প্রসংগ: মানব মন এবং শয়তান

ড. মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম খান

মানবের অস্থির প্রকৃতি সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “মানুষ তো সৃষ্টি হয়েছে অস্থির চিত্ত নিয়ে।” (সূরা আল-মা’আরিজ : ১৯)। তাই মানুষ সবকিছু দ্রুত পেতে চায়, কল্যাণ ও অকল্যাণের ব্যবধান না বুঝে দু’টোই কামনা করে। আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “মানুষ যেভাবে কল্যাণ কামনা করে সেইভাবে অকল্যাণ কামনা করে। মানুষ তো খুবই দ্রুততা প্রিয়।” (সূরা আল-ইসরা : ১১)। মানুষ এতই অস্থির চিত্ত যে, যখন সে কোন দুঃখ-কষ্টের সম্মুখীন হয়, তখন হা-হুতাশ শুরু করে। আবার কল্যাণপ্রাপ্ত হলে কৃপণতা বশে অকৃতজ্ঞ বান্দা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “যখন তাকে অনিষ্ট স্পর্শ করে, তখন সে হা-হুতাশ করে। আর যখন কল্যাণপ্রাপ্ত হয়, তখন কৃপণ হয়ে যায়। তবে তারা স্বতন্ত্র, যারা নামায আদায়কারী।” (সূরা আল-মা’আরিজ : ২০-২২)। প্রত্যেক মানবই অসুখ ও বিপদ-আপদে আল্লাহ তা’আলাকে সবিনয়ে সাহায্যের জন্য ডাকেন। মূর্তিপূজকরাও দেব-দেবীর কথা ভুলে এক ভগবানকে ডাকেন। এমনকি নাস্তিকরাও একাজ করেন। অথচ বিপদ মুক্তির পর মানুষ অকৃতজ্ঞ হয়ে পড়ে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “আর যখন মানুষ কষ্টের সম্মুখীন হয়, শুয়ে বসে, দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকতে থাকে। তারপর আমি যখন তা থেকে মুক্ত করে দেই, সে কষ্ট যখন চলে যায়, তখন মনে হয়, কখনো কোন কষ্টের সম্মুখীন হয়ে যেন আমাকে ডাকেইনি।” (সূরা ইউনুস : ১২); “আমি যখন মানুষকে আমার রহমত আস্বাদান করাই, তখন সে উল্লসিত হয়, আর যখন তাদের কৃতকর্মের কারণে কোন অনিষ্ট ঘটে, তখন মানুষ খুব অকৃতজ্ঞ হয়ে যায়।” ( সূরা আশ-শূরা)।
মানুষ কল্পনা প্রবণ এবং সর্বদা চিন্তাগ্রস্ত থাকে। রাসূল (সঃ) বলেছেন, তোমাদের প্রত্যেক ব্যক্তির সাথেই একটি করে শয়তান নির্ধারিত আছে। সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সঃ)! আপনার সাথেও কি? তিনি (সঃ) বললেন, হ্যাঁ, আমার সাথেও। তবে শয়তানের মুকাবিলায় আল্লাহ পাক আমাকে সাহায্য করেছেন। আমি তার ব্যাপাওে সম্পূর্ণরূপে নিরাপদ, সুতরাং এখন সে আমাকে কোন ভালো কাজ ছাড়া অন্য কাজের দিকে নিবার চেষ্টা করে না। (মুসলিম, ৬৮৫০)। শয়তান সর্বদা মানবকে বিপথগামী করতে নানা কৌশল অবলম্বন করে থাকে। এ সম্পর্কে রাসূল (সঃ) একদা ভাষণ দানকালে বললেন, সাবধান! আমার প্রতিপালক আজ আমাকে যা শিক্ষা দিয়েছেন, তা হতে তোমাদেরকে এমন বিষয়ের শিক্ষা প্রদান করার জন্য তিনি নিদের্শ দিয়েছেন, যে বিষয়ে তোমরা সম্পূর্ণরূপে অজ্ঞ। তা হল এই যে, আমি আমার বান্দাদেরকে যে ধন-সম্পদ দান করব, তা সর্ম্পূণরূপে বৈধ। আমি আমার সকল বান্দাকে খাঁটি প্রকৃতি (আল-ফিতরায়) দিয়ে সৃষ্টি করেছি। তারপর তাদের নিকট শয়তান এসে তাদেরকে দ্বীন হতে বিচ্যুত করে দিয়েছে। আমি যে সকল বস্তু তাদের জন্য বৈধ করেছিলাম, সে তা অবৈধ করে দিয়েছে। অধিকিন্তু শয়তান তাদেরকে আমার সাথে এমন বিষয় শিরক করার জন্য নিদের্শ দিয়েছে যে বিষয়ে আমি কোন সনদ পাঠাইনি (মুসলিম, ৬৯৪৫)। শয়তানের প্ররোচনাতেই মানুষ শুধুমাত্র পার্থিব কল্যাণ ও সমৃদ্ধির জন্য অহর্নিশ চিন্তামগ্ন থাকে। তাই পরকালীন কল্যাণ তার চিন্তা-চেতনায় স্থান পায়না। আত্মিক পরিশোধনের গুরুত্বও সে অনুধাবন করেনা। সর্বদাই ধর্মীয় মূল্যবোধের বিরোধী কর্মের প্রতি সে মগ্ন থাকে। অন্যদিকে ধর্মীয় মূল্যবোধের শ্রেষ্ঠত্ব মানুষকে পরকাল সচেতন করে তোলে।
ইসলামী মূল্যবোধ হচ্ছে মানবের পার্থিব জীবনের জন্য পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা যা পার্থিব ও পরকালের সাফল্যে আল্লাহ তা’আলার প্রদত্ত মানবের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ এবং অন্যতম ব্যবস্থা। মানবের অস্থির মনের নিয়ন্ত্রণে এবং ভারসাম্য রক্ষায় আল্লাহ-সচেতনতা ও পরকালের জবাবদিহি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই সার্বজনীন পদ্ধতির অনুসরণে আল্লাহ ভীরু হৃদয়ে, আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টির জন্য পার্থিব জীবন যাপন না করলে অস্থির মনকে স্থিও রাখা সম্ভব নয়। শয়তানের ফিসফিসানির প্রভাবে মন্দ চিন্তা গ্রস্ত মনকে সুপথে পরিচালিত করা যায় না। যারা ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রকৃত জ্ঞানের অভাবে আল্লাহ-সচেতনতায় আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পার্থিব জীবন পরিচালনা করে না, তারা পক্ষান্তরে হয়ে পড়ে শয়তানের কুমন্ত্রণার পাত্র। পার্থিব জীবনকে তারা চরম ও পরম পাওয়া বলে স্থির করে। ভোগবিলাসপূর্ণ জীবনের প্রতি অতিরিক্ত মোহ মানুষকে বিপথগামী করে এবং ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়। আবার অনেকেই নিয়ন্ত্রণহীন অস্থির মনের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য মিথ্যা অজুহাতে মানুষ হত্যার মত গর্হিত কাজে জড়িত হয়। বর্তমানে সারাবিশে^ই এ ধরনের মানবের নিষ্ঠুর কর্মের শিকার হচ্ছেন অসংখ্য নিরীহ নির্দোষ মানুষ। তাতে ইহকালে মানুষের কাছে অপমানিত হয় এবং পরকালের জীবনকে বিসর্জন দেয়।
