প্রবাসে ষোলোআনা বাঙালিয়ানায় বর্ষবরণ

মো.ইয়াকুব আলী, অস্ট্রেলিয়ার সিডনি থেকে

নববর্ষ পালনের পরিকল্পনাটা শুরু হয়েছিল কয়েক সপ্তাহ আগেই। ভেবেছিলাম এবার নিজেদের মতো করে নববর্ষ উদযাপন করব ষোলআনা বাঙালিয়ানায়।
খাবারের দায়িত্ব আমার গিন্নি আর বান্ধবী জেইনার মায়ের উপর ছেড়ে দিয়ে আমি লেগে গেলাম আনন্দ উপকরণগুলো যোগাড় করতে। অফিসের কাজ ফাঁকি দিয়ে ইন্টারনেট ঘেটে পহেলা বৈশাখের খুবই সুন্দর কিছু আলপনা আর মুখোশের ছবি খুঁজে বের করলাম।
তারপর আলপনার ছবিগুলোকে বড় আকারের কাগজে এবং মুখোশগুলোকে ছোট আকারের কাগজে রঙিন প্রিন্ট করে নিলাম। পহেলা বৈশাখের আগের দিনটা শুক্রবার হওয়াতে অফিসে তেমন একটা কাজ ছিল না। তাই সহজেই বসের চোখ ফাঁকি দিয়ে এগুলো প্রিন্ট করে নিলাম।
সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে একটা দাওয়াত খেয়ে ফিরতে রাত প্রায় একটা বেজে গেল। সারাদিনের ক্লান্তিতে দুই চোখ বুজে আসতে চাইলেও কষ্ট করে জেগে রইলাম।
সবাই কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে গেলে আমি কাঁচি আর কাগজ নিয়ে বসে গেলাম। আলপনার কাগজগুলোতে তেমন কোনো কাটাকাটির দরকার ছিল না, কিন্তু মুখোশের কাগজগুলোকে কাঁচি দিয়ে কেটে মুখোশের আকার দিতে শুরু করলাম।
অনেকগুলো মুখোশ, আর সেগুলোকে ধরে রাখার জন্য একটা করে স্ট্যান্ডও বানাতে হবে। কিন্তু বাসায় কাঠি জাতীয় কোনো কিছু না পেয়ে কাগজ ভাজ করে সেগুলোতে স্ট্যাপলার লাগিয়ে স্ট্যান্ড বানিয়ে ফেললাম। তারপর সেগুলোকে আবার স্ট্যাপলার দিয়ে মুখোশের সাথে জুড়ে দিলাম।
এভাবে তৈরি হয়ে গেলো আমাদের মুখোশ, যেগুলো দেখতে অবিকল বাংলাদেশের মুখোশের মতোই লাগছিল। দূর থেকে দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না যে এগুলো প্রিন্ট করা। কারণ, মুখোশের ছবিগুলো ছিল খুবই প্রাণবন্ত।
মুখোশগুলো তৈরি করতে গিয়ে রাত প্রায় ৩টা বেজে গেল। ঘড়িতে ৬টার এলার্ম দিয়ে ঘুমাতে গেলাম। কারণ, বাচ্চারা ঘুম থেকে ওঠার আগেই আমরা আমাদের মঞ্চটা তৈরি করে ফেলতে চাইছিলাম যেন ওরা ঘুম থেকে উঠে সেগুলো দেখে আশ্চর্য হয়ে যায়!
এলার্মের শব্দে ঘুম ভাঙলো কিন্তু তখনও চোখে রাজ্যের ঘুম। তবুও জোর করে ঘুম থেকে উঠে কাঁচি ও স্কচ টেপ নিয়ে কাজে লেগে গেলাম। শুক্রবার বিকাল থেকেই ঠাণ্ডা ঝড়ো হাওয়া বইছিল। শনিবার সকালেও বাতাসের ঠাণ্ডা ও গতি একই ছিল।
আমি আগে স্কচ টেপ কেটে তৈরি করে রাখলাম। তারপর এক হাতে আলপনার পোস্টারগুলোকে ধরে অন্য হাতে টেপ দিয়ে সেগুলোকে কারপার্কের দরজার সাথে সেটে দিতে শুরু করলাম।
একটু পরেই দেখি আমার মেয়ে তাহিয়া এসে হাজির। সে আমাকে কাজে সাহায্য করতে চায়। তারপর আমরা দু’জনে মিলে কাজে লেগে পড়লাম। তারপর একসময় আমার গিন্নি আর জেইনার মা ঘুম থেকে উঠে আমাদের কাজকর্ম দেখে কাজে যোগ দেয়।
প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আমি আর তাহিয়া মিলে একটা সুন্দর মঞ্চ তৈরি করে ফেললাম। সবই ছিল, কিন্তু ১৪২৫ কথাটা কোথাও ছিল না। তখন তাহিয়া বলল, “বাবা, আমার ড্রইংয়ের রঙিন কাগজ দিয়ে তুমি লিখতে পারো।”
তারপর সেগুলো এনে প্রথমে পেন্সিল দিয়ে সেগুলোর উপরে লিখে সেটাকে কাঁচি দিয়ে কেটে ১৪২৫ লেখাটা তৈরি করে ফেললাম। তারপর সেটাকে সবার উপরে স্কচ টেপ দিয়ে সেটে দিলাম।
তারপর আমাদের কাজ শেষ হয়ে গেলে আমরা ফ্রেশ হয়ে পোশাক বদলে পহেলা বৈশাখের পোশাক পরে নিলাম সবাই। ইতোমধ্যে রান্নার কাজও শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাই আমরা সবাই মিলে তৈরি হয়ে নিলাম। জেইনার মা বলল, “কলাপাতা জোগাড় করতে পারলে ষোলোআনা বাঙালিয়ানায় নববর্ষ পালন করা যেত।”
