প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা: বাংলাদেশের উন্নয়নই যার একমাত্র স্বপ্ন

বিশেষ ক্রোড়পত্রের প্রচ্ছদ

তপন দেবনাথ

দেখতে দেখতে প্রবাস জীবনের প্রায় উনিশটি বছর কেটে গেল। এই উনিশ বছরে একদিনের জন্যও বাংলাদেশকে মনে পড়েনি-এমন দিন হয়তো একটিও কাটেনি। উনিশ বছর আগের বাংলাদেশ এবং আজকের বাংলাদেশের মধ্যে একটি বিরাট পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের বিস্ময়কর উন্নয়ন বিশ্ববাসীকেও অবাক করছে। যুক্তরাষ্ট্রে থাকি, আর যেখানেই থাকি- মন পড়ে থাকে বাংলাদেশ। তাই বাংলাদেশের যে কোনো দুর্যোগ-দুর্বিপাকে মন যেমন ব্যথিত হয়, তেমনি উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের খবর পেলে ও দেশের অগ্রগতি দেখলে মন আনন্দিত হয়।
ভূ-প্রকৃতিগতভাবেই বাংলাদেশ একটি দুর্যোগ প্রবণ এলাকা। তার উপর অল্প শিক্ষা, অশিক্ষা, ধর্মীয় উন্মাদনা, রাজনৈতিক অস্থিরতা উন্নয়নের চাকাকে কখনো স্থবির, কখনো বা একেবারে অচল করে দেয়। এই প্রতিকূল পরিস্থিতির সাথে নিরলস সংগ্রাম করে বাংলাদেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে যিনি নিয়ে গেছেন তাঁর নাম- জননেত্রী শেখ হাসিনা। যে কোনো দুর্যোগে, যে কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে সামান্যতম বিচলিত না হয়ে, মৃত্যুকে তুচ্ছজ্ঞান করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া অসীম সাহসের প্রতীকের নাম- শেখ হাসিনা।
বর্তমানে সময় নিয়ে টানা তিনবার এবং মোট চারবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়ন এবং তার পূর্ববর্তী সরকারের উন্নয়নের একটি তুলনামূলক চিত্র অংকন করলে বর্তমান সরকারের আমলের একটি খতিয়ান পাওয়া যাবে। এ কথা বলছি না, বা বলার এখনো সময় হয়নি যে, বাংলাদেশ সব সমস্যাকে অতিক্রম করে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে গেছে। বাংলাদেশে আর কোনো সমস্যাই বিদ্যমান নেই। তবে এ কথা বলতেই পারি, কীভাবে সমস্যা মোকাবেলা করে ঘুরে দাঁড়াতে হয় বাংলাদেশ তা শিখে গেছে। এই ঘুরে দাঁড়ানোর নেপথ্য কারিগরের নাম শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা দেখিয়েছেন ঝিমিয়ে পড়ার নাম জীবন নয়, ছুটে চলার নামই জীবন। বিশেষ করে বাংলাদেশের নারীর ক্ষমতায়ন আমাকে আল্পুত করে এই দেখে যে, শহুরে নারীদের চেয়েও গ্রামীণ নারীরা এখন বেশি উপার্জন করছেন।

এ কথা কী করে ভুলে যাই যে ১৯ বছর আগে মধ্যরাতে জেগে বসে থাকতাম ভাগ্নে ঢাকাতে কখন টিউশনি করতে যাবে এবং ছাত্রের বাসায় ফোন করে দেশের আত্মীয়-স্বজনের খবর নেবো, আমাদের খবরাখবর দেবো। লাইন সেদিনই পেতাম, যেদিন ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকতো। সে দেশে এখন ১৩/১৪ কোটি লোক মোবাইল, কোটি কোটি লোক ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ফেসবুক, ইমু, ভাইবারের কথা না হয় নাই-ই বললাম। ব্যাংকে টাকা পাঠিয়ে দিন গুণতে হতো- কবে টাকা জমা হবে? আর এখন এখানে ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে বাসায় আসার আগে আত্মীয়দের একাউন্টে টাকা জমা হয়ে যায়! ই-মেইলে ম্যাসেজ আসে টাকা জমা হয়ে গেছে। গ্রাহক ব্যাংক থেকে শর্ট ম্যাসেজ পায় টাকা এসেছে। দিন বদলের পালায় এ এক সুখানুভ‚তি। দেশে শিক্ষার হার বেড়ে ৭১% হয়েছে। এক্ষেত্রে নারী শিক্ষার হার বেড়েছে চোখে পড়ার মতো। দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী, স্পিকার- নারী। শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বই নারীকে অবগুণ্ঠন থেকে বের করে কর্মমুখী করেছে। একটি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে কর্মহীন রেখে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রেসক্রিপশন অমর্ত্য সেনও দিতে পারবেন না।
শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে মাথাপিছু আয় ৭০০ মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ১৬১০ মার্কিন ডলার হয়েছে। জনগণের গড় আয়ু এখন ৭৩ বছর। দারিদ্র্য ৪৪% থেকে কমে ২২ % হয়েছে।
এক দশকের বেশি সময় ধরে একটানা ঢাকা শহরে বসবাসের সময় বিদ্যুতের ভেলকিবাজির কথা বেশ ভালোই মনে আছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ৩২০০ মেগাওয়াট থেকে বেড়ে বর্তানে ১৫,০০০ মেগাওয়াট হয়েছে। দেশে এখন যারা বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন, তারা নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাচ্ছেন বলেই ধরে নেওয়া যায়। যদিও শতভাগ বিদ্যুতের ব্যবস্থা এখনো করা যায়নি। তবে শেখ হাসিনা আরো কয়েক বছর বেঁচে থাকলে এবং ক্ষমতায় থাকতে পারলে দেশব্যাপী শতভাগ বিদ্যুতের ব্যবস্থা অবশ্যই করবেন।
মহানগরীগুলো বিশেষ করে পানীয় জলের জন্য হাড়ি মিছিল এখন অতীতের ব্যাপার। প্রশ্ন হলো- কেন এমন অরাজকতা আগে বিরাজমান ছিল?
সন্ত্রাস দমনে শেখ হাসিনা সরকারের জিরো টলারেন্স জনমনে স্বস্তি এনে দিয়েছে। এ কথার অর্থ এই নয় যে- বাংলাদেশ সন্ত্রাসমুক্ত হয়ে গেছে। অতীতে সন্ত্রাস রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল। দেশের একাংশ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। ভুক্তভোগীরা বিশেষ ভবনের হুকুম ছাড়া থানায় মামলাও দায়ের করতে পারত না। সন্ত্রাস পুরোপুরি দমন হয়নি, তবে সন্ত্রাস করে যে কেউ পার পাবে না, সেটা সন্ত্রাসীরা বেশ ভালোভাবেই বুঝে গেছে।
দেশের এমন কোনো খাত নেই, যেখানে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন আর কোনো স্বপ্ন নয়, বাস্তবতা! চোখের সামনে দৃশ্যমান। প্রমত্তা পদ্মার বুকের উপর দিয়ে বাস চলবে, ট্রেন চলবে- সেটা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। ঢাকা শহরের মধ্যে দিয়ে মেট্রো ট্রেন চলবে, যানযটের নাকাল থেকে নগরবাসী রক্ষা পাবে, নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছবে, যেটা ছিল কল্পনায়। সে কল্পনা এখন বাস্তবের কাছাকাছি চলে এসেছে। মেট্রো রেল ঢাকা শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চললো বলে।

বাংলাদেশ সৃষ্টির পর দেশের সর্ববৃহৎ বাজেটের (এক লক্ষ কোটি টাকা) রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালু হলে দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন হবে।
কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে যে ট্যানেল নির্মিত হবে, চট্টগ্রামবাসী এক শহর থেকে চোখের পলকে অন্য শহরে চলে যাবে- এটা কোনো রূপকথা নয়। এটা এখন বাস্তব। ঢাকা শহরে মাটির নিচ দিয়ে রেল চলাচল করবে- এটা একটু কল্পনাবিলাস মনে হলেও সে ব্যাপারেও কাজ চলছে। বর্তমান সরকারের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে পাতাল রেল প্রকল্প কল্পনায় নয়, বাস্তবে রূপ নেবে। সড়ক, মহাসড়ক, গ্রামীণ জনপদে সর্বত্র উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। বর্ষাকালে গ্রামীণ পথে যেখানে পায়ে হাঁটা কষ্টসাধ্য ছিল, সেখানে এখন যানবাহন চলাচল করছে।
বিদেশে অসংখ্য কর্মসংস্থান বর্তমান সরকারের একটি উল্লেখযোগ্য কাজ। প্রবাসীবান্ধব বর্তমান সরকার প্রবাসীদের পাঠানো টাকার উপর ২% প্রণোদনা দিয়ে যুগান্তকারী কাজ করেছে। পৃথিবীর আর কোনো দেশে প্রবাসীদের পাঠানো টাকার ওপর সরকারি প্রণোদনা দেয়ার কথা আমার জানা নেই।
প্রবাসীরা যে দেশের অর্থনীতির এক বিরাট চালিকা শক্তি, বর্তমান সরকারের চেয়ে বেশি ভালো কেউ তা উপলব্ধি করতে পারেনি।
রাষ্ট্র পরিচালনার মতো পবিত্র ও অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি লেখক হিসাবেও শেখ হাসিনা কম যান না। এ পর্যন্ত তিনি ৩০টি গ্রন্থ রচনা ও সম্পাদনা করেছেন। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামা’ সম্পাদনায় বেশ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন বলেই মনে হয়। তাঁর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্বের নামকরা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে প্রাপ্ত বেশ কয়েকটি পুরস্কার ও সম্মাননা বাংলাদেশের জন্য অনেক মর্যাদা ও সম্মান বয়ে এনেছেন শেখ হাসিনা।
১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় জন্ম নেয়া একজন গ্রামীণ মেয়ে কী করে জননেত্রী থেকে বিশ্বনেত্রীতে পরিণত হলেন- তা এক বিস্ময় বটে! সততা, নিষ্ঠা, প্রজ্ঞা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা সর্বোপরি দেশের মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও নৈতিক দায়বদ্ধতা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে আজকের এই শেখ হাসিনায় উন্নীত করেছে বলে আমি মনে করি। তিনি তাঁর নিজেকে ছাড়িয়ে গেছেন অনেক আগেই। আজ বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে জ্যেষ্ঠ মেয়ের দেশ পরিচালনায় নৈপুণ্য দেখে হয়তো বলতেন- ‘হাসু, তুই তো আমারেও ছাড়াইয়া গেলিরে মা’।
কথাসাহিত্যিক, লস এঞ্জেলেস।