প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফর সফল হোক

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে গত ১৯ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে এসেছেন। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে তিনি বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন। অধিবেশন শুরু হবে আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর। জাতিসংঘের সাধারণ কার্যবিধি অনুযায়ী সাধারণ অধিবেশনে যোগদানকারী সব রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সাধারণ ভাষণ সাত দিনে শেষ হলেও এবার তা চলবে নিরবচ্ছিন্নভাবে নয় দিন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভাষণ দেবেন ২৩ সেপ্টেম্বর। জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সুস্বাগত।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিউইয়র্কে অবস্থানকালে কেবল ভাষণই দেবেন না, অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করবেন। জাতিসংঘের বিভিন্ন কর্মসূচিতে যোগদানের পাশাপাশি অনেক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গেও তার গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, জাতিসংঘের ভাষণদান ও অন্যান্য কর্মসূচির পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের দিক থেকে সর্বাধিক গুরুত্ব পাবে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে নিজ বাড়িঘরে সসম্মানে এবং সম্পূর্ণ নিরাপত্তার নিশ্চয়তাসহ ফিরে যাওয়ার বিষয়টি। এ ছাড়া গুরুত্ব পাবে বর্তমান বিশ্ব সংকট, যেমন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিষয়। এর মধ্যে অন্যতম হবে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে জ্বালানি ও খাদ্য সংকট নিয়ে কথাবার্তা।

বিশ্বজুড়ে বর্তমান সময়ের যে সংকট, মানুষ আশাবাদী জাতিসংঘের চলতি সাধারণ অধিবেশন সমাধানের দুয়ার অনেকটাই খুলে দেবে। কেননা জাতিসংঘের অধিবেশনে সংকটের জন্য যারা দায়ী আর যারা ভুক্তভোগী, তারা উভয়েই অংশ নিচ্ছেন। বিশ্ববাসীও আশায় পথ চেয়ে আছে, আজকের সংকটÑমুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, পণ্যমূল্যের আকাশছোঁয়া দাম বৃদ্ধি, মানববসতির জন্য পরিবেশ বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়াÑএসব সংকটের পূর্ণ সমাধান না হলেও জীবনযাপনের জন্য সহনীয় একটা ব্যবস্থা হবে।
এদিকে শেখ হাসিনার সফর নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিরাও আশান্বিত। বিশ্ব মহামারি করোনার সময় ব্যতীত সব সময় শেখ হাসিনা নিউইয়র্কে এসেছেন জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিতে। তিনি সফরে এলেই যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ বাঙালি কমিউনিটি তার সান্নিধ্য কামনা করে। তবে বিএনপিসহ বিরোধী মতের অনেকে তার সমালোচনায়ও মুখর হয়। তবে অধিকাংশ প্রবাসী এ কথা বিশ্বাস করেন, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, অর্থনৈতিক দূরদর্শিতা ও কূটনীতির কুশলতার ওপর বিশ্ব আস্থা রাখে, যা প্রবাসে-স্বদেশে বাঙালিকে গর্বিত করে।

দেশে উন্নয়নের মেগা মেগা প্রকল্প নিয়ে তা সফলভাবে বাস্তবায়ন করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো বিশাল এক প্রকল্প বাস্তবায়ন করে দেশের কারিগরি, প্রযুক্তিগত ও মানসিক সক্ষমতার যে প্রমাণ তিনি দিয়েছেন, তা বাংলাদেশকে আকাশচুম্বী একটি জায়গা করে দিয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব বলে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস।

এত এত উন্নয়নের পরও প্রবাদতুল্য কিছু কথা থেকে যায়। তা হলো কিছু অপ্রাপ্তি। উন্নয়নের জোয়ারে দেশ ভাসলেও গণতন্ত্রের খরায় দেশ ভুগছেÑএ কথা অনেক বিশেষজ্ঞের অভিমত। অভিজ্ঞজনের অভিমত, গণতন্ত্র বিসর্জন দিয়ে শুধু উন্নয়নের পথে হাঁটা যেমন ভুল, তেমনি উন্নয়নের পথে একেবারে পা না বাড়িয়ে শুধু গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে চিৎকার করাও ভুল। এতে দেশের মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটবে না। আসলে দেশের উন্নয়ন এবং জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন নির্ভর করে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের সুসম সমন্বয়ের ওপর। সেই প্রার্থিত সমন্বয় সাধনেও নেতৃত্বের জায়গাটি শেখ হাসিনার অধীনে। এ জন্য তাকে আরো যত্নশীল হতে হবে বলেই তার শুভকামীদের পরামর্শ। প্রধানমন্ত্রীও নিশ্চয় এ কথা জানেন, উন্নয়নে দেশ অবকাঠামোগতভাবে এগিয়ে গেলেও মানব উন্নয়নের প্রত্যাশিত অর্জন হয় না। এ জন্য গণতন্ত্রের উন্নয়ন আবশ্যক। গণতন্ত্রের উন্নয়নে মানব উন্নয়নের পাশাপাশি সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত হয়। মানুষের নৈতিকতার উন্নয়ন হয়। জবাবদিহি থাকে।

