প্রধানমন্ত্রীর হুংকারে চাঞ্চল্য

বিএনপির ২৭ দফায় তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছে সরকার

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: পিএমও

বিশেষ প্রতিনিধি : দলের প্রধান অবরুদ্ধ, অকার্যকর। ভারপ্রাপ্ত প্রধান সাত সমুদ্দুর তের নদীর ওপারে দেশান্তরী। মহাসচিব কারাবন্দী। স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ মাঠ গরম করার সামর্থ্যবান নেতাদের কেউ জেলে, কেউ পলাতক। তাহলে বিএনপি চালাচ্ছে কে? দলটি কীভাবে দেয় একের পর এক কর্মসূচি? এসব প্রশ্নের মাঝেই দিয়েছে রাষ্ট্র সংস্কারের ২৭ দফার ‘রেইনবো নেশন’ কর্মসূচি, যা প্রকারান্তরে একটি তত্ত্ব এবং নির্বাচনী মেনিফেস্টো।
এর তথ্য তালাশ করতে গিয়ে ক্ষমতাসীনরা শুধু বিব্রতই নয়, চরম ক্ষুব্ধ হয়ে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছে। খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলে ফেলছেন কড়া কথা। তৃতীয় শক্তিকে ক্ষমতায় আনার তৎপরতা চলছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁকে উৎখাত করা এত সোজা নয় বলে কঠিন হুংকারও দিয়েছেন তিনি।
নির্বাচনকালীন দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন, দুই মেয়াদের বেশি রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী না থাকা, উচ্চকক্ষবিশিষ্ট আইনসভাসহ রাষ্ট্র মেরামতে বিএনপির দেওয়া ২৭ দফা রূপরেখার মুসাবিদায় কারা কাজ করেছেন? নোট কোত্থেকে এসেছে? কে কে এর পেছনে সারাক্ষণ লেগে থেকেছেন? -এসব তথ্যের সারসংক্ষেপ এখন প্রধানমন্ত্রীর হাতে। এ উপলক্ষে রাজধানীর বিলাসবহুল হোটেলে আলিশান রেইনবো অনুষ্ঠানের খরচদাতার নামও জানা বাকি নেই প্রধানমন্ত্রীর। এতে তিনি বিএনপির ওপর যতটা না ক্ষুব্ধ, তার চেয়ে বেশি ক্ষিপ্ত ওই সহযোগীদের প্রতি। বিদেশি কয়েকটি দূতাবাস ও কূটনীতিক বিএনপিকে সহযোগিতা দিচ্ছে-দেবে, তা আগেই ওয়াকিবহাল ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। তাদের বাইরে ক্ষমতাসীন দল, সরকার, বিশেষ মহল, আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী ব্যবসায়ীসহ কিছু ব্যক্তির সংযোগ প্রধানমন্ত্রীর ধারণায়ও ছিল না, যা তাকে ভীষণ কষ্ট দিয়েছে। এই কষ্টের তীব্রতা ধরে রাখা বা হজম করার মতো নয়।
রাজনীতির মাঠে দেড় যুগ ধরে নিষ্ক্রিয় বিএনপিকে নেপথ্যে থেকে হঠাৎ এভাবে সামনে এগোবার ছক এঁকে দেওয়া হবে, তা সরকার বা প্রধানমন্ত্রীর ভাবনায় না আসাই স্বাভাবিক। সরকারের সন্দেহ ছিল অন্যদিকে। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাস, নোবেলজয়ী ড. ইউনূস, সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারদের নানাভাবে সন্দেহ করে সরকার তাদের ছায়ার সঙ্গে এক ধরনের যুদ্ধে ব্যস্ত থেকেছে। তাদের শত্রু তালিকাভুক্ত করে নানাভাবে হয়রানিও করেছে। কিন্তু বিএনপির কল্যাণে দূরবর্তী অবস্থান থেকে কাজ করা এই বর্ণচোরা মহলের বিষয়ে ধারণার ছিটেফোঁটাও করেনি সরকার। চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য জানার পরই সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক হুংকার দিয়ে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ঘোষিত বিএনপির ভিশন ২০৩০ আলোকে রাষ্ট্র সংস্কারে ২৭ প্রস্তাবের পরতে পরতে বহু সূক্ষ্ম ও কূটবুদ্ধি লুকানো রয়েছে। আওয়ামী লীগের অভিজ্ঞ নেতাদের মতে, সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন করে সব বিতর্কিত ও অগণতান্ত্রিক সাংবিধানিক সংশোধনী ও পরিবর্তন, বিজয়ী হলে জাতীয় সরকার