন্টির শেরিফ বলেছেন, সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কর্মকর্তারা গোটা সপ্তাহ জুড়েই সিনাগগগুলোর পরিস্থিতির ওপর গভীরভাবে নজর রাখবে। ফিলাডেলফিয়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে শহরজুড়ে প্রতিটি সিনাগগ ও অন্যান্য উপাসনালয়ে কর্মকর্তাদের পাঠানোসহ পরিস্থিতি নজরে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ বিভাগ। সন্দেহভাজন হামলাকারী ৪৬ বছর বয়সী রবার্ট বাওয়ার্সের শনিবার সকালে পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের পিটসবার্গ শহরের ট্রি অব লাইফ সিনাগগ ভবনের ভেতর প্রার্থনারত ইহুদিদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান ট্রাম্পের
সিনাগগে হামলার ঘটনায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ডেমোক্র্যাটসহ সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এগুলো বিদ্বেষমূলক হামলা। এ বিষয়ে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনি হামলাকারীকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ- দেওয়ার আহবান জানান। তিনি বলেন, যেসব মানুষ নিরাপরাধ মানুষের ওপর এভাবে হামলা চালিয়ে হত্যা করতে পারে তার মৃত্যুদন্ডই হওয়া উচিত। সেই হামলা গির্জা কিংবা মন্দির যেখানেই হোক না কেন। তিনি উপাসনালয়ে সশস্ত্র প্রহরী রাখার আহবান জানান। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পিটসবার্গের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবেন বলে জানান।
জুইস সিনাগগে হামলার প্রতিবাদ জানিয়েছেন মোহাম্মদ এন মজুমদার
বাংলাদেশি আমেরিকান কমিউনিটি, কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট, ব্রঙ্কসের স্থানীয় বোর্ড মেম্বার ও আইনজীবী মোহম্মদ এন মজুমদার এক বিবৃতিতে ২৭ অক্টোবর পিটাসবার্গে জুইস সিনাগগে সন্ত্রাসী হামলার তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।
তিনি বলেন, একটি ধর্ম বিশ্বাসের ওপর হামলার অর্থ হচ্ছে সকলের ওপর হামলা। বাংলাদেশি আমেরিকান কমিউনিটি কাউন্সিল এর জোর প্রতিবাদ জানান এবং এতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অগ্রণী ভূমিকা প্রত্যাশা করেন। প্রেস বিজ্ঞপ্তি।