বর্তমানে স্যাকিউলার পন্থী (ধর্মহীন) ব্যক্তিদেরকে মুক্তমনা ব্যক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। অথচ তারা ভুলে গিয়েছে যে, মানব সন্তান সৃষ্টি হয়ে চিন্তাশক্তির স্বাধীনতা (ফ্রিডম অব চয়েস) নিয়ে, এটিই হচ্ছে মুক্তমন। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “বল, সত্য তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আগত। অতএব, যার ইচ্ছা , বিশ^াস স্থাপন করুক এবং যার ইচ্ছা অমান্য করুক।” (সূরা আল-কাহ্্ফ : ২৯)। অতএব বলা যায় বিশেষ একটি দল নয় বরং সকল মানবই মুক্তচিন্তা বা মুক্তমনের অধিকারী। মানবতার চিরশত্রু ইবলিস জ¦ীন জাতির অন্তর্ভুক্ত বিধায় তারও মানবের মত চিন্তাশক্তির স্বাধীনতা ও মুক্তমন ছিল। তাই আল্লাহ তা’আলার একটি পবিত্র আদেশ অমান্য করে অভিশপ্ত হয়ে কাফের হয়েছে। এটি ছিল তার মুক্তমনের অপব্যবহারের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এদিকে প্রকৃত ধর্মীয় জ্ঞানের অভাবে অনেকে ধর্মীয় মূল্যবোধ সম্পর্কে আপত্তিমূলক মন্তব্য করে। আবার ধর্মীয় জ্ঞানী হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের অনেকেই অর্থ-সম্পদের লোভে আল-কুর’আনের অপব্যাখ্যায় ফাতওয়া দিয়ে মুসলমানদের বিভ্রান্ত করেন। আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “যাদের মনে ভয় রয়েছে (আল্লাহ-সচেতন অন্তর), তাদের উপর শয়তানের আগমন ঘটার সাথে সাথেই তারা সর্তক হয়ে যায় এবং তখনই তাদের বিবেচনাশক্তি জাগ্রত হয়ে উঠে। পক্ষান্তরে যারা শয়তানের ভাই (মুক্ত মনকে স্বাধীনভাবে ব্যবহার করে), তাদেরকে সে ক্রমাগত পথভ্রষ্টতার দিকে নিয়ে যায়। অতঃপর তাতে কোন কমতি করে না (মানবকে বিপথগামী করায় সে সর্বদা ব্যস্ত থাকে)।” ( সূরা আল-আরাফ : ২০১-২০২)।
কিছু সংখ্যক ধর্মে রয়েছে প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণে সংসারত্যাগী বৈরাগী অথবা কৌমার্য-ব্রত জীবন যাপনের ব্যবস্থা। একারণেই এদের অনেকেই মানব প্রবৃত্তির অন্যতম যৌন চাহিদা নিবারণের জন্য অবৈধ কর্মে জড়িত হয়ে চরম অপরাধী হয়। চিত্তের অবৈধ দাবী এবং প্রকৃতিগত জৈবিক চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করতে তারা হয় অক্ষম। এ সকল ধর্ম যাজকের নামে প্রতিনিয়তই যৌনতার অপকর্মেও কাহিনী প্রকাশ পায়। তদুপরি পার্থিবের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে প্রচুর পরিমাণে ধন-সম্পদ আত্মসাৎ করে। তারা অপরাধমূলক ও অমানবিক কর্ম এবং শিরকের মত সবচেয়ে বড় পাপ থেকে বের হতে পারেন না। শয়তানের প্রভাব সম্পর্কে নবীর (সঃ) স্ত্রী সাফিয়া বিনতে হুয়াই (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, একবার তিনি রাসূল (সঃ) এর সংগে দেখা করতে আসলেন। এ সময় রাসূল (সঃ) রমজানের শেষ দশ দিনে মসজিদে এতেকাফে ছিলেন। সাফিয়া (রাঃ) রাসূল (সঃ) এর সাথে কিছুটা রাত পর্যন্ত কথাবর্তা বললেন। তারপর চলে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। তখন রাসূল (সঃ) তাকে এগিয়ে দেয়ার জন্য