আমি, তাহিয়া আর রায়ান তক্ষুণি কলাপাতার সন্ধানে বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের বাসার খুব কাছেই দুইটা মন্দির আছে। তার মধ্যে একটা দক্ষিণ ভারতের প্রবাসী মানুষদের, অন্যটা নেপাল প্রবাসীদের।
আমাদের চড়ুইভাতির দিন রুপা বৌদি বলেছিলেন, “ভাইয়া, কলাপাতায় খেতে পারলে ভালো হতো।” তখন বিজয় দাদা বলেছিলেন, নেপালি মন্দিরের ভেতরে কলাগাছ আছে।
আমরা নেপালি মন্দিরের ভেতরে গিয়ে দেখলাম, পুরুত মহাশয় একটা গাড়ির উদ্বোধনী পূজায় ব্যস্ত। আমরা অপেক্ষা করলাম ওনার পূজা শেষ হওয়া পর্যন্ত।
তারপর গিয়ে বললাম, “আমরা বাংলাদেশের মানুষ। আজ আমাদের বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন।” উনি মনে করলেন, আমরা হয়তো পূজার কথা বলছি। তাই উনি বললেন, “আপনারা সোমবারে আসেন, তখন পূজা দিতে পারবেন।”
আমি বললাম, আসলে আমাদের কয়েকটা কলাপাতার দরকার ছিল বলে কলাগাছের দিকে দেখিয়ে দিলাম। তখন উনি বুঝলেন আমরা আসলে কেনো এসেছি। উনি জানালেন মন্দিরের লোকজন খুবই কড়া। তারা কলাপাতা দেবে না। তবে লুকিয়ে নিয়ে যেতে পারব বলে জানালেন।
আমি গাড়িতে রাখা ছোট ছুরিটা নিয়ে কলাগাছের কাছে গেলাম। দেখি সেটা একটা ঝোপের ভেতরে আর তার আশেপাশে এক ধরনের গাছ আছে। ওই গাছের কাছে গেলেই তার কাঁটার মতো ফল পোশাকের সাথে লেগে যায়। তবুও গা বাঁচিয়ে কলাপাতা কেটে এনে গাড়ির পেছনে রেখে দিলাম।
বাসায় ফিরে সেগুলোকে ছোট ছোট টুকরা করে ভালোমতো ধুয়ে নিলাম। তারপর আমরা সদলবলে জেইনাদের বাড়িতে চলে গেলাম। জেইনার দাদা-দাদীও আমাদেরকে এই আয়োজনে সকল প্রকারের উৎসাহ ও সহযোগিতা করে আসছিলেন শুরু থেকেই।
কলাপাতায় খাওয়া নিয়ে শুরুতে আমরা একটু দ্বিধায় ছিলাম। বিশেষ করে বাচ্চারা কলাপাতায় খেতে চাইবে কিনা? শুরুতে তাহিয়াকে কলাপাতায় খেতে দেখে জেইনাও রাজি হয়ে গেল। তারপর আমি কলাপাতা নিয়ে ওদের পাশে বসে পড়লাম ওদেরকে উৎসাহ দিতে। জেইনার দাদাও আমাদের সাথে যোগ দিলেন।
আমরা কলাপাতায় খাওয়া শেষ করে বাটিতে পান্তাভাত নিয়ে সেটাও খেয়ে নিলাম। এরপর আমার গিন্নি, জেইনার মা এবং দাদী অনেক আনন্দ নিয়ে কলাপাতায় খেতে বসে গেল। একইভাবে শেষে পান্তা দিয়ে খাওয়া শেষ করলো।
তারপর আমরা সবাই মিলে আমাদের বানানো মঞ্চে এসে ছবি তুলতে শুরু করলাম। কিন্তু ছোট্ট রায়ান আর জাহিয়াকে কোনোভাবেই মুখোশ পরানো সম্ভব হচ্ছিল না। অবশেষে রায়ানকে মুখোশ পরানো সম্ভব হলেও জাহিয়াকে আর মুখোশ পরানো সম্ভব হলো না।
ছবি তোলা শেষ করে আমরা বড়রা নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। তাহিয়া আর জেইনা ব্যস্ত হয়ে গেল তাদের আঁকাআঁকি নিয়ে। আর রায়ান ও জাহিয়া ব্যস্ত হয়ে ছুটোছুটি করতে শুরু করলো। এভাবে আমরা অনেক বেশি আনন্দ নিয়ে বাংলা নতুন বছর ১৪২৫-এর প্রথম দিনটা শুরু করলাম।
এই প্রবাসে আরও হয়তো অনেকবার এমনভাবে পহেলা বৈশাখ পালনের সুযোগ আসবে, কিন্তু এটাই ছিল প্রথম। তাই এই স্মৃতি উজ্জ্বল হয়ে সংরক্ষিত থাকবে আমাদের মনে।
একটা অভিজ্ঞতাও হলো এবার। আমরা যদি কোনো কাজ শুরু করি, তাহলে অবধারিতভাবেই আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে অনেক উৎসাহ ও উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। আমাদের মুখোশ বানানো থেকে শুরু করে কলাপাতায় ভাত খাওয়া- সবগুলো কাজেই পরিবারের ছোটদের অংশগ্রহণ সেটারই জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ।
আমরা ছোট পরিসরে হলেও যদি আমাদের সংস্কৃতির চর্চাটা ধরে রাখতে পারি, তাহলে একদিন আমাদের পরবর্তী প্রজন্মও সেগুলো পালনের চেষ্টা করে যাবে। বাংলা নববর্ষ ১৪২৫ বয়ে আনুক সকলের জন্য আনন্দবার্তা।

লেখক: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী

মেইল: [email protected]