প্রধানমন্ত্রীর ওয়াশিংটন সফর কতটা গুরুত্বপূর্ণ!

ফাইল ছবি

ঠিকানা রিপোর্ট : বিশ্বব্যাংকের আমন্ত্রণে আগামী ২৮ এপ্রিল শুক্রবার ওয়াশিংটনে আসছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আগামী ১ মে সোমবার ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংকের সদর দপ্তরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন তিনি। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাস বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে এই আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত সম্মানের এবং গুরুত্বপূর্ণ। এই সফর বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে বিশ্ব দরবারে আরো উজ্জ্বল করবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
বিশ্বব্যাংকের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমন এক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসছেন, যখন মাত্র আট মাস পরে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচনে সরকারের সামনে যত চ্যালেঞ্জ রয়েছে তা সরকারের অর্জিত সাফল্য দিয়ে মোকাবেলা করতে হবে। আর এই সাফল্যের পালকে অনেক আগেই যোগ হয়েছে পদ্মা সেতু। এই সেতুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশ্বব্যাংকের নাম।
একসময় পদ্মা সেতু বাংলাদেশের মানুষের কাছে স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্নেই শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছিল বিশ্বব্যাংক। পরে সেই অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। শেখ হাসিনার সরকার নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছে। গোটা বিশ্ব তাঁর সরকারের এই সাফল্য দেখেছে। বিশ্বব্যাংকও তাদের ভুল বুঝতে পেরেছে। আর এ কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান সাড়ম্বরে উদযাপন করতে চায় বিশ্বব্যাংক। এ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিশেষ সম্মাননা জানানো হবে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ২৫ এপ্রিল মঙ্গলবার সরকারি সফরে জাপান যাবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখান থেকে ২৮ এপ্রিল শুক্রবার বিকাল ৩টায় যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে আসবেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর সফর ও অনুষ্ঠানসূচির বিষয়ে এখনো কিছু চূড়ান্ত হয়নি। এ নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
তবে দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, ২৯ এপ্রিল শনিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে আইএমএফ ডেলিগেশনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈঠকে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই বৈঠকে সংস্থাটি বাংলাদেশকে যে ঋণসুবিধা দিয়েছে সে বিষয়ে অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে বলে জানা গেছে।
৩০ এপ্রিল রোববারের কর্মসূচি এখনো জানা যায়নি। তবে ১ মে সোমবার সকাল ১০টায় বিশ্বব্যাংক সদর দপ্তরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি ভাষণ দেবেন বলে জানা গেছে।
২ মে মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ-আমেরিকা বিজনেস কাউন্সিলের অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। এই অনুষ্ঠানে তিনি আমেরিকান ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানাবেন।
৩ মে বুধবার ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন কংগ্রেস সদস্যের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। এদিন বিকালে রিজ কার্লটন হোটেলে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনায় যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই হোটেলেই অবস্থান করবেন বলে জানা গেছে।
৪ মে বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্যের লন্ডনের উদ্দেশ্যে ওয়াশিংটন ডিসি ছেড়ে যাবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সরকারি সফরে সেখানে তিন দিন অবস্থান শেষে দেশে ফেরার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর এই মুহূর্তের সফর রাজনীতিতে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর অর্থায়ন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। অথচ সেই বিশ্বব্যাংক প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষ মর্যাদায় আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
ড. সিদ্দিকুর রহমান আরো জানান, প্রতিবছর জাতিসংঘের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র সফরে আসেন। কিন্তু এবারই প্রথম তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পা রাখছেন বিশ্বব্যাংকের আমন্ত্রণে। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাজনীতির জন্য এই সফর মাইলফলক হয়ে থাকবে।
তিনি জানান, ২৮ এপ্রিল শুক্রবার ওয়াশিংটনের ডালাস এয়ারপোর্টে অবতরণ করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এদিন নিউইয়র্কের জেএফকে এয়ারপোর্টে আগে প্রধানমন্ত্রীকে যেভাবে অভ্যর্থনা জানানো হয়, সেভাবেই জানাবে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ী লীগ। এছাড়া ১ মে সোমবার বিশ্বব্যাংকের অনুষ্ঠানের দিন প্রধান কার্যালয়ের সামনে ‘জয়বাংলা’ সমাবেশ করবে সংগঠনটি।
এখানে উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের গত পাঁচ দশকের সম্পর্ক সবচেয়ে বড় ধাক্কা খায় পদ্মা সেতুর অর্থায়ন নিয়ে। পদ্মা সেতুতে ১২০ কোটি ডলার দেওয়ার কথা ছিল সংস্থাটির। কিন্তু দুর্নীতি হতে পারে, এমন অভিযোগ এনে ২০১১ সালে পদ্মা সেতু প্রকল্পের অর্থায়ন থেকে সরে দাঁড়ায় বিশ্বব্যাংক। এ নিয়ে সংস্থাটির সঙ্গে কয়েক বছর ধরে টানাপোড়েন চলে। তবে বিশ্বব্যাংক এ দেশে তাদের অন্যান্য উন্নয়ন কর্মসূচি অব্যাহত রাখে। এমন প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রে আসছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে অংশীদারিমূলক কর্মসূচি লাখ লাখ বাংলাদেশির জীবনকে উন্নত করেছে। অর্ধশতক সময়ের এই অংশীদারীত্ব উদ্‌যাপন করছে বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাংক।
সদ্য স্বাধীন দেশে ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারা বাংলাদেশ সফরে আসেন। সে সময় তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। ম্যাকনামারার সফরের ছয় মাসের মধ্যেই ১৯৭২ সালের ১৭ আগস্ট বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের ১১৭তম সদস্য হয়।
গত কয়েক দশকে বিশ্বব্যাংক হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ উন্নয়ন সহযোগী। পাঁচ কোটি ডলার সহায়তা দিয়ে দেশের সঙ্গে সংস্থাটির যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে সংস্থাটির ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলার সহায়তাপুষ্ট ৫৭টি প্রকল্প চলমান।