উঠলেন। যখন রাসূল (সঃ) মসজিদের অন্য দরজার কাছে পৌঁছলেন, সেটি ছিল অপর বিবি উম্মে সালামার (রাঃ) বাসস্থানের নিকটে অবস্থিত, তখন তাদের পাশ দিয়ে মদীনাবাসী দু’জন আনসারী পথ অতিক্রম করছিলেন। দু’জনই রাসূল (সঃ) কে সালাম দিলেন। পুনরায় তারা দু’জন রওয়ানা হয়ে গেলেন। তখন রাসূল (সঃ) তাদের দু’জনকে ডেকে বললেন একটু অপেক্ষা করো। (আমার সাথের ) মহিলাটি আর কেউ নয়, (আমারই স্ত্রী) সাফিয়া বিনতে হুয়াই। (এ কথা শুনে) তারা দু’জনই বলে উঠলেন, সুবহানাল্লাহ। ইয়া রাসূলুল্লাহ! তাদের দু’জনের মনে এটা খুব লাগল। রাসূল (সঃ) বললেন, শয়তান বনী আদমের শিরা- উপশিরায় রক্তের মতো চলাচল করে। তাই আমি আশঙ্খা বোধ করলাম, শয়তান (কোন ফাঁকে) তোমাদের মনে কোনরূপ
প্ররোচণা ঢুকিয়ে দেয় নাকি। (সহীহ আল-বোখারী, খন্ড ৫, ৫৭৭৮)।
আবার মনোযোগের পরিমাণের উপরই নির্ভও কওে কাজের গুণাগুণ এবং সফল হওয়ার সম্ভাবনা। মনের চঞ্চলতা এতোটাই গতিশীল যে, সে এক মূহুর্তেই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে আসতে পারে। অতীত ও বর্তমান জীবনের বিভিন্ন অঙ্গনের ঘটনার বিষয় দৃশ্যমান করতে পারে, অবাস্তব চিন্তায় মন্দ কর্মের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ায় প্রভাবিত হতে পারে। ভবিষ্যত জীবনের অলীক কল্পনায় চিন্তামগ্ন থাকতে পারে। একসাথে বহু রকমের চিন্তায় মগ্ন থাকতে পারে। ইসলামী বিধান অনুসারে পাঁচ বেলা নামায আদায় করা প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের জন্য ফরয দায়িত্ব। যার উপর নির্ভর করে পার্থিব এবং পরকালের সাফল্যের চাবিকাঠি। এ কারণেই গভীর মনোনিবেশে একাগ্রচিত্তে আল্লাহ-সচেতনতায় নামায আদায় করার তাগিদ আল-কুর’আনের বহু আয়াতে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “মু’মিনগণ সফলকাম হয়ে গেছে, যারা নিজেদের নামাযে বিনয়-ন¤্র (গভীর মনোযোগে নামায আদায় করে), এবং যারা নামাযসমূহে খবর রাখে (অর্থাৎ অত্যন্ত যতেœর সাথে নামায আদায় করে)”। ( সূরা আল-মু’মিনুন : ১-২, ৯); “মানুষ তো সৃজিত হয়েছে অস্থির চিত্ত নিয়ে, যখন তাকে অনিষ্ট স্পর্শ করে, তখন সে হা-হুতাশ করে। আর যখন কল্যাণপ্রাপ্ত হয়, তখন কৃপণ হয়ে যায়। তবে তারা স্বতন্ত্র, যারা নামায আদায়কারী।” (সূরা আল-মা’আরিজ : ১৯-২২)
আল-কুর’আন পাঠ শুরু করা এবং নামাযের শুরুতে শয়তান থেকে আল্লাহ তা’আলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করার আদেশ আল্লাহ তা’আলা দিয়েছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “অতএব যখন তুমি কুর’আন পাঠ কর, তখন বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ কর।” (সূরা আন-নাহল : ৯৮। নামাযের সময় শয়তানের কর্ম ও প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে রাসূল (সঃ) বলেছেন যে, যখন নামাযের আযান দেয়া হয় তখন শয়তান বায়ু নিঃসরণ করে পিছনে ফিরে ফিরে দৌড়াতে থাকে, যেন আযানের আওয়াজ তার কানে না যায়। আযান শেষ হলে সে তখন আবার ফিরে আসে। আর যখন একামত বলা হয় তখন আবার পিছনে ফিরতে ফিরতে দৌড়াতে শুরু করে। একামত শেষ হলে আবার সে ফিরে আসে এবং মানুষের অন্তওে ওয়াসওয়াসা দিতে শুরু করে। সে তাকে এমন সব বস্তুর কথা মনে করিয়ে দেয় যা ইতিপূর্বে সে কোনদিনই মনে করেনি। ফলে সে কয় রাকাত নামায পড়ল তা স্মরণ রাখতে পারে না। (মুসলিম, ৭৪৫)।
মনের কল্পনা ও চিন্তায় ভারসাম্যহীন হলেই মানুষ হয় মানসিকরোগী। অনেকেই মনোচিকিৎসকের কাছে যায়। তাতে আংশিকভাবে উপকৃত হয়। তবে মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য মনোবিজ্ঞানীর চিকিৎসায় রয়েছে সীমাবদ্ধতা। এর জন্য দরকার হয় আধ্যাত্মিকভাবে আত্মাকে পরিশোধিত করা। বিশুদ্ধ ও পবিত্র হৃদয়ের গুরুত্ব সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “যেদিন (শেষবিচার দিবসে) সম্পদ ও সন্তান কোন কাজে আসবে না; কেবল সে-ই সফলকাম হবে যে বিশুদ্ধ হৃদয় নিয়ে আল্লাহর কাছে উপস্থিত হবে।” (সূরা আশ-শু’আরা : ৮৮-৮৯)। বর্তমানে নানা ধরনের আসক্তির শিকার অনেকে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। অথচ নিজের প্রবৃত্তির উপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ থাকলে মানুষ কস্মিনকালেও এ জঘণ্য পাপাচারে জড়িত হতনা। আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “অতঃপর তাকে (মানবকে) তার অসৎকর্ম ও সৎকর্মেও জ্ঞান (ভালো-মন্দ যাচাই করায় বিচক্ষণতা) দান করেছেন। যে নিজেকে শুদ্ধ করে, সেই সফলকাম হয় এবং যে নিজেকে কলুষিত করে, যে ব্যর্থ মনোরথ হয়।” (সূরা আশ-শামস : ৮-১০)। মনের বা নাফসের কল্পনা ও চিন্তাকে আল্লাহ তা’আলা স্মরণে পবিত্র ও শুদ্ধ রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একমাত্র সত্যনিষ্ঠ হৃদয়ে আল্লাহ তা’আলার সন্তষ্টির উদ্দেশ্যে নামায আদায়ে আল্লাহ তা’আলা স্মরণে একাজ সহজ হয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “তুমি তোমার প্রতি প্রত্যাদিষ্ট কিতাব (আল-কুর’আন) পাঠ কর এবং নামায কায়েম কর। নিশ্চয় নামায অশ্লীল ও গর্হিত কার্য থেকে বিরত রাখে। আল্লাহর স্মরণ সর্বশ্রেষ্ঠ।” (সূরা আল-আনকাবুত : ৪৫)। কাজেই শুধুমাত্র বাহ্যিক কথা-বার্তায় ও পোশাকে পরিপাটি ও শুদ্ধ থাকলে একাজে সফল হওয়া যাবে না। সফলকাম হতে অবশ্যই আভ্যন্তরীণ [হৃদয়, মন, নাফস] চিন্তায় শুদ্ধতা থাকতে হবে।
