বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে বাংলাদেশ আরো উচ্চতায় উন্নীত হোক

মার্চ মাসটাই আসলে বাঙালিদের জন্য অন্য রকম এক আবেগের মাস। এ মাসে কিছু লিখতে গেলেই ৭ মার্চের কথা আসে। ১৭ মার্চ, ২৬ মার্চের কথা আসে। আসে বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধের কথা। আবার এই এক রকমের কথায় পাঠক একঘেয়েমিও অনুভব করে। আমেরিকার ঘটনা নিয়ে লিখতে গেলেও সেই অবস্থা। ইমিগ্রেশন, স্টিমুলাস, ট্রাম্পের কর্মকাণ্ড, হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের ‘পাগলা রাজা’র শাসন, ক্যাপিটল ভবনে ট্রাম্পের দাঙ্গাবাজদের হামলা, ভাঙচুর এবং হত্যা। ৬ জানুয়ারির ওই হামলায় পুলিশসহ ৫ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু। যুক্তরাষ্ট্রের ২৪৪ বছরের ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল। নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ক্ষমতা গ্রহণের পর বাইরের আবহাওয়া অনেকটাই শান্ত। তবে আতঙ্ক কাটেনি। তলে তলে ‘দেশীয় সন্ত্রাসীরা’ এখনো ঘোঁট পাকাচ্ছে। সুযোগ পেলে আবারও ৬ জানুয়ারির চেয়েও ভয়ংকর ছোবল বসাবে-এমনটাই আশঙ্কা।
এত শঙ্কা নিয়েও নতুন প্রেসিডেন্ট বাইডেন তার ১০০ দিনের অঙ্গীকার পূরণের দিকে লক্ষ্যস্থির রেখে এগিয়ে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যেই নতুন স্টিমুলাস প্যাকেজ পাস হয়েছে। ইমিগ্রেশন সংস্কারে হাত দিয়েছেন। ওবামা হেলথ কেয়ার পুনরায় চালু হচ্ছে। শিশুকালে যারা অভিভাবকহীন অবস্থায় আমেরিকায় এসেছিল, তাদের গ্রিন কার্ড ইস্যু করার ব্যবস্থা হচ্ছে। মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ক্লাইমেট চেঞ্জ ফোরামে পুনরায় যোগ দিচ্ছে আমেরিকা। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন ঘটতে শুরু করেছে। আমেরিকানদের মধ্যে নতুন এক উদ্দীপনা, চাঞ্চল্য লক্ষ করা যাচ্ছে। যে করোনাকে অবজ্ঞা করে ট্রাম্প আমেরিকাকে একটা মৃত্যুপুরীতে পরিণত করতে চাচ্ছিলেন, অথচ নিজে বাঁচার জন্য গোপনে ভ্যাকসিন নিয়ে অন্যদের ভ্যাকসিন নিতে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে নিরুৎসাহিত করতেন, আজ সে অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটতে দেখা যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ৯ ভাগের অধিক আমেরিকান ভ্যাকসিন নিয়ে ফেলেছে। ভ্যাকসিন-গ্রহীতার সংখ্যা প্রতিদিন বেড়ে চলেছে। আমেরিকা তার জন্মের অঙ্গীকারে ফিরে চলেছে, যা গত ৪ বছরে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল।
এ তো গেল পাশ্চাত্যের পরিস্থিতি। অন্যদিকে প্রাচ্যের খবর-করোনার মরণঘাতী অভিঘাতে মানুষের মৃত্যু, হাহাকার, ভ্যাকসিন-রাজনীতির বাইরে ক্রমাগত জটিল হয়ে উঠছে চীন-আমেরিকার দ্বৈরথ। আর দুই রথীর এই দ্বন্দ্বে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হয়ে উঠছে বিশ্ব রাজনীতির উত্তপ্ত রণাঙ্গন। একসময় এই দ্বৈরথ ছিল আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে। তখন বিশ্ব ভাগ ছিল দুই মেরুতে। জারি ছিল ৪৫ বছরের মতো। নব্বই দশক পর্যন্ত। তাদের সম্পর্ককে বলা হতো ‘কোল্ড ওয়ার বা শীতল যুদ্ধ’। আসলে এটা ছিল মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। এরা প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে একপক্ষে থেকেই লড়েছে বিশ্ব সভ্যতা ও বিশ্ব শান্তির শত্রু জার্মানির বিরুদ্ধে। তখন চীনের উত্থান দূরে থাক, চীন স্বাধীনতাই অর্জন করতে পারেনি। আমেরিকা-রাশিয়ার দ্বৈরথ তখন বিশ্বের ভারসাম্য রক্ষা করত। আমেরিকা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যখন-তখন যার-তার ওপর খবরদারি করতে পারত না। পৃথিবী অনেক দুর্ভোগ থেকেই রক্ষা পেয়েছে।
