প্রবাসে ঘরে ঘরে বাংলার কৃষক

বিভিন্ন বাসার ব্যাকইয়ার্ড ও ব্যালকনিতে রকমারি শাকসবজি

ঠিকানা রিপোর্ট : আমেরিকার প্রায় প্রতিটি স্টেটেই বাংলাদেশিদের বসবাস। তবে সব স্টেটের তুলনায় নিউইয়র্কে বাংলাদেশিদের বসবাস বেশি। ফ্লোরিডা, লস অ্যাঞ্জেলেস, টেক্সাস, আরিজোনাসহ অনেক স্টেটেই সারা বছর গরম থাকে। কিন্তু নিউইয়র্কসহ অনেক স্টেটে ছয় মাস গরম এবং ছয় মাস ঠান্ডা থাকে। গরম স্টেটগুলোতে প্রায় সারা বছরই প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাদের বাসার ব্যাকইয়ার্ডে শাকসবজির চাষ করে থাকেন। নিউইয়র্কে যারা থাকেন, তারা বাসার ব্যাকইয়ার্ড ও ব্যালকনিতে শাকসবজি চাষ করার জন্য অপেক্ষা করেন। নিউইয়র্কসহ আশপাশের স্টেটগুলোতে প্রবাসে ঘরে ঘরে গরমের সময় প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাদের বাসার ব্যাকইয়ার্ডে শাকসবজির বাগান করে থাকেন। আবার যারা অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে থাকেন, তারা বাসার ব্যালকনিতে শাকসবজি চাষ করে থাকেন। এবারো তার ব্যতিক্রম হয়নি। বলতে গেলে, মহামারি করোনার কারণে এবার শাকসবজির চাষ বেশি হয়েছে। নিউইয়র্কে অনেক বাংলাদেশি গ্রোসারি স্টোরের মালিক রয়েছেন, তারা আপটেস্টে জমি নিয়ে শাকসবজির চাষাবাদ করে থাকেন। তারা চাষাবাদ করেন নিজেদের স্টোরের জন্য। কিন্তু যারা বাসার ব্যাকইয়ার্ডে শাকসবজির চাষাবাদ করেন, তারা মূলত শখের বশে করে থাকেন। অধিকাংশ বাসার মধ্যে বয়স্ক বাবা-মা থাকেন, তারা সময় কাটানোর জন্য বাগান বা শাকসবজির বাগান করে থাকেন। আবার অনেক বাসার ঘরনী রয়েছেন, যারা সংসারের কাজ করেন কিন্তু বাইরে কাজ করেন না, তারা জায়গা পেলে শাকসবজির বাগান করে থাকেন।
করোনার সময় নিউইয়র্কসহ আশপাশের স্টেটগুলোতে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। এ সময় মানুষ ঘরের মধ্যেই বন্দী ছিলেন। কারোরই কিছু করার ছিল না। বলতে গেলে সবাই বাসায় বন্দী এবং কাজ ছিল অলস সময় কাটানো। সেই সময়টি এবার তারা কাজে লাগিয়েছেন বাসার আশপাশে বাগান করে। এর মধ্যে অনেকেই আছেন যারা গরমের সময় প্রতিবছরই বাগান করেন বা সবজির চাষাবাদ করেন। নিউইয়র্কে বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকা জ্যাকসন হাইটস, এস্টোরিয়া, জ্যামাইকা, ব্রঙ্কস, চার্চ ম্যাকডোনাল্ড, লং আইল্যান্ড, বেলরোজ, সাউথ জ্যামাইকা, কুইন্স ভিলেজ, ওজন পার্ক এলাকায় বাড়ির সামনে বা পেছনে দাঁড়ালেই বোঝা যায়, এই বাড়িতে বা এলাকায় বাঙালি থাকেন। বাঙালিরা সাধারণত বাসার পেছনে বা সামনে শাকসবজির বাগান করে থাকেন। যারা বাসার সামনে এবং পেছনে সবজির বাগান করেছেন, তারা জানিয়েছেন, তারা শখের বশে এসব বাগান করে থাকেন। তারা আরো জানান, এতে একসাথে দুটি কাজ হয়। প্রথমত সময় কাটানো এবং দ্বিতীয়ত তাজা শাকসবজি খাওয়া যায়। আবার আত্মীয়-স্বজনকেও দেওয়া যায়। বাজার থেকে তাজা শাকসবজি নিলেও অনেক সময় স্বাদ পাওয়া যায় না। কিন্তু নিজের বাগান থেকে তুলে রান্না করা সবজির সাথে অন্য কোনো কিছুর তুলনা হয় না। বাঙালিরা সাধারণত যেসব শাকসবজির চাষাবাদ করে থাকেন, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে লাল শাক, ডাঁটা শাক, লাউ, মিষ্টি লাউ, টমেটো, নাগা মরিচ, মিষ্টি কুমড়া, লেবু, ঢ্যাঁড়স, শিম, বেগুন, চিচিঙ্গা, করলা, পুঁই শাক, মুলা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, কমলা, সাতকরা, আদালেবু, অকরা ইত্যাদি।
ওজন পার্কের রকওয়েতে থাকেন প্রবাসের অন্যতম জনপ্রিয় শিল্পী জলি কর। তিনি তার বাসায় সবজি এবং ফুলের বাগান করেছেন। জানালেন, করোনাকালে বাসায় বন্দী, তা ছাড়া সবজি বা ফুলের বাগান করা শখ। তাই আমি এবার বাসার পেছনে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করেছি। তিনি আরো বলেন, সবজি এবং ফুলের বাগান করতে আমার খুব ভালো লাগে। যে কারণে প্রতিবছরই আমি বাগান করে থাকি। তিনি বলেন, এটা আমার অক্সিজেন। আমি প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই বাগানে যাই এবং সবজি তুলি। আমি দেখছি নিজের হাতে লাগানো গাছগুলো বড় হচ্ছে আর আমরা আনন্দের সাথে খাচ্ছি। বাংলাদেশি গ্রোসারিগুলোতে তাজা শাক পাওয়া যায় না। তাই বাগান করলে তাজা সবকিছুই পাওয়া যায়।