মানুষের মন সাধারণত মন্দকর্ম প্রবণ। এ সর্ম্পকে নবী ইউসুফের (আঃ) জবানীতে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “আমি [ইউসুফ (আঃ)] নিজেকে নির্দোষ বলি না। নিশ্চয় মানুষের মন মন্দ কর্মপ্রবণ কিন্তু সে নয়-আমার প্রতিপালক যার প্রতি অনুগ্রহ করেন। নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক ক্ষমাশীল, দয়ালু।” (সূরা ইউসুফ : ৫৩)। মানুষের অস্থির মন, যার মূল উপাদান হচ্ছে চার বস্তুর মত যথা -অগ্নি, পানি, মৃত্তিকা ও বায়ু। এগুলো অবস্থার ও পরিবেশের ভিত্তিতে মনের প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তন হয় বিধায় এ মন আপন স্বভাবে প্রত্যেককে মন্দ কাজের দিকে আহ্বান করে। তবে ঐ মন এর ব্যতিক্রম, যার প্রতি আল্লাহ তা’আলা অনুগ্রহ করেন এবং মন্দ স্পৃহা থেকে পবিত্র রাখেন। নবী-রাসূলরা ছিলেন এরকম মনের অধিকারী। আল্লাহ তা’আলার অশেষ অনুগ্রহে তারা এরকম মন অধিকারী হয়েছিলেন। মানব মনের প্রকৃতি হচ্ছে তিন প্রকার কাজেই তিন স্তরে প্রতিষ্ঠিত থাকে। উপরোক্ত আয়াতে রয়েছে এর একটি স্তর “ নাফসে আম্মারা” মন্দ কর্ম প্রবণ মন। সর্বদাই মন্দ বা খারাপ কাজের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে থাকে। মনের প্রবণতা সম্পর্কে রাসূল (সঃ) সাহাবাদের প্রশ্ন করলেন, এরূপ সাথী সর্ম্পকে তোমাদের কি ধারণা, যাকে সম্মান-সমাদার করলে সে তোমাদেরকে বিপদে ফেলে দেয়। পক্ষান্তরে তার অবমাননা করা হলে অর্থাৎ ক্ষুধার্ত ও উলঙ্গরাখা হলে সে তোমাদের সাথে সদ্ব্যবহার করে? সাহাবায়ে-কেরাম আরয করলেন, ইয়া রাসুলূল্লাহ! এর চাইতে অধিক মন্দ দুনিয়াতে আর কোন কিছু হতে পারে না। তিনি (সঃ) বললেন: ঐ সত্তার কসম, যার কব্জায় আমার প্রাণ, তোমাদের বুকের মধ্যে যে মনটি আছে সে-ই এই ধরনের সাথী। (কুরতবী) অন্য হাদিসে আছে, তোমাদের প্রধান শত্রু স্বয়ং তোমাদের মন। সে তোমাদেরকে মন্দ কাজে লিপ্ত করে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করে এবং নানা বিধ বিপদাপদে জড়িত করে। (মা’আরেফুল ক্বোরআন, পৃষ্ঠা ৬৭১)। অদৃশ্য শয়তান মানবের সাথী হয়েই মানুষের মনকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। যারা মনকে নিয়ন্ত্রণ করায় ধর্মীয় মূল্যবোধে বর্ণিত ব্যবস্থা গ্রহণ না করে তারা শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে মনকে মুক্ত রাখতে পারে না। ইতির্পূবে উল্লিখিত উম্মাহর মাতা সাফিয়া (রাঃ} বর্ণিত হাদিস থেকে সেটা স্পষ্টভাবে বুঝা যায়।
প্রত্যেক মানব-মনই মন্দ কাজের আদেশ দাতা। তবে মানব যখন আল্লাহ তা’আলা ও পরকালের ভয়ে মনের আদেশ পালন থেকে বিরত থাকে, তখন মন, দ্বিতীয় স্তর ‘নাফসে লাওয়ামা’ [ ধিক্কারকারী, অনুতপ্ত মন] মনে পরিণত হয়। সৎকর্ম সর্ম্পকেও নিজেকে এই বলে তিরস্কার কওে যে, আরও বেশি সৎকাজ সম্পাদন কওে উচ্চমর্যাদা লাভ করলে না কেন? (আত-তবারী ২৪:৫০; ইবনে কাসীর, খন্ড ১০ পৃষ্ঠা ২৬২) এ মন সর্ম্পকে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “আরও শপথ করি সেই মনের, যে নিজেকে ধিক্কার দেয় (লাওয়ামা)।” ( সূরা আল- ক্বেয়ামাহ : ২)।
