প্রবাসী বঞ্চনার শেষ কোথায়, তারা কি কেবল দিয়েই যাবে?

ঘরছাড়া যারা হন, তারা সারা জীবনই ঘরের জন্য মনের মধ্যে মায়া পুষে রাখেন। চোখের পানিতে বুক ভাসান সেই ভিটের জন্য। কিন্তু যারা ভিটেছাড়া করেন, তাদের মনে কি আশ্রয় ছেড়ে যাওয়া স্বজনের জন্য সে রকম মায়া হয়? মায়া যেটুকু হয়, তার মধ্যে কতটা মায়াকান্না থাকে, আর কতটা প্রকৃত দরদ থাকে, তা-ও ভাবার বিষয়।

দেশের এমন কোনো সংকট, এমন কোনো দুর্যোগ নেই, যখন প্রবাসীরা দেশের মানুষের সেই বিপৎকালে সাহায্যের হাত না বাড়িয়ে চুপচাপ বসে থেকেছেন। ব্যক্তিগতভাবে বা সম্মিলিতভাবে সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে প্রবাসীরা দেশের স্বজনদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
দেশ নিয়ে প্রবাসীদের অনেক অভিযোগ। দেশে প্রবাসীরা সকল সময়ে অবহেলার শিকার। গুরুত্বহীন। প্রবাসী যারা দেশ ছেড়েছেন, দেশের প্রতি তাদের টান, ভালোবাসা সব সময়ই আছে।

যে কারণে দেশ ছেড়ে তারা প্রবাসী হয়েছেন, সে কারণে তাদের নিজেদের চেয়ে দেশই যে বেশি উপকারভোগী হয়েছে, এই বাস্তবতাটা কেউ স্বীকার করতে চায় না। দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস আজ প্রবাসীরা। সেই সঙ্গে দেশে রেখে আসা মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজনও দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাচ্ছে। তা থেকেও উপকৃত হচ্ছে দেশ। এই প্রবাসী হতে গিয়ে কত দুর্ভোগ! দালাল চক্রের, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কত রকম প্রতারণা। কত শত দুর্ভোগ। জীবনও হারাতে হয় কত মানুষকে। দেশে কর্মসংস্থান করতে না পেরেই যে এত দুর্ভোগ সয়ে জীবন বিপন্ন করে প্রবাসজীবন, তা দেশের অনেকেই বুঝতে চায় না।

এত সংকট, এত দুঃখ-কষ্ট, জ্বালা-যন্ত্রণা নিরসনে কোনো কর্তৃপক্ষকেই প্রবাসীদের পাশে এসে আন্তরিকভাবে দাঁড়াতে দেখা যায় না। উল্টো মায়াকান্নাই বরাদ্দ হয় প্রবাসীদের জন্য। দেশে-প্রবাসে জনপ্রিয় সংবাদপত্র ঠিকানাসহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রবাসীদের প্রতি এই মায়াকান্না, অবহেলা, প্রতারণা, জীবন সংশয়ের বিষয় বারবার উঠে এসেছে।

কিন্তু প্রতিকার পায়নি প্রবাসীরা। প্রবাসী হয়ে ভাগ্য বদলাতে এসে যেমন অনেকে প্রাণ দিয়েছেন, দেশকে ভালোবেসে, দেশ ও স্বজনদের টানে দেশে বেড়াতে গিয়েও অনেক প্রবাসী প্রাণ হারিয়েছেন দেশের দুর্বৃত্ত-ঘাতকদের হাতে। বিচার মেলেনি। ঠিকানার গত ৪ জানুয়ারি অর্থাৎ ২০২৩ সালের প্রথম সংখ্যাতেও প্রধান সংবাদ হয়ে উঠে এসেছে প্রবাসীদের দুর্ভোগের কথা। শিরোনাম : ‘প্রবাসীদের জন্য মায়াকান্না’। আরো কয়েকটি সহ-শিরোনাম ছোট করে পাশে দেওয়া হয়েছে : * ‘তদন্তের নামে ঝুলে থাকে দ্বৈত নাগরিকত্বের আবেদন’ * ‘সহজে মেলে না জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্মসনদ’ * ‘স্বার্থরক্ষায় আইন নেই, আছে খড়্গ ও হয়রানি’ এবং ‘দেশে বিনিয়োগ করে ফেঁসে গেছেন বহু প্রবাসী’।

