প্রেসক্লাব নির্বাচনে এক অবিসংবাদিত বিজয়

শামসাদ হুসাম :

বাংলাদেশের সাংবাদিকতার জগতে মহিলাদের অংশগ্রহণের ইতিহাসটা খুব বেশি পুরনো নয়। তারপরও গত কয়েক বছরে ঐ ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নারীর অংশগ্রহণের হার ক্রমবর্ধমান গতিতে এগিয়েই যাচ্ছে। জাতীয় প্রেসক্লাব এবং সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের গত ৩০ ডিসেম্বরের দ্বি-বার্ষিক নির্বাচনে দু’জন মহিলা সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন।

তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ফরিদা ইয়াসমিন। তিনি দ্বিতীয়বারের তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে দিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি পদে দ্বিতীয়বারের মতো বিজয়ী হয়ে এক অনবদ্য ইতিহাসের জন্ম দিয়েছেন। ১৯৫৪ সালে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের যাত্রা শুরুর ৬৬ বছরের ইতিহাসে তিনিই প্রথম নারী সভাপতি হিসেবে জয়লাভের মধ্যদিয়ে এক ঐতিহাসিক ইতিহাস তৈরির সূচনা ঘটিয়েছিলেন। ফরিদা ইয়াসমিন ২০২২-২০২৩ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে পুনরায় সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।


১৯৯৯ সাল থেকে তিনি দৈনিক ইত্তেফাকে কর্মরত আছেন। তার স্বামীও একজন প্রথিতযশা সাংবাদিক কিন্তু সাংবাদিক হিসেবে ফরিদা ইয়াসমিনের রয়েছে বর্ণাঢ্য এক জীবন। জাতীয় প্রেসক্লাবের প্রথম নারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ছাড়াও তিনি ২০১২, ২০১৩ এবং ২০১৪ পর পর তিনবার তিনি ঐ প্রতিষ্ঠানের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করে গেছেন। ১৯৮৯ সালে ‘বাংলার বাণী পত্রিকায় প্রথম সাংবাদিকতার জগতে পা রেখেছিলেন তিনি। ফরিদা ইয়াসমিন বাংলাদেশ উইমেন জার্নালিস্ট নেটওয়ার্ক এবং বাংলাদেশ উইমেন জার্নালিস্ট ফোরামের উপদেষ্টা এই গুণী ব্যক্তিত্ব ২০১৭ সালের ৭ মে যুক্তরাষ্ট্রের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ থেকে বিশেষ কংগ্রেশনাল রিকোগনিশন লাভ করা ছাড়াও নিউইয়র্ক পাবলিক অ্যাডভোকেট অফিস থেকে পেয়েছেন কংগ্রেসম্যান স্পেশাল সার্টিফিকেট।

অন্যদিকে সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের প্রথম নারী সভাপতি পদে নির্বাচনে অংশ নিয়ে হাসিনা বেগম চৌধুরীও আরেক অনন্য ইতিহাসের জন্ম দিয়েছেন। সিলেটের রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থার বিপরীতে এই অর্জন কম বড় বিষয় নয়। যদিও ইতিহাস স্বাক্ষী দেয় ঐ রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সিলেটের নারীসমাজ বরাবরই সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। তবে হাসিনা চৌধুরীর বিষয়টা একটু অন্যমাত্রার ছিল। তার স্বামী মহিউদ্দিন শীরু সিলেটের সাংবাদিকতার জগতে এক পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিত্ব ছিলেন। সিলেট প্রেসক্লাবের দু’বারের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ছাড়াও স্থানীয় সাংবাদিকদের জন্য ভরসার স্থল হিসেবে অনায়াসে বিবেচিত হতেন মহিউদ্দিন শীরু। সেই তিনি নিতান্তই অল্প বয়সে ২০০৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর যখন মারা গেলেন, দু’সন্তান নিয়ে একজন গৃহবধুর ভূমিকায় থাকা হাসিনা বেগম চৌধুরী শুধু সংসার সামলানোর দায়িত্বই পালন করেননি, একই সাথে মহীউদ্দিন শীরুর সম্পাদনায় যে পত্রিকাটি নিয়মিত প্রকাশিত হতো, তারও দায়িত্ব পালণ করার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন তিনি।

আস্তে আস্তে একজন সংবাদ কর্মীর ভূমিকায় তার উজ্জ্বল উপস্থিতি সবারই দৃষ্টিতে পড়েছে। শেষ পর্যন্ত সিলেটের প্রাচীনতম সংবাদপত্র দৈনিক যুগভেরীর স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত থেকে সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের ২০২৩-২০২৪ সালের দ্বিবার্ষিক নির্বাচনে অংশ নিয়ে সভাপতি পদে জয়লাভ করে এ অনন্য ইতিহাসের জন্ম দিয়েছেন। সিলেটে এখন দু’টি প্রেসক্লাব রয়েছে। একটি সিলেট প্রেসক্লাব এবং অন্যটি সিলেট জেলা প্রেসক্লাব। শেষেরটি থেকেই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন হাসিনা চৌধুরী। সিলেট প্রেসক্লাবের জন্ম ১৯৬৫ সালে। যুগভেরীর প্রাণপুরুষ মরহুম আমীনূর রশীদ চৌধুরী প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি ছিলেন। জেলা প্রেসক্লাবের জন্ম তার বহু পরে। তবে সিলেট প্রেসক্লাবের ৫৬ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম একজন নারী সভাপতির এই শীর্ষ পদে পৌঁছানোর খবর সব নারী সংবাদকর্মীদের জন্য আশার খবর হয়ে উঠবে। কারণ সিলেটে এখন বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্র নামে একটি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। যার সদস্য সংখ্যা বেশ উল্লেখযোগ্য।