হাসান আল-বসরী (রাহঃ) নাফসে-লাওয়ামার তফসীর করেছেন ‘নাফসে-মু’মিন’। তিনি বলেছেন, আল্লাহর কসম, মু’মিন তো সর্বদা সর্বাবস্থায় নিজেকে ধিক্কারই দেয়। সৎকর্মসমূহেও সে আল্লাহর শানের মোকাবেলায় আপন কর্মে অভাব ও ত্রুটি অনুভব করে। কেননা, আল্লাহর হক পুরোপুরি আদায় করা সাধ্যাতীত ব্যাপার। ফলে তার দৃষ্টিতে ত্রুটি থাকে এবং তজ্জন্যে নিজেকে ধিক্কার দেয়। নাফসের প্রকৃতি হচ্ছে সে মন্দ কাজে জড়িত হতে সর্বদা আদেশ করে। কিন্তু ঈমান, সৎকর্ম ও সাধনা এবং আল্লাহ -সচেতনতার কারণে সে নাফসে-লাওয়ামা হয়ে যায় এবং মন্দ কাজ ও ত্রুটির জন্য অনুতপ্ত হয়। কিন্তু মন্দ থেকে সে সর্ম্পূণরূপে বিচ্ছিন্ন হয় না। অতঃপর সৎকর্মে উন্নতি ও আল্লাহ তা’আলার নৈকট্যলাভের চেষ্টা করতে করতে যখন শরিয়তের আদেশ-নিষেধ প্রতিপালন তার স্বভাবগত ব্যাপার হয়ে যায় এবং শরিয়তের বিরুদ্ধাচরণ ঘৃণা অনুভব করতে থাকে, তখন নাফসে-লাওয়ামা নাফসে-মুতমায়িন্না উপাধিপ্রাপ্ত হয়। (মা’আরেফূল ক্বোরআন, পৃষ্ঠা ৬৭১)। মু’মিনদের আত্মা (নাফসে -মুতমায়িন্না) সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “হে প্রশান্ত মন (আত্মা, নাফসে-মুতমায়িন্না), তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট ফিরে যাও সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে।” {সূরা আল-ফযর : ২৭-২৮)। সহজাত প্রকৃতির কারণে সকল আদম সন্তান খারাপ কাজকে ঘৃণা করে। ভালো কাজে উদ্যোগী হয়ে সফল হলে মনে প্রশান্তি লাভ করে। এজন্য তারা সঙ্ঘবদ্ধভাবে বিভিন্ন ধরনের জনকল্যাণমূলক কাজে জড়িত হয়। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে আর্তমানবতার পাশে দাঁড়ায়। আবার শয়তানের প্ররোচনায় মানুষ নানাবিধ মন্দ কাজেও নিমগ্ন হয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “যখন লোকমান উপদেশচ্ছলে তার পুত্রকে বলল: হে বৎস! আল্লাহর সাথে শরীক করো না। নিশ্চয় আল্লাহর সাথে শরীক করা মহা অন্যায়। তাদেরকে যখন বলা হয়, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তোমরা তার অনুসরণ কর, তখন তারা বলে, বরং আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে যে বিষয়ের উপর পেয়েছি, তারই অনুসরণ করব। শয়তান যদি তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তির দিকে দাওয়াত দেয়, তবুও কি।” (সূরা লোকমান : ১৩,২১)। অতএব, শয়তানের প্ররোচনা থেকে আত্মরক্ষা এবং ইহকালীন ও পরকালীন সাফল্য লাভের জন্য মানসিক স্থিরতার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
আইওয়া।