বঙ্গভঙ্গ বনাম কাশ্মীরভঙ্গ

রক্ষণশীল ঘরানার ভাইসরয়, ভারতে ইংরেজ শাসনকর্তা লর্ড কার্জনের মাথায় শয়তানি বুদ্ধি বাঙালি বিপ্লবী ও প্রতিবাদী, শাসকবিরোধী আন্দোলন দমন করার কৌশলীপন্থা বঙ্গবিভাগ একাধিক নিহিত কার্যকারণ নিশ্চিত করে। মুসলমানপ্রধান পূর্ববঙ্গকে বিচ্ছিন্ন করে বিজাতীয় আসামের সঙ্গে যুক্ত করে নতুন প্রদেশ গঠন, একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নরের অধীন শাসনের ব্যবস্থা। খুশি হবে মুসলমান সমাজ।
সুবে বাংলা, নবাবী বাংলা থেকে বিহার-উড়িষ্যা বিচ্ছিন্ন করে পশ্চিমবঙ্গকে নিঃসঙ্গ করে কলকাতাকেন্দ্রিক ছোট প্রদেশ গঠন। তাতে এক ঢিলে অনেক পাখি মারা পড়বে। হিন্দু শিক্ষিতশ্রেণি, জমিদারশ্রেণি দুর্বল হবে, পূর্ববঙ্গের জমিদারি নিয়ে দুই নৌকার যাত্রী হবে না ঘরকা, না ঘটকা অবস্থা। পূর্ববঙ্গীয় হিন্দু তরুণ বিপ্লবী ঘরানার প্রবণতা নিয়ে, বাস্তুসত্তা নিয়ে সমস্যায় পড়বে, মাথার বিপ্লবের ভূত বিরাট বাকুলি খাবে। তাই বঙ্গভঙ্গ পূর্বোক্ত হিসাবে ১৯০৫ সালে। কিন্তু আয়োজন শুরু হয় ১৯০৩-এর শেষ দিক থেকেই। এতে বিশেষ ভূমিকা ছিল চতুর আমলাদের।
পূর্ববঙ্গীয় মুসলমানদের এই বিশেষ সুবিধা সত্ত্বেও বাঙালি জাতিসত্তার বিভাজন একশ্রেণির শিক্ষিত মুসলমান মেনে নেয়নি। ১৯০৪ সাল থেকে বগুড়া-চট্টগ্রামসহ কলকাতার মুসলমান পল্লী রাজাবাজারের মুসলমান সমাজ বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতায় সভা ও মিছিলে যোগ দিয়েছে। রসুল-গজনভি-দেলোয়ার প্রমুখ থেকে শুরু করে মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী পর্যন্ত প্রথম দিকে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে শামিল। শামিল স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তার স্বদেশি গানের ডালি নিয়ে যা ছিল দেশাত্মবোধক প্রতিবাদী প্রেরণার উৎস। পরে এতে হিন্দুত্ববাদী চেতনার প্রকট প্রকাশ ঘটে জাতীয়তাবাদকে দূষিত করে। এসব ভিন্ন প্রসঙ্গ। শেষ পর্যন্ত কয়েক বছরব্যাপী প্রবল ও ব্যাপক আন্দোলনের চাপে ১৯১২ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ।
দুই
ভারতে ইংরেজ শাসনে যে চতুর দুর্বৃদ্ধির প্রাধান্য, একই সঙ্গে মাঝে মধ্যে যুক্তিবাদী শুভবুদ্ধির পরিচয়ও দেখা গেছে। যেমন দেখা গেছে বঙ্গভঙ্গ রদে, তেমনি চল্লিশের দশকে ভারতকে স্বশাসন দিতে মিশন পাঠানো ১৯৪২-এ, ১৯৪৬-এ। অবশেষে তাদের খুবই চতুরপন্থায় ভারত ভাগ করে উপমহাদেশ ত্যাগ। কিন্তু যে দূষিত দ্বিজাতিতত্তে¡র ভিত্তিতে ভারত ভাগ, এর বিভাজক প্রভাবে ভারত-পাকিস্তান কখনো বৈরী মনোভাব থেকে মুক্ত হতে পারেনি। পারেনি বিভক্ত ভারতবর্ষের কাশ্মীর, জুনাগড় ইত্যাদি প্রসঙ্গ নিয়ে। সেখানে যুক্তি প্রাধান্য পায়নি, ধর্মাভূতিসম্পন্ন কথিত জাতীয়তাবাদের আবেগই গভীর প্রাধান্য বিস্তার করেছে। শেষ বিচারে কাশ্মীর হয়ে দাঁড়ায় উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে গলার কাঁটা। ওই কাঁটা এতটাই এতটা ধারালো ও তীক্ষè যে, তা শুধু খচখচই করে না, রীতিমতো রক্তক্ষরণ ঘটায়। ঘটায় সীমিত ধরনের একাধিক যুদ্ধে। যেমন ১৯৪৭ সালে কাশ্মীর স্বাধীন দেশীয় রাজ্য থাকাকালে ওই ধারায় বিভাজিত দুই ডোমিনিয়নের স্বতন্ত্র অস্তিত্বের সময়েও। সূচনা ঘটায় পাকিস্তান। জিন্নাহ সাহেব তখনো বেঁচে। তিনি পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল, লিয়াকত আলী প্রধানমন্ত্রী।
