প্রসঙ্গ : ব্যাটল ফর স্পিকার

বাহারুল আলম :

অনেক নাটকীয়তা, উত্তেজনা, অনিশ্চয়তা ও বিভ্রান্তির পর অবশেষে গত ৭ জানুয়ারি ১১৮তম মার্কিন কংগ্রেসের স্পিকার নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। এটা সম্পন্ন করতে ৪ দিনে সর্বমোট ১৫ দফা ভোট অনুষ্ঠান করতে হয়। গত ৬ জানুয়ারি মধ্যরাতের পর ১৫ দফা ভোট শেষে নতুন স্পিকার নির্বাচিত হন ক্যালিফোর্নিয়ার রিপাবলিকান সদস্য কেভিন ম্যাকার্থি। তিনি আগে হাউজের মাইনরিটি লিডার ছিলেন। সেই হিসেবে বহু আগে থেকেই ধারণা ছিল রিপাবলিকানরা হাউজে মেজরিটি পেলে তিনিই হবেন স্পিকার। ম্যাকার্থি নিজেও বহু ফোরামে স্পিকার হওয়ার জন্য তার প্রবল আগ্রহের কথা বহুবার জানান দিয়েছেন। মার্কিন কংগ্রেসের বিগত ১০০ বছরের ইতিহাসে স্পিকার নির্বাচনে এ ধরণের বহু দফা ভোটের ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি।

১০০ বছর আগে ১৯২৩ সালে তিনদিনে ১১ দফা ভোটের পর স্পিকার নির্বাচন হয়েছিল। সে সময় ম্যাসাচুয়েটসের প্রবীণ রিপাবলিকান সদস্য ফ্রেডারিক এইচ গিলেন কয়েক দফা ভোটের পর স্পিকার নির্বাচতি হন। এর আগে ১৮৫৫ সালে দু’মাস ধরে ৪৪ দফা ভোটাভোটির পর স্পিকার নির্বাচনের দৃষ্টান্ত রয়েছে। বর্তমান স্পিকার ম্যাকার্থিও আগে নিকট অতীতে ডেমোক্র্যাট ন্যান্সি পোলোসি এবং রিপাবলিকান জন বেনার নিজ নিজ দলের পূর্ণ সমর্থন পেয়ে প্রথম দফা ভোটেই স্পিকার নির্বাচিত হন।

গত ৩ জানুয়ারি প্রতিনিধি পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশনে দিনের কর্মসূচি (Order of the day) অনুযায়ী স্পিকার নির্বাচনের ভেটোভোটি শেষে ম্যাকার্থি স্পিকার নির্বাচিত হতে প্রয়োজনীয় ২১৮ ভোট পেতে ব্যর্থ হলে স্পিকার নির্বাচন সম্ভব হয়নি। রিপাবলিকান পার্টির ২২২ জন সদস্যের মধ্যে ১৯ জন ম্যাকার্থিকে ভোট না দেয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অপরদিকে স্পিকার পদে ডেমোক্র্যাট নেতা, নিউইয়র্কের ব্রুকলিন থেকে নির্বাচিত কংগ্রেস সদস্য, হাকিম জেফরিস তার দলের সব সদস্যের (২১২) ভোট লাভ করেন। প্রথম দফা ভোটে হারের পর প্রতিদিন হাউজ কিছু সময়ের জন্য মূলতবি রেখে গত ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৪ দফা ভোট হয় এবং সব ভোটেই ম্যাকার্থি প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভোট পেতে ব্যর্থ হন।

ইতোমধ্যে রিপাবলিকান নেতা, সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, রিপাবলিকান বিদ্রোহী সদস্যদের কয়েকজনকে ফোন করে তাদেরকে ম্যাকার্থিকে সমর্থনের আহ্বান জানান। দলের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং কংগ্রেসে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য এই আহ্বান জানানো হয়। তাছাড়া অধিবেশনের বিরতিকালে ম্যাকার্থি নিজে এবং তার সমর্থক অন্য কয়েকজন সদস্য বিদ্রোহী সদস্যদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে তাদেরকে নানা কনসেশনদানের আশ্বাস দিয়ে ম্যাকার্থিকে ভোটদানের অনুরোধ জানান। প্রদত্ত কনসেশনগুলোর মধ্যে বিভিন্ন কংগ্রেসনাল কমিটিতে বিদ্রোহী সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ পদ প্রদান এবং স্পিকার পদ থেকে অপসারণের জন্য একজন সদস্যের আনীত প্রস্তাবের (Motion of No-confidence) উপর আলোচনার সুযোগদান অন্যতম। ট্রাম্পের আহ্বান এবং এ ধরণের কনসেশনের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্রোহীদের ১৪ জন সদস্য ম্যাকার্থিকে ভোট দিতে সম্মত হন। রিপাবলিকান সদস্য অ্যান্ডি বিগস (অ্যারিজোনা), ড্যান বিশফ (নর্থ ক্যারোলাইনা), চিপ রয় (টেক্সাস), ম্যাট রোজেনডেল (মন্টানা), লরেন বোবার্ট (কলোরাডো) এবং ম্যাট গেটস (ফ্লোরিডা) অবশ্য ম্যাকার্থিকে ভোট না দেয়ার সিদ্ধান্তে অবিচল থাকেন। বহু দেন-দরবারের পর ১৫ দফা ভোটে এসব সদস্য ম্যাকার্থিকে সরাসরি ভোট না দিয়ে নিজেদের ‘উপস্থিত’ বা Present ঘোষণা দেন।

