প্রযুক্তির সম্ভাবনার যুগে আমাদের নতুন প্রজন্ম

সৈয়দ মামুনুর রশীদ : প্রত্যেক মা-বাবার কাছে তার সন্তানাদি হচ্ছে এক অমূল্য সম্পদ। আল্লাহর এই নিয়ামতকে ঘিরে দাম্পত্য জীবনের শিকড় প্রোথিত হয়। স্বপ্নের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে। সাথে সাথে যুক্ত হয় সঠিকভাবে মানুষ করার দায়িত্বও। এই দায়িত্ব শুধু পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রও এর দায়িত্ববহনে অংশগ্রহণ করে থাকে। অতএব, দুইয়ের সমন্বয়ের দায়িত্বের যোগফল নিয়েই পরিবারের সুসন্তান হয়ে রাষ্ট্রের সুনাগরিক হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের কথাই যদি উদাহরণে নিয়ে আসি তবে সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্র প্রায় সব দায়িত্বই নিয়ে নেয়। বিশেষ কওে, নিউইয়র্কের দায়ভার পুরোপুরিভাবে নিয়েছে। স্বল্প আয়সম্পন্ন পরিবারকে এই সরকার অনেক কিছু ফ্রি করে দিয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে প্রি-কে থেকে পাবলিক কলেজ পর্যন্ত কোনো শিক্ষার্থীকে টিউশন ফি দিতে হয় না। খাওয়াদাওয়ার জন্যও ফুডস্টাম্প রয়েছে। কোনো অর্থ দিতে হয় না চিকিৎসায় পরিসেবা পেতে। এমনকি বাসস্থানের জন্যও বাসা ভাড়া মওকুফেরও ব্যবস্থা রয়েছে। তার পরও কি নিজের সন্তানকে আপন মাধুরি মিশিয়ে যত্ন দিয়ে সঠিকভাবে মানুষ করে গড়া যায় না? ইচ্ছা থাকলে সবকিছু সম্ভব, নতুবা নেতিবাচক প্রশ্ন আর নিষ্প্রভ মানসিকতা নিয়ে কিছুই সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে কিছু কিছু মানুষ ব্যতিক্রম হলেও প্রায় সব পিতামাতা তাদের ছেলেমেয়ের প্রতি খুব যত্নশীল।
এখানে প্রশ্ন থেকে যায়, তাহলে প্রত্যেক মা-বাবাকে কোন পথ অবলম্বন করলে তাদের সন্তানেরা প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে পারবে? সব মা-বাবা চান তাদের সন্তানাদিকে কীভাবে প্রকৃত মানুষরূপে গড়ে তোলা যায় এবং কোন পথ সঠিক? বিজ্ঞান বলে, ‘There isnÕt a set recipe for hwo to raise a successful child. However, research points to several factors that could help.’ যে যার ধর্মে বিশ্বাসী সে তার ধর্মীয় চর্চাকে বজায় রেখে বিজ্ঞানসম্মত রিসার্চগুলো যথার্থ সন্তান পালনে অনেক সাহায্য দিতে পারে। তবে সন্তান পালনে কোনো নির্ধারিত পথ নেই, যে পথ আদৌ সঠিক জীবনের সন্ধান দেবে। আমরা অনেক সময় অত্যধিক কঠোর নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে সন্তানকে আবদ্ধ রাখতে চাই, যাতে ওরা ধরাবাধা নিয়মপালনের ভেতর দিয়ে সঠিক মানুষ হয়ে উঠবে। আসলে সন্তানের ভালো করতে গিয়ে ওইসব অতিরিক্ত নিয়মবিধি হিতে বিপরীত ডেকে আনে। তাই তার শিশুসুলভ মনের ওপর কোনো আঘাত বা অতিরিক্ত মানসিক চাপের কথা স্মরণে রাখতে হবে। পিতামাতা তার সন্তানের কাছ থেকে কী চায় আর সেই সন্তান তার অভিভাবকের কাছ থেকেও কী চাওয়ার থাকতে পারে তারও সঠিক পরিকল্পনার বিষয়টি ভাবা দরকার। জন্মগতভাবে প্রতিটি শিশুর নিজস্ব জগৎ আছে, যেখানে তারা আপন মনে স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দে মেতে ওঠে। শিশুর স্বতঃস্ফূর্ত সীমানার মধ্যে ঢুকে অত্যধিক শাসন দিয়ে তার আপন জগৎটাকে যেন বিনষ্ট করে না দেওয়া হয়। পিতামাতা আর সন্তানের উভয় ক্ষেত্রে লেনদেনের বিষয়কে বিবেচনায় আনতে হবে। অভিভাবক যেখানে তার সন্তানের কাছ থেকে যেকোনো বিষয়ে ভালো রিজাল্ট ডিমান্ড করে, সেখানে সেই শিশুর চাওয়ার কী থাকতে পারে, তাতেও মনোযোগ দিতে হবে। মা-বাবা ও সন্তানের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত সহজাত বিনোদনের বিষয়ের প্রতি সচেতন থাকা জরুরি।