গঠন, প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন, মিডিয়া কমিশন, অর্থ পাচার ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করে শ্বেতপত্র প্রকাশ, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের তালিকা করে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানো, সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নে নারীদের প্রাধান্য দেওয়া, উচ্চকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা করা, ন্যায়পাল নিয়োগের মতো প্রস্তাবনা বিএনপির থিংকট্যাঙ্ক থেকে আসেনি। এর পেছনে বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী অনেকের প্রেসক্রিপশন রয়েছে। তাদের দিক থেকেই বিএনপির গঠনতন্ত্র সংশোধনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, ঘটা করে নয়, দলটির গতানুগতিক কোনো অনুষ্ঠান থেকে এ-সংক্রান্ত একটি ঘোষণা আসতে পারে।
সরকার বিএনপির রেইনবোকে তাচ্ছিল্য করলেও মোটাদাগে ২৭ প্রস্তাবনা সমর্থন পাচ্ছে মানুষের মধ্যে। অতীতের হানাহানির অবসান করে সামনে সম্প্রীতির দেশ গড়ার ওয়াদাটি সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনার খোরাক দিয়েছে। সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মতামত প্রদানের সুযোগ দিতে দীর্ঘদিন থেকে আলোচিত সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের ওয়াদা এ আলোচনায় আরো মাত্রা দিয়েছে, যা ‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য’ গড়ে তুলতে একটি রাজনৈতিক বন্দোবস্তের পথ দেখাতে পারে। বিএনপির এই ২৭ এর দেখাদেখি আশপাশের দলগুলোতে এখন দফারফার ক্রিয়াকর্ম শুরু হয়েছে। বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনরত অতি বাম, অল্প বাম, বিপ্লবী বাম ১৪ দফা দিয়েছে। জোনায়েদ সাকির গণসংহতি আন্দোলন দিয়েছে ৭ দফা। বামদের এসব দফারফায়ও বিরক্ত প্রধানমন্ত্রী। তারা কেন বিএনপির সঙ্গে ঘোরে- এই ক্ষোভ লুকিয়ে রাখতে পারেননি তিনি।
এদিকে সরকারকে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেওয়ার মতো অবিরাম টোকা দিয়ে চলছেন ঢাকায় নিযুক্ত বিদেশি রাষ্ট্রদূতরা। বিদেশি কিছু গণমাধ্যমও ভিড়েছে এই দলে। তারা বিএনপির সাম্প্রতিক আন্দোলনকে কেবল কাভারেজ নয়, প্রমোট করছে। ভোয়া, বিবিসি, আল-জাজিরা বা পাকিস্তানের ডন তা করলে সরকারের জন্য তা হজমযোগ্য কিন্তু ভারতের সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একই ভূমিকা আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য অসহ্যের। ‘শেখ হাসিনা ভোট চোর’, ‘বাংলাদেশ খাদের কিনারে’ ধরনের মন্তব্যাশ্রয়ী রিপোর্ট করেছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। আর প্রশংসা করছে বিএনপির আন্দোলন ও তাদের ঘোষিত রেইনবোর।
বাংলাদেশের বিরোধী দলের আন্দোলনের খবর কখনো বিশ্ব মিডিয়ায় এভাবে আসেনি। এবার ঢাকায় বিএনপির সম্মেলন, তাদের পার্টি অফিসে পুলিশের তাণ্ডব, নেতাদের গ্রেফতার-কারাবাস-হয়রানি ও ২৭ প্রস্তাবনাকে হাইলাইট করে প্রভাবশালী মিডিয়াগুলোতে ধারাবাহিক প্রতিবেদন হচ্ছে। রয়টার্স, গার্ডিয়ান, জাপানের নিক্কেই, ভারতের হিন্দুস্তান টাইমস পর্যন্ত এ স্রোতে মিশে গেছে। প্রিন্ট ভার্সনের পাশাপাশি টেলিভিশনেও প্রতিবেদন এবং বিশ্লেষণ প্রচার হয়েছে এ নিয়ে। এরাই কিছুদিন আগেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের হেন প্রশংসা নেই, যা না করেছে। সরকারের জন্য গোটা বিষয়টি ভাবনার ও বিরক্তির। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠারও। আবার হজমও করতে হচ্ছে।