এ ঘোষণাকে ম্যাকার্থির প্রতি তাদের সমর্থন ধরে নিয়ে তাকে স্পিকার পদে যথাযথভাবে নির্বাচিত (Duly elected) বলে ঘোষণা দেয়া হলে স্পিকার নির্বাচনের নাটকের যবনিকাপাত হয়। স্পিকার নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে সব সদস্য দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে নতুন স্পিকারকে অভিনন্দন জানান। ডিন অব কংগ্রেস কেন্টাকির প্রবীণ কংগ্রেস সদস্য হ্যাল রজার্স নতুন স্পিকারকে শপথবাক্য পাঠ করান। পরে স্পিকার নতুন কংগ্রেস সদস্যদের শপথ গ্রহণ করান। বিগত কংগ্রেসের স্পিকার ন্যান্সি পোলোসির পক্ষ থেকে হাকিম জেকরিস নতুন স্পিকারের হাতে স্পিকারের হাতুড়ি (Gavel) তুলে দেন।

স্পিকার নির্বাচনে অচলাবস্থার জন্য আপাত দৃষ্টিতে দৃশ্যপটে ২০ জন রিপাবলিকান সদস্যকে দেখা গেলেও কোনো কোনো রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক আড়াল থেকে এক্ষেত্রে ট্রাম্পের কলকাঠি নাড়ানোকে মুখ্য বলে মনে করেন। রিপাবলিকান পার্টিতে ট্রাম্পের কথাই যে শেষ কথা এবং তার মতের বাইরে গিয়ে কেউ যে সুবিধা করতে পারবে না, সেটা দেখিয়ে দিতেই এ নাটক সৃষ্টি করা হয় বলে এসব পর্যবেক্ষক মনে করেন।

কট্টর ট্রাম্প সমর্থক তথাকথিত ফ্রিডম বা মাগা ককাসের এসব বিদ্রোহী সদস্য, যারা Holdout নামে পরিচিতি পান, তারা ম্যাকার্থিকে এটা বুঝিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্পের আশীর্বাদ ছাড়া তার পক্ষে কোনদিন স্পিকার হওয়া সম্ভব ছিল না এবং সে কারণে তিনি যেনো কখনো ট্রাম্পের অবাধ্য হবার চেষ্টা না করেন!
নিকট অতীতে, ৬ জানুয়ারি, ক্যাপিটল ভবন হামলার ঘটনায় ম্যাকার্থি পরোক্ষভাবে ট্রাম্পকে দোষারোপ করেছিলেন। এর ফলে ম্যাকার্থি ট্রাম্প ও তার সমর্থকদের বিরাগভাজন হন। তারা ম্যাকার্থিকে যথেষ্ট ট্রাম্প অনুগত (Insufficiently loyal to Trump) নন বলে মনে করতে থাকেন। যার ফলশ্রুতিতে তাকে স্পিকার হতে এতসব কাঠখড় পোড়াতে হয়।

স্পিকার নির্বাচন শেষ হওয়ার দেশবাসী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও এ ঘটনায় রিপাবলিকান পার্টিতে বিরাজমান বড় ধরণের অনৈক্যের বিষযটি অত্যন্ত নগ্নভাবে ফুটে উঠেছে, যা আগামী দিনে তাদের রাজনীতি ও নির্বাচনী ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে অনেকেই মনে করেন। আব্রাহাম লিংকন বলেছেন, A home divided against itself cannot stand. স্পিকার নির্বাচনের মতো একটি গতানুগতিক প্রক্রিয়া সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে রিপাবলিকানদের ব্যর্থতার কারণে দেশ পরিচালনার (এড়াবৎহ) মতো একটি বড় ও গুরুদায়িত্ব তারা কীভাবে সামলাতে সক্ষম হবেন, তা নিয়ে বহু মহলে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে।

লেখক : কলামিস্ট।