এই সেদিনও আমেরিকার এই শ্রেষ্ঠত্ব বজায় ছিল নব্বই দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার ফলে। তখন বলা হতো, এক মেরুর বিশ্ব। বিশ্বে শক্তির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু প্রকৃতি নাকি কোনো শূন্যতা দেখতে পারে না। সেই তত্ত্বের কারণেই বোধ করি ১৯৪৯-এ স্বাধীনতা অর্জনকারী যে চীনের এই সেদিনও বিশ্ব পরাশক্তির তকমা ছিল না, আজ তাকে রাজনীতি ও অর্থনীতির বিশ্ব পরাশক্তি হিসেবে মান্য করা হয়। রাশিয়া বর্তমান সময়ে হারানো তেজ ও মর্যাদা খানিকটা পুনরুদ্ধার করতে পারলেও তার থেকে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে চীন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সীমা ছাড়িয়ে চীন এখন বিশ্ব রাজনীতির দ্বৈরথের এক রথ। বিশ্ব রাজনীতির পাদপ্রদীপের আলোয় চীন আজ আলোকিত। অনেক দেশ চীনের আশ্রয় পেতে চায়। চীনের অর্থনৈতিক সহযোগিতায় সমৃদ্ধি অর্জন করতে চায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইতিমধ্যেই অর্থনীতি-কূটনীতিতে ভারতের উপরে স্থান করে নিয়েছে। একসময় মনে করা হতো, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতই সব দিক থেকে নেতৃত্ব দেবে। ভারত সেই টার্গেটে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। চীনের সামর্থ্য এখন সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তো বটেই, সারা বিশ্বেই চীন এখন পরাশক্তি।
আর কিছুতে না হলেও অর্থনৈতিক শক্তির দিক থেকে চীন এখন আমেরিকাকেও ছাড়িয়ে গেছে বলে অনেকে মনে করেন। যদিও অনেক গবেষক, বিশ্লেষক মনে করেন, এখনকার চীন-আমেরিকা অনেকটাই আলাদা। শীতল যুদ্ধকালে আমেরিকা-রাশিয়া যেমন একে অপরের দিকে অস্ত্র তাক করে থাকত, এখন চীন-আমেরিকা একে অপরের দিকে সামনাসামনি অস্ত্র তাক করে নেই, একমাত্র তাইওয়ান-উত্তর কোরিয়া ইস্যু ছাড়া। তবু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকা-চীন দুই পরাশক্তির প্রতিযোগিতা এই অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের আশঙ্কা এ মুহূর্তে না থাকলেও পরিস্থিতি জটিল। মিয়ানমারে সম্প্রতি সেনা অভ্যুত্থানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পরাশক্তির অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মূলত বর্তমান সময়ে চীন-আমেরিকার মধ্যে চলছে বাণিজ্য-যুদ্ধ। দুদিন বাদে যে এই যুদ্ধ অন্যদিকে মোড় নেবে না, তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না।
মিয়ানমারের বর্তমান ঘটনাপ্রবাহ চীনের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা বলে মনে করছেন সামরিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা। মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানে সেনাশাসকদের প্রতি চীনের সমর্থনের বিপরীতে চীনের সাধারণ নাগরিকদের সেনাশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ-প্রতিবাদ আর আমেরিকা-ইউরোপের নিষেধাজ্ঞা আরোপ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তুলেছে। মিয়ানমারের এই অবস্থা যে দুই পরাশক্তির মধ্যে সামরিক উত্তেজনায় রূপ নেবে না, তা বলার সাধ্য নেই কারও।
তবে এ কথাও অস্বীকার করা যাবে না, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে চীন শক্তির যে বলয় গড়ে তুলতে চাচ্ছে, তাতে মনে করা হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিশ্ব ভূরাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখন এই অঞ্চলের রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিবিদ ও অর্থনীতিবিদদের প্রজ্ঞা, দূরদৃষ্টি, দর-কষাকষির ক্ষমতা এবং কূটনীতির দক্ষতার ওপর নির্ভর করছে দুই পরাশক্তির এই দ্বন্দ্বের মধ্য থেকে কে কতটা সুফল নিজ নিজ ঘরে তুলতে পারবে। এখানে লাভের সম্ভাবনা এবং খোয়ানোর আশঙ্কা দুইয়ের ঝুঁকিই বিদ্যমান।
বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্য দেশগুলোর চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তাদের যুক্তি হচ্ছে : এক. বাংলাদেশের অবস্থান এবং দুই. বাংলাদেশের নেতৃত্ব। বাংলাদেশ অবস্থানগত দিক থেকে ভারতের কাছ থেকে সমর্থন ও সুবিধা আদায় করে নিতে পারবে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিচালনার নেতৃত্ব যার হাতে, তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরিত করেছেন। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আরো এগিয়ে যাবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
তবে স্বাধীনতার ৫০ বছরে অবকাঠামোগতভাবে দেশ অনেকটা এগিয়ে গেলেও প্রকৃতপক্ষে যেটা মানুষের সবচেয়ে বড় চাওয়া, সেই গণতন্ত্র বাংলাদেশে এখনো অধরা। তাই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে প্রত্যাশা-ভোটাধিকারসহ মানুষের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার যেন নিশ্চিত করা হয়।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর মাসে আমরা বঙ্গবন্ধুর প্রতি জানাই অতল শ্রদ্ধা।