শিশু বিশেষজ্ঞ Kren Rechardson Gill MD.FAAP.Gi-এর মতে, ‘The first 7 years of life really mean everything.’ অর্থাৎ জীবনের প্রথম সাত বছর সময়কাল হচ্ছে জীবনের সবকিছু। শিশুবিষয়ক চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, শিশুদের প্রথম সাত বছর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। চাইল্ড ডেভেলপমেন্টের জন্য প্রত্যেক পিতামাতাকে তাদের ছেলেমেয়েদের প্রথম ২,৫৫৫ দিন সচেতনতার সাথে কাজে লাগানো প্রয়োজন। কোনো মা-বাবা চান না তাদের সন্তানের অনিষ্টতা, যা জীবনচলার পথকে বিপন্ন করে দেয়। তার পরও মা-বাবার দাম্পত্য কলহ সঠিক সন্তান পালনে বিঘ্নতার সৃষ্টি করে। দাম্পত্য জীবন যদি সুখ-শান্তির না হয়, তবে সেখানে পিতামাতা কী করে তাদের সন্তানের সাফল্যময় জীবন আশা করেন? চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় পাওয়া যায়, মা-বাবা নিজেরা সুখী হলে তার প্রভাব তাদের ছেলেমেয়েদের ওপর বিস্তার লাভ করে। তাই প্রথমত নিজেকে সুখী হতে হবে সন্তানের সার্থক ভবিষ্যতের জন্য। সে অনেক পুরোনো কথা হলেও দার্শনিক এরিস্টটলের কথা বর্তমান যুগের সাথে খাপ খেয়ে নেয়, ‘Give me a child until he is 7 and I will shwo you the man.’
শিশুরা বয়োবৃদ্ধির পথে তাদের চারপাশ ঘিরে যে পারিপার্শ্বিকতার জগৎ রয়েছে তা নিয়ে তাদের কাছে অনেক কৌতূহলপূর্ণ প্রশ্ন থাকে। তারা তা জানার জন্য স্বভাবতই বারবার প্রশ্ন করলে বিরক্ত না হয়ে বরং সব কটির জবাব দেওয়ার চেষ্টা করব। তাতে তাদের জানার আগ্রহ ক্রমাগত বাড়তে থাকবে। বুদ্ধিমান শিশুরাই সাধারণত প্রশ্ন করে থাকে। উত্তর এড়িয়ে যাওয়াটা ঠিক নয়। ছেলেমেয়েদের সাথে স্বচ্ছন্দ মনে কথা বলা ও তাদের সব বিষয়ে শেয়ার করা দরকার। এতে তারা সব ব্যাপারে ঈড়সসঁহরপধঃরড়হ রক্ষায় সচেতন হয়ে উঠবে। সমস্যা সমাধানে একে অন্যের পরামর্শ নেওয়ার অভ্যাস গড়ে উঠবে। জড়তা দূর হবে যেকোনো সামাজিক আলোচনায় নিজেদেরকে সক্রিয় রাখতে।
প্রতিটি শিশুর প্রথম শিক্ষালয় হচ্ছে তার নিজ পরিবার। এখানেই তারা আদর্শবান হওয়ার প্রথম অনুশীলনে অনুশীলিত হয়। পারিবারিক পরিবেশে সেখানকার সুশৃঙ্খল নিয়মনীতির আদর্শে প্রতিটি শিশু আদর্শবান হওয়ার প্রাথমিক শিক্ষা পায়। সেখানে মা-বাবার ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে শিশুরা বেড়ে ওঠার পথে বেপরোয়া হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে। ভদ্রতা, সভ্যতা, নৈতিকতা, শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা, সমঝোতা ও অপরের উপকারিতায় যে শিশু যেখান থেকে সর্বপ্রথম অনুশীলন নেয়, সে হচ্ছে তার পরিবার। পরিবার থেকে নেওয়া ভালো শিক্ষাই একটি শিশুকে প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জনের পথকে আরও সম্মাননায় প্রজ্জ্বলিত করে তোলে।
