প্রশ্নপত্র ফাঁসচক্র

প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে অনেক লেখালেখি হলেও এবং সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও এই কুচক্রের জাল কিছুতেই ছিন্ন করা যাচ্ছে না। সম্প্রতি একটি ইংরেজী সংবাদপত্রে প্রশ্নপত্র ফাঁসের চক্র বিষয়ে যেসব তথ্য এসেছে তা একদিকে যেমন লজ্জাজনক, অন্যদিকে তেমনি উদ্বেগজনকও। এমন একজন হোতার সন্ধান মিলেছে যিনি একটি ছাত্র সংগঠনের সাবেক কর্মী এবং প্রভাবশালী মহলের আনুকূল্যে অযোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সরকারী চাকরি বাগিয়ে নিয়েছে। সিআইডি সূত্রমতে ওই ব্যক্তি প্রশ্নপত্র ফাঁসের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে সক্রিয়তার যথেষ্ট নজির রেখেছেন। ঢাবির ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া অন্তত ১৫ জন আদালতে জবানবন্দী দিয়েছে। স্বীকার করেছেন বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা, ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষা এবং শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে তারা জড়িত।
বর্তমানে সংস্কৃতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, যত পরীক্ষা তত যেন ফাঁস। প্রশ্নপত্র ফাঁসের চোরাবালি থেকে কোন পরীক্ষাই যেন বেরিয়ে আসতে পারছে না। তাতে ফাঁস লাগছে নীতিনৈতিকতার গলায়, দেশের সামনের পথ চলায়। সত্যি বলতে কি, দেশে খুব কম পাবলিক পরীক্ষা আছে, যার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠেনি! ফাঁস হয়েছে এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও। প্রশ্নপত্র ফাঁস, অবৈধপথে তা গ্রহণ ও সমস্যার সমাধান না হওয়া আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা দেউলিয়া পথে যাওয়ার আলামত।
একবার রাজধানীতে প্রশ্নপত্র ফাঁসচক্রের শিক্ষকসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গ্রেফতারকৃতরা ফেসবুক, হোয়াটসআপ, ভাইবার, টুইটার, ইমোসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন পরীক্ষার ভুয়া প্রশ্নপত্র প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তারা এইচএসসি পরীক্ষাসহ মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষা, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা, নটর ডেম কলেজের ভর্তি পরীক্ষা, একটি বাড়ি একটি খামার নিয়োগ পরীক্ষার ভুয়া প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছে। বলাবাহুল্য, প্রশ্ন জালের সুবিশাল নেটওয়ার্কের এটি একটি অতি ক্ষুদ্র অংশ। এছাড়াও রয়েছে প্রশ্ন ফাঁসকারী চক্র।
সরকারী এক হিসাবে দেখা গেছে, ১৯৭৯ সালে প্রথম এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়। ওই সময় থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সরকারী তথ্য অনুযায়ী ৮২ বার বিসিএসসহ বিভিন্ন চাকরি ও পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। ২০১৪ সালের জেএসসি, পিএসসি, এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। ২০১৫ সালে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে। ২০১৬ সালেও পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ২০১৭ সালের গণিত পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে। প্রশ্ন ফাঁসের তথ্য-পরিসংখ্যান বেসরকারী হিসাবে সংখ্যা আরও বাড়বে। এর মধ্যে পরীক্ষা স্থগিত, বাতিল ও তদন্ত কমিটি হয়েছে মাত্র ৩০টি পরীক্ষার। তদন্ত কমিটি হোতাদের চিহ্নিত করে প্রশ্ন ফাঁস রোধে বিভিন্ন সুপারিশ করলেও কোনটিরই বিশেষ বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে প্রশ্নপত্র ফাঁসচক্রের জাল ছিন্ন করার কাজটি দুরূহ হয়ে পড়েছে।
সব ধরনের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই জাল যে কোন মূল্যে ছিন্ন করতেই হবে। তা না হলে দেশের ভবিষ্যত প্রজন্মকে আমরা প্রকৃত শিক্ষিত এবং সত্যিকারের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে অসমর্থ থেকে যাব। আমরা আগেও বলেছি, দুটো উপায় রয়েছে। এক, এই আত্মঘাতী অপরাধকর্মের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের খুঁজে বের করে স্বল্প সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান। দুই, প্রশ্নফাঁসচক্রের শেকড় উপড়ে ফেলা। আর সময়ক্ষেপণ নয়, এখনই কাজ শুরু করা চাই। পুলিশের তদন্তে যেসব নাম এসেছে এবং যারা আদালতে জবানবন্দী দিয়ে অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছে তাদের প্রত্যেকের ব্যাপারেই আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে জরুরীভিত্তিতে।