প্রজন্মের চোখে

আবু সাঈদ রতন :

মাহিনের ইচ্ছে খুব কাছ থেকে বাংলাদেশকে দেখবে। বড় হয়েছে বিদেশে। যখন সে খুব ছোট, পাঁচ-ছয় বছর, তখনই যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের কথা, ভাষা আন্দোলনের কথা, বাংলা ভাষার কথা, প্রকৃতির কথা, বন্যা, মহামারি, কৃষি ও খেটে খাওয়া মানুষের কথা শুনেছে সে। শুনেছে আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা। এ দেশে বেড়ে ওঠা একজন পরিপূর্ণ যুবক মাহিন। সে যা শুনেছে, তার বাইরে গুগল সার্চ করে জেনেছে অনেক কিছু। মনে অনেক প্রশ্ন জেগেছে তার। কিছু প্রশ্নের উত্তর পেয়েছে আবার কিছু পায়নি। কিছু পেলেও মনঃপূত হয়নি।

যা-ই হোক, এবার কেন জানি মাহিন বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য একটু বেশি আগ্রহী হয়ে উঠল। তারই আগ্রহে সামারের ছুটিতে চলে গেলাম বাংলাদেশে। পিতা-পুত্রের ছুটি ভালোই লাগছিল। মনটাকে হালকা করার জন্য প্রথমেই কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতকেই বেছে নেওয়া হলো। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলায় অবস্থিত একটি সৈকত। ১২০ কিলোমিটার অর্থাৎ ৭৫ মাইল দীর্ঘ এই সৈকত পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত। বিস্তীর্ণ সমুদ্রসৈকত, বিশাল সমুদ্রের ঢেউ, ঢেউয়ের গর্জন-এসব দেখে মাহিন তো অবাক। মহিন বলে, বাবা, কী সুন্দর বাংলাদেশের সমুদ্রসৈকত, সমুদ্র, ঢেউ।

ওর মনে একধরনের মুগ্ধতা দেখা গেল। তারপর একে একে ঘুরে দেখা হলো বান্দরবানের পাহাড়ি জনপদ। দেখেছে সমুদ্র এবং পাহাড় কীভাবে পাশাপাশি অবস্থান করে চলেছে বাংলাদেশে। ঘুরে দেখেছে খুলনার বিশাল সুন্দরবন। দেখেছে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার। হরিণের চপলতা। বাংলার বিশাল সবুজ প্রান্তর। মানুষের আতিথেয়তা। খাল-বিল-নদী। পুকুরের মাছ। ঘরে ঘরে হাঁস-মুরগির লালন-পালন। কৃষকের ধান কাটার দৃশ্য। বাংলার পথে-প্রান্তরে ফল-ফলাদির বৃক্ষ। মাঝে মাঝে বিশাল বটবৃক্ষের নিচে বসে প্রশান্তির নিঃশ্বাস নিয়েছে। এসব দেখতে দেখতে আবার প্রশ্ন করে বসে মাহিন, বাবা, এত দিন কেন তুমি আমাকে বাংলাদেশ দেখতে নিয়ে আসোনি?

কেমন করে বলি তাকে, ব্যস্ততা আমাকে দেয়নি এতটুকু অবসর। শুধু বললাম, দেখতে থাকোÑপদ্মা, মেঘনা, যমুনা নদী। বিলের শাপলা-শালুক, স্বচ্ছ পানিতে ছোট ছোট মাছের পোনার উদ্দীপনা।
এবার তাকে নিয়ে গেলাম ঢাকার অদূরে সাভারের স্মৃতিসৌধ দেখাতে। এবার মাহিন বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল এই স্থাপত্যের সৌন্দর্য দেখে। সেই সঙ্গে অযত্ন, অবহেলা দেখে রাজ্যের বিস্ময় তার চোখেমুখে। আমি বিষয়টি আঁচ করতে পেরে স্মৃতিসৌধ নিয়ে কিছু বলতে শুরু করলাম।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হয়। একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের মাধ্যমে এই যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। এই যুদ্ধে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ শহদি হন। এই স্মৃতিসৌধ বাংলাদেশের জনসাধারণের বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের স্মরণে নিবেদিত এবং মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি জাতির শ্রদ্ধার উজ্জ্বল নিদর্শন। স্মৃতিসৌধটির উচ্চতা ১৫০ ফুট।

আমার কথা থামিয়ে দিয়ে মাহিন জিজ্ঞেস করে, এই স্থাপনার নকশা কি কোনো কিছুর অর্থ প্রকাশ করে?

