প্রশ্নফাঁস ব্যবচ্ছেদ-একটি বিটিভি লাইভ পরীক্ষা

সকাল ৯:০০ টা। বিটিভি লাইভ। প্রিয় এসএসসি পরীক্ষার্থীরা, তোমাদের সামনে এখন বাংলা দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্ন নিয়ে আসছেন মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী। তোমরা সবাই প্রস্তুত তো?!!
প্রস্তুত সারা বাংলাদেশ। প্রস্তুত আগামীর বাংলাদেশ গড়ার ক্ষুদে কারিগররা। লাইভ দেখে বোর্ডে প্রশ্ন লিখতে প্রস্তুত প্রতিটি কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকবৃন্দ। বাবা-মারা বাড়িতে বসে দেখছেন কেমন প্রশ্নে পরীক্ষা দিচ্ছে ছেলে-মেয়েরা।
মাননীয় মন্ত্রী টিভির পর্দায়। অ্যাকশন! ধীরে ধীরে প্রশ্ন পড়া শুরু। “বাংলা ২য় পত্র। প্রশ্ন ১) যে কোন একটি বিষয়ে অনুচ্ছেদ রচনা কর : (ক) একুশের বইমেলা (খ) নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধ (মান ১০)। প্রশ্ন ২) যে কোনো একটি ভাব সম্প্রসারণ কর :….
…মন্ত্রী প্রশ্ন পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাশেই ঝড়ের বেগে বড় ফন্টে বড় স্ক্রিনে টাইপ হচ্ছে এবং তা দেখানো হচ্ছে টিভির পর্দায়। জ্যামিতি, গাণিতিক সূত্র সব দেখানো হচ্ছে ঐ স্ক্রিনে। ৩০ মিনিটে ১০ টি প্রশ্ন পড়া শেষ, প্রতিকেন্দ্রের বোর্ডে লেখাও শেষ। এমসিকিউ প্রশ্ন নেই। স্টার্ট! পরীক্ষা শুরু! ঠিক ৩ ঘণ্টা পর খাতা কেড়ে নেয়া হবে। শুভকামনা জানিয়ে মন্ত্রীর প্রস্থান। সব পরীক্ষা কেন্দ্রের টিভি বন্ধ।
# প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ, অর্থমন্ত্রীর বাজেট বিটিভিতে লাইভ হলে শিক্ষামন্ত্রীও পারবেন।
# ভাষণ/বাজেট যদি ফাঁস না হয়, তবে মন্ত্রীর ব্রিফকেসে রাখা প্রশ্নও ফাঁস হবে না।
# টিভি ক্যামেরা নিয়ে পরীক্ষার কেন্দ্রে না ঘুরে নিজেই ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে যান।
# বিজি প্রেস, সিলগালা করা প্রশ্ন, ফেইসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইন্টারনেট সব ভুলে যান।
# টেলিভিশন আর বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে না পারলে সেই কেন্দ্রের লাইসেন্স বাতিল।
# যান্ত্রিক ত্রুটিতে “প্রচারে বিঘœ ঘটায় দুঃখিত” বলামাত্রই বিটিভির কর্মকর্তারা ক্লোজড।
# ঝুঁকি এড়াতে বিটিভির পাশাপাশি বাংলাদেশ বেতারেও সরাসরি সম্প্রচার।
# ডিজিটাল যুগে অ্যানালগ চিন্তা, সহজ ভাবনা, রিয়াল-টাইম পরীক্ষা, সময়ক্ষেপণ নেই।
# পরীক্ষার হলে কেও মোবাইল ফোন সহ ধরা পড়লে সারাজীবনের জন্য বহিষ্কার।
# পিএসসি, টিএসসি, এ-টু-জেডএসসি টাইপ পরীক্ষাগুলো বাতিল ঘোষণা করেন।
# পরীক্ষার্থীরা ৩০ মিনিট আগে হলে ঢোকার পর কাকপক্ষীও ঢুকবে না, কেন্দ্রের আশেপাশে অস্ত্রধারী পুলিশ, যুদ্ধাবস্থা। এ লড়াই ভবিষ্যত প্রজন্ম বাঁচানোর লড়াই।
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচিত্র “শ্যামলছায়া” তে ভয়ে জুবুথুবু এক ভদ্রলোককে দেখে মুক্তি কমান্ডারের ভূমিকায় হুমায়ূন ফরিদী বলেছিলেন, “আসেন যুদ্ধ করি”। ভদ্রলোকের ভূমিকায় মডেল/ অভিনেতা শিমুল তখন বলেন, “আমি তো যুদ্ধ করতে পারি না। আমি একজন ইঞ্জিনিয়ার, জার্মানিতে থাকি। উত্তরে কমান্ডার ফরিদী বলেন, “ঢিল ছুঁড়ছেন না জীবনে? আপনি গ্রেনেড চার্জ করবেন, শিখাইয়া দিবোনে।“
যে কিছুই পারে না, তার ভেতরেও যে আগুন জ্বালাতে পারে, সেই তো সত্যিকারের মুক্তি কমান্ডার। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, আপনি না মুক্তিযুদ্ধে গেরিলাবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলেন? তাহলে এখন কেন একজন কমান্ডারের মতো প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে পারছেন না?
মুক্তিযুদ্ধেও সবার হাতেই অস্ত্র ছিল না, আর বিশ্বায়নের এই যুগে অস্ত্র বলতে শুধু মারণাস্ত্রকেই বুঝায় না। শিক্ষা-দীক্ষায়, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, প্রযুক্তি-গবেষণায় এগিয়ে গেলেই শুধুমাত্র টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়াকে দেখেন!
মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীন হওয়া দেশের শিক্ষাব্যাবস্থা এভাবে হেরে যেতে পারেনা। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার এভাবে হেরে যাওয়া দেখে গভীরভাবে ব্যথিত হই মাননীয় মন্ত্রী!!
পরিবেশ প্রকৌশলী ও গবেষক, জার্মানি থেকে।