পড়ালেখা নিয়েই ছেলেমেয়েরা শুধু ব্যস্ত থাকবে, তা কিন্তু সমীচীন নয়। এতে ছেলেমেয়েরা পড়ালেখায় একঘেয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে। ফলে পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ে উঠতে পারে। তাই সময় সময় তাদেরকে বিনোদনের জগতে নিয়ে যাওয়া দরকার। সে হতে পারে দেশভ্রমণ, ঘরের বাইরে খেলাধুলা, ছবি তোলা, ছবি আঁকা অথবা যেকোনো কালচারাল অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ। এতে আমাদের সন্তানেরা মানসিকভাবে বিকশিত হয়ে ওঠে। বিশেষ করে নৈসর্গিক পরিবেশে মুক্ত আকাশের নিচে নদীর তীর, সমুদ্রসৈকত ইত্যাদির প্রাকৃতিক স্পর্শ শিশুদের মানসিক সুস্থতা দানে সহায়ক। ২০০৫ সালে The American Medical Association-Gi cÖKvwkZ wbe‡Üi Conclusion-এ তুলে ধরা হয়েছে, ‘Children will be smarter, better able to get along with others, healthier and happier when they have regular opportunities for free and unstructured play in the out-of-doors.’ শিক্ষাজীবনের পথে উপরিউক্ত বিষয়ের ওপর সচেতন থাকলে মাঝপথে শিক্ষাজীবনে ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কাও কম থাকে।
সমাজকল্যাণমূলক কাজের সাথে ছোটবেলা থেকেই ছেলেমেয়েদের সম্পৃক্ত রাখা দরকার। যার ফলে একে অন্যের সাথে যেকোনো সামাজিক উন্নয়নে শেয়ার করার অভ্যাস গড়ে উঠবে। যেমন তা হতে পারে নিজ নিজ এলাকায় বৃক্ষরোপণ, রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে অংশগ্রহণ, দুস্থ মানবতার কার্মকাণ্ডে জড়িত রাখা। সামাজিক ওই সব কর্মকাণ্ডের চর্চা থেকে মানুষ সাধারণ প্রয়োজনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একত্রে কাজ করার অনুপ্রেরণার শিক্ষা নেয়। এতে করে একাডেমিক শিক্ষার সাথে তাল মিলিয়ে সামাজিক শিক্ষায় অনুশীলন নিয়ে আমাদের সন্তানেরা প্রকৃত মানুষ হওয়ার গৌরব অর্জন করতে পারবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই শতাব্দী আমাদের হাতের মুঠোয় বিশাল পৃথিবীকে এনে দিয়েছে বটে কিন্তু কেড়েও নিচ্ছে অনেক কিছু। ইলেকট্রনিক ডিভাইস আমাদের নতুন প্রজন্মকে হুমকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। এতটুকু ছোট বাচ্চাটিকেও ভিডিও গেম, স্মার্টফোনের জন্য দিওয়ানা হয়ে উঠতে দেখা যায়। স্কুল থেকে আসামাত্র বর্তমানকালের ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যার ফলে তারা যেমন পড়ালেখায় অমনোযোগী হয়ে পড়ে, তেমনি বহির্জগতের মুক্ত আবহাওয়ায় খেলাধুলার আনন্দ বিনোদন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। সেই সাথে আধুনিক মা-বাবাও সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। বাইরে অফিসের কাজ, ঘরে এসে সাংসারিক কাজের সাথে ফেসটাইম জুড়ে দিলে সেখানে আর সময়ই-বা কতটুকু বরাদ্দ থাকে নিজের সন্তানের জন্য! আধুনিক সভ্যতার প্রযুক্তির যুগে পিতামাতার এই ব্যস্ততা ছেলেমেয়েদের প্রকৃত মানুষরূপে গড়ে তোলার কাজ কঠিন হয়ে পড়েছে। পিতামাতার অসাবধানতা নতুন প্রজন্মের ক্রিয়েটিভ চিন্তাশক্তিকে অধঃপতনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হওয়ার জন্যই আবিষ্কৃত হয়েছে আর সেখানে যদি তার ব্যবহার হয় কেবল অহেতুক সময় নষ্ট করার কাজে, তাহলে আমাদের অসতর্কতার কর্মফল আমাদেরই ভোগ করতে হবে। অতএব, সময়ের সাথে এগিয়ে যাওয়ার পথকে বিচক্ষণতা দিয়ে কাজে লাগানোর চেষ্টাই হবে নতুনকে নিয়ে বাঁচার সার্থকতা।
-নিউইয়র্ক। ৬ আগস্ট ২০২০।