ওই সময় পরিকল্পিতভাবে ভূস্বর্গ নামে পরিচিত কাশ্মীর দখলের উদ্দেশ্যে পাকিস্তানি উপজাতীয় যোদ্ধাদের পাঠিয়ে পেছনে পাকিস্তানির সেনাবাহিনীর সমর্থনের ভিত্তিতে কাশ্মীরের একাংশ দখল। বাকি অংশ দখলের আগেই ভীত, সন্ত্রস্ত কাশ্মীররাজ হরি সিং ভারত বিভাজনের নীতিমাফিক (যেকোনো এক ডোমিনিয়নের যুক্ত হওয়া) ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়। কিন্তু ততক্ষণে কাশ্মীর আর পূর্ণাঙ্গ নেই। আগেই বলেছি, তার একাংশ পাকিস্তানের দখলে, নাম আজাদ কাশ্মীর। আর এই জবরদখলের কারণে কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের ছোটখাটো মহড়া চলেছে। এতে হস্তক্ষেপ জাতিসংঘের, নেপথ্যে ইন্দ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। একাধিক দেশের সঙ্গে সীমান্তরেখার কারণেও কাশ্মীরের রাজনৈতিক গুরুত্ব তাদের কাছে অনেক। কিন্তু ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কিংবা জাতিসংঘ কাশ্মীরের অখণ্ডতা পুনরুদ্ধার করতে পারেনি।
আমার বিবেচনায় তারা তা চায়নি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে। পাকিস্তানকে খুশি রাখা তখনকার মার্কিন নীতি। তাই বিশ্বমোড়লদের ইচ্ছামাফিক ভারতীয় স্বশাসনের শুরুতেই প্রথম কাশ্মীর বিভাজন তথা কাশ্মীরভঙ্গ। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ইচ্ছায় এ ব্যবস্থাই বহাল থাকে। ক্ষুব্ধ ভারত কাশ্মীর বিভাজনে, ক্ষুব্ধ পাকিস্তান পুরো পাকিস্তান গিলতে না পেরে।
ভারত চেয়েছে অখণ্ড কাশ্মীরের সংযুক্তি। কাশ্মীরের সেক্যুলার-গণতন্ত্রী রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল কনফারেন্সের অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক নেতৃত্ব শেখ আবদুল্লাহ থেকে তার তৃতীয় প্রজন্মের উত্তরসূরিদের রাজনীতিও ভিন্ন কথা বলেনি। মূলত জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে সহযোগিতায়, ক্বচিৎ অসহযোগিতায়। তারা কখনই পাকিস্তানপন্থী নয়, পুরোপুরি সেক্যুলার জাতীয়তাবাদী কাশ্মীরি।
জাতীয় কংগ্রেস তাদের সঙ্গে সর্বদা সদাচারী না হলেও মোটামুটি একটা সুসম্পর্ক তাদের মধ্যে ছিল। রাজনৈতিক মতাদর্শে উভয়ে একই ঘরানার। রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষা বা দলীয় স্বার্থপরতা উভয়ের ক্ষেত্রে কখনো কখনো মতাদর্শিক দিক থেকে হয়তো বিচ্যুতি ঘটেছে, সেটিও অপ্রিয় সত্য। তাই বলে বিরুদ্ধ মত কখনো রাজনৈতিক সার্জারিতে গিয়ে পৌঁছেনি। রাজনীতিতে চড়াই-উৎরাই মার্কা টানাপড়েন স্বীকৃত ঘটনা।
তিন
এখন হঠাৎ এমন কী ঘটল যে, ভারত সরকারকে কাশ্মীর সম্পর্কে রাজনৈতিক সার্জারির নীতি গ্রহণ করতে হলো এবং তা এমনই যে গণতন্ত্রী, প্রগতিবাদী কারো পক্ষে সে পদক্ষেপের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ছাড়া গত্যন্তর রইল না। কাশ্মীরিদের সব ধরনের গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী ভূরাজনৈতিক সুবিধা হরণ করা হলো সংবিধান সংশোধন করে। স্বশাসন, স্বায়ত্তশাসন, বিশেষ সুবিধা সব কিছু বাতিল করা হলো। জয় হলো বিজেপির কট্টরপন্থীদের। তবে সবচেয়ে বড় আঘাতটা হলো কাশ্মীরভঙ্গ।