আমি বললাম, হ্যাঁ, করে। সৌধটি সাত জোড়া ত্রিভুজাকৃতির দেয়াল দিয়ে গঠিত। দেয়ালগুলো ছোট থেকে ক্রমশ বড়ক্রমে সাজানো হয়েছে। এই সাত জোড়া দেয়াল বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাতটি ধারাবাহিক পর্যায়কে নির্দেশ করে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৬’র শাসনতন্ত্র আন্দোলন, ১৯৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬’র ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯’র গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধÑএই সাতটি ঘটনাকে স্বাধীনতা আন্দোলনের পরিক্রমা হিসেবে বিবেচনা করে সৌধটি নির্মাণ করা হয়েছে।
মাহিন বলল, বেশ দারুণ তো।

আমি বললাম, হ্যাঁ বাবা। এই নকশাটি প্রণয়ন করেছেন স্থপতি সৈয়দ মইনুল হোসেন। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ আমাদের বাঙালি জাতির গর্ব।

মাহিন বলল, বাবা, আমি বুঝতে পেরেছি। আমি তথ্যগুলো জেনে নেব। চলো, আজ ঢাকায় ফিরে যাই। ৫২’র ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিনিদর্শন সেই শহীদ মিনারটিও আমি দেখতে চাই।
শেষ বিকেলে ফিরলাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। কিছুক্ষণ পাদদেশে বসে বিশ্রাম নিলাম। বললাম, এটা হলো শহীদ মিনার। বাংলা ভাষার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের স্মৃতির উদ্দেশে এই শহীদ মিনার।
মাহিন বলল, একটু বুঝিয়ে বলবা, বাবা।

আমি বললাম, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে করা মিছিলে কাঁদানে গ্যাস ও গুলি চালানো হয়। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারিতেও প্রতিবাদ মিছিলে গুলি করা হয়। এতে শহীদ হন রফিক, সালাম, জব্বার, বরকত, আউয়াল, শফিউরসহ অনেকে। তাদের এই মহান আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধার প্রতীক কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, যা বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজের কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগ সংলগ্ন) অবস্থিত। এর স্থপতি হলেন বিশিষ্ট শিল্পী হামিদুর রহমান। তবে এই শহীদ মিনারটি কিন্তু সর্বপ্রথম তৈরি হয়নি। বরং ক্রমানুযায়ী বিচার করতে গেলে এটির পূর্বে আরো কয়েকবার নির্মিত হয়েছিল শ্রদ্ধার পরিচায়ক এই স্মৃতিস্তম্ভ।
হঠাৎ মাহিনের প্রশ্ন, বাবা, আমাকে জাতির পিতাকে দেখাবে না, যিনি তাঁর জীবনের ৪৬৮২ দিন জেলে কাটিয়েছেন আন্দোলন করতে গিয়ে।

আমি বললাম, এখন কীভাবে দেখাব, তিনি তো আর বেঁচে নেই।
মাহিন বলল, বাবা, আমি তো সেটা জানি। আমি টুঙ্গিপাড়ায় যাব, ৩২ নম্বর যাব।
আমি কিছুটা লজ্জাই পেয়ে গেলাম তার কথায়। তারপর বললাম, আচ্ছা, ঠিক আছে, তা-ই নিয়ে যাব। পরদিন চলে গেলাম টুঙ্গিপাড়ায়, যেখানে চিরশান্তিতে শুয়ে আছেন আমাদেরই পথপ্রদর্শক, একটি স্বাধীন দেশের স্থপতি, সোনার বাংলার কারিগর, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের নায়ক, যার অঙ্গুলিহেলনে দুলে উঠেছে সারা বাংলা, দুলে উঠেছে সারা বিশ্বের কোটি মানুষের হৃদয়। সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের টুঙ্গিপাড়ায় বেশ কিছু সময় নীরবেই কেটেছে। তারপর মাহিনকে নিয়ে টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর মাজার, জাদুঘরসহ বাড়ির আশপাশে ঘুরে ঘুরে দেখে ঢাকায় ফিরে এলাম।