মনসুর চৌধুরী পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকেন লং আইল্যান্ডের রোজল্যান্ড হাইটসে। তিনি তার বাসার ব্যাকইয়ার্ডের প্রায় এক একর জায়গায় সবজি বাগান করেছেন। তার বাগানে শতাধিক আইটেম রয়েছে। রয়েছে বাংলাদেশি সবজি এংয় সিলেটি সবজি। বাংলাদেশি সবজির পাশাপাশি রয়েছে লাই পাতা, কমলা, আদালেবু, সাতকরা, জালি কুমড়া। ঠিকানার এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি নিজে বাগানের তদারকি করি। তা ছাড়া স্প্যানিশ লোকজনকে দিয়ে গাছের সেবাযত্ন করি। তিনি বলেন, বাগান করতে আমার ভালো লাগে। তাই আমি বাগান করি। হোম ডিপো থেকে যাবতীয় জিনিসপত্র আমি কিনেছি। বাগানের এই শাকসবজি আমরা নিজেরা খাই এবং আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে বিতরণ করি। তিনি আরো বলেন, কিছু গাছ রয়েছে যার মধ্যে আদালেবু, সাতকরা গাছ শীতে মরে যায়। তাই আমি একটি ঘর করেছি এবং শীতের সময় টেম্পারেচার ঠিক রেখে এসব গাছ ওই ঘরে রাখি।
কুইন্সে বসবাস করেন আলিম উদ্দিন। তিনিও শখের বশে এবং অলস সময় কাটানোর জন্য বাসার ব্যাকইয়ার্ডে বিভিন্ন ধরনের সবজি লাগিয়েছেন। তিনি বলেন, গাছগুলো হচ্ছে, দেখতেই ভালো লাগছে, আবার যখন খাই তখন খুবই আনন্দ পাই। কারণ নিজের করা বাগানের সবজি খাওয়ার আনন্দই আলাদা। তিনি আরো বলেন, ঠিকমতো যত্ন নিলে প্রচুর ফলন হয়। তা ফ্রিজে রেখে দিলে পুরো এক বছর না হলেও কয়েক মাস খাওয়া যায়। এর ফলে আনন্দ পাচ্ছি, এই আনন্দের তুলনা হয় না।