প্রবাসী ভাবনা : অন্তরে বাংলাদেশ

শুভ্রেন্দু শেখর ভট্টাচার্য : যত দূর মনে পড়ে সেই ১৯৬২ সালে সূচনা। যুক্তরাজ্যে তখন প্রচুর শ্রমিকের চাহিদা। ভুক্ত দেশ থেকে চাহিদা পূরণ করতে হবে। সিলেট স্টেডিয়ামে চার আনা দামে খড়হফড়হ যাওয়ার ভড়ৎস বিক্রি হচ্ছে। চার দিকে সাজসাজ রব। লন্ডন যাওয়ার হিড়িক বিশেষত কৃষি শ্রমিকদের মধ্যে। পুরো আড়ম্বরের নির্যাস একটি গানে প্রকাশ পেল। গানটি বাতাসে আপনা আপনি ভাসত।
‘আইলরে লন্ডনের জ্বর/ঘরবাড়ি সব বিক্রি কর,/তাড়াতাড়ি পাসপোর্ট কর/দিন তো বইয়া যায়রে।’ সেই যে শুরু হলো দেশান্তর হওয়া কালক্রমে এই প্রবাহ আরও বহু মাত্রায় বৃদ্ধি পেল। অবশ্য সেই ব্রিটিশ আমলেও আমাদের দেশ থেকে জাহাজের খালাসি হয়ে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা ছিল। সময়ের বিবর্তনে এই প্রবণতা শুধু শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রইল না। শ্রমিক, শিক্ষিত-অশিক্ষিত ইত্যাদি সকল শ্রেণিপেশা নির্বিশেষে মানুষ এখন বিদেশ যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর। দেশের বেকারত্ব ,দারিদ্র্য, অতি দ্রুত সম্পদশালী হওয়ার বাসনা এবং সর্বোপরি প্রজন্ম অন্তর একটি স্বচ্ছন্দ, নিরাপদ, জীবনের সব ইচ্ছাপূরণের প্রত্যাশাও দেশান্তর হওয়ার বাসনাতে প্রণোদনা যুগিয়েছে। এই ইচ্ছা কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে বিদেশে পাড়ি দিতে গিয়ে অনেক বঙ্গ সন্তানের সলিল সমাধিও হয়েছে। যাই হোক, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে বিদেশ যাত্রা তো সম্পন্ন হলো। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের আশাতীত সংস্থান হলো। জীবনের সব বৈষয়িক প্রত্যাশা পূরণ হলো। কিন্তু তারপর আমার পর্যবেক্ষণে কিছু পরিচিতজনকে দেখেছি দেশে থাকতে শিক্ষাজীবন অথবা কর্মজীবনে তারা আপন মহিমায় মহিমান্বিত। রাজনীতিবিমুখ, পারিপার্শ্বিক বিষয়ে নির্লিপ্ত, আপন ভুবনেই তাদের বেশি স্বচ্ছন্দ মনে হতো। কালক্রমে তারাও একটা সুন্দর জীবনের স্বপ্নে, কেউবা উচ্চ শিক্ষার্থে অথবা অন্য কোন কারণে কাল¯্রােতে দেশান্তর হয়েছেন। তারা এখন প্রবাসী। প্রজন্মসহ তারা এখন শিকড় গেড়েছেন জীবনের ইপ্সিত সব প্রাপ্তির মধ্যে। অস্তিত্বের দৃঢ় ভিত্তি প্রতিষ্ঠার দৃপ্ত প্রত্যয়ে তাদের আপন মেধার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটছে একটা অনুকূল পরিবেশে। মানুষ বিপুল অবদান রাখছেন বসবাসরত দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ইত্যাদির উন্নয়ন ক্ষেত্রে। এমনকি প্রবাসের রাজনীতির মূলধারায়ও তাদের অনেকে নিজের আসন পাকাপোক্ত করেছেন। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভা-ারও ফুলে ফেঁপে স্ফীত হচ্ছে বিদেশে তাদের ঘাম ঝরা পরিশ্রমের ফসল হিসেবে।
কিন্তু বিদেশের জল, হাওয়া, মেশিনের সাথে খাপ-খাওয়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা সত্তে¦ও তারা কিন্তু নাড়ির টান ছেদ করতে পারেননি। এত কর্মযজ্ঞের মধ্যে মনোনিবেশ করেও মাঝে মধ্যে তারা আনমনা হয়ে যান। দেশের জন্য মন আনচান করে
সময় সুযোগে ছুটে আসেন তারা দেশে, ছায়া সুনিবিড় নিজ আলয়ে। পরিচিত পরিবেশে মিশে যেতে তাদের কত ব্যাকুলতা। পুকুরঘাটে ¯œান করেন, বড়শি দিয়ে মাছ ধরেন, গ্রামের হাটে যান, পুরনো ইয়ার, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেন হাটে, ঘাটেও মাঠে। সবই চিরপরিচিত পরিবেশের সঙ্গে মিশে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা। অতীতকে ফিরে পাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা। এরপরও পিয়াসী মন আরও যেন কিছু খুঁজে বেড়ায়। একটা শূন্যতাবোধ, নিজেকে সেই অতি পরিচিত পরিবেশে বিলীন করে দেয়া যায় না। দেশকালের পরিক্রমায় কোথায় যেন একটা মধুর হয়ে গেছে। এভাবেই সময় কাটে। ফেরার সময় হয়ে যায়। মনে কিছুটা শূন্যতা নিয়েই ফিরতে হয় সুখের দেশে অতৃপ্ত শান্তিকে পেছনে ফেলে শান্তির দেশ ছেড়ে।