মাহিন কেমন যেন চুপ হয়ে গেল। হাসি, খুশি, উৎফুল্ল ছেলেটিকে কেন জানি ম্রিয়মাণ মনে হলো। তার চোখের দৃষ্টিও কেমন জানি অন্য রকম হয়ে উঠল। একসময় বলল, বাবা, সাতই মার্চের ভাষণের জায়গাটা দেখব।

আমি বললাম, তুমি কেমন করে এটা জানলে?
মাহিন বলল, গুগল সার্চ করে আমি সব জেনেছি। ভাষণটা অনেকবার শুনেছি বাবা। তবে গুগল সার্চ করলে সত্য-মিথ্যা সবকিছুই আসে। তাই সত্যটা জানতে চাই, দেখতে চাই। গুগল আর ইউটিউবে কি সত্যিকারের পিপাসা মেটে? রেসকোর্স মাঠ এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। মাহিন অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখে।…

একদিন দেশে ফেরার সময় হয়ে এল। সর্বশেষ ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ঠিকানায় চলে গেলাম। যেখানে দেয়ালে রয়েছে অসংখ্য বুলেটের চিহ্ন, রক্তের দাগ। ৩২ নম্বরে গেলে কেন যেন হৃদয়স্পন্দন থেমে যায়। চোখের পাতা অবসন্ন হয়ে ওঠে। মস্তিষ্ক ঠিকমতো কাজ করে না। বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতির সামনে অবনত মস্তিষ্কে তাকিয়ে রইলাম পিতা-পুত্র। কানে যেন অসংখ্য বুলেটের আওয়াজ, বীভৎস চিৎকার, শিশু রাসেলের বুকফাটা কান্না ‘আমি পানি খাব, পানি খাব’, ‘আমি মায়ের কাছে যাব’Ñআরো কত কী! আমার হাতে রাখা পানির বোতলটা মাহিনের হাতে দিয়ে বললাম, এই যে পানি।
মাহিন বলল, আমি তো পানি চাইনি।

মাহিন আমার চোখের দিকে একবার তাকাল। তারপর বলল, এবার ফেরা যাক।
আমিও তার চাহনি দেখে কিছুই বলিনি। গাড়িতে বসে তেমন কোনো কথা হয়নি। শুধু বলল, আমাদের জাতির পিতাকে দেখিনি, তবে মনে হচ্ছে তিনি ছিলেন পাহাড়ের মতোই বিশাল দৃঢ়চেতা, সমুদ্রের মতো হৃদয়ের বিশালতা, স্বচ্ছ পানির মতোই ছিল তার মমতা, রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মতোই ছিল তার সাহসিকতা, হরিণের মতোই ছিল তার চপলতা। এমন একটি মানুষকে ওরা কীভাবে মারতে পারল?
আমি নীরবে তার কথাগুলো শুনলাম। আমি তার দিকে তাকিয়ে দেখলাম। সে একটি টিস্যু পেপার দিয়ে চোখ মুছছে। এটা কি চোখে ধুলোবালির জন্য, নাকি বঙ্গবন্ধুর জন্য এক ফোঁটা ভালোবাসা। যে চোখের পানিতে মিশে আছে বঙ্গবন্ধুর সেই অমর বাণী-
‘এবারের সংগ্রাম-আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’
রক্ত যখন দিয়েছি-রক্ত আরো দিব
এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব-ইনশাল্লাহ…।
পুরো পথে আমিও ভাবছিলাম, এই পশুরা কেমন করে এমন মানুষটির বুকে গুলি চালাতে পারল?…