প্রসঙ্গ যখন রাজনৈতিকীকরণ

সারওয়ার-উল-ইসলাম : ‘রাজনৈতিকীকরণ।’ শব্দটা উচ্চারণ করতেও কেমন যেন সমস্যা সৃষ্টি করে। ঠিক তেমনি সামাজিক-পারিবারিক-অর্থনৈতিক, সবখানেই শব্দটা ঢুকে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করছে। সমাজব্যবস্থার পুরো সিস্টেমকে নষ্ট করে দিচ্ছে। গত ২০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের উদ্যোগে ‘বাংলাদেশের বর্তমান সিভিল সার্ভিস ব্যবস্থা’ শীর্ষক একক বক্তৃতায় সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক সচিব আকবর আলি খান বলেছেন, ‘রাজনৈতিকীকরণের ফলে দেশের প্রশাসন প্রায় ভেঙে পড়েছে। আর এটা করেছে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলো। এক দল আরেক দলের চেয়ে এটিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।’
একজন গুণীজনের এমন নিরেট সত্য উপস্থাপন আমাদের কতটুকু ভাবায়? আমরা দেখছি সবখানেই রাজনীতি ঢুকে পড়ছে। যেকোনো সমস্যা হলে আমরা প্রথমে ভাবি অমুক জায়গায় কে আছেন? তার রাজনৈতিক পরিচয়টা কি? যদি তার রাজনৈতিক দল বর্তমানে ক্ষমতায় থাকে তা হলে পরিচিত কোনো রাজনৈতিক নেতাকে দিয়ে একটা ফোন করানো যায় কি না তাকে, সেটা নিয়ে ব্যস্ত হই। অর্থাৎ আমি আমার ব্যক্তিগত কাজ নিয়ে সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে গিয়ে নিজের সমস্যার কারণে অসুবিধায় পড়েছি, সেই সমস্যা থেকে বাঁচার জন্য অন্যায়ভাবে একটা ফোন করিয়ে সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার চেষ্টা করি। একবারও ভাবি না ওই সমস্যাটা যাতে না হয়, বা সমস্যা না পড়ার জন্য ন্যায়ভাবে কাজটা আগে কেন করলাম না? এভাবে একটা অন্যায়কে চাপা দিয়ে নিজেকে অনেক সফল মনে করি। এবং পরের অন্যায়টা করতে উৎসাহী হই।
আমাদের সমাজে আবার এমন লোকেরও অভাব নেই, যারা খুঁজে বেড়ায় কে কোন জায়গায় বিপদে পড়েছে। টাকার বিনিময়ে ক্ষমতাবানদের দিয়ে ফোন করিয়ে কিছু টাকা কামাই করে নেয় এরা। এদেরকে আবার দালাল বললে মন খারাপ করে। এরা ‘সিস্টেম’ শব্দটা উচ্চারণ করতে পছন্দ করে। আরে ভাই, আপনার কাজটা সিস্টেমে ফেলে করে দেব, কিছু খরচাপাতি করলেই চলবে। সেই সিস্টেম করতে গিয়ে রাজনৈতিকীকরণ হয়ে যাচ্ছে সব জায়গায়। একই কায়দায় অমুক নেতা তমুক নেতাকে ধরে তার দলের লোকের কাজ বলে অন্যায়ভাবে কাজ করিয়ে নেয়। অর্থাৎ প্রশাসনিক যে নিয়মকানুন সব নষ্ট করে দলীয় পরিচয়ে অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে কাজ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে প্রশাসন প্রায় ভেঙে পড়ছে।
কোনো কর্মকর্তা এখন আর তার ওপরের কর্তা ব্যক্তিকে পাত্তা দেয় না। সম্মান তো দূরের কথা। কারণ সে দেখে তার বসকে ম্যানেজ করে কত মানুষ কাজ বাগিয়ে নিচ্ছে অন্যায়ভাবে। রাজনৈতিক পরিচয়ের কাছে সবকিছু জিম্মি হয়ে গেছে। রীতিমত তটস্থ থাকে কর্তাব্যক্তিরা। কারণ কোনো হোমড়াচোমড়া নেতার কথা না শুনে ন্যায়ভাবে কাজটা করতে গিয়ে চাকরি হারাবার আশঙ্কা নিয়ে বাড়ি ফেরার দরকার কি?
প্রশাসন থেকে শুরু করে বর্তমানে সব সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিকীকরণ হয়ে যাচ্ছে। এটা শুধু বর্তমান সরকার না, এর আগের সরকারের আমলেও হয়েছে। এখন প্রতিযোগিতা চলছে রীতিমতো। কোন আমলে কত বেশি রাজনৈতিকীকরণ করা গেল প্রশাসনকে। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা যত দিন বন্ধ না হবে তত দিন দেশ কতটা এগুলো আর পেছালো সেই হিসেব করে কোনো লাভ নেই।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক সচিব আকবর আলি খান যে কথাটা বলেছেন সেটা অনেকেরই মনের কথা। পার্থক্য হচ্ছে উনি বলতে পেরেছেন আবার অনেককে বলতে গিয়েও ব্রেক কষেন। কারণ ওই যে রাজনৈতিক হিসেব। কতটুকু বললে নিজের স্বার্থে আঘাত আসবেÑ সেটা বিবেচনা করে থেমে যান। এই ব্রেক কষার দলে অনেক বুদ্ধিবিক্রেতা থেকে শুরু করে শিক্ষাবিক্রেতাও রয়েছেন।
আকবর আলি খান রাজনৈতিকীকরণ সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হলে কাজের জন্য রাজনীতিবিদদের জনগণের কাজে জবাবদিহিতা করতে হবে।
এখন তো আসলে কোনো কিছুর জন্য রাজনীতিবিদদের জবাবদিহি করতে হয় না। আমরা চাই সেই সুন্দর রাজনৈতিক পরিবেশ। যেখানে মানুষ তার অধিকার বঞ্চিত হবে না। সমাজের কর্তাব্যক্তিদের জবাবদিহিতা থাকবে। সেই দিনের প্রতীক্ষায় থাকা ছাড়া আমজনতার আর কি করার আছে?