প্যারোলে মুক্তি পেতে পারেন খালেদা জিয়া

নিজস্ব প্রতিনিধি : আনুষ্ঠানিক সংলাপের আড়ালে অনানুষ্ঠানিকভাবে একান্তে কথাবার্তা চলছে সরকারি দল ও আওয়ামী লীগের মধ্যে। বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে গ্রহণযোগ্য ও সম্মানজনক রাজনৈতিক ফয়সালা চেয়ে আসছিল গোড়া থেকেই। বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তিই এর পথ সুগম করবে বলে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হলেও সরকার এতে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না। উল্টো খালেদা জিয়াকে হঠাৎ করেই হাসপাতাল থেকে জেলে নেওয়া হয়েছে বিএনপির ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য।
বিএনপির নেতৃস্থানীয় সূত্রমতে, তাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত লন্ডনে তারেক-মির্জা ফখরুলের বৈঠকেই হয়। কৌশলগত কারণেই নির্বাচনে প্রস্তুতির পাশাপাশি কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ৮ নভেম্বর তফসিল ঘোষণার পর অহিংস, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পরিকল্পনাও নেওয় হয় সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে। ২০ দলীয় জোটে থাকা ও জোটের বাইরের কোনো শক্তি যাতে পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটানোর সুযোগ না পায়, সেদিকেও প্রখর দৃষ্টি রাখছেন বিএনপির নেতারা। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর জোটভুক্ত একটি ধর্মভিত্তিক দলের প্ররোচনায়, বিভ্রান্তিতে চরম অমানবিক, হিংসাত্মক যেসব কর্মকা- পরিচালিত হয়, তাতে বিএনপির নেতা-কর্মীদের সাধারণভাবে অংশগ্রহণ না থাকলেও সরকারের হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন দলটির কয়েক লাখ নেতা-কর্মী। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এবার মাঠপর্যায় থেকে উচ্চপর্যায়ে পুলিশ প্রশাসন ও সাধারণ প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিচার বিভাগ, শিক্ষাঙ্গনের কিছুসংখ্যক বিশিষ্ট ব্যক্তি তাদের টার্গেট হতে পারেন। নির্বাচনে প্রার্থীরা হবেন তাদের প্রথম টার্গেট। নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা পুরোদমে শুরু হওয়ার পর অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটানোর অপেক্ষায় রয়েছে কুচক্রী মহল। তাদের পেছনে বাইরের একটি শক্তিও থাকতে পারে, যারা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে গোলযোগ সৃষ্টির অব্যাহত প্রয়াস চালিয়ে আসছে। তাদের স্থানীয় প্রধান শক্তি মানুষ হত্যা, মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যাকাণ্ডে, রগ কাটার কাজে দক্ষ দলটি। বিএনপি আন্দোলনের কর্মসূচি দিয়ে মাঠে নামার পর ওদের প্রশিক্ষিত কর্মী বাহিনীকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নিয়োজিত করা হবে। দলীয়ভাবে রাজনীতির ভাষায় বলা হয়েছে, তারা প্রস্তুত রয়েছে। বিএনপির শীর্ষমহল এতে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। তাই সরকারের সঙ্গে কোনো রকম সমঝোতায় এসে নির্বাচনে অংশ নেওয়াই অধিকতর নিরাপদ এবং রাজনৈতিকভাবে লাভজনক বলে মনে করা হচ্ছে। এ ধরনের সংবাদকে সরকারের উচ্চতর মহলও হালকা করে দেখছেন না। বিএনপির কোনো কোনো নেতার সঙ্গে সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের আসনভিত্তিক কথাবার্তাও এগিয়ে আছে। শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় তারা। চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে বন্দী অবস্থায় রেখে বিএনপির নেতা-কর্মীদের নির্বাচনী মাঠে শামিল করার ঝুঁকিও নিতে চান না নির্বাচনমুখী নেতারা। বেগম খালেদা জিয়ার একটা সম্মানজনক গতি করতে সরকারকে তারা প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন। সরকারের উচ্চতর মহলও বিষয়টি নিয়ে ভাবছে বলেই জানা যায়। আইনমন্ত্রী, সিনিয়র নেতা তোফায়েল আহমদ, শেখ ফজলুল করিম, আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিকের সঙ্গে এ নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের কথা হয়েছে। আইনগত সীমাবদ্ধতা এ ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়।
জামিনে মুক্তি পেলেও বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। রাজনৈতিক কর্মকা-ও চালাতে পারবেন না। সর্বোচ্চ আদালত দ- স্থগিত করলে অথবা দণ্ড ভোগের পাঁচ বছর পরই তিনি এ অধিকার ফিরে পাবেন। এ কারণে সরকারি মহল বিষয়টি অপেক্ষাকৃত উদারভাবেই দেখছে। তবে জামিনে মুক্তির বিষয়টি সর্বোচ্চ আদালতের ইচ্ছাধীন। এখানে সরকারের ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে শুধু খালেদা জিয়ার আবেদনের বিরোধিতা না করার মাধ্যমে। আদালতের অনুমোদন সাপেক্ষে সরকার তাকে প্যারোলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজনে মুক্তি দিতে পারে। এ প্রস্তাব সরকারপক্ষ থেকে আগেও দেওয়া হয়েছিল। বেগম খালেদা জিয়া তাতে রাজি হননি। নতুন করে সরকারপক্ষ ও বিএনপির শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতা এ নিয়েই সলাপরামর্শ করছেন। অভিজ্ঞ আইনজ্ঞ ড. কামাল হোসেনও তাদের সহযোগিতা করছেন। নির্বাচনে ভোটের কয়েক দিন আগে কিংবা ভোটের পর তিন মাসের জন্য বেগম খালেদা জিয়াকে প্যারোলো মুক্তি দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরে আরো তিন মাস, প্রয়োজনে আরো বেশি সময়ের জন্য প্যারোল বর্ধিত করা হবে। তবে প্রথম পর্যায়েই তিনি লন্ডন বা দেশের বাইরে কোথাও যাচ্ছেন না। কিছুদিন হাসপাতালে ও পরে গুলশানের বাসায় নেওয়া হতে পারে। যেখানেই থাকুন নির্দিষ্ট কয়েকজন ছাড়া তার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। বিএনপির নির্বাচনে আসা এবং কোনো রকম অস্থিরতা সৃষ্টি না করার শর্তেই সরকার এই নমীয়তা দেখাবে। মূল শর্তই হচ্ছে নির্বাচনে অংশগ্রহণ। তবে সরকারি নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এ চিন্তাও জোরালোভাবে কাজ করছে যে প্যারোলে চিকিৎসার জন্য মুক্তি দেওয়া হলে বিএনপির নেতা-কর্মীরা ঢাকাসহ সারা দেশে যে বিপুল উচ্ছ্বাস, উদ্দীপনাময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করবেন, তার প্রভাব পড়বে নির্বাচনে। যত দূর জানা যায়, খালেদা জিয়া দেশের মানুষ ও নেতা-কর্মীদের রেখে সরকারি ফাঁদে পা দিয়ে দেশের বাইরে যেতে চান না।