বর্তমান ভূসত্তার কাশ্মীরকে শুধু কিছু অধিকারবঞ্চিত করাই নয়, গোটা মানচিত্রকে কেটে দুই ভাগ করা হলো জম্মু-কাশ্মীর ও লাখাদ। আর ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হলো দুটিই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলরূপে আখ্যায়িত (যদিও বলা হয়েছে জম্মু-কাশ্মীরে বিধানসভা থাকবে)। অর্থাৎ কাশ্মীর তার রাজ্যসত্তা হারাল। রাজনৈতিক-রাষ্ট্রনৈতিক দিক থেকে ভারতীয় কাশ্মীরের ওপর ভারত সরকারেরই তরবারিতে একটি মারাত্মক আঘাত। পরিণামে অনেক অনেক রক্ত ঝরবে কাশ্মীরের গা থেকে, বিশেষ করে জম্মু-কাশ্মীর অংশ থেকে।
বেশকিছু মৌলিক অধিকার তথা সুযোগ-সুবিধা হারাল কাশ্মীরের জনগণ। ভিন্ন জাতিসত্তা, ভিন্নভাষী মানুষ এখানে ভূমি কিনে স্থায়ী আবাস গড়ে তুলতে পারবে। কাশ্মীরের জনসংখ্যাগত ও জনচরিত্রগত পরিসংখ্যান এবং মনোচিত্রবদলের উদ্দেশ্য নিয়ে এ পরিবর্তন ঘটানো হলো। নামে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল, বাস্তবে সামরিক বাহিনী দ্বারা শাসিত হবে এই কাশ্মীর।
বঙ্গভঙ্গের প্রতিক্রিয়া সীমাবদ্ধ ছিল বঙ্গদেশ ভূখণ্ডে যদিও প্রবল আন্দোলনের মাধ্যমে। আর বিপরীতে দ্বিতীয় দফায় কাশ্মীরভঙ্গের প্রতিক্রিয়ার চরিত্র শুধু সর্বভারতীয়ই নয়, তা রীতিমতো আন্তর্জাতিক। শেষোক্তটির প্রকাশ পরিস্ফুট হবে ধীরেসুস্থে। তাৎক্ষণিক স্থানীয় প্রতিক্রিয়ায় কংগ্রেসের দলনেতা গোলাম নবি আজাদ বলেছেন, ‘সংবিধানকে হত্যা করা হলো।’ তবে কাশ্মীরের দুই সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর (গৃহবন্দী অবস্থায়) প্রতিক্রিয়া তীব্র। তাদের মতে, ‘দিনটি ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য কালো দিন। ১৯৪৭ সালে যে বিশ্বাস ও আস্থা নিয়ে কাশ্মীর ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল, মানুষের সে বিশ্বাস আজ ভেঙে দেওয়া হলো। এ পদক্ষেপ বিপজ্জনক।’ বিভাজন প্রসঙ্গে ১৯৪৭-এ সীমান্ত গান্ধীর একটি তীব্র মন্তব্য মনে পড়ছে। তিনি বলেছিলেন, ‘কংগ্রেস ভারত বিভাগ মেনে নিয়ে আমাদের নেকড়ের মুখে ফেলে দিলো।’ বাস্তবে তা-ই ঘটেছিল।
কাশ্মীরি নেতাদের প্রতিক্রিয়াও ওই বিশ্বাস হননের যদিও ধরনটা ভিন্ন। পি চিদাম্বরমের তীব্র আক্রমণও যুক্তিসঙ্গত। তার মতে, ‘ভারতের ভাঙন শুরু হয়ে গেছে।
আজ কাশ্মীর, কাল অন্য একটি রাজ্য, পরশু আরেকটি। প্রথমে রাষ্ট্রপতির শাসন, বিধানসভা ভাঙন, এর পর একাধিক বিভক্তি। দিনটিকে সত্যি কালো দিন ছাড়া অন্য কিছু বলা যায় না।’ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ বা মন্তব্য নিয়ে বিতর্কিত মমতা ব্যানার্জি ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবার জন্য উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন। বিশ্ব মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিক্রিয়াও বিরূপ।
গণতন্ত্রী ভারত, সেক্যুলার সংবিধানের ভারত বরাবর বিভাজনবিরোধী, ভূতাত্তি¡ক অখণ্ডতার পক্ষে রাজনৈতিক বাহাস চালিয়েছে বিজেপি ও গেরুয়াধারী সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতায় আসীন হয়ে সেসব মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়েছে। মনে হচ্ছে, বাবরি মসজিদের ছাদে হাতুড়ি-কুঠার আদভানি-উমা ভারতীয়দের প্রেতনৃত্য ভিন্ন প্রতীকে দেখা দিয়েছে কাশ্মীর ভঙ্গের মাধ্যমে। বঙ্গভঙ্গ রদ হয়েছিল। কাশ্মীরভঙ্গ রদ হবে কিভাবে, কোন আন্দোলনে, কাদের হাতে, কেন্দ্রে কাদের পদক্ষেপে এবং কবে? একমাত্র সময়ই তা বলতে পারবে।
লেখক : কবি, ভাষাসংগ্রামী, প্রাবন্ধিক ও গবেষক।