প্রাসঙ্গিক ভাবনা

বাহারুল আলম :

গত ৫ অক্টোবর অষ্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় তেল উৎপাদনকারী মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ও রাশিয়াসহ আরো কয়েকটি দেশের সমন্বয়ে গঠিত ওপেক প্লাস-এর তেল মন্ত্রীদের এক সভায় আসছে নভেম্বর মাস থেকে প্রতিদিন ২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল কম উৎপাদনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে তেল সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় তেলের বাজারে ইতোমধ্যে বিরাজিত সংকট এর ফলে আরো গভীর হবে বলে অনেকেই মনে করছেন। বৈশ্বিক অর্থনীতির সম্ভাব্য বিপর্যয় থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে বৈঠক সূত্রে জানানো হয়।

এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন এর তীব্র সমালোচনা করে এটাকে একটা অদূরদৃষ্টিমূলক (Shortsighted) সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেন। শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশ হিসাবে সৌদি আরব এই সিদ্ধান্তের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সৌদি আরব বহুকাল ধরে মার্কিনীদের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। দু’বছর আগে সৌদি আরব আমেরিকার কাছ থেকে আগামী ১০ বছরে অস্ত্র ক্রয়ের জন্য ৪০০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি সই করেছে। তেল উৎপাদন হ্রাসের সিদ্ধান্তের কারণে বহু মার্কিন নেতা ঐ দেশের সঙ্গে মার্কিন সম্পর্কের নতুন মূল্যায়নের দাবি তুলেছেন।

সৌদি আরবে বর্তমান রাজপরিবারের শাসন নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু থাকার পেছনে ঐ দেশের শাসকদের প্রতি মার্কিন সরকারের সমর্থনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তথা অপরিহার্য বলে মনে করা হয়।

কিছুকাল আগে ব্যারেল প্রতি তেলের মূল্য ১২০ ডলারের উন্নীত হয়, যে কারণে আমেরিকাসহ সারাবিশ্বের বিভিন্ন দেশে তেলের মূল্যের ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটে, যা ঐসব দেশের অর্থনীতির উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। তেলের মূল্যবৃদ্ধির ডেমিনো এফেক্টের জেরে পরিবহন, বিদ্যুৎসহ সব পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়, যে কারণে সাধারণ মানুষ আর্থিকভাবে চাপের মধ্যে পড়েন।

আমেরিকায় প্রতি গ্যালন তেলের মূল্য স্থানভেদে ৪ থেকে ৭ ডলারে উন্নীত হয়। মার্কিন জনগণ তাদের কাজ ও দৈনন্দিন যাতায়তের জন্য সবসময় গাড়ি ব্যবহার করেন। সে কারণে গাড়ির জন্য তেল কেনা তাদের একটি প্রাত্যহিক বিষয়। এ অবস্থায় প্রতিদিন পাম্পে তেলের উচ্চ মূল্য দেখে তাদেরকে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করতে দেখা যায়। দু’বছর আগে তেলের মূল্য যখন এখনকার তুলনায় অর্ধেক ছিল, সেখানে তেলের এহেন উচ্চমূল্যের জন্য তাদের অনেকে বাইডেন সরকারকে দায়ী করতে থাকেন। এটা বাইডেনের জন্য রাজনৈতিকভাবে একটা বিষফোঁড়ার মতো হয়ে দাঁড়ায়।

বিশেষ করে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে এ ধরনের মূল্যবৃদ্ধির কারণে জনমনে সৃষ্ট অসন্তোষ তার জন্য বিশেষ মাথা ব্যথার কারণ ওঠেছে। নিজের ও তার দলের রাজনৈতিক অস্তিত্বের কথা চিন্তা করে বাইডেন তেলের মূল্যহ্রাস করতে উদ্যোগী হন। এ লক্ষ্যে সম্প্রতি তিনি আমেরিকার আপৎকালীন তেলের রিজার্ভ থেকে কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার ব্যবস্থা করেন। যা তেলের মূল্য কিছুটা কমাতে সহায়তা করে। বর্তমানে প্রতি গ্যালন তেল তিন থেকে চার ডলারের বিক্রি হচ্ছে। পরিস্থিতি আরো সহজ করার জন্য বাইডেন গত জুলাই মাসে সৌদি আরব সফরে গিয়ে সৌদি ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে সেসব দেশের নেতাদের তেলের উৎপাদন বৃদ্ধির অনুরোধ জানান। নেতারা বাইডেনের অনুরোধ বিবেচনার আশ্বাস দেন বলে হোয়াইট হাউজ সূত্রে জানানো হয়।

সৌদি আরবে বাইডেন সৌদি শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের (MBS) সঙ্গে বৈঠকের আগে করমর্দনের বদলে মুষ্ঠি বিনিময় (Fist Bump) করেন। সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যার পেছনে এমবিএস-এর হাত রয়েছে মর্মে অভিযোগ থাকায় বাইডেন তার সঙ্গে করমর্দন করতে অনীহা প্রকাশ করেন বলে জানা যায়। সৌদি প্রিন্স বাইডেনের এহেন আচরণ সহজভাবে নেননি এবং এটাকে তিনি তাকে অপমানের সামিল বলে মনে করেন। তেলের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বাইডেনের অনুরোধে সাড়া না দিয়ে উল্টো তেলের উৎপাদন হ্রাস করার সাম্প্রতিক ঘোষণা সেই অপমানের জবাব বলে কেউ কেউ মনে করেন। নিকট অতীতে বাইডেন সৌদি আরবকে একটি ‘দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র’ বলে বর্ণনা করেন।

আগামী ৮ নভেম্বরের নির্বাচন জো বাইডেনের মতো ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্যও একটা বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থনীতি, মুদ্রাস্ফীতি, বিপুল সংখ্যক মাইগ্র্যান্টের অনেকটা বিনাবাধায় আমেরিকায় প্রবেশ, ডিফান্ড পুলিশ, অপরাধের সংখ্যা বৃদ্ধি ইত্যাদি ইস্যু বাইডেনের জন্য নেতিবাচক হলেও, তার সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ জনমনে তার ও তার দলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বলে কিছুটা হলেও সহায়ক হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।

মুদ্রাস্ফীতি হ্রাসের উদ্দেশ্যে সম্প্রতি কংগ্রেসে পাসকৃত বিলে জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় প্রায় ৪শ বিলিয়ন ডলার বরাদ্ধ রাখা, শিক্ষার্থীদের স্টুডেন্ট লোনের আংশিক মাফকরণ এবং দারিদ্র্য ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বৈরশাসকদের নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে আমেরিকায় প্রবেশকারীদের প্রতি বাইডেনের মানবিক আচরণ বহু মার্কিন নাগরিকের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছে, যদিও তার বিরোধীদের অনেকেই এ ধরণের আগমনকে আগ্রাসনের সঙ্গে তুলনা করে সীমান্ত সুরক্ষায় তার কথিত ব্যর্থতার তীব্র সমালোচনা করেছেন।

জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় বিপুল বরাদ্ধ, ফসিল ফুয়েলের উপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব গ্রিন এনার্জি ব্যবহারে উৎসাহ সৃষ্টির মাধ্যমে বায়ুমন্ডলে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা কমাতে সাহায্য করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাছাড়া, মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক ৫০ বছরের পুরনো গর্ভপাত বৈধের আইন বাতিলের ঘটনা ডেমোক্র্যাটদের প্রতি বিপুল সংখ্যক নারীর সমর্থন অর্জনে সক্ষম হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। জানা যায়, সাম্প্রতিককালে নতুন ভোটার হিসাবে নিবন্ধনকারীদের অধিকাংশই নারী। ঐতিহাসিকভাবে আমেরিকার মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণির মানুষ নানা কারণে রিপাবলিকান পার্টির চাইতে ডেমোক্র্যাটিক পার্টিকে তাদের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতি অধিক আন্তরিক বলে মনে করে থাকেন। সোশ্যাল সিকিউরিটি বেনিফিট, ফুড স্ট্যাম্পসহ বিভিন্ন ওয়েলফেয়ার কর্মসূচি বহাল ও রক্ষার ক্ষেত্রে তারা ডেমোক্র্যাটিক পার্টিকে অধিকতর কমিটেড বলে মনে করেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে এ বিষয়গুলো নিঃসন্দেহে ডেমোক্র্যাটদের জন্য সুখবর।

বাইডেন ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করলেও এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলের উপর তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা, বা না করা নির্ভর করছে। ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও অনেকটা একই ধারণা করা হয়। কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের জয় ও বেশ কয়েকটি রাজ্যে তার সমর্থিত প্রার্থীরা জয়ী হলে তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, এটা নিশ্চিত করে বলে যায়। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত জনমত জরিপের ফলাফলে ট্রাম্প সমর্থিত প্রার্থীদের সঙ্গে ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থীদের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যায়।

মধ্যবর্তী নির্বাচনকে নিয়ে একজন মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মন্তব্য দিয়ে লেখাটি শেষ করছি। তিনি বলেছেন, This election is a demonstration of how voters in a polarized country unity themselves around what they hate instead of what they love.

উপরে বর্ণিত প্রেক্ষাপটে আগামীতে মার্কিন রাজনীতির গতিধারা কোন দিকে মোড় নেবে, তা নির্ধারণে আসন্ন নির্বাচন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি।

লেখক : কলামিস্ট।