এ তো গেল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় বড় চাওয়া-পাওয়া, বড় বড় স্বপ্ন। প্রবাসীরাও এসব চায়। তারা দেশকে ভালোবাসে। দেশের জন্য সাধ্যমতো তারা করেও দুর্যোগে-দুর্বিপাকে। বাংলাদেশের উন্নয়নের খবরে উল্লসিত হয়, আনন্দিত এবং গর্বিত হয়। বিশ্বে যখন বাংলাদেশ প্রশংসিত হয়, তখন প্রবাসী সব বাঙালিই গর্ব ও অহংকার বোধ করেন।

তবে এ কথাও ঠিক, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখনই জাতিসংঘ বা অন্য কোনো উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্র সফরে আসেন, তখন প্রবাসীরা নিজেদের কমিউনিটির জন্য কিছু প্রাপ্তির কথা ভাবেন। প্রবাসীদের এ কোনো স্বার্থপরতা নয়। নতুন কোনো দাবিও নয়। পুরোনো চাওয়াই নতুন করে বলা। কিছু কিছু চাওয়ার সঙ্গে প্রবাসীদের জীবন-মরণের প্রশ্নও জড়িয়ে আছে। বারবার বলার পরও তার কোনো সমাধান আজ অবধি হয়নি। যেমন দেশে অনাবাসী বাঙালিদের জানমাল ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির নিরাপত্তা। প্রবাসীদের নাড়ির টান ছাড়াও নানা কারণে দেশে যেতে হয়। কিন্তু অনেক প্রবাসীকেই দেশে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয়। কখনো কখনো অনাত্মীয়, কখনো-বা আবার আত্মীয়-বন্ধু-স্বজনদের দ্বারাও তারা লাঞ্ছনা এবং জীবননাশের হুমকির মুখোমুখি হন। আবার কখনো হুমকি আরো ভয়াবহ রূপ নিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত ডেকে আনে। এই জীবননাশের বাইরে সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার ঘটনা তো বেশুমার ঘটে থাকে। সেসব খবর স্থানীয় এবং জাতীয় সংবাদপত্রে প্রায়ই প্রকাশিত হতে দেখা যায়।

প্রবাসীরা বাংলাদেশে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দ্বিতীয় উৎস। পোশাক খাতের পরই ডলার প্রাপ্তির অন্যতম প্রধান উৎস স্বদেশে প্রবাসীদের অর্থ প্রেরণ। রেমিট্যান্স প্রেরণকারীরা যে কত বড় যোদ্ধা, তা অনুধাবন করা যাচ্ছে বর্তমানে ডলার সংকটকালে। তারা আত্মীয়-পরিজনহীন প্রবাস-জীবনে হাড়ভাঙা পরিশ্রমে যে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেন, তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়মিতভাবে দেশে প্রেরণ করেন, যা দেশের অর্থনীতি সবল রাখতে সাহায্য করে। অথচ দেশে হয়রানি ও অসম্মান এবং অশোভন আচরণ তাদের নিত্য প্রাপ্তি। অনেক মন্ত্রী-এমপি পর্যন্ত প্রবাসীদের সম্পর্কে অনাকাক্সিক্ষত মন্তব্য করতে দ্বিধা করেন না।

এর বাইরেও প্রবাসীদের জন্য অনেক হতাশার ঘটনা ঘটে। যেমন উত্তর আমেরিকার মধ্যে নিউইয়র্কে সর্বাধিক বাঙালির বাস। তারা সব সময় আশা করে থাকেন, নিউইয়র্কে বন্ধ হয়ে যাওয়া বিমানের ফ্লাইট পুনরায় চালু হবে। লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে বিমান আবার নিউইয়র্কের মাটি স্পর্শ করবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সব বাঙালিকে হতাশ করে বিমান নামছে কানাডায়। আমরা বুঝতে সক্ষম যে নিউইয়র্কে যদি বিমানের ফ্লাইট লোকসান দিয়ে থাকে, তবে কানাডার রুট কী করে লাভজনক হতে পারে! প্রবাসীরা আরো কিছু ন্যায্য ও যৌক্তিক প্রত্যাশা পূরণের স্বপ্ন দেখে যাচ্ছেন। প্রবাসীদের জন্য জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত কিছু আসনের দাবিও প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের। আরো একটি পুরোনো দাবি প্রবাসীদের, সেটা একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার দাবি। পূর্ণাঙ্গ ব্যাংক হলে শুধু সাধারণ প্রবাসীদেরই উপকার হবে না, ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি ব্যয় পরিশোধ সহজ হবে, যা সরকারের জন্যও লাভজনক হবে। প্রবাসীদের এসব দাবি পূরণ হলে দেশের ও সরকারের প্রতি মানুষের অঙ্গীকার আরো সুদৃঢ় হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাতিসংঘ সফর সফল হোক। নিউইয়র্কে অবস্থান আনন্দময় হোক। তার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।