প্রসঙ্গক্রমে আবার এই প্রবাসীদের পরের প্রজন্মের যারা বাপ-দাদার দেশ দেখতে আসেন। তাদের অনেকের মধ্যে আচার-আচরণে এই চিত্রকল্পের কিছুটা ব্যতিক্রমও লক্ষ্য করা যায়। দেশে আসার পর তারা কোন পাঁচ তারা হোটেলে অবস্থান করেন। এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলে যাওয়ার পথে হয়ত বনানীতে জ্যামে আটকালেন। এই অবস্থায় প্রথমে তাদের ভ্রু কুঞ্চিত হওয়া শুরু হলো। তারপরও সহজে ছাড়ে না। তখন শব্দটি বের হতে থাকে তার মুখ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। হোটেলে পৌঁছে একটু এরপর হোটেল থেকেই তিনি পিতৃভূমি, আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান বিভিন্ন জায়গায়। তার হাবভাব-চলাফেরায় বিদেশি-এর ধরন। তার চুলের কাটিং রোনাল্ডো, দ্রগবাদের মতো। সাধারণত তিনি ৩, পরেই চলাফেরা করতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। কথাবার্তা-এ একটা বিদেশি ভাব সদাদৃশ্যমান। হোটেলের বাইরে ঘোরাফেরায় তিনি দেশের সম্পর্কে-এ থাকেন। সঙ্গে, নিয়ে চলেন সব সময়। রাস্তাঘাটের বেহাল অবস্থা আর মানুষের ভিড়ে চলতে চলতে এক সময় তিনি হাঁপিয়ে ওঠেন। সবকিছু মনে হয়। ভাবেন এ দেশে মানুষ কিভাবে থাকে। সময় শেষ হওয়ার আগেই হয়ত ছুট দেন এয়ারপোর্টের দিকে মুক্তির দেশের ঠিকানায়। পিতৃভূমি দর্শনের অভিলাষ দ্রুতই নিঃশেষ হয়ে যায়। প্রজন্ম অন্তরে নাড়ির টান এভাবেই বোধহয় ছিন্ন হতে থাকে, একটা সময় আসে যখন পরদেশই পরের প্রজন্মের কাছে আপন ভূমি হয়ে যায়।
ফিরে যাই প্রথম প্রজন্মের প্রবাসীদের মূল প্রসঙ্গে। এক বুক শূন্যতা নিয়ে শান্তির দেশকে পেছনে ফেলে তারা ফিরে যান আবার সেই ছকে বাধা জীবনে, পরবাসে। এখানে আরাম আছে, স্বচ্ছন্দ আছে, জীবনের নিরাপত্তা আছে, আছে দূষণমুক্ত পরিবেশ। কিন্তু সব পাওয়ার এই স্বপ্নর দেশেও যেন কি নেই। একটা শূন্যতাবোধ, অন্তরের হাহাকার।
প্রবাসে কাজের ফাঁকে সুযোগ পেলেই তারা একত্র হন। সাত সমুদ্র তের নদীর পারে তারা আরেকটা বাংলাদেশের রচনা করেন। সোচ্চার হন দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি সংস্কৃতি, ঘটমান ঘটনা ইত্যাদি বিষয়ে। আয়োজন করেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানের। শিল্প-সাহিত্যচর্চা করেন দেশীয় আবহে, মেজাজে। আমার পরিচিত নিভৃতচারী স্বজনদের অজানা সুপ্ত প্রতিভার জোরাল প্রকাশ ঘটতে দেখি প্রবাসে তাদের রচিত শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি ইত্যাদি চর্চার পরিম-লে সরব ও সক্রিয় বিচরণে। বিভিন্ন সামাজিক মিডিয়ায় প্রকাশ পায় দেশ সম্পর্কে তাদের আলোচনা, সমালোচনা, মতামত ইত্যাদি। এসব কর্মকা-ই দেশের সঙ্গে তাদের একাত্ম থাকার প্রয়াস। ম্যানহাটনের বাঙালি অধ্যুষিত কোনো রেস্তোরাঁয় গিয়ে বসে আলাপ-আলোচনা শুনলে মনে হয় আমি যেন বাংলাদেশেই আছি, বিশ্বময় বাংলাদেশ ।
সর্বোপরি প্রবাসে থাকা আমার দেশের এই মানুষদের জীবনের শেষ ইচ্ছা থাকে দেশের মাটিতে যেন তাদের প্রাণহীন বাসনাহীন নিথর দেহটাকে শায়িত করা হয় এবং স্বজনদের উপস্থিতিতে হয়। পরিশেষে জীবনানন্দ দিয়ে ইতি টানি-
‘আমি যে দেখিতে চাই, আমি যে বসিতে চাই বাংলার ঘাসে,
পৃথিবীর পথ ঘুরে বহুদিন অনেক বেদনা
প্রাণে সয়ে।’
লেখক : সাবেক সরকারি কর্মকর্তা, বিসিএস (প্রশাসন)