প্রবাসীদের পক্ষে এ কোনো বায়বীয় অভিযোগ নয়। কঠিন কঠোর বাস্তবতা। চোখে দেখা যায়, অবকাঠামোগত হয়তো অনেক কিছুই করা হয়েছে প্রবাসীদের কল্যাণের লক্ষ্যে। কিন্তু বাস্তবে সেসব অবকাঠামো প্রবাসীদের কল্যাণে কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রবাসীদের মধ্যে অনেক প্রশ্ন। প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে সে কথা স্পষ্ট। দীর্ঘ প্রতিবেদন। তার ছত্রে ছত্রে প্রবাসীদের দুর্ভোগ ও বঞ্চনার কথা। অসম্মান আর অবহেলার কথা। প্রবাসীদের হয়রানি লাঘবে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় আছে। মন্ত্রণালয়ে একজন মন্ত্রী, একজন সচিব আছেন। দেশের সব কটি জেলা অর্থাৎ ৬৪টি জেলাতেই রয়েছে ওয়েজ আর্নার কল্যাণ বোর্ড। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকও আছে দেশে। অনেক কিছুই করা হয়েছে প্রবাসীদের কল্যাণ সাধনে। কিন্তু সব সেই প্রবাদের মতো : ‘কাজীর গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই!’ আছে কেবল মায়াকান্না।

একটি কথা বাস্তবতার খাতিরে বলতেই হয়, দীর্ঘ ৫১ বছর হয়েছে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। ঢের এই সময়ের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাংলাদেশি আছেন এক কোটির ঊর্ধ্বে। নানা লক্ষ্যে তারা অনাবাসী হয়েছেন। কেউ ভাগ্য বদলাতে অদক্ষ, কেউ দক্ষ শ্রমিক হয়ে বিদেশে এসেছেন। এদের অধিকাংশই মধ্যপ্রাচ্যে। কেউ এসেছেন ইঞ্জিনিয়ার, চিকিৎসক হয়ে। কেউ পড়াশোনা করতে শিক্ষার্থী হয়ে। যারা রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশে অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন। তাদের গালভরা কথায় ডাকা হয় ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ বলে।

বাস্তবে সেই যোদ্ধাদের দেশে অবহেলা সীমাহীন। বিদেশে গিয়ে দেশের নাগরিকত্ব হারাচ্ছেন প্রবাসীরা। এ নিয়ে তাদের বুকে সীমাহীন রক্তক্ষরণ। দ্বৈত নাগরিকত্ব লাভের সুযোগ থাকলেও তদন্তের নামে তা ঝুলে থাকে বছরের পর বছর। আবার অনেকে যারা বিদেশে গিয়েও নাগরিকত্ব নেননি, তারা বঞ্চিত হচ্ছেন জাতীয় পরিচয়পত্র থেকে, পাচ্ছেন না জন্মসনদ। অথচ জাতীয় পরিচয় ব্যতীত কোনো কাজই করা যায় না। এসব পাওয়ার জন্য প্রবাসীরা দ্বারে দ্বারে ঘুরে হয়রান হয়ে যাচ্ছেন। প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, যে সরকারই ক্ষমতায় আসে, তারা নিজেদের প্রবাসী-বান্ধব দাবি করলেও দেশে প্রবাসীদের স্বার্থবিরোধী আইন জিইয়ে রাখছেন। প্রবাসীদের সম্পত্তি বেদখল হয়ে যাচ্ছে, তার কোনো প্রতিকার নেই। সম্পত্তি দখলের মামলাগুলো সব ঝুলে থাকছে, নিষ্পত্তি হচ্ছে না।

এদিকে প্রবাসীদের জন্য দ্বৈত নাগরিকত্ব লাভের বিষয়টি অনেক সহজ করা যেত। তা না করে আরো জটিল করা হয়েছে কৌশলে। কোনো প্রবাসীর দ্বৈত নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে তিনটি গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত প্রতিবেদন লাগবে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, যিনি মাতৃভূমিতে জন্ম নিয়েছেন, তিনি নাগরিকত্ব কেন হারাবেন? দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে কেউ লিপ্ত থাকলে এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে সে ক্ষেত্রে ভিন্ন আইন করা যেতে পারে। যিনি বিদেশি নাগরিকত্ব নিচ্ছেন, তার পাসপোর্টেই কিন্তু জন্মস্থান হিসেবে বাংলাদেশ লেখা থাকে। তা সত্ত্বেও তিনি জন্মভূমির পরিচয় হারাচ্ছেন। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকার নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করলেও তা মোটেও সহজ হয়নি। সেখানে যে ২৮টি ধারা রয়েছে, তা মোটেও প্রবাসী-বান্ধব নয়। রাষ্ট্রপতি পদের নির্বাচনসহ প্রবাসীরা বিভিন্ন নির্বাচন এবং সরকারি কোনো কাজে নিয়োগ লাভ করতে পারবেন না।

দেখা যাচ্ছে, একজন প্রবাসীকে নানাভাবে আটকানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দেশের নাগরিকত্ব কেউ পুনরায় গ্রহণ করতে চাইলে, আইনের খসড়ায় বলা আছে, ‘সরকার তা বিবেচনা করতে পারবে’। কিন্তু সেই প্রহর আর ফুরোয় না। এ ক্ষেত্রে উপর মহলে যাদের যোগাযোগ আছে, তারা সৌভাগ্যবান, খুব তাড়াতাড়িই দ্বৈত নাগরিকত্ব পেয়ে যাচ্ছেন। তবে অধিকাংশ প্রবাসীর আবেদনই বছরের পর বছর ঝুলে থাকছে তদন্তের নামে। পৈতৃক সম্পত্তির ন্যায্য অংশ থেকেও অনেকে বঞ্চিত হচ্ছেন জাতীয় সনদপত্র না থাকায়। এ ক্ষেত্রে স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর প্রতারণার শিকার এবং দালালদের দৌরাত্ম্য থেকে কারো যেন মুক্তি নেই।

সবাই বলেন, প্রবাসীদের অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। শেষ পর্যন্ত বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার আর লোক পাওয়া যায় না। প্রবাসীরা দেশে গেলে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তাঝুঁকি দেখা দেয় ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনদের দিক থেকে। তারা সহায়-সম্পত্তির কোনো ব্যবস্থা না করতে পারলেই আত্মীয়-স্বজনের লাভ। তারা সেই সব সম্পত্তি নিজেরা ভোগদখল করতে পারে। দেশে প্রবাসীদের বিনিয়োগ করার বিষয়টিও একই রকম। অনেক প্রবাসীরই এ বিষয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। অনেকে পালিয়ে এসে জীবন বাঁচাতে পেরেছেন, সেটাই তাদের সৌভাগ্য।

বিষয়গুলো যে কারো জানা নেই তা যেমন বলা যাবে না, তেমনি সমাধানযোগ্য নয়, তেমনও নয়। অভাব কেবল আন্তরিকতায়। জটিলতা মন ও মননে। মস্তিষ্ক থেকে জটিলতা সরিয়ে দিতে পারলেই অনেক কিছু সহজ হয়ে যায়। যদি সত্যি সত্যি প্রবাসীদের কল্যাণ সাধন সরকারের লক্ষ্য হয়ে থাকে, তবে অনেকেই মনে করেন, এক-দুই সপ্তাহের মধ্যেই তা সম্ভব। নইলে দুর্ভোগ শুধু প্রবাসীদেরই হবে না, তার চেয়ে বেশি সংকট নেমে আসবে সরকারের জন্যই।