আমি যখন এ জগতে পা রেখেছিলাম, তখন পরিবেশটা অন্যরকম ছিল। যুগভেরী তখন সাপ্তাহিক পত্রিকা ছিল। ১৯৮৩ সালের কথা, সম্পাদক ছিলেন আমীনূর রশীদ চৌধুরী। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তখন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী মাহবুবুর রহমান। কোন একটি ঘটনাকে উপজীব্য করে প্রথম একটি উপসম্পাদকীয় কলাম লিখে পত্রিকা অফিসে সশরীরে উপস্থিত হয়েছিলাম। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কলামটি ছাপিয়ে ছিলেন। তারপর থেকে প্রায় কয়েক মাস নিয়মিত লেখার পরে একদিন আমিনূর রশীদ চৌধুরীর সাথে দেখা করতে গেলে তিনি বললেনÑ আমি চাইলে পত্রিকার টেবিলে যোগ দিতে পারি।

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক বিষয়টি সহজে মেনে নিলেও সমাধানের পথ হিসেবে একটা কথা বললেন। তখন প্রধান সম্পাদকের স্ত্রী মিসেস ফাহমিদা রশীদ চৌধুরী মহিলাদের একটা পাতা ‘অঙ্গন ও প্রাঙ্গণ’-এর দায়িত্বে ছিলেন। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সাহেব জানালেন, আমি চাইলে সেই পাতার সহকারী হিসেবে কাজ করতে পারি। ভিতরে প্রচণ্ড একটা ধাক্কা খেলো। আবারো বিভাজন! মানুষ নয়, মেয়ে মানুষ! তারপরও সিদ্ধান্ত নিলাম, আপাতত এই পদেই যোগ দেবো। তারপর কাজ দেখিয়ে সম্মান আদায় করব ইনশাল্লাহ। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে যখন রিকশা থেকে নেমে অফিসের চৌকাঠে পা রাখি। সামনের ঘরে বসা বয়োবৃদ্ধ সার্কুলেশন ম্যানেজার চিবিয়ে চিবিয়ে উচ্চারণ করেন, ‘কি ভাগের চাউতলী তান আবার গিয়াস নগর’!

একটি সিলেটী প্রবাদ। যার অর্থ অনেকটা ব্যাঙ্গাত্মক। অর্থাৎ পত্রিকাই ভালোভাবে চলে না, তার আবার মহিলা পাতার সহকারী সম্পাদক! অনেক প্রতিকূলতা নিয়ে টিকে থাকার সংগ্রাম করি। কয়েক মাস পরে সিলেট প্রেসক্লাবের সদস্য পদের জন্য আবেদনপত্র জমা দিলাম। সভাপতি তখন মরহুম বোরহান উদ্দিন খান। খান সাহেব এক কথায় রিজেক্ট করলেন। বললেন, মেয়ে মানুষকে সদস্য করলে প্রেসক্লাবের পরিবেশ নষ্ট হবে। কয়েক মাসের মধ্যে ভেতরে বিরুদ্ধ পক্ষ একটি দাঁড়িয়ে গেল। আমার চরিত্র খারাপ। একজন গৃহবধু হয়ে এ রকম এক পরিবেশে কাজ করার জন্য আমার সংসার ভাঙার উপক্রম। এ ছাড়াও অফিসে আমি জঘন্য কাজে লিপ্ত থাকি! এমন এক অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে এনে ছাপানো এক লিফলেট ছাড়া হলো ডাক মারফত আমার পরিচিত-অপরিচিত সবার কাছে। ক্ষণিকের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে ছিলাম! কিন্তু সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে ছিলেন আমার লাইফ পার্টনার। যে কারণে সাহসের সাথে পথ চলেছিলাম। সেই দুঃসময়ে আমিই আমার প্রেরণা ছিলাম। নিজেই নিজেকে প্রবোধ দিতাম, ‘ডে বাই ডে, রি ডে, গেটিং, বেটার এন্ড বেটার’। আমাকে পারতেই হবে। যুগভেরীর টেবিলে কেটে গেল আমার সুদীর্ঘ সময়। প্রায় একুশ বছরের মতো। ১৯৮৯ সালে মাহবুব সাহেব ইমিগ্রেশন নিয়ে নিউইয়র্কে চলে এলেন। আসার আগে তার সাথে কাজ করেছি প্রায় আট বছরের মতো। ততোদিনে আমি সিলেট প্রেসক্লাবের সদস্য পদ লাভ করেছি। দু’বার নির্বাচনে অংশ নিয়ে নির্বাহী কমিটির সদস্য হওয়া ছাড়াও একবার ভাইস-প্রেসিডেন্ট পদে জিতে প্রেসক্লাবের পুরোপুরি একজন সাংবাদিক হিসেবে স্বীকৃতিও লাভ করেছি।

১৯৯৩ সালে যুগভেরী পত্রিকা সাপ্তাহিক থেকে দৈনিকে উত্তরণ ঘটলে আমারও পদোন্নতি হয়েছে। বিভাগীয় সম্পাদক থেকে দৈনিকের সহকারী সম্পাদক। পুরোপুরি সংবাদকর্মী। দৈনিক যুগভেরীর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তখন আজিজ আহমদ সেলিম। বার্তা সম্পাদক তাপস দাস পুরকায়স্থ। দিনের শিফটে আমি থাকি। সপ্তাহের সাতদিনের মধ্যে পাঁচদিন প্রধান সম্পাদকীয় আমি লিখি, বাকি দু’দিন লিখেন আজিজ আহমদ সেলিম। অপূর্ব শর্মা এর বহু পরে যুগভেরীতে যোগ দিয়েছেন। মাঝখানে ১৯৯৫ সালে জাতীয় দৈনিক বাংলার ব্যুরো অফিসে যোগ দিলাম আমি এবং লিয়াকত শাহ ফরিদী। যিনি এবার জেলা প্রেসক্লাবের নির্বাচনে হাসিনা বেগম চৌধুরীর সাথে সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দিতা করেছেন। ব্যুরো চিফ ছিলেন মুজাহিদ শরীফ।

প্রেসক্লাবের নির্বাচন নিয়ে এত কথা বলার কারণ হচ্ছে, একটা কথা মনে করিয়ে দেয়া যে, শুধুমাত্র সিলেট, কিংবা পুরো বাংলাদেশ অথবা পুরো বিশ্বের প্রেক্ষাপটে কোথাও কিন্তু নারীর কাজের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় না। এটা এক অবিসংবাদিত সত্য বিষয়। আমার দীর্ঘদিনের সহকর্মী, অগ্রজ সাংবাদিক মাহবুব সাহেবের সাথে নিউইয়র্কে আসার পরে ১৯৯৭ সালে ‘সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা’ এবং পরবর্তী সময়ে ২০১০ সালে তার সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক নিউইয়র্ক’ পত্রিকায় সংবাদ কর্মী হিসেবে কাজ করলেও তার স্মৃতিচারণের কোন মুহূর্তেই তিনি আমার মূল্যায়নই সেভাবে করেননি। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্কের প্রথম আলোতে মাঝে মাঝে লিখে থাকেন। এ রকম এক স্মৃতিচারণের মুহূর্তে একবার লিখলেন, যার শিরোনাম ছিল ‘দিন শেষে কেউ হিরো, কেউ…’। লেখাটিতে এভাবেই স্মৃতি জাবর কাটলেন তিনিÑ ‘১৯৮৯ সালে আমেরিকায় আসার আগ পর্যন্ত সাপ্তাহিক যুগভেরীতে কাজ করেছি। আমি আসার পরে ফাহমিদা রশীদ চৌধুরীর নেতৃত্বে আজিজ আহমদ সেলিম ও তাপস দাস পুরকায়স্থ যুগভেরীকে এগিয়ে নিয়ে যান। এর পরে হাল ধরেন অপূর্ব শর্মা’। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, কোথাও আমার নাম নেই!

আমাকে নিয়ে প্রথম আলোতে আরো একটি লেখায় তিনি বলেছেন, ‘শামসাদ হুসাম একসময়ে যুগভেরীতে যোগ দিলেন। কিন্তু মজার বিষয় হলো সাহিত্যের পাতা দেখার দায়িত্ব তার উপরেই পড়ল’। এটি একটি তথ্যগত মারাত্মক ভুল ছিল। আমি কখনই সাহিত্যের পাতা দেখিনি। সেই সময়ে সাহিত্যের পাতা দেখতেন হামিদ মোহাম্মদ। তিনি পরে লন্ডন চলে যাওয়ায়, সেই পাতা দেখতেন আজিজ আহমদ সেলিম। এত কাঁসুন্দি ঘাটায় অনেকেই আমার উপর নাখোশ হবেন। সবার কাছে বিনীতভাবে ক্ষমা চেয়ে একটি কথাই বলতে চাই, আসুন না আমরা নারীকে নারী হিসেবে বিবেচনায় না রেখে, একটু হলেও মানুষের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করি। গত ৯ ডিসেম্বর ছিল নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যু দিবস। এ দিনটি পালিত হয়েছে রোকেয়া দিবস হিসেবে। ডিসেম্বর মাস শেষ হওয়ার আগে দুই দুইজন নারীর এই সম্মানজনক অবস্থানের বিষয় নিয়ে আমার এই লেখা আমি বেগম রোকেয়ার স্মৃতির প্রতি উৎসর্গ করলাম।

